পুরুষোত্তম শ্রীরাম ও বালী বধ

0
574

© শ্রী সূর্য শেখর হালদার

শ্রীরাম হলেন মর্যাদা পুরুষোত্তম। শুধু ভারত বর্ষ নয়, সমগ্র দক্ষিণ এশিয়াতে শ্রীরাম এক সম্মানীয় ব্যক্তিত্ব । হাজার হাজার বৎসর ধরে ভারত ভূমি ছাড়াও সমগ্র দক্ষিণ এশিয়াতে ( অখণ্ড ভারতের অংশ) তিনি পূজিত ও চর্চিত হচ্ছেন। তবুও আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত কিছু তথাকথিত পন্ডিত শ্রীরামকে মনে করেন কাল্পনিক চরিত্র, কেউবা আবার শ্রী রামের চরিত্রে কালিমা লেপন-এর প্রচেষ্টায় উদ্যোগী। শ্রীরামের চরিত্রে কালিমা অন্বেষণ দেদীপ্যমান সূর্যের মধ্যে অন্ধকার অন্বেষণের মতই। তবুও অনেক মানুষ তাতেই প্রভাবিত হন কারণ বাল্মিকী রামায়ণ তাঁদের পড়া নেই। বিদ্যালয়, যেখানে শিশুর ব্যক্তিত্ব গঠিত হয়, সেখানেও রামকথা পাঠ করা বা ব্যাখ্যা করা হয় না, কারণ ভারতের সংবিধান অনুযায়ী সেটা নাকি সাম্প্রদায়িক! অথচ সরকার অনুমোদিত মাদ্রাসাতে ঐচ্ছিক বিষয় হিসেবে রাখা যেতে পারে ইসলামী শিক্ষা। অভিনব এই ধর্মনিরপেক্ষতা! যাইহোক শ্রী রামের যেসব কর্মকাণ্ড আধুনিক পণ্ডিতদের চোখে বিসদৃশ মনে হয় তার মধ্যে অন্যতম হল কিস্কিন্ধ্যা কাণ্ডে বর্ণিত বালী বধের ঘটনা ।এই নিবন্ধে তুলে ধরতে চেষ্টা করব বালি বধ-এর পটভূমি যাতে করে পাঠক নিজেই বিচার করতে পারেন এই কর্মকান্ডের ঔচিত্য ।

🚩 বালীর জন্ম বৃত্তান্ত ও পরাক্রম :

বালীর জন্ম বৃত্তান্ত রামায়ণের উত্তর কাণ্ডে বিবৃত হয়েছে। মহর্ষি অগস্ত্য এখানে শ্রী রামের কাছে বালী ও সুগ্রীব এর জন্ম বৃত্তান্ত বর্ণনা করেন। দুজনেরই ক্ষেত্রজ পিতা হলেন ঋক্ষরজা। ঋক্ষরজার জন্ম ব্রহ্মার থেকে। আর বালী ও সুগ্রীব, এই দুই ভাই উৎপত্তি লাভ করেন পিতার শরীর থেকে, যথাক্রমে ইন্দ্র ও সূর্যের ঔরসে। /১/ বালী ও সুগ্রীব-এর কোন মাতা ছিল না। ব্রহ্মার নির্দেশে ঋক্ষরজা কিষ্কিন্ধ্যাতে আসেন এবং ব্রহ্মা প্রেরিত দূত ব্রহ্মার নির্দেশ অনুযায়ী ঋক্ষরজাকে বিশ্বকর্মার দ্বারা নির্মিত কিষ্কিন্ধ্যা নগরীর রাজা বলে ঘোষণা করেন। সেই থেকে ঋক্ষরজা হলেন কিষ্কিন্ধ্যার রাজা। তাঁর মৃত্যুর পরে মন্ত্রীগণ বালী কে রাজপদে প্রতিষ্ঠা করেন।

এখানে একটি বিষয় উল্লেখ এর প্রয়োজন যে বালী ও সুগ্রীব দুজনেই দেবগণের ঔরসজাত। বালী ও সুগ্রীব যথাক্রমে ইন্দ্র ও সূর্যের পুত্র। ঠিক এইরকমই মহাভারতে আমরা সহোদর ইন্দ্র ও সূর্য পুত্র কে পাই। মহাভারতে ইন্দ্রপুত্র হলেন ‘পরন্তপ’ অর্জুন যিনি এক আদর্শ চরিত্র হিসাবে নররূপী পরমেশ্বর শ্রীকৃষ্ণের আশীর্বাদ ধন্য হয়েছিলেন। অর্জুনকে ভগবান স্বয়ং ধর্মক্ষেত্র কুরুক্ষেত্রে তাঁর মুখনিঃসৃত অমৃত বচন শুনিয়েছিলেন : বিশ্বরূপ দর্শন করিয়েছিলেন ( শ্রী শ্রী গীতার একাদশ অধ্যায়) । প্রভুর নেতৃত্বে ধর্মরাজ্য প্রতিষ্ঠার অন্যতম কারিগরও ছিলেন ধনঞ্জয়। অন্যদিকে তাঁর জ্যেষ্ঠ সহোদর কর্ণ শ্রীকৃষ্ণের আহ্বানকে উপেক্ষা করে রয়ে যান বন্ধু দুর্যোধনের পক্ষে এবং কুরুক্ষেত্রে প্রাণ বিসর্জন দেন। শ্রীকৃষ্ণের সমর্থনেই অর্জুন অঞ্জলিক বাণের প্রয়োগে বধ করেন মেদিনী তে প্রবিষ্ট রথচক্র তুলতে ব্যস্ত কর্ণকে। রামায়ণে আমরা দেখি ঠিক বিপরীত চিত্র। এখানে সূর্য পুত্র সুগ্রীব পেয়েছিলেন প্রভুর সাহচর্য, মৈত্রী ও আশীর্বাদ। এমন এক সময়ে তাঁর সঙ্গে প্রভু শ্রী রামের সাক্ষাৎ ও মৈত্রী হয়, যে সময় দুজনেই স্বরাজ্য হতে নির্বাসিত এবং উভয়েরই পত্নী অন্য কোনো দুর্বৃত্ত দ্বারা অপহৃত। অন্যদিকে ইন্দ্রপুত্র বালী অহংকার ও কামতাড়িত হয়ে করে চলেছেন একের পর এক অন্যায় ও অধর্ম। সেই কারণেই প্রভু স্বয়ং শরাঘাতে বধ করলেন সুগ্রীবের সঙ্গে মল্লযুদ্ধ রত ইন্দ্রপুত্র বালী কে। ভগবান বিষ্ণুর দুই অবতারের (শ্রীরাম ও শ্রীকৃষ্ণ) সঙ্গে ইন্দ্রপুত্র ও সূর্যপুত্র দের এই সম্পর্ক আমাদের স্মরণে রাখতে হবে।

কিষ্কিন্ধ্যা পতি বালী ছিলেন মহাশক্তিশালী। তাঁর জন্মের সময় ইন্দ্র তাকে এক স্বর্ণ হার দিয়েছিলেন। যুদ্ধের সময় বালী তা ধারণ করতেন। রাক্ষসরাজ রাবণও বালীর কাছে পরাজিত হন। তিনি যখন কিষ্কিন্ধ্যাপতির সঙ্গে দ্বন্দ্ব যুদ্ধ করতে গিয়েছিলেন, তখন বালী তাঁকে কক্ষে (বাহুমূল) ধারণ করে বেগে আকাশে উড়ে গিয়েছিলেন। একে একে চতু: সমুদ্রে গিয়ে সন্ধ্যা বন্দনা শেষ করে কিষ্কিন্ধ্যার উপবনে তিনি অবতরণ করেন। রাবণ বালীর শক্তিতে বিমোহিত হয়ে অগ্নি সাক্ষী করে বালীর সঙ্গে মৈত্রীতে আবদ্ধ হন এবং একমাস কিষ্কিন্ধ্যাতে বসবাস করেন। উভয়ের মধ্যে চুক্তি হয় যে স্ত্রী, পুত্র, নগর, রাষ্ট্র, খাদ্য, বস্ত্র সবই তাঁরা দুজনে অবিভক্ত রূপে ভোগ করবেন। /২/
রাবণের সঙ্গে বালীর এই সখ্যতা আমাদের মহাভারতে কর্ণের সঙ্গে দুর্যোধনের সখ্যতা কে মনে করিয়ে দেয়। কর্ণের সখ্যতা দুর্যোধনকে আত্মবিশ্বাসী করেছিল। রাবণ ও সেইরূপ বালীর সঙ্গে মিত্রতায় পাপ কার্যে অধিক উৎসাহী হয়ে ওঠেন। প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য শ্রীরাম ভিন্ন আর মাত্র দুই জনের কাছে রাবণ পরাজিত হন। এনারা হলেন কার্তবীর্যার্জুন ( হৈহয় এর রাজা) আর বালী। উভয়ের এর সঙ্গেই রাবন সন্ধি স্থাপন করেন।

কিষ্কিন্ধ্যা কাণ্ডে র একাদশ সর্গ তে সুগ্রীব বালী বধ এর পূর্বে বালীর শক্তি শ্রীরামের কাছে বর্ণনা করেন। ময়দানবের দুই পুত্র মায়াবী ও দুন্দুভিকে বালী বধ করেছিলেন। তিনি প্রতিদিন সূর্যোদয়ের প্রাক্কালে পশ্চিম থেকে পূর্ব সমুদ্রে, দক্ষিণ থেকে উত্তর সমুদ্রে অক্লান্ত ভাবে যাতায়াত করতে পারতেন। তিনি নিজের বল দেখানোর জন্য পর্বতে আরোহণ করে শিখর সমূহ ঊর্ধ্বে নিক্ষেপ করে পুনর্বার গ্রহণ করতে পারতেন। বনের বৃক্ষ ভঙ্গ করতে পারতেন। দুন্দুভি নামক রাক্ষসকে বধ করে বালি তার দেহ এক যোজন দূরে নিক্ষেপ করেছিলেন। মহিষ রূপী এই দুন্দুভির মৃতদেহ মতঙ্গ মুনির আশ্রমে গিয়ে ভূমিতে পড়ে। তপবলে বলিয়ান মহর্ষি মতঙ্গ তখন তাঁর আশ্রম
(ঋশ্যমূকপর্বতের পাদদেশে) দূষিত করবার জন্য বালি কে অভিশাপ দেন যে বানর আমার আশ্রম দূষিত করেছে সে যদি একজনের মধ্যে আছে তবে তখনই মরবে। “
/৩/ অর্থাৎ রাবনের মতোই বালীও অভিশপ্ত হয়েছিলেন।

🚩 বালী ও সুগ্রীব এর বিরোধের ইতিহাস :

কিষ্কিন্ধ্যা কান্ডের নবম সর্গ তে সুগ্রীব শ্রীরাম কে বালীর সঙ্গে তাঁর বিরোধের ইতিবৃত্ত ব্যক্ত করেন। একদা মায়াবী নামক এক তেজস্বী অসুর যাঁর সঙ্গে বালী স্ত্রী ঘটিত বিষয়ে বিরোধ ছিল, বালীকে যুদ্ধে আহ্বান করেন। মায়াবী কিষ্কিন্ধ্যা নগরীতে এসে বালীকে যুদ্ধের জন্য আহ্বান করতে থাকেন। বালীর পত্নীগণ তাঁকে নিবৃত্ত করলেও বালী তা শুনলেন না। বালির সঙ্গে সুগ্রীব ও প্রাসাদ থেকে বেরিয়ে এলেন। বালী ও সুগ্রীব উভয়কে দেখে মায়াবী পালাতে লাগল। চন্দ্রালোকিত পথে দুই ভাই মায়াবী কে অনুসরণ করতে লাগলেন। অবশেষে মায়াবী একটি ভূমিবরে প্রবেশ করলেন। বালি তখন সুগ্রীব কে সেই বিবরদ্বারে প্রহরারত রেখে মায়াবী কে অনুসরণ করে বিবরে প্রবেশ করলেন।সুগ্রীব অন্দরে যেতে চাইলেও বালী তাঁকে ভেতরে প্রবেশ করতে দেননি। অতএব রাজাজ্ঞা অনুযায়ী সুগ্রীব সেখানেই অপেক্ষমান রইলেন। এরূপ এক বৎসর অতিক্রান্ত হবার পর সেই বিবর থেকে রুধির নির্গত হতে লাগল। অসুরদের গর্জন শোনা গেল, কিন্তু সুগ্রীব
বালীর কণ্ঠস্বর শুনতে পেলেন না । সুগ্রীব অনুমান করলেন বালীর মৃত্যু হয়েছে । তাই তিনি বিবরদ্বারে বৃহৎ শিলাখণ্ড বসিয়ে সেই দুয়ার বন্ধ করে রাজধানীতে ফিরে এলেন । প্রাথমিকভাবে তিনি এই ঘটনা গোপন করেছিলেন, কিন্তু মন্ত্রীরা সব শুনে কিষ্কিন্ধ্যা রাজপদে তাঁকে অভিষিক্ত করলেন।

তার অনেকদিন পর বালী প্রত্যাগমন করলেন। সুগ্রীব কে রাজপদে দেখে ক্রুদ্ধ হয়ে সুগ্রীব কে তিরস্কার করলেন। সুগ্রীব তাঁকে নিগৃহীত না করে অভিবাদন করলেন। বালীর পায়ে তাঁর মুকুট স্পর্শ
করালেন এবং অনিচ্ছাকৃত ভুলের জন্য ক্ষমা চাইলেন। তিনি রাজত্ব ফেরত দিতে চাইলেন এবং প্রতিশ্রুতি দিলেন যে তিনি পূর্বের ন্যায় বালীর প্রতি অনুগত হয়ে থাকবেন। কিন্তু বালীর তাতে ক্রোধ কমল না ।সভাস্থলে তিনি মন্ত্রীবর্গকে বোঝালেন সুগ্রীব বিস্মৃত হয়ে তাঁকে গহ্বরের মধ্যে অবরুদ্ধ করে ফিরে আসেন। তারপর তিনি একবস্ত্রে সুগ্রীবকে রাজ্য থেকে নির্বাসিত করেন। শুধু সুগ্রীবের নির্বাসনই নয়, সুগ্রীব পত্নী রুমাকে তিনি নিজের কাছে রেখে দেন যা সনাতন ধর্মে গর্হিত কাজ। প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য, লঙ্কেশ রাবণও একই অপরাধে অপরাধী ছিলেন। তিনি বহু ঋষি কন্যা, দেবকন্যা ,এবং পরিশেষে দেবী সীতা কে অপহরণ করে নিজের কাছে রেখেছিলেন। সীতা দেবী ছাড়া কেউই রাবণ কে তাঁদের সম্মানহানি করা থেকে প্রতিহত করতে পারেননি। ঘটনাক্রম প্রমাণ করে বালীও রাবনের মতোই নারী লোলুপ ছিলেন । মায়াবীর সঙ্গেও বালী বিরোধের কারণ ছিল স্ত্রী ঘটিত কোন ব্যাপার। /৪/।

🚩 শ্রী রামের শক্তি পরীক্ষা ও বালী বধ :

বালীর ভয়ে সুগ্রীব তাঁর কিছু বিশ্বস্ত অনুচর সহ ঋশ্যমূক পর্বতে আশ্রয় নেন। বালি এই পর্বতের কাছে আসতেন না মতঙ্গ মুনির অভিশাপের কারণে । এই পর্বতেই অগ্নি সাক্ষী করে মিত্রতা হয় শ্রীরাম ও সুগ্রীবের মধ্যে । অগ্নি প্রজ্জ্বলন করেন হনুমান। সুগ্রীবের সঙ্গে মিত্রতা হবার পর শ্রীরাম তাঁকে আশ্বাস দেন বালী কে বধ করে কিষ্কিন্ধ্যা রাজ্যে তাঁকে প্রতিষ্ঠা করার । শ্রীরাম শুধুমাত্র তাঁর মিত্রের হিতের জন্যই যে এই কাজে প্রবৃত্ত হন তা নয় , তিনি এই কাজে প্রবৃত্ত হয়েছিলেন, কারণ বালি ছিলেন পরস্ত্রী হরণকারী পাপী।

যাই হোক সুগ্রীব বালীর শক্তি সম্পর্কে অবহিত ছিলেন, কিন্তু শ্রীরামের শক্তি সম্পর্কে তাঁর কোন ধারনা ছিল না । তাই তিনি শ্রীরামের শক্তি পরীক্ষায় অগ্রসর হন । বাল্মীকি রামায়ণের কিষ্কিন্ধ্যা কান্ডের একাদশ সর্গতে এই ঘটনার উল্লেখ আছে । প্রথমে তিনি দুন্দুভি নামক মহিষ রুপী রাক্ষসের শুষ্ক অস্থিসার দেখান । এই রাক্ষস কে বধ করে তার অস্থিসার দুই হাতে তুলে, কয়েক যোজন দুরে ছুঁড়ে ফেলে ছিলেন বালী। সুগ্রীব বলেন- শ্রীরাম যদি এই মহিষের অস্থি একপায়ে উঠিয়ে দুইশত ধনু (এক ধনু সমান চার হাত ) দূরে নিক্ষেপ করতে পারেন, তবেই তিনি বুঝবেন শ্রীরামের বালী বধ এর ক্ষমতা আছে । শ্রীরাম অবলীলাক্রমে এই কার্য সম্পাদন করেন। এরপর একটি শরে শ্রীরাম সাতটি শালবৃক্ষকে ভেদ করেন। তাঁর সেই শর শালবৃক্ষ ভেদ করে, পর্বত বিদীর্ণ করে, ভূমিতে প্রবেশ করে । শ্রী রামের এই দুই কার্য সুগ্রীবের মনে বিশ্বাস এনে দেয় যে তিনি বালী বধ করতে সক্ষম । এর থেকে এটাও প্রমাণ হয় যে বালী বধ এর শক্তি শ্রীরামের ছিল।

বাল্মিকী রামায়ণের কিষ্কিন্ধ্যা কান্ডের দ্বাদশ সর্গ থেকে ষোড়শ সর্গ অবধি বালী বধ এর ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। শ্রীরাম সুগ্রীবকে বলেন বালীকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে আহ্বান করতে, আর তিনি সংগোপনে থেকে শরাঘাত করবেন।
শ্রীরামের এই অভিপ্রায় অনেকের মনে ধারণা তৈরি করেছে যে আড়ালে থেকে কাউকে আঘাত করা অন্যায়, অতএব এই কার্য শ্রীরামের করা ঠিক হয়নি। কিন্তু মনে রাখতে হবে বালী অপরাধী, পরস্ত্রীহরণকারী, সনাতন ধর্মবিচ্যূত। তাই একজন পাপী কে হত্যা করার জন্য ধর্ম নীতি মেনে চলার প্রয়োজন হতে পারে না। প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যায়- বালকান্ডের পঁচিশতম সর্গ তে তারকা বধ এর সময় এই রূপ ধর্ম সংকটের পরিস্থিতি উদ্ভূত হয়। বীর ক্ষত্রিয় স্ত্রী হত্যা করেন না ,তাই কিশোর রাম তারকাকে বধ করতে ইতস্তত করছিলেন, কিন্তু ঋষি বিশ্বামিত্র তখন বলেন :

“নৃশংসমনৃশংসং বা প্রজারক্ষণ কারণাৎ / পাতকং বা সদোষং বা কর্তব্যং রক্ষতা সদা ।। / রাজ্যভারনিযুক্তানামেষ ধর্ম: সনাতন।” (বাল কান্ড/২৫/১৮-১৯)।

অর্থাৎ প্রজা রক্ষার নিমিত্তে নৃশংস, অনৃশংস, পাপ জনক বা দোষ যুক্ত সকল কর্মই করতে হবে। যাঁদের উপর রাজ্য চালনার ভার আছে, এটা তাঁদের সনাতন ধর্ম।

এর তাৎপর্য হলো এটাই যে শরণাগত, অন্যায়ের শিকার সুগ্রীব কে রক্ষা করার উদ্দেশ্যেই শ্রীরাম প্রচ্ছন্ন থেকে বালী বধ করেন । তারকা বধের ন্যায় বালী বধও কোন অন্যায় নয়; বরং একজন ক্ষত্রিয়ের কাছে এটাই ছিল ধর্ম সংগত।

এই প্রসঙ্গে আরও বলা যায় যে মহাভারতের যুদ্ধের সময় যখন কর্নের রথের চাকা মেদিনীতে প্রবিষ্ট হয়, এবং কর্ণ যখন অস্ত্র ত্যাগ করে রথের চাকা উত্থিত করতে নামেন, তখন কর্ণও এইরূপ ধর্মের কথা বলেছিলেন । উদ্দেশ্য ছিল অর্জুনকে বাণ চালানো থেকে বিরত করা। শ্রীকৃষ্ণ কর্ণকে স্মরণ করিয়ে দেন যে কৌরব সভাগৃহে দুঃশাসন কর্তৃক দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ, দুর্যোধনের ভীম কে বিষ প্রয়োগে সম্মতি, জতুগৃহ তে পান্ডবদের পুড়িয়ে মারার ষড় যন্ত্রে দুর্যোধনের পক্ষ নেওয়া , আর বালক অভিমুন্য কে একাধিক মহরথ মিলে হত্যার সময় কর্নের ধর্ম চেতনা জাগ্রত হয়নি। অতএব অর্জুনের উচিত নয় কর্ণকে দুর্দশাগ্রস্ত হবার কারণে তাঁর প্রতি তীর না চালানো । বাসুদেবের কথামতো এরপরেই অর্জুনের তীর ছেদ করে কর্ণের মস্তক। সুতরাং এটা প্রমাণিত হয় যে অধর্ম কারীকে বধ করার জন্য ধর্মনীতি মানার প্রয়োজন হয় না । রাজধর্ম এটাই বলে যে অধর্মকারীকে বিনাশ করা উচিত। এটাই ক্ষত্রিয়ের ধর্ম। আর বালী বধ এর ক্ষেত্রে শ্রীরাম তাই করেছিলেন। তাই প্রচ্ছন্ন থেকে বালী বধ‌ তাঁর চরিত্রে কোন কলংক লেপন করতে পারে না।

এতদসত্ত্বেও একটি প্রশ্ন থেকেই যায় শ্রীরাম কি সামনাসামনি যুদ্ধ করে বালী বধ করতে পারতেন না ? আসলে শ্রীরাম যদি বালীকে আক্রমণ করতেন ,তাহলে তিনি তাঁকে বিনাশ করতে পারতেন। তিনি এতটাই পরাক্রমী ছিলেন যে তিনি একাই খর দূষণ ও ত্রিশিরা সহ একাই চৌদ্দ হাজার রাক্ষস কে ধ্বংস করেছিলেন। অরণ্য কান্ডের সাতাশ থেকে ত্রিশ সর্গ তে এর বর্ণনা রয়েছে। বালী কে তিনি আক্রমণ করলে যে যুদ্ধ হতো তাতেও বহু নিরীহ প্রাণীহত্যা হতো : বহু নিষ্পাপ বানরের ও মৃত্যু ঘটতো। তাছাড়া খরকে শ্রীরাম আক্রমণ করেননি, খরই সসৈন্যে শ্রীরাম ও লক্ষণ কে মারতে এসেছিলেন। বালী কিন্তু শ্রীরাম কে আক্রমণ করেননি। এই ক্ষেত্রে পরিস্থিতি এই রূপ ছিল যে বালীকে নিধন করা প্রয়োজন এবং সেটাও যতদূর সম্ভব নিরীহ প্রাণী বধ ব্যতীত। কিন্তু বালি আবার শ্রীরাম কে আক্রমণ করেননি তাই এই পরিস্থিতিতে বালির ক্রোধ আর দর্প কে শ্রীরাম তাঁর বিনাশের কাজে লাগান ।

সুগ্রীবের থেকে বালির জীবন ইতিহাস শুনে তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে বালীকে
শক্তি পরীক্ষায় আহ্বান জানালে তিনি অবশ্যই উত্তেজিত হবেন, কারণ দাম্ভিক রাবণের ন্যায় তিনিও মানতে পারতেন না যে তাঁর চেয়েও শক্তিশালী কেউ থাকতে পারে। সুগ্রীবের সঙ্গে যেহেতু বালীর পূর্ব শত্রুতা ছিল, তাই সুগ্রীব যখন যুদ্ধের আহ্বান করেন বালী
সহজেই তা গ্রহণ করেন । এখানে সুগ্রীব এর পরিবর্তে যদি শ্রীরাম বা লক্ষণ বা অন্য কেউ যেতেন , তাহলে বালীর মনে সন্দেহ জাগত এবং কৌশল ব্যর্থ হত । এতদসত্বেও মহীয়সী তারা (বালীর স্ত্রী) বুঝতে পারেন যুদ্ধের আহ্বান কোন রাজনৈতিক কৌশল হতে পারে। তিনি বালী কে বলেন, অঙ্গদ এর চরেরা সংবাদ দিয়েছে শ্রীরাম ও লক্ষণ এখানে বনে বর্তমান। শ্রীরাম সাধুদের আশ্রয়, বিপন্নের গতি তাই মহারাজ বালীর উচিত নয় শ্রীরামের সঙ্গে বিরোধ করা। তিনি এও বলেন যে কনিষ্ঠ ভ্রাতা স্নেহের পাত্র: তার সঙ্গে বিরোধ অকর্তব্য। অতএব বালীর উচিত সুগ্রীব কে যৌবরাজ্যে অভিষিক্ত করা। আর সুগ্রীবের তুল্য বন্ধু বালীর নেই। /৫/ কিন্তু
তারা কে তিরস্কার করে বালী যুদ্ধে যান এবং মৃত্যুবরণ করেন।

এখানে আরেকটি তথ্য উল্লেখ করা প্রয়োজন। শ্রীরাম কিন্তু প্রথম প্রচেষ্টায় বালী বধে সফল হননি , কারণ বালী ও সুগ্রীবকে দেখতে ছিল সদৃশ। সুগ্রীব এই তথ্য আগে শ্রীরাম কে দেননি। তাই শ্রীরাম কার উদ্দেশ্যে আঘাত হানবেন তা বুঝে উঠতে পারেননি । দ্বিতীয় বার দ্বন্দ্ব যুদ্ধের পূর্বে লক্ষণ শ্রী রামের আদেশে গজ পুষ্পি লতা সুগ্রীবের গলায় বেঁধে দেন যা অভিজ্ঞান রূপে কাজ করে । আর শ্রীরাম অন্তরাল থেকে শরাঘাত করে বালীকে বধ করেন।

🚩বালীর ক্ষোভ, শ্রী রামের যুক্তি ও বালীর সমর্পণ :

শ্রী রামের তীরে ধরাশায়ী হলেও মহাবীর বালীর প্রাণ ও তেজ তখনও নষ্ট হয়নি। বাল্মীকি রামায়ণের কিষ্কিন্ধ্যা কান্ডের সতের তম সর্গতে আমরা দেখি শ্রীরাম ও লক্ষণ অন্তরাল থেকে নির্গত হয়ে যখন বালির নিকট গেলেন, বালি তখন সক্রোধে শ্রীরাম কে তিরস্কার করলেন। তিনি শ্রীরাম কে দুরাত্মা ‘ ধর্মধ্বজী’, ‘অধার্মিক তৃণাবৃত কূপ’, ও ‘প্রচ্ছন্ন অগ্নিসদৃশ সাধু বেশি পাপাচারী’ /৬/ ইত্যাদি বিশেষণে বিশেষিত করেন। তিনি এটাও বলেন যে শ্রীরাম তাঁর সাহায্য নিলে তিনি দুরাত্মা রাবণের কণ্ঠ বন্ধন করে তাঁকে শ্রীরামের কাছে এনে দিতেন। সীতাকে উদ্ধার করতেন কিন্তু তাঁকে এভাবে বধ করে শ্রীরাম অধর্ম করেছেন।

শ্রীরাম তখন যুক্তি জালে বালীর বক্তব্যকে ছিন্ন করেন। তিনি বালী কে বলেন তিনি ধর্ম ,অর্থ ,কাম, লোকাচার না জেনে তাঁকে (শ্রীরামকে) নিন্দা করছেন। আসলে বালী
কামপরায়ণ এবং রাজধর্ম থেকে বিচ্যূত:

“তদেতৎ কারনং পশ্য যদর্থং ত্বং ময়াহত ।
ভ্রাতুর্বতসি ভার্যায়াং ত্ব্যত্ত্বা ধর্মং সনাতনম্ ” ।।
(কিষ্কিন্ধ্যা : ১৮: ১৮)

অর্থাৎ, বালী সনাতন ধর্ম ত্যাগ করে কাম পরায়ণ হয়ে পুত্রবধূসম ভাতৃজায়া (সুগ্রীব পত্নী রুমা) কে গ্রহণ করেছেন। সনাতন ধর্ম অনুযায়ী ভাইয়ের জীবদ্দশাতেই ভাতৃবধূ কে গ্রহণ করা অপরাধ। বালী
সুগ্রীব এর জীবদ্দশাতে রুমাকে গ্রহণ করে সেই অপরাধ করেছেন , যে অপরাধের উপযুক্ত দন্ড মৃত্যুদণ্ড । শ্রীরাম আরও বলেন যে রাজা ধর্ম রক্ষার্থে পাপীকে শাস্তি দেন। পাপী রাজদণ্ড ভোগ করলে তবেই নির্মল ও পূণ্যবান হন, অপরদিকে পাপীকে শাস্তি না দিলে রাজা পাপগ্রস্থ হন । অতএব ইক্ষ্বাকু (তিনি সমগ্র পৃথিবীর রাজা ছিলেন) বংশের প্রতিনিধি হিসাবে পাপাচারী বালীকে বধ করে তিনি সঠিক কাজ করেছেন।

বালী কৃতাঞ্জলি হয়ে শ্রীরামের এই যুক্তি মেনে নেন এবং
শ্রীরামের কাছে নিজেকে সমর্পণ করে ক্ষমা চান।
শ্রীরামের কাছে তিনি আবেদন জানান যে তিনি যেন অঙ্গদ ও তারা কে রক্ষা করেন। শ্রীরাম বালীকে বলেন যে অনুতাপ করে ও দণ্ড লাভ করে বালী নিষ্পাপ ও ধর্মানুগত হয়েছেন। অঙ্গদ কে তিনি রক্ষার প্রতিশ্রুতি দিলেন এবং সেই মতো সুগ্রীব কিষ্কিন্ধ্যা র রাজা হলে অঙ্গদ যৌবরাজ্য পান। বালী মৃত্যুর পূর্বে তাঁর কৃতকর্মের জন্য সুগ্রীবের থেকে ক্ষমা চান। সুগ্রীবকে তিনি সাধ্বী সদৃশ তারার উপদেশ শুনতে ও অঙ্গদকে রক্ষা করতেও অনুরোধ জানান ।অঙ্গদ কেও তিনি সুগ্রীবের বশে চলতে বলেন। সুগ্রীব , ভাইয়ের মৃত্যুতে অস্থির হয়ে নিজের মৃত্যু কামনা করেন। তারাও
শ্রীরামের কাছে সহমরণ প্রার্থনা করেন, কিন্তু দুঃখহারী শ্রীরাম তাঁদের কর্তব্য জ্ঞানের উপদেশ দিয়ে উভয় কেই নিরস্ত করেন । বাল্মীকি রামায়ণের কিষ্কিন্ধ্যা কান্ডের ঊনিশ থেকে পঁচিশ তম সর্গ তে এই ঘটনা গুলির উল্লেখ রয়েছে।

এইসব ঘটনা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে শ্রীরামকে যাঁরা বালীবধ এর জন্য কলঙ্কিত করেন , তাঁরা আসলে সম্পূর্ণ রামায়ণ পঠন করে উঠতে পারেননি অথবা সনাতন ধর্মের দর্শন তারা এখনো বুঝে উঠতে পারেননি। ভাতৃবধূকে ভাইয়ের উপস্থিতিতে যে গ্রহণ করে সে মহা পাপী। তাঁকে বধ করবার জন্য ধর্মনীতি প্রয়োগ করার প্রয়োজন হয় না। আজকের দিনেও যদি দেশের সৈন্য বাহিনী বা নগররক্ষক গণ এই ধরনের কৌশল অবলম্বন করে অপরাধী নিকেশ করে থাকেন, তাহলে সেটাকে কি অন্যায় বলা হবে? বহুজন হিতে তা গ্রহণযোগ্য হয়। তাছাড়া বালী মৃত্যুর পূর্বে শ্রীরামের কাছে তাঁর নিজের অপরাধ স্বীকার করেন। তিনি শ্রী রামের কাছে ক্ষমা ভিক্ষা করেন। যেখানে অপরাধী স্বয়ং পাপ স্বীকার করছে, সেখানে কিছু তথাকথিত শিক্ষিত বুদ্ধিজীবির বালী বধের নিমিত্তে শ্রীরাম এর ভাবমূর্তিতে কালিমা লেপন করা তাদের নির্বুদ্ধিতা , অজ্ঞতা এবং সনাতন ধর্ম ও সংস্কৃতির প্রতি বিদ্বেষ প্রমাণ করে।

১. উত্তর কান্ড : সর্গ ৫ (প্রক্ষিপ্ত)।

২. উত্তর কান্ড: সর্গ ৩৪।

৩. কিষ্কিন্ধ্যা কান্ড: সর্গ ১১: শ্লোক ৫২।

৪. কিষ্কিন্ধ্যা কান্ড: সর্গ ৯: শ্লোক ৪।

৫. কিষ্কিন্ধ্যা কান্ড: সর্গ ১৫: শ্লোক ২৩, ২৪,২৫,২৬।

৬. কিষ্কিন্ধ্যা কান্ড: সর্গ ১৭: শ্লোক ২১, ২২।

তথ্য ঋণ:

১. বাল্মীকি রামায়ণ সরনুবাদ: শ্রী রাজশেখর বসু।

২. কৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাস কৃত মহাভারত সারানুবাদ: শ্রী রাজ শেখর বসু।

We are not big media organisation. Your support is what keeps us moving. Don't hesitate to contribute because, work, for society needs society's support. Jai Hind.