দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গ- শ্রী ভীমাশংকর

© শ্রী সূর্য শেখর হালদার

শ্রী ভীমাশংকর ( পুনা)

ষষ্ঠ জ্যোতির্লিঙ্গ
শ্রী ভীমাশংকর এর অবস্থান মহারাষ্ট্রের পুনে নগরের কাছে সহ্যাদ্রি পর্বতে। আবার অনেকে মনে করেন অসমের গুয়াহাটির কাছে ব্রহ্মপুর পর্বতে অবস্থিত শিবলিঙ্গ
(শ্রী ভীমেশ্বর ) হলেন ষষ্ঠ জ্যোতির্লিঙ্গ। অর্থাৎ ষষ্ঠ জ্যোতির্লিঙ্গের অবস্থান নিয়ে কিছু মহলে দ্বিমত আছে। এই জ্যোতির্লিঙ্গ যেখানেই স্থাপিত হোক না কেন এই জ্যোতির্লিঙ্গের বিবরণ আমরা পাই শিব পুরাণের ১৯ থেকে২১ তম অধ্যায় তে। এই জ্যোতির্লিঙ্গের উদ্ভবের ইতিহাস এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে রামায়ণ এবং মহাভারত এর কথা।

প্রাচীনকালে ভীম নামে এক মহাবল রাক্ষস ছিলেন । এই মহাপ্রতাপশালী রাক্ষস এক পাহাড়ের গুহায় তাঁর মায়ের সঙ্গে থাকতেন। সেই স্থান ছিল গভীর অরণ্যানীর মধ্যে এক নির্জন অঞ্চল। শুধু ভীম আর তার মা। একাকিত্বের জ্বালায় হাঁপিয়ে ওঠেন ভীম । একদিন তাঁর মাকে জিজ্ঞাসা করেন, কেন তাঁরা এই জনহীন স্থানে থাকেন? তাঁর বাবাই বা কোথায় থাকেন ?

ভীমের মা জানতেন যে ছেলে একদিন এই প্রশ্ন করবেই তিনি তখন বলেন যে তাঁর বাবা ছিলেন মহাবীর কুম্ভকর্ণ। তিনি শ্রী রামের হাতে যুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছিলেন তারপর থেকে লঙ্কা ধাম ছেড়ে এখানে এই নির্জন গুহায় তিনি ভীমকে নিয়ে বাস করছেন।

এই কথা শুনে ভীম প্রবল ক্রুদ্ধ হলেন। তিনি চাইলেন স্বর্গ মর্ত্য পাতাল এর অধীশ্বর হতে আর সমস্ত স্থানে রাক্ষসরাজ প্রতিষ্ঠা করতে। শ্রীহরিকে বধ করার অভিপ্রায় ও ছিল তাঁর। অতএব তিনি শুরু করলেন কঠোর তপস্যা । দিনের পর দিন ধরে চলল তপস্যা। শেষ পর্যন্ত ব্রহ্মার বলে বলীয়ান হলেন ভীম। ব্রহ্মা তাঁকে দিগ্বিজয়ী হবার পর প্রদান করলেন।

ব্রহ্মার আশীর্বাদ লাভ করার পরেই ভীম বেরিয়ে এলেন গুহা ছেড়ে, আর আক্রমণ করলেন স্বর্গরাজ্য। যুদ্ধে পরাজিত হয়ে দেবলোক থেকে বহিস্কৃত হলেন ইন্দ্রাদি সহ সমস্ত দেবতা। স্বয়ং শ্রীবিষ্ণু কেও বৈকুণ্ঠধাম ছেড়ে পালাতে হল। স্বর্গরাজ্য করতলগত হল কুম্ভকর্ণ পুত্র ভীমের।

স্বর্গরাজ্য জয়ের পর ভীমের চোখ পরল পৃথিবীর দিকে।
অচিরেই পৃথিবীর উপরে অধিকার প্রতিষ্ঠা হল তাঁর। ভীমের অত্যাচারে কাঁপতে লাগল মর্ত্যলোক। বন্ধ হল দেব-দেবীর পূজা ,ঋষিদের সাধনার পথ । রাজারা হলেন রাজ্য হারা, প্রজারা হলেন অসহায় । ভীমের দোর্দণ্ড প্রতাপে পৃথিবী তখন কাঁপছে থর থর করে, আর অত্যাচারিত মানুষের দীর্ঘশ্বাসে ভারী হয়ে উঠেছে আকাশ বাতাস।

এই সময় সুদক্ষিণ নামে এক রাজা ছিলেন। তিনি ছিলেন পরম শিব ভক্ত।
( অনেকের মতে সুদক্ষিণ ছিলেন কামরূপের রাজা। যাঁরা সুদক্ষিণ কে কামরূপের রাজা বলে মনে করেন, তাঁদের মতে ষষ্ঠ জ্যোতির্লিঙ্গ হলেন শ্রীভীমেশ্বর, যাঁর অবস্থান গৌহাটির কাছে ব্রহ্মপুর পাহাড়ে।)
ভীমের চোখ পড়লো রাজা
সুদক্ষিণের উপর । প্রথমে আদেশ জারি হল যে সসাগরা এই পৃথিবীতে মহামতি ভীম ছাড়া আর কারো অর্চনা করা চলবে না। কিন্তু রাজা সুদক্ষিণ আদেশ মানবেন না । অতএব সুদক্ষিণ কে আক্রমণ করলেন ভীম, এবং তাঁকে যুদ্ধে পরাজিত করে তাঁর মন্ত্রী মন্ডল ও অনুচরসহ তাঁকে বন্দী করলেন।

এই ঘটনার পরে সমগ্র বিশ্বে ভীমের অধিকার কায়েম হল। তাঁর অত্যাচারে বেদ-পুরাণ শাস্ত্র এবং স্মৃতি গ্রন্থ সমূহ সর্বত্র একেবারে লোপ পেয়ে গেল। যাগ-যজ্ঞ, দান, তপস্যা ইত্যাদি কার্য এবং ধর্মাচরণ একেবারে বন্ধ হয়ে গেল । অত্যাচারের ভয়াবহতায় হতভম্ব হয়ে মুনি-ঋষি এবং দেবগণ শরণাপন্ন হলেন ভগবান শিবের। তাঁদের প্রার্থনা শুনে ভগবান শিব বললেন,

” আমি শীঘ্রই অত্যাচারী রাক্ষসকে সংসার করব । কেননা সে আমার প্রিয় ভক্ত রাজার সুদক্ষিণকে তার সেবক সমেত বন্দি করেছে। এই অত্যাচারী অসুরের অধিক দিন জীবিত থাকার অধিকার নেই।”

ভগবান শঙ্করের এই আশ্বাসবাণী শুনে মুনি, ঋষি ও দেবগন নিজ নিজ স্থানে ফিরে গেলেন।

এদিকে রাক্ষস ভীমের বন্দিশালায় রাজা সুদক্ষিণ ভগবান শিবের ধ্যান করতে লাগলেন। তিনি সামনে একটি পাথরের শিবলিঙ্গ রেখে পূজা করছিলেন । তাঁকে পূজা করতে দেখে ভীম ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে গেলেন এবং তরবারি দিয়ে সেই পাথরের শিবকে প্রহার করতে গেলেন। কিন্তু তাঁর তরবারি সেই শিবলিঙ্গ কে স্পর্শ করতে পারল না । তার পূর্বেই শিব লিঙ্গ থেকে আবির্ভূত হলেন স্বয়ং মহেশ্বর। তাঁর কন্ঠ থেকে বেরিয়ে এলো ভয়ঙ্কর রুদ্র রব । সেই রুদ্র রবে ভীম এবং তাঁর সমস্ত সঙ্গী-সাথীদের মৃত্যু ঘটল।

দেবতারা এসে শিবকে পূজা করতে লাগলেন। রাজা সুদক্ষিণ যুক্তকরে ভগবান শঙ্করের কাছে নিবেদন রাখলেন;

“হে প্রভু আপনি যখন প্রকট হয়েছেন, তখন এখানেই এই লিঙ্গ মূর্তিতে অধিষ্ঠান করুন।”

ভগবান শংকর ভক্তের নিবেদনে সাড়া দিয়ে সেখানেই শ্রী ভীমাশংকর নামে, জ্যোতির্লিঙ্গ রূপে অবস্থান করতে লাগলেন।

শ্রী ভীমাশংকর মন্দির যে স্থানে অবস্থিত, সেখানে মহাভারতের অন্যতম চরিত্র মধ্যম পাণ্ডব ভীমকে নিয়েও একটি কাহিনী প্রচলিত আছে যা এই জ্যোতির্লিঙ্গের ইতিহাসের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত। পান্ডবদের বনবাস এর শেষের দিকে তাঁরা একটা বছর কাটিয়েছিলেন এই সহ্যাদ্রি পর্বতে । সহ্যাদ্রি পর্বতের আজকের নাম পশ্চিমঘাট পর্বতমালা আর এই পর্বতমালার পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে কৃষ্ণা নদী । কৃষ্ণা নদীর সঙ্গে মিশেছে আর একটি নদী যার নাম ভীমা। এই নদীর উৎসে পৌঁছে মহামতি ভীম দেখলেন সেখানে একটি সুন্দর ঝর্না অবস্থান করছে । গভীর নির্জন অরণ্যে সেই সুন্দর ঝর্ণার পাশে একটি শিবলিঙ্গ প্রতিষ্ঠা করলেন ভীমসেন, এবং শুরু করলেন শিবের আরাধনা ।

বনবাস পর্ব শেষ হয়ে গেলে পাণ্ডবেরা ফিরে গেলেন ইন্দ্রপ্রস্থ । আর গভীর অরণ্যের জনহীন প্রান্তরে পড়ে রইলেন সেই শিবলিঙ্গ। পরে বনবাসী ভীলরা আবিষ্কার করলেন এই শিবলিঙ্গ এবং ছোট্ট একটি মন্দির নির্মাণ করে শুরু করলেন পূজা। এই জ্যোতির্লিঙ্গের নাম ভীমেশ্বর হওয়ার পিছনে এটি একটি অন্যতম কারণ। ভীমা নদীর উৎস স্থানে মন্দির নির্মিত বলে লোকমুখে এই জ্যোতির্লিঙ্গ ভীমাশংকর নামেও পরিচিত।

প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য, যে গভীর অরণ্যে এই জ্যোতির্লিঙ্গের অবস্থান, সেখানে বাস করত কোল ও ভীল জাতির বনবাসিরা। এই ভীল উপজাতি দের মধ্যেও এই জ্যোতির্লিঙ্গ বিষয়ে একটি কাহিনী প্রচলিত আছে। কথিত আছে যে ভীলদের আদিপুরুষ একবার শিকারে বেরিয়ে একটি বরাহের পিছনে তাড়া করেন। বরাহটি অনেক পথ এগিয়ে এসে এক পর্বত গুহার মধ্যে লুকিয়ে পরে। পর্বত গুহার মধ্যে ভীল সর্দার প্রবেশ করেন, কিন্তু তিনি সেখানে বরাহটিকে দেখতে পান না : দেখতে পান একটি শিবলিঙ্গ। এই লিঙ্গ মূর্তির পাশ থেকে কুলু কুলু ধ্বনি তে থেকে নির্গত হচ্ছিল স্বচ্ছ জলধারা। ভীল সর্দার তখন সেই লিঙ্গ মূর্তি পূজা করেন এবং সেই থেকেই সেই মূর্তির নাম হয় ভীলশঙ্কর আর নদীটির নাম হয় ভীল নদী । কালের আবর্তনে
ভীলশঙ্কর হয়ে যান ভীমাশংকর আর ভীল নদী হয়ে যায় ভীমা নদী।

শ্রী ভীমাশংকর জ্যোতির্লিঙ্গের সঙ্গে ভীল সম্প্রদায়ের এই সংযোগ বিশেষভাবে লক্ষণীয়। এই কাহিনী বুঝিয়ে দেয় বনবাসীরাও এই সনাতন ধর্ম ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। এখনো বনবাসী
ভীলগণ এই জ্যোতির্লিঙ্গকে নিজেদের দেবতা বলেই মনে করেন। শিবরাত্রির সময় এখানে বড় মেলা বসে। কয়েকদিন ধরে চলে সেই উৎসব এবং সেই উৎসবে অংশগ্রহণ করেন বনবাসী সম্প্রদায়ের মানুষ।

শ্রী ভীমাশংকর
জ্যোতির্লিঙ্গটি সুপ্রাচীন। মন্দিরটিও বহু পুরানো। মন্দিরের অবস্থান অত্যন্ত নির্জন স্থানে। ছত্রপতি শিবাজীর গুরু
শ্রী রামদাসস্বামী এই নির্জন পরিবেশে শিবের আরাধনা করতেন । শিবাজী তা জানতে পেরে তানাজি কে এই মন্দির তৈরি করার আদেশ দেন। বর্তমানে সেই মন্দিরেই আছেন শ্রী ভীমাশংকর।

মন্দিরের সামনেই আছে নাটমন্দির। অপরূপ তার কারুকার্য । চারিদিকে বনানী এবং বড় বড় গাছের ছায়া শীতল রেখে দিয়েছে সেই অঞ্চলটিকে। এই শিবলিঙ্গের সঙ্গে রামায়ণ এবং মহাভারতের একজন করে চরিত্রের সংযোগ এই জ্যোতির্লিঙ্গের প্রাচীনতাকে তুলে ধরে । এই জ্যোতির্লিঙ্গের মহিমা অমোঘ। এই জ্যোতির্লিঙ্গ দর্শন ও পূজন করলে ভক্তের সকল মনস্কামনা পূর্ণ হয়।

” যং ডাকিনীশাকিনিকাসমাজে নিষেব্যমাণং পিশিতাশানৈশ্চ।
সদৈব ভীমা বিপদ প্রসিদ্ধং তং শঙ্করং ভক্তহিতং নমামি।।”

তথ্য ঋণ:

১. শিব ঠাকুরের বাড়ি: সোমনাথ।
দেব সাহিত্য কুটির।

২. ওঁ্ নমঃ শিবায় : গীতা প্রেস, গোরক্ষপুর।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!