আরএসএস-কে সন্ত্রাসবাদী সংগঠন হিসেবে প্রমাণ করতে পাকিস্তান ও লিবারালদের অপচেষ্টা

0
9

© শ্রী সূর্য শেখর হালদার

রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘকে সন্ত্রাসবাদী সংগঠনের তকমা আগেই দিয়েছিল ভারতের শহুরে বামপন্থী বুদ্ধিজীবী কুল। এবার তাঁদের দাবিকে সমর্থন করে সেই বার্তা নিয়ে রাষ্ট্রপুঞ্জের দরবারে পৌঁছে গেল পাকিস্তান। পাকিস্তান এই মুহূর্তে রাষ্ট্রপুঞ্জ অনুমোদিত সংস্থা FATF ( Financing Watchdog Financial Action Task) এর দ্বারা কালো তালিকাভুক্ত দেশ ঘোষণা হবার দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে আছে। প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য FATF সারা বিশ্বের সন্ত্রাসবাদী সংগঠনদের আর্থিক সমর্থনের বিষয়টি নজরদারি করে থাকে। এই সংস্থার প্রধান কার্যালয় হল প্যারিস। হাস্যকরভাবে পাকিস্তান এই সংস্থার কাছে আবেদন জানিয়েছে যে তারা যেন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের তহবিল নিষিদ্ধ ঘোষণা করে, কারণ রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ নাকি সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপে জড়িত।

সম্প্রতি পাকিস্তান সংসদে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে পাকিস্তান সংসদের কাশ্মীর কমিটির চেয়ারপারসন শাহরিয়ার আফ্রিদি এবং পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী সরদার আতিক খান দাবি করেন যে আরএসএস এর সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপে অর্থ সাহায্য করছে বিদেশে প্রতিষ্ঠিত ভারতীয় অভিবাসীগণ। এই বিষয়ে সতর্কীকরণ করে এই দুইজন জানান,
” এই অবস্থার গুরুত্ব বুঝে এবং দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করে এইসব বেআইনি আর্থিক লেনদেন বন্ধ করা উচিত। “

তাঁরা এই দাবি পেশ করেন রাষ্ট্রপুঞ্জ, FATF এবং অন্যান্য আর্থিক সংস্থা গুলির কাছে। তাঁরা বলেন,
” আর এস এস সেই অর্থ ব্যবহার করছে ভারত এবং কাশ্মীরে (ভারত ও কাশ্মীর পৃথকভাবে উল্লেখ লক্ষণীয়) ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উপর অত্যাচার ও তাদের হত্যা করার জন্য এবং হিন্দু মতাদর্শকে শ্রেষ্ঠ প্রমাণ করবার জন্য।”

তাঁরা আরো বলেন, “আরএসএসের সন্ত্রাসবাদীরা সারা ভারত জুড়ে সন্ত্রাসবাদী আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছে । এর মধ্যে রয়েছে 2006 খ্রিস্টাব্দে মালেগাঁও বোমা বিস্ফোরণ, হায়দ্রাবাদের মক্কা মসজিদে বিস্ফোরণ, সমঝোতা এক্সপ্রেসে বিস্ফোরণ, এবং আজমির শরীফ দরগাতে বিস্ফোরণ । আরএসএস পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের অভিবাসীদের থেকে অর্থ সংগ্রহ করছে এবং ভারতীয় দূতাবাস গুলি এই আর্থিক দান যাতে আরএসএস এর কাছে পৌঁছে যায়, তাতে সহযোগিতা করছে। আর এই সংগঠন (আরএসএস ) ভারত ও কাশ্মীরে মুসলিমদের হত্যা, গণপিটুনি তে অংশগ্রহণ এবং হিন্দুত্বের শ্রেষ্ঠত্ব প্রচার করছে ।”
আফ্রিদি এবং খান এই কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে দুঃখ প্রকাশ করে বলেন যে এই অবৈধ এবং বে-আইনি আর্থিক লেনদেনের দ্বারা আরএসএস এর অর্থ প্রাপ্তির বিষয় সম্পর্কে FATF নিশ্চুপ রয়েছে।

এই দুই নেতা আরো বলেন যে সারা বিশ্বের আর্থিক লেনদেনের উপর নজরদারি করার সংস্থা FATF এর অবশ্যই উচিত এই হিন্দু সংগঠনের (আরএসএস) সন্ত্রাসবাদী কাজে অর্থ সংগ্রহের বিরুদ্ধে এবং আর্থিক নয়-ছয় এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ।

প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য তাঁদের কর্তা তথা পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান ভারতের কাশ্মীর সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে জনমত তৈরি করতে আপ্রাণ চেষ্টা করছেন । এই দুই নেতা আরো বলেন যে ভারতীয় ফ্যাসিস্ট শক্তিরা কাশ্মীরিদের ওপর যে সন্ত্রাস চালাচ্ছে, সে বিষয়ে সারা বিশ্বকে সতর্ক করা প্রয়োজন।

এ কথা স্মরণে রাখা যেতে পারে যে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে পাকিস্তান সন্ত্রাসবাদকে আশ্রয় দেওয়ার জন্য সারা পৃথিবীতে অনেকাংশে এক ঘরে হয়েছে। এইদেশের অভ্যাসই হল একটি কাহিনী তৈরি করে নিজেদের সন্ত্রাসবাদীদের সাহায্য করার ইস্যু থেকে সবার মনোযোগ সরিয়ে দেওয়া। এটা করতে গিয়ে এই সন্ত্রাসবাদি রাস্ট্র যেটা করে থাকে, সেটা হল ভারতের বর্তমান শাসকদল ভারতীয় জনতা পার্টি এবং আরএসএসকে হিন্দু সন্ত্রাসবাদ বিস্তার করার অভিযোগে অভিযুক্ত করা। দুর্ভাগ্যের বিষয় যে ঠিক একই বক্তব্য ভারতের জাতীয় কংগ্রেস দীর্ঘদিন ধরে প্রচার করে আসছে। এক্ষেত্রে পাকিস্তানের কূটনীতির সঙ্গে কংগ্রেসের রাজনীতির যথেষ্ট সাদৃশ্য লক্ষণীয়। কিন্তু পরিহাসের বিষয় হল এই যে, যেখানে FATF পাকিস্তানকে ক্রমাগত নিচু রেটিং দিচ্ছে, সেখানে এই সন্ত্রাসী রাষ্ট্র বিশ্বজোড়া সন্ত্রাসের উপর নজরদারি করা সংস্থার কাছে ভারতের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবার দাবি করছে।

বিশ্বের সন্ত্রাসবাদ নজরদার FATF এই ফেব্রুয়ারীতে পাকিস্তানকে ধূসর তালিকাভুক্ত করেছে। FATF এর মধ্যেকার একটি বিভাগ International Cooperation Review Group পাকিস্তানকে ধূসর তালিকাভুক্ত করার প্রস্তাব অনুমোদন করেছিল, যেহেতু পাকিস্তান সন্ত্রাসী কার্যকলাপের আর্থিক সাহায্য কারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে অক্ষম হয়।

2019 খ্রিস্টাব্দের অক্টোবর মাসে FATF এর Asia Pacific group (APG) তার বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ করে। Mutual Evaluation Report of Pakistan নামক এই প্রতিবেদনে বলা হয় কিছু কিছু সাম্প্রতিক ব্যবস্থা গ্রহণ ছাড়া পাকিস্তান UNSCR 1267 শর্তাবলী রূপায়নের ক্ষেত্রে যথেষ্ট ব্যবস্থা গ্রহণে অসমর্থ হয়েছে । যেসব সংস্থা ও ব্যক্তি সন্ত্রাসবাদী তালিকাভুক্ত ছিল যেমন লস্কর-ই-তৈবা ( LET) / জামাত- উদ – দাওয়া (JUD) , ফালাহ – ই- ইনসানিয়াৎ ফাউন্ডেশন (FIF) এবং সন্ত্রাসের মূল কান্ডারী হাফিজ সাঈদ – এদের বিরুদ্ধে পাকিস্তান যথেষ্ট ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেনি।

আরএসএস এর বিরুদ্ধে পাকিস্তানের এই অভিযোগ প্রমাণ করে কাশ্মীর ও পাকিস্তান ইস্যুতে আরএসএসের তৈরি জনমত পাকিস্তান সরকারকে যথেষ্ট চাপে রেখেছে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে ভারতের অভ্যন্তরে একদল বামপন্থী বুদ্ধিজীবী এবং অবশ্যই জাতীয় কংগ্রেস তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষতার নামে আরএসএসকে অন্য সন্ত্রাসবাদী সংগঠনের সঙ্গে এক চোখে দেখে। বিভিন্ন মুসলিম সংগঠন এমনকি বেশকিছু মিডিয়া গ্রুপও একইভাবে আরএসএস কে সন্ত্রাসবাদী সংগঠনের তকমা দিয়ে থাকে। ভারতের অভ্যন্তরের এই প্রচার অবশ্যই পাকিস্তান সরকারকে উৎসাহিত করেছে। এই ঘটনা থেকে এটা প্রমাণ করা যায় যে দেশের অভ্যন্তরের একটা শক্তি বরাবরই পাকিস্তানকে শক্তিশালী করার কাজ গোপনে করে চলেছে। উভয়পক্ষের মধ্যে যোগাযোগের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

কিন্তু সত্যিই কি আরএসএস একটি সন্ত্রাসবাদি সংগঠন ? 1948 খ্রিস্টাব্দে মহাত্মা গান্ধীজী হত্যাকাণ্ডের পরে আরএসএস কে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিল সদ্য স্বাধীন ভারত সরকার। সেই সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন সরদার বল্লভ ভাই প্যাটেল। ভারত সরকারের গোয়েন্দা সংস্থা কোন প্রমাণ যোগার করতে পারেনি আরএসএস এর বিরুদ্ধে। তাই ব্যান তুলে নিতে হয় আরএসএসের ওপর থেকে। এরপর গঙ্গা দিয়ে বহু জল গড়িয়েছে। দেশের মানুষ দেখেছে আরএসএস স্বয়ংসেবক ও কার্যকর্তারা কিভাবে নিজেদের জীবন তুচ্ছ করে ঝাঁপিয়ে পড়েছে বিভিন্ন প্রাকৃতিক বিপর্যয় মোকাবিলাতে। 1962 খ্রিস্টাব্দে চীন-ভারত যুদ্ধের সময় আরএসএস যেভাবে ভারতীয় সৈন্যদের সহযোগিতা করে তা স্মরণ করেই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী পন্ডিত জহরলাল নেহেরু 1963 খ্রিস্টাব্দে সাধারণতন্ত্র দিবসের প্যারেডে আরএসএসকে অংশগ্রহণের আমন্ত্রণ জানান।

1965 খ্রিস্টাব্দে ভারত পাকিস্তান যুদ্ধের সময় এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় আরএসএস এর ভূমিকা আজও প্রশংসনীয়। সম্প্রতি Covid 19 এর বিশ্বজোড়া সংক্রমনের সময় আরএসএস স্বয়ং সেবক ও কার্যকর্তাদের দেখা গেছে অসহায় মানুষের পাশে ত্রাণ নিয়ে দাঁড়াতে। বর্তমানে এটি ভারতের তথা বিশ্বের সর্ববৃহৎ সামাজিক সংগঠন। এতদসত্ত্বেও কিছু দেশবিরোধী বুদ্ধিজীবী, মিডিয়া এবং রাজনৈতিক দল প্রচার চালিয়ে যাচ্ছে আরএসএস এর বিরুদ্ধে আর হাত শক্ত করছে পাকিস্তানের। তবে আশার কথা যে
ভারত সরকারের সফল কূটনীতি দেশদ্রোহীদের এই প্রচেষ্টাকে এখনো অব্দি সফলতার মুখ দেখতে দেয় নি।

We are not big media organisation. Your support is what keeps us moving. Don't hesitate to contribute because, work, for society needs society's support. Jai Hind.

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here