১৭৫৩ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত হয় শ্রীরামপুরের রামসীতা মন্দির!

© শ্রী সূর্য শেখর হালদার

বিগত ৫ আগস্ট শ্রীরামের জন্মভূমি অযোধ্যা নগরী তে অনুষ্ঠিত হল ভব্য রামমন্দির এর ভূমি পূজন কার্যক্রম। সারা পৃথিবীর রাম ভক্ত দের কাছে এ এক বিরাট দিন। ভারত তথা সমগ্র দক্ষিণ এশিয়া তে পূজিত হন শ্রীরাম । ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে অদ্ভুত জনপ্রিয়তা মর্যাদা পুরুষোত্তম শ্রীরামের। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে রয়েছে তাঁর মন্দির । পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য ও তার ব্যতিক্রম নয়। তবে পশ্চিমবঙ্গে রাম মন্দির এর কথা বললেই আমাদের মনে আসবে হাওড়া র রামমন্দির এর কথা। এই সুপ্রাচীন রামমন্দির এর নাম অনুসারে সেই স্থানের নাম হয়েছে রামরাজাতলা । এই হাওড়া নগর থেকে রেলপথে ২০ কিমি দূরেই অবস্থিত
শ্রীরামপুর। এই প্রাচীন নগর হুগলি জেলার অন্তর্গত। এখনও রয়েছে প্রাচীন এক রামমন্দির। বলা বাহুল্য এই রামমন্দির এর জন্যই নগরের নাম হয় শ্রীরামপুর।

হাওড়া-ব্যাণ্ডেল  রেলপথে  শ্রীরামপুর অষ্টম  রেলস্টেশন।    গ্রান্ট  ট্রাঙ্ক  রোড  এই  শহরের  উপর  দিয়ে  চলে  গেছে।  ১৭৫৩  খ্রীষ্টাব্দে  শেওড়াফুলির  রাজা  রাজচন্দ্র  রায়  এখানে  রামসীতার  মন্দির  নির্মাণ  করেন।    ১৭৫৭  খ্রীষ্টাব্দে  ডেনীশ  বা  দিনেমাররা  ডেনমার্কের  তৎকালীন  রাজা  পঞ্চম  ফ্রেডরিকের  নামানুসারে  এই  শহরের  নাম  রাখেন  ফ্রেডরিক  নগর।  শ্রীপুর,  আকনা,  গোপীনাথপুর,  মোহনপুর  ও  পেয়ারাপুর  এই  পাঁচটি  স্থান  নিয়ে  ফ্রেডরিক  নগর  গঠিত  হয়।  বার্ষিক  ১৬০১  সিক্কা  টাকা  খাজনায়  দিনেমাররা  শেওড়াফুলি-রাজের  কাছ  থেকে  এই  স্থানগুলি  ইজারা  নেয়।  ১৮৪৫  খ্রীষ্টাব্দে  ইংরাজরা  ডেনীয়দের  কাছ  থেকে  এই  শহরটিকে  কিনে  নেন এবং শ্রীরামপুরের নাম পুনরায় শ্রীরামপুর হয়। আগে  শ্রীরামপুর  মহকুমা  ছিল  না।  ইংরাজদের  হাতে  আসার  পর  ১৮৪৭  খ্রীষ্টাব্দে   দ্বারহাট্টা  মহকুমার  বদলে  শ্রীরামপুর  মহকুমা  হয়।  

  শ্রীরামপুর  স্টেশন  থেকে  ২  কিমি  দক্ষিণে  বটতলার  কাছে  রামসীতা  লেনে  অবস্থিত এই  রামসীতার  মন্দির।  অল্প  উঁচু  ভিত্তিবেদির  উপর  স্থাপিত,  ত্রিখিলানযুক্ত,  পশ্চিমমুখী,  ছোট  দালান  মন্দির।  গর্ভগৃহের  সামনে  অলিন্দ,  তার  সামনে  রোয়াক।  মন্দিরটি  গাছ-গাছালিতে  ভরা।  গর্ভগৃহে  ঢোকার  একটিই  প্রবেশদ্বার।  গর্ভগৃহে  একটি  কাঠের  সিংহাসনে  শ্রীরামচন্দ্র,  লক্ষণ,  সীতাদেবী , হনুমান ও
জাম্ববান এর মূর্তি  বিরাজমান।  এছাড়া  অন্যান্য  বিগ্রহও  আছেন।   

 শেওড়াফুলি  ( পূর্বনাম  সাড়াপুলি )  রাজবংশের  প্রতিষ্ঠাতা  রাজা  মনোহর  চন্দ্র  রায়ের  পুত্র  রাজা  রাজচন্দ্র  রায়  ৭ ই  জ্যৈষ্ঠ,  ১১৬০  বঙ্গাব্দে  (  ১৭৫৩  খৃষ্টাব্দে )  মন্দির  ও  বিগ্রহগুলি  প্রতিষ্ঠা  করেন।  তিনি  বিগ্রহের  সেবা  নির্বাহের  জন্য  তিন  শ’  বিঘা  জমি  দেবোত্তর  করেন।  কিন্তু  সেই  জমির  কিছুই  আজ  মন্দির  কর্তৃপক্ষের  হাতে  নেই।  শ্রীরামচন্দ্রের  নামে  শ্রীপুর,  মোহনপুর  ও  গোপীনাথপুর  এই  তিনটি  গ্রামের  মিলিত  নাম  হয়  শ্রীরামপুর।  ডক্টর  হেমেন্দ্রনাথ  দাশগুপ্ত  লিখেছেন,  “শ্রীপুর,  মোহনপুর  ও  গোপীনাথপুর  নামক  তিনটি  গ্রাম  শ্রীরামচন্দ্র  বিগ্রহের  সেবায়  দেবোত্তর  করেছিলেন  বলে  গঙ্গাতীরস্থ  শ্রীরামপুর  তীর্থস্থান।”

 মন্দিরে  সকল  বিগ্রহ  নিত্য  পূজিত।  মন্দিরে  নিত্য  পূজা  ছাড়াও  রামনবমীতে  তে  বড়  করে উৎসব পালিত হয়।
এছাড়াও স্থানীয় রাম ভক্তেরা দেওয়ালি র সময় প্রদীপ প্রজ্জ্বলন করেন। বছরের অন্যান্য দিনে রাম ভক্তরা এই মন্দির চত্বরে রাম নাম করে থাকেন। দুর্ভাগ্য যে রাজা রাম এর মন্দির বর্তমানে জরাজীর্ণ অবস্হা, কিন্তু শরিকি দ্বন্দ্বে সারাই করা যাচ্ছে না এই মন্দির।

যাইহোক, এই রামমন্দির শ্রীরামপুরের ঐতিহ্য। যাঁদের মনে হচ্ছে যে শ্রীরাম এর সঙ্গে
বাংলার সংস্কৃতির যোগাযোগ নেই, তাঁরা এই মন্দিরে এসে একটু দেখে যেতে পারেন। ১৮১৮ খ্রিস্টাব্দে তৈরি হওয়া শ্রীরামপুর কলেজ যদি বাংলার ঐতিহ্য হয় তবে শ্রীরামপুরের রাম মন্দির ও আমাদের ঐতিহ্য।

🚩🏹 জয় শ্রীরাম🚩🏹

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!