দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গ- শ্রী কেদারনাথ

© শ্রী সূর্য শেখর হালদার

শ্রী কেদারনাথ (হিমালয়)

হিন্দু পুরাণ এবং শাস্ত্র গ্রন্থগুলিতে শ্রী কেদারেশ্বর বা
শ্রী কেদারনাথ জ্যোতির্লিঙ্গের মহিমা বারংবার বিবৃত হয়েছে। এই পবিত্র জ্যোতির্লিঙ্গ হিমালয় পর্বতের কেদার শৃঙ্গে অবস্থিত। সংস্কৃত ভাষায় ‘ কেদার ‘ শব্দের অর্থ অপরাজেয় বা শক্তিশালী। কেদার মহাদেবের আরেক নাম। এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অবর্ণনীয়। কেদার শৃঙ্গের পশ্চিম ভাগে পুণ্যবতী মন্দাকিনী নদী তটে অবস্থিত শ্রী কেদারেশ্বর জ্যোতির্লিঙ্গ। এই জ্যোতির্লিঙ্গ ধর্ম ও আধ্যাত্মিক পথে অগ্রসর হবার বার্তা দেয়। শৃঙ্গের পূর্বদিকে বয়ে চলেছে সুরম্য অলকানন্দা নদী। এই পবিত্র নদীর তটে ই অবস্থিত শ্রী বদ্রীনাথ এর পরম প্রসিদ্ধ মন্দির। অলকানন্দা ও মন্দাকিনী এই দুই নদী রুদ্রপ্রয়াগ এসে মিলিত হয়েছে। উভয় নদীর সংযুক্ত ধারা হিমালয়ের আরো নীচে দেবপ্রয়াগ এসে ভাগীরথী ও গঙ্গার সঙ্গে মিলিত হয়েছে। তাই একথা বলা যায় যে, পুণ্যতোয়া গঙ্গা তে অবগাহন করলে শ্রী কেদারেশ্বর এবং
শ্রী বদ্রীনাথ এর চরণ ধৌত
কারী জল স্পর্শ করার সুযোগ পাওয়া যায়।

পুরাণে এই পবিত্র পুণ্য ফলদায়ী জ্যোতির্লিঙ্গ স্থাপনের বিষয়ে বলা হয়েছে, যে অনন্ত রত্নের জনক, অত্যন্ত পবিত্র, তপস্বী- ঋষি- সিদ্ধ ও দেবগনের বাসভূমি নগাধিরাজ হিমালয়ের কেদার নামক অত্যন্ত সুরম্য শৃঙ্গের উপর মহাতপস্বী শ্রীনর ও ঋষি নারায়ন অনেক বছর ধরে শিবকে প্রসন্ন করবার নিমিত্তে তপস্যা করছিলেন। তাঁরা কয়েক হাজার বছর ধরে অনাহারে ,এক পায়ে দাঁড়িয়ে শিব নাম জপ করতে থাকেন। ‘ ওঁ্ নম: শিবায় নম:’ ‘ এই পবিত্র মন্ত্রে মুখরিত হয়ে ওঠে হিমালয়ের আকাশ বাতাস। নর ও নারায়ণ একাগ্রচিত্তে চালাতে থাকেন শিবের ধ্যান। দেবাদিদেবের দেখা না পেলে তারা উঠবেন না আসন ছেড়ে। তাঁদের তপস্যা স্থলের সামনেই তারা তৈরি করেন এক শিবলিঙ্গ।

এই শিবলিঙ্গের সামনে তাঁদের এই শিব আরাধনা সকল বিশ্ববাসীর আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। দেবতা, ঋষি, মুনি, যক্ষ ,গন্ধর্ব সকলেই প্রশংসা করতে থাকেন তাঁদের এই সংযম ও সাধনার। পিতামহ ব্রহ্মা এবং পালনকারী ভগবান বিষ্ণুও নর আর নারায়ণের ভূয়সী প্রশংসা করতে থাকেন। শেষে স্বয়ং ভূতনাথ তাঁদের কঠিন সাধনায় প্রসন্ন হন এবং প্রকটিত হয়ে দুই ঋষিকে দর্শন দেন।

সাধক ঋষিদ্বয় আনন্দে বিহ্বল হয়ে ওঠেন এবং নানা প্রকার পবিত্র স্তুতি মন্ত্রের দ্বারা দেবাদিদেবের পূজা, অর্চনা করতে থাকেন। ভগবান আশুতোষ তাঁদের বর প্রার্থনা করতে বলেন। এই কথা শুনে তাঁরা ভগবান শিব কে বলেন,

” হে দেবাদিদেব মহাদেব, আপনি যদি আমাদের ওপর প্রসন্ন হয়ে থাকেন তাহলে ভক্তদের কল্যাণের জন্য আপনি এই স্থানে সর্বদা লিঙ্গ রূপে প্রতিষ্ঠিত হন। আপনার বসবাস জনিত কারণে এই স্থান সর্বপ্রকারে অত্যন্ত পবিত্র হয়ে উঠবে। যেসব ভক্ত এসে আপনাকে দর্শন ও পূজা করবেন তাঁরা আপনার অবিনাশী ভক্তি লাভ করবেন।হে প্রভু , আপনি আমাদের প্রার্থনা স্বীকার করে এখানে আপনার স্বরূপে অধিষ্ঠিত হন।”

সেই থেকেই কেদারনাথে অবস্থান দেবাদিদেব মহাদেবের। জ্যোতির্লিঙ্গ রূপে ভগবান শংকর রয়ে গেছেন সেই স্থানে, যে স্থানে আরাধনা করেছিলেন নর-নারায়ণ।

শ্রী কেদারনাথ মন্দিরে গেলে দেখা যাবে মহাদেব একটি বৃষের পিঠের আকৃতি বিশিষ্ট। কেন এমন হল? এর
পিছনেও আছে এক মনোজ্ঞ ইতিহাস।

এর উত্তর জানার জন্য আমাদের চলে যেতে হবে সেই মহাভারতের যুগে। কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ সমাপ্ত হয়েছে। জ্ঞাতি হত্যার পাপ থেকে উদ্ধার পেতে চাইলেন পাণ্ডব ভাইয়েরা। অতএব পরীক্ষিতের ওপর রাজ্যের ভার দিয়ে তাঁরা চললেন স্বর্গারোহণ মানসে হিমালয়ের পথে। পঞ্চপান্ডব আর সঙ্গে দ্রৌপদী। পাহাড় বেয়ে উঠতে উঠতে তাঁরা এসে পৌছলেন শ্রীকেদারনাথে। তাঁরা শুনলেন সেখানে রয়েছেন ভগবান শংকর। তাই তাদের ইচ্ছা হল দেবাদিদেবের দর্শন লাভ। কিন্তু পাণ্ডবদের দেখেই অদৃশ্য হলেন শিব। এদিকে শিবের দর্শন ছাড়া পাণ্ডবরা কেদারনাথ ছাড়বেন না। কোথায় মহাদেব? মহাদেবের তপস্যায় বসলেন মধ্যম পাণ্ডব ভীমসেন। কঠোর তপস্যার দ্বারা তিনি আকর্ষণ করলেন দেবাদিদেবকে ।

মহাদেব তখন চাইলেন ভীম সেনকে পরীক্ষা করতে। তাই তিনি বৃষ রূপ ধারণ করে এসে দাঁড়ালেন ভীমের সামনে। মস্ত দুটো শিং বাগিয়ে তিনি ভয় পাওয়ানোর চেষ্টা করলেন মধ্যম পাণ্ডবকে। কিন্তু ভয় পাওয়া তো দূরের কথা,বৃষ রুপী মহাদেবকে চিনতে এতটুকু দেরি হল না ভীমসেনের। তিনি শিব কে ধরতে গেলেন। আর তাই দেখে ছুটতে শুরু করলেন
বৃষ রুপী দেবাদিদেব। পিছনে ছুটতে লাগলেন ভীম সেন। ভীম যখন তাঁকে প্রায় ধরে ফেলেছেন, তখন দেবাদিদেব প্রবেশ করতে চাইলেন মাটির নীচে। ভীম সেখানে পৌঁছানোর আগেই ভগবান শঙ্কর প্রায় মাটির তলায় চলে গিয়েছিলেন। দেখা যাচ্ছিল শুধু পশ্চাতের অংশটুকু। তাই ভীম চাইলেন বৃষের লেজ ধরে তাঁকে টেনে তুলতে।

ভীমের স্পর্শ পাওয়া মাত্র বৃষ রুপী শিব পরিণত হলেন প্রস্তর মূর্তিতে। আর এই প্রস্তরীভূত শিবের দেহ ধরিত্রীর পাঁচটি অংশে ছড়িয়ে পরে প্রকাশিত হল। এই পাঁচটি স্থানই আজ পঞ্চকেদার নামে পরিচিত। এই পঞ্চকেদার হল-
শ্রী কেদারনাথ, শ্রীমধ্যমহেশ্বর, শ্রী তুঙ্গনাথ, শ্রী রুদ্রনাথ এবং শ্রী কম্পেশ্বর। এর মধ্যে কেদারনাথে রয়েছে বৃষের পিঠ, নাভিদেশ মধ্যমাহেশ্বরে, বাহু তুঙ্গনাথে, মুখ রুদ্রনাথে, আর শৃঙ্গ কম্পেশ্বরে। বৃষের শরীরের বাকি অংশ গুলি নিয়ে হল নেপালের শ্রীপশুপতিনাথ। তবে
শ্রী পশুপতিনাথ কে কিন্তু পঞ্চকেদার এর মধ্যে ধরা হয় না।

শ্রী কাশীরাম দাসের মহাভারতে উল্লেখ আছে যে স্বর্গারোহণ এর পথে পাণ্ডবরা গৌরীকুণ্ডে স্নান করে তর্পণ করেন আর তারপর গৌরিকুণ্ডের পাশে দানবেশ্বর শিবের পূজা করেন। এরপর তাঁরা এসে পৌঁছান কেদারনাথে। কেদারনাথ পর্বতে পঞ্চপান্ডব দেখা পান দেবাদিদেবের। সেখানে তারা পূজা করেন দেবাদিদেবের এবং তৈরি করেন কেদারনাথের মন্দির তারপর আশীর্বাদ নিয়ে যাত্রা করেন স্বর্গারোহণ এর পথে। পান্ডবদের তৈরি ওই মন্দির কাল ক্রমে ভেঙে পড়ে এবং তারপর সেখানে মন্দির তৈরি করান জগৎগুরু শ্রীশঙ্করাচার্য।

শ্রী কেদারনাথের মন্দির অবস্থিত হিমালয়ের কোলে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২২ হাজার ৭৭০ ফুট উঁচুতে। তিনদিকে পাহাড়ে ঘেরা ছোট্ট উপত্যকা। সেখানেই কয়েকটি ছোট ছোট ঘর বাড়ির পরে পাহাড়ের কোলে অবস্থান করছেন শ্রী কেদারনাথ। পাশেই বয়ে চলেছে ক্ষীণকায়া মন্দাকিনী।

মন্দিরটি পাথর দ্বারা নির্মিত এবং অপূর্ব কারুকার্যময়। তুষারশুভ্র হিমালয়ের পেক্ষাপটে এই মন্দিরের দৃশ্য অবর্ণনীয়, অনির্বচনীয়। মন্দিরে যেতে উঠতে হয় কয়েক ধাপ আর তার সামনেই অবস্থান করছেন শিবের বাহন নন্দী। বিশাল তার আকার। মন্দিরের ভিতরে ধূপ- চন্দন -ঘৃতের সুবাস ছড়িয়ে সেই অনাদি অনন্ত কাল থেকে এখানে বিরাজমান শ্রী কেদারনাথ।

মন্দিরের পিছনেই রয়েছে একটি সমাধি মন্দির। শোনা যায় আচার্য শঙ্কর এখানেই নাকি দেহ রেখেছিলেন। এটা তাঁরই সমাধি মন্দির। কাছেই রয়েছে সঙ্কীর্ণ এক গিরিপথ। লোকমুখে কথিত রয়েছে ওই গিরিপথ বেয়েই পঞ্চপান্ডব আর দ্রৌপদি গিয়েছিলেন মহাপ্রস্থানের পথে।

শ্রী কেদারনাথে রয়েছে পাঁচটি কুণ্ড- উদক , রেতস, ঋষি, হংস আর রুদ্র কুন্ড। শ্রীকেদারনাথের পূর্বদিকে পাহাড়ের উপর একটু উঠলেই রয়েছে ভৈরব মন্দির। সেখান থেকে অসাধারণ দেখায় কেদার উপত্যকা।
শ্রী কেদারনাথের মন্দিরের পিছনে রয়েছে বরফের পাহাড়। আর সেই পাহাড়ের ঠিক নিচে একটা জায়গায় খাড়া একটা কালো পাথর। ঝর ঝর করে জল পড়ছে সেখানে। যেন একটি ছোট জলপ্রপাত। শোনা যায় সাধুরা স্বর্গে যাবার জন্য ওই পাথরের উপর থেকে ঝাঁপ দিতেন। এই পাথরের নাম ভৈরব ঝম্প।

শ্রী কেদারনাথ দর্শন যে কোনো শিব ভক্তেরই জীবনের স্বপ্ন। এই জ্যোতির্লিঙ্গ সম্পর্কে যা কিছু লেখা আছে তা সবই অক্ষরে অক্ষরে সত্য। এই জ্যোতির্লিঙ্গের দর্শন এবং পূজা করলে এবং এই স্থানে স্নান করলে ভক্তদের লৌকিক ফল প্রাপ্তির সঙ্গে সঙ্গে অচল শিব ভক্তি এবং মোক্ষলাভ ও হয়।

💐💐💐

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!