ভারতকে ব্রিটিশ শাসন মুক্ত করেন নেতাজি; গান্ধীজী নন: বাবাসাহেব আম্বেদকর

(১৯৫৫ খ্রিস্টাব্দের ফেব্রুয়ারি মাসে বি.বি.সি.কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বাবাসাহেব আম্বেদকর ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশের ভারত ত্যাগের কারণ বিস্তারিতভাবে জানান। পরবর্তীকালে তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ক্লিমেন্ট রিচার্ড এটলি স্বীকার করেন যে ভারতের ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের কাছে নেতাজি ছিলেন সবচেয়ে কঠিন প্রতিপক্ষ। প্রতিরক্ষা ও গোয়েন্দা দপ্তরের অনেক সুদক্ষ অফিসারও এ কথা স্বীকার করেন ।

মূল নিবন্ধটি রচনা করেছেন বিশিষ্ট নেতাজি গবেষক শ্রী অনুজ ধর। ২১ অক্টোবর ২০১৮ তে swarajyamag.com নামক ওয়েবসাইটে এটি প্রকাশিত হয়।)

আজও ভারতের সাধারণ জনগণ নেতাজির অন্তর্ধান রহস্য জানতে চায়। সত্তর বৎসর পরেও তারা সত্যের সন্ধানে আগ্রহী। নেতাজি আমাদের জাতির জন্য যে আত্মত্যাগ করেছেন , সেটাই এই অনুসন্ধানের কারণ বলে মনে করা যেতে পারে।

মহাফেজখানার তথ্য , যাঁরা সামনে থেকে এই ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছেন, তাঁদের সাক্ষ্য আর সাধারণ জ্ঞান দিয়ে বিচার করলে বোঝাই যায় নেতাজি ব্রিটিশদের উপর চরম আঘাত হেনেছিলেন। সত্য কথা বলতে কি, তাঁর ভাগ্যে কি ঘটেছিল কিভাবে এবং কোথায় প্রকৃতপক্ষে তাঁর দেহাবসান ঘটল, এইসব কুটু সত্যর সন্ধান আজও তাঁর পরিচিত মানুষজন পান নি।

রাজনৈতিক কারণেই ভারতের শাসকগণ 1947 খ্রিস্টাব্দে ক্ষমতা হস্তান্তরের পিছনে নেতাজির অনস্বিকার্য অবদানকে স্বীকার করেন না। সম্ভবত: তাঁর পরিবারের একজন এই ব্যাপারে ইতিমধ্যেই একজনকে বলেছেন । সংক্ষেপে বললে, যখন 1939 খ্রিস্টাব্দে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ আরম্ভ হয়, তখন ভারতে সেই ভাবে কোন স্বাধীনতা সংগ্রাম চলছিল না। শ্রী সুভাষ বোস এই অবস্থার মধ্যে সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন। তাই তিনি চেয়েছিলেন এই সময় জাতীয় কংগ্রেস ব্রিটিশদের ছয় মাসের মধ্যে ভারত ছাড়ার সূচনা দিয়ে একটি চরমপত্র দিক। কিন্তু মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বাধীন কংগ্রেস সাম্রাজ্যবাদী প্রভুদের বিরুদ্ধে এমন কিছু করতে রাজি ছিল না , যাতে সাম্রাজ্যবাদী শাসকের চাপ বেড়ে যায়। যাই হোক কংগ্রেস থেকে বহিস্কৃত নেতাজি ভারত ত্যাগ করেন, এবং আজাদ হিন্দ ফৌজের প্রধান হন । অনেকেই ভারতে বসে তখন আজাদ হিন্দ বাহিনী কে নিয়ে মস্করা করাতে নিয়োজিত ছিলেন। তাঁরা একবারও এটা ধর্তব্যের মধ্যে আনেননি যে কি পরিমান প্রতিকুলতার সঙ্গে লড়াই করে স্বল্প সময়ে শ্রী সুভাষ বোসকে এই বাহিনী সংগঠিত করতে হয়েছিল । তাঁরা পেশাদার, প্রশিক্ষিত ও সুবৃহৎ ভারতীয় সৈন্য বাহিনীর সঙ্গে আজাদ হিন্দ বাহিনীর তফাৎ করতে ব্যস্ত ছিলেন।

1942 খ্রিস্টাব্দে যখন আজাদ হিন্দ বাহিনী যুদ্ধ ক্ষেত্রে ব্রিটিশদের মোকাবিলা তে এগিয়ে এল, গান্ধীজী তখন ভারত ছাড় আন্দোলন ঘোষণা করলেন। 1939 খ্রিস্টাব্দে, অর্থাৎ অনেক আগেই নেতাজি এই ধরনের আন্দোলন করতে চেয়ে ছিলেন। এই আন্দোলন (ভারত ছাড় আন্দোলন )খুব দ্রুততার সঙ্গে ঘোষিত হয়, কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে মাত্র তিন সপ্তাহের মধ্যে এই আন্দোলন দমিত হয় । কয়েক মাস পরে এই আন্দোলন পুরোপুরিভাবে সমাপ্ত হয়।

গান্ধীজী যে ভারতের জন্য চমৎকার করেছিলেন , এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই । কিন্তু যদি বলা হয় ভারতছাড় আন্দোলনের জন্যই ভারত স্বাধীনতা প্রাপ্ত হয়েছিল, তাহলে তা সত্যের অপলাপ হয়। তাহলে কোন ঘটনা স্বাধীনতাপ্রাপ্তি ঘটাল? বাবাসাহেব আম্বেদকর এই প্রশ্নের একটি যুক্তিসঙ্গত উত্তর দেন। 1955 খ্রিষ্টাব্দের ফেব্রুয়ারি মাসে বি.বি.সি. এর ফ্রান্সিস ওয়াটসনের সঙ্গে এক খোলাখুলি সাক্ষাৎকারে বাবাসাহেব আম্বেদকর ব্রিটিশদের ভারত ছাড়ার কারণ বিবৃত করেন।

তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী রিচার্ড এটলির হঠাৎ করে ক্ষমতা হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত স্মরণ করে তিনি বলেন,
” আমি জানিনা হঠাৎ কিভাবে মিস্টার এটলি ভারতকে স্বাধীনতা দিতে রাজী হলেন। এটা একটা গোপন রহস্য যেটা তিনি তাঁর আত্মজীবনীতে উল্লেখ করবেন। কেউই এই সময় আশা করেননি, যে তিনি এইরকম কিছু করবেন।”

1956 খ্রিস্টাব্দের অক্টোবর মাসে বাবাসাহেব আম্বেদকর এর মৃত্যুর মাত্র দুই মাস আগে, ক্লিমেন্ট এটলি এই গোপন রহস্যের পর্দা ফাঁস করেছিলেন এক অন্তরঙ্গ ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় । আরও দুই দশক লেগেছিল এই গোপন কথাটি সাধারণ জনগণের কানে পৌঁছতে।

বাবাসাহেব অবশ্য মিস্টার এটলির এই স্বীকারোক্তিতে আশ্চর্যান্বিত হতেন না , কারণ তিনি আগেই এটা উপলব্ধি করেছিলেন । 1955 খ্রিষ্টাব্দে বি.বি.সি.কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বাবাসাহেব নিজের বিশ্লেষণী বুদ্ধি কাজে লাগিয়ে বলেছিলেন, যে দুটি বিষয় লেবার পার্টির (ক্লিমেন্ট এটলি র রাজনৈতিক দল) ভারতকে স্বাধীনতা দেবার সিদ্ধান্ত নেবার পিছনে কার্যকরী ভূমিকা নেয়।

আম্বেদকর এর মতে শ্রী সুভাষচন্দ্র বসু একটি জাতীয় বাহিনী তৈরি করেন। ব্রিটিশরা ভারত শাসন করছিল এই মজবুত বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে, যে দেশে যেরূপ রাজনৈতিক পরিস্থিতিই আসুক না কেন ; রাজনৈতিক নেতৃবর্গ যে সিদ্ধান্তই গ্রহণ করুন না কেন, সৈনিকরা তাদের আনুগত্য পরিবর্তন করতে পারবে না। এই বিশ্বাস ছিল ভারতে ব্রিটিশ শাসনের ভিত্তি, কিন্তু সেই ভিত্তি পুরোপুরিভাবে ধ্বংস হয়ে যায়, যখন নেতাজি আজাদ হিন্দ বাহিনী তৈরি করেন। ব্রিটিশরা দেখেছিল এখন সৈনিকদের নিয়ে দল গঠন করা যাবে, আর যদি এই রকম হয় তাহলে সেই সৈন্যদল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভিত্তি কে সম্পূর্ণরূপে উড়িয়ে দেবে।

আজকের দিনে যদি আমরা জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা শ্রী অজিত ডোভাল থেকে শুরু করে মেজর জেনারেল জি.ডি. বক্সী এবং অন্যান্য বিশেষজ্ঞদের দেওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করি , তাহলে দেখব বাবাসাহেব এর কথা সত্য বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে।

এই প্রসঙ্গে দেখা যেতে পারে তৎকালীন গুপ্তবার্তা সংস্থার অধ্যক্ষ নর্মান স্মিথের গোপন প্রতিবেদন যা 1945 খ্রিস্টাব্দের নভেম্বর মাসে প্রকাশিত হয়েছিল। তিনি সেই প্রতিবেদনে লেখেন, ” আজাদ হিন্দ বাহিনীর বিষয়টিকে নিয়ে একটি অস্থিরতার অবস্থা তৈরি হয়েছে। এটা বলা যেতে পারে যে আর কোন বিষয় এইভাবে ভারতীয় জনমানসে এত প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি । এখানে একটা সহানুভূতির হওয়া কাজ করছে। ভারতের জাতীয় বাহিনীর নিরাপত্তার বিষয়টি উড়িয়ে দেওয়া মুর্খামি র কাজ হবে।”

লেফটেন্যান্ট জেনারেল এস. কে. সিনহা ,যিনি জম্মু ও কাশ্মীর এবং আসামের প্রাক্তন রাজ্যপাল ছিলেন, তিনি এমন একজন অফিসার যে 1946 খ্রিস্টাব্দে তিনি ছিলেন নিউ দিল্লির সামরিক কার্যকলাপের পরিচালন দপ্তরে নিয়োজিত । তিনি সেসময়ের পরিস্থিতি স্মরণ করে 1976 খ্রিস্টাব্দে জানান,
” সেই সময় ভারতীয় সেনাবাহিনীতে আজাদ হিন্দ এর প্রতি যথেষ্ঠ সহানুভূতি ছিল এবং এটা সত্যি যে ব্রিটিশদের মনে সে সময় আরেকটি 1857 খ্রিস্টাব্দের মহাবিদ্রোহের ভয় কাজ করছিল।

এই যুক্তির সঙ্গে সহমত পোষণ করেই একদল ব্রিটিশ সাংসদ ক্লিমেন্ট এটলির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তাঁরা এটলিকে বলেন, যে সাধারণের চাহিদা মেটানোর জন্য তাদের সামনে দুটি রাস্তা আছে
(ক ) তাঁদের নিজেদের ভারত ছেড়ে চলে যাওয়া।
( খ ) তাঁদের ভারত থেকে বিতাড়িত হবার জন্য অপেক্ষা করা ।
এই দ্বিতীয় রাস্তা সম্পর্কে তাঁরা বলেন, যে ভারতীয় সৈন্যবাহিনীর আনুগত্য এখন আর প্রশ্নাতীত নয়। আজাদ হিন্দ বাহিনী এখন জাতীয় বীরের সম্মান পাচ্ছে।

এভাবেই পরাজিত হওয়া সত্বেও নেতাজি ভারতের ব্রিটিশ শাসনের ভিত্তিকে টলিয়ে দেন। আর তারপর যে সময় ভারতের সবচেয়ে বেশি দরকার ছিল তাঁকে, তখনই তিনি অন্তর্হিত হন।

শ্রী সুভাষ বসুর কাছে কৃতজ্ঞ থাকার সুবাদে আমাদের কি জানার চেষ্টা করা উচিত নয় যে শেষপর্যন্ত তাঁর কি হয়েছিল ?এখনকার প্রজন্ম যদি এতটা জানতে পারে, তাহলে পূর্ববর্তী প্রজন্ম কি এগুলো জানত না?

অনুবাদক: শ্রী সূর্য শেখর হালদার।

One thought on “ভারতকে ব্রিটিশ শাসন মুক্ত করেন নেতাজি; গান্ধীজী নন: বাবাসাহেব আম্বেদকর

  • August 19, 2020 at 6:24 am
    Permalink

    @anuj dhar & @surjo sekha haldar , apnader kache jane nite chai Babasaheb Ambedkar r likha kon authentic book a ai golpo uni bolechen? nischoi e desher swadhinata pete bir Subhas Chandra Bose ulekhjoggo bhumika palon korechen,🙏.kintu tabole Mahatma Gandhi obodan k khato kora bodhhoy uchit hoyni.samogrik mass movement ki,seta Gandhi ji e bujhiyechen.oi ekta manush gota desh k netritva diyechen.unar bhumika bichar korar manosikta khub Kom jon r e ache.

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!