দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গ- শ্রী ত্র্যম্বকেশ্বর

© শ্রী সূর্য শেখর হালদার

শ্রী ত্র্যম্বকেশ্বর ( নাসিক)

এই জ্যোতির্লিঙ্গ মহারাষ্ট্রের নাসিক থেকে তিরিশ কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত। নাসিক প্রাচীন ভারতের এক বিশিষ্ট নগরী। ত্রেতাযুগে সূর্যবংশীয় রাজা দশরথের পুত্র হিসেবে জন্ম নিয়েছিলেন স্বয়ং শ্রীনারায়ন । পিতৃসত্য পালনের জন্য ভগবান শ্রীবিষ্ণুর অবতার
শ্রীরাম গিয়েছিলেন বনবাসে। আর অগস্ত্য মুনির পরামর্শে এই নাসিকের নিকট পঞ্চবটিতে অবস্থান করছিলেন সীতা ও লক্ষণ সহ । এইখানেই পদার্পণ করেন রাবণের বোন সূর্পনখা আর পতি হিসেবে পেতে চান
শ্রীরাম অথবা লক্ষণকে। অসঙ্গত এই দাবি মানেন নি কেউ। তাই তিনি সীতাকে হত্যা করতে অগ্রসর হন। এইসময় লক্ষণ তরবারির আঘাতে সূর্পনখার নাসিকা কর্তন করেন। সেই থেকেই গোদাবরী তীরস্থ এই জনপদের নাম হয় নাসিক। বৈদিক যুগে মহামুনি অগস্ত্য আশ্রয় গ্রহণ করেছিলেন এই স্থানের গোদাবরী উপত্যকায়। গোদাবরী নদীর উৎস ক্ষেত্রে তিনি ত্র্যম্বকেশ্বর শিবের উপাসনা শুরু করেন। পৃথিবীর প্রাচীনতম গ্রন্থ ঋকবেদেও ত্র্যম্বকেশ্বর শিবের উপাসনা র বর্ণনা পাওয়া যায় । নাসিকের আরেকটি বড় পরিচিতি হল এই যে, এই স্থানের গোদাবরী তীরে আয়োজিত হয় পৃথিবীর সর্ববৃহৎ মেলা কুম্ভ মেলা। সমুদ্রমন্থনের পর দেবরাজ ইন্দ্রের পুত্র জয়ন্ত যখন অমৃতকুম্ভ নিয়ে পালাচ্ছিলেন, তখন তিনি চারটি স্থানে অমৃত কুম্ভ রেখে বিশ্রাম নিয়েছিলেন। এই চারটি স্থানেই সামান্য অমৃত ছলকে পড়েছিল। এই চারটি স্থানের অন্যতম একটি হল নাসিক। বাকি তিনটি স্থান হল উজ্জয়িনী, প্রয়াগরাজ আর হরিদ্বার মহাতীর্থ। অতএব সন্দেহাতীতভাবেই প্রাচীন জনপদ নাসিক সনাতনী দের কাছে বড় পুণ্যস্থান।

শ্রী ত্র্যম্বকেশ্বর জ্যোতির্লিঙ্গ স্থাপনের বর্ণনা শিব পুরাণে উল্লিখিত হয়েছে । একবার মহর্ষি গৌতমের তপবনে বসবাসকারী ব্রাহ্মণদের পত্নীগণ কোন কারনে গৌতম পত্নী অহল্যার উপর অসন্তুষ্ট হন। তাঁরা তখন তাঁদের পতি দের মহর্ষি গৌতমের অপকার করার জন্য প্রেরণ করেন।

ব্রাহ্মণেরা তখন শ্রীগণেশের আরাধনা আরম্ভ করেন। তাঁদের আরাধনায় প্রকটিত হন শ্রীগণেশ এবং বর প্রার্থনা করতে বলেন। ব্রাহ্মণেরা বলেন:
” হে প্রভু আপনি যদি আমাদের উপর প্রসন্ন হয়ে থাকেন তাহলে কোন ভাবে ঋষি গৌতমকে এই আশ্রম থেকে বহিষ্কার করে দিন। “

কিন্তু, শ্রীগণেশ এইরূপ বর দিতে সম্মত হলেন না এবং তাঁদের এইরূপ বর না চাওয়ার জন্য বোঝাতে লাগলেন। কিন্তু ব্রাহ্মণেরা তাঁদের সিদ্ধান্তে অটল।

তখন শ্রী গণেশ ভক্তদের মন রাখার উদ্দেশ্যে একটি দুর্বল গাভীর রূপ ধারণ করে ঋষি গৌতম এর ক্ষেত্রে বিচরণ করতে লাগলেন। গাভীকে ফসল খেতে দেখে ঋষি একটি কুশ দিয়ে গাভীটিকে খুবই মৃদু আঘাত করলেন। দুর্বল গাভী এই কুশের আঘাতেই নিহত হল। চতুর্দিকে তখন হাহাকার পরে গেল। এইরূপ রটে গেল যে ঋষি গৌতম গোহত্যা করেছেন। সকল ব্রাহ্মণগণ ঋষি গৌতম কে
গোহত্যাকারী বলে নানা প্রকার তিরস্কার করতে লাগলেন। ঋষি গৌতম এই আকস্মিক দুর্ঘটনায় যারপরনাই বিস্মিত ও দুঃখিত হলেন। আর অন্য ব্রাহ্মণরা একত্রিত হয়ে তাঁকে বললেন, এই আশ্রম পরিত্যাগ করে দূরে অন্য কোথাও চলে যেতে, কারণ গো হত্যাকারীর সঙ্গে থাকলে তাঁদেরও পাপের ভাগী হতে হবে।

ঋষি গৌতম তখন তাঁর স্ত্রী অহল্যাকে নিয়ে এক ক্রোশ দূরে এক স্থানে বসবাস করতে শুরু করলেন। কিন্তু ব্রাহ্মণেরা সেখানেও তাঁর থাকা দুষ্কর করে তুলল। তাঁরা বলতে লাগলেন যে গোহত্যা করার ফলে ঋষি গৌতম এর এখন আর বেদ পাঠ করা বা যজ্ঞাদির আয়োজন করার কোন অধিকার নেই। ঋষি গৌতম তখন অত্যন্ত কাতর হয়ে ব্রাহ্মণদের অনুরোধ করলেন যে তাঁরা যেন তাঁকে তাঁর অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত করার উপায় জানিয়ে দেন।

তখন ব্রাহ্মণেরা বললেন: গৌতম তুমি সর্বত্র নিজমুখে তোমার পাপের কথা জানিয়ে তিনবার সমগ্র পৃথিবী পরিক্রমা কর । তারপর ফিরে এসে এখানে এক মাস ধরে ব্রত পালন কর। তারপর
ব্রহ্মগিরিকে একশত একবার পরিক্রমা করলে তোমার পাপ ক্ষয় হবে। অথবা এখানে গঙ্গা আনয়ন করে তার জলে স্নান করে এক কোটি পাথরের শিবলিঙ্গ নির্মাণ করে শিবের আরাধনা কর। তারপর পুনরায় গঙ্গা স্নান করে
ব্রহ্মগিরি কে এগারবার পরিক্রমা কর এবং পরে একশ ঘড়া পবিত্র জলে পাথরের শিবলিঙ্গ গুলিকে স্নান করালে তবেই তোমার মুক্তি হবে।

ব্রাহ্মণদের কথা অনুযায়ী মহর্ষি গৌতম সমস্ত কার্য সম্পন্ন করলেন এবং সপত্নী ভগবান শিবের আরাধনা করতে লাগলেন। ভগবান শংকর প্রসন্ন হয়ে প্রকট হলেন এবং তাঁকে বর প্রদান করতে ইচ্ছুক হলেন। তিনি বললেন:

” হে গৌতম, তুমি সদা সর্বতভাবে নিষ্পাপ। তোমাকে ছলনার দ্বারা গোহত্যাকারী বলা হয়েছে। যারা তোমার সঙ্গে ছলনা করেছে তাদের আমি শাস্তি দিতে চাই।”

মহর্ষি গৌতম বললেন:
“হে প্রভু তাদের নিমিত্তেই আমি আপনার দর্শন লাভ করেছি। তাই তাঁদের আমি আমার পরম হিতৈষী মনে করি । দয়া করে ওদের ওপর আপনি রাগ করবেন না।”

মহর্ষি গৌতম এর এইরূপ বাক্য দেবাদিদেবকে অভিভূত করল। তিনি গোদাবরীকে ওই অঞ্চল দিয়ে বয়ে যেতে নির্দেশ দিলেন। গোদাবরী বললেন ভগবান শংকর যদি সেখানে জ্যোতির্লিঙ্গ হিসাবে বিরাজ করেন, তবেই তিনি ওই স্থান দিয়ে সর্ব পাপহরা হয়ে প্রবাহিত হবেন । বহু ঋষি- মুনিগণ এবং মহর্ষি গৌতমও শিবকে জ্যোতির্লিঙ্গ হয়ে সেখানে থাকার জন্য প্রার্থনা করলেন। শিব সেই কথায় রাজি হলেন এবং ত্র্যম্বক জ্যোতির্লিঙ্গ নামে সেই স্থানে অবস্থিত হলেন গোদাবরীও সেখান দিয়ে প্রবাহিত হতে লাগল।

ত্র্যম্বকেশ্বর জ্যোতির্লিঙ্গ
ব্রহ্মগিরি পাহাড়ের নিকট অবস্থিত। গোদাবরীর তীরে রয়েছে কুশাবর্ত কুণ্ড। এই কুন্ডের চারপাশে অনেক দেবদেবীর মন্দির রয়েছে। তারই মধ্যে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে গোদাবরীর মন্দির আর অন্যপাশে ত্র্যম্বকেশ্বর এর
পঞ্চচুড় বিশাল মন্দির। অষ্টাদশ শতকে প্রাচীন মন্দিরের ভিত্তির উপরেই এই মন্দিরটি নির্মিত হয়। মন্দিরটি তৈরি করতে সময় লেগেছিল ৩১ বছর : খরচ হয় ১৬ লক্ষ টাকা। মন্দিরের তিনটি তোরণ। পূর্বদিকে প্রধান প্রবেশপথ। সামনেই দীপ স্তম্ভ ও ত্র্যম্বকেশ্বর এর ত্রিশূল। দক্ষিণ দিকের দেওয়ালের গায়ে পরপর ত্রিশটি শিবলিঙ্গ। ত্রিশূল এর সামনে নাট মন্দির, তারপর গর্ভগৃহ। গর্ভগৃহে প্রতিষ্ঠিত শিবলিঙ্গ ব্রহ্মা বিষ্ণু শিবের মুখ বিশিষ্ট লিঙ্গ মূর্তি। পাথরের লিঙ্গ মূর্তি রুপোর মুখ দিয়ে ঢাকা।

তীর্থযাত্রীরা কুশাবর্ত কুন্ডে স্নান করে ত্র্যম্বকেশ্বর জ্যোতির্লিঙ্গের পূজা দেন। এখানে সব সময়ই ভক্তরা আসেন। তবে ভিড় উপচে পড়ে বিশেষ কয়েকটি তিথিতে। শিব চতুর্দশী, দশহরা আর কার্তিক পূর্ণিমাতে মেলা বসে। কুম্ভ স্নানের সময় ভক্তেরা নাসিকে গোদাবরীর ঘাটে স্নান করে এসে ডুব দেন কুশাবর্তের কুন্ডেও।

এখানে এলে দেখতে পাওয়া যাবে যে, গোদাবরী নদী দুইটি শহরের মধ্য দিয়ে বয়ে গেছে। এই দুটি শহরের একটি হল নাসিক, আরেকটি পঞ্চবটি। কাছাকাছি অনেক মন্দির রয়েছে, যেমন শ্রীলক্ষ্মী নারায়ণ মন্দির, রামমন্দির, অগস্ত্য মুনির আশ্রম । পাশেই গোদাবরী ও কপিলা নদীর সঙ্গম। স্থানীয় মানুষের বিশ্বাস এখানে কপিলমুনির একটি আশ্রম ছিল। তার থেকেই সম্ভবত এই নদীর নাম কপিলধারা।

পঞ্চবটিতে রয়েছে ভেট মন্দির। এই ভেট মন্দির হল শ্রীরাম, লক্ষণ আর সূর্পনখার মন্দির। মারীচ বধের পর
শ্রীরাম ও লক্ষণ এর এখানেই দেখা হয়েছিল। পাশেই একটি কুটিরে রয়েছে শ্রীরাম ও লক্ষণ এর মূর্তি । একটু দূরে সীতা গুম্ফা। শোনা যায় খর ও দূষণের সঙ্গে যুদ্ধের সময় সীতা ওই গুম্ফায় আশ্রয় নিয়েছিলেন। পাশেই সীতা মাতার পূজা করা শিবমূর্তি।

গোদাবরীর দুই পারে রয়েছে দুটি বড় শিব মন্দির কপালেশ্বর ও নরোশংকর । নরোশংকর শিব মন্দিরের সামনে রয়েছে প্রসিদ্ধ ঘন্টা। বহুদূর থেকে সেই ঘন্টার ধ্বনি শোনা যায়। এছাড়াও পঞ্চ বটিতে কালা রামের মন্দির খুব বিখ্যাত । এখানে কালো কষ্টি পাথরে নির্মিত রামমূর্তি অবস্থান করছেন।

পুণ্যসলিলা , দক্ষিণের গঙ্গা গোদাবরী নদীর সৃষ্টিও এই নাসিকের নিকটস্থ ব্রহ্মগিরি পর্বত থেকে। সাতশো সিঁড়ি ভেঙে পৌঁছতে হয় গোদাবরীর উৎস কেন্দ্র। সামনেই একটি কুণ্ড। গুহা থেকে জলধারা বেরিয়ে এসে সেই কুন্ডে পড়ছে। কুণ্ডের ঠিক নিচেই শিবের মূর্তি। কুন্ডের জল শিবমূর্তি কে স্নান করিয়ে নেমে যাচ্ছে নীচে। পাশেই কোলাম্বিকা মন্দির । কে এই কোলাম্বিকা? শোনা যায় মহর্ষি গৌতম এর তপস্যার কারণে সন্তুষ্ট হয়ে দেবাদিদেব যখন তাঁর জটা থেকে গোদাবরীকে মুক্ত করেন, তখন প্রবাহমান গোদাবরীকে দেখে কোলহাসুর এর মনে কামভাব জেগে ওঠে। সে গোদাবরীর ওপর বল প্রয়োগ করতে যায় । তখন দেবী চণ্ডী কোলাম্বিকা রূপ ধারণ করে কোলহাসুরকে বধ করেন।

পবিত্র এই জ্যোতির্লিঙ্গ দর্শন করলে ভক্তগণ সকল প্রকার পুণ্য ফল অর্জন করে ন ।

তথ্যঋণ :

১. শিব ঠাকুরের বাড়ি: সোমনাথ। দেব সাহিত্য কুটির

২. ওঁ্ নমঃ শিবায় :
গীতাপ্রেস , গোরক্ষপুর।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!