বকরি ঈদ ও বাঙালির ভাবাবেগ

0
376

© দীপ্তাস্য যশ

গতকাল বকরি ঈদ গেছে। সম্প্রীতিবাজরা এই বকরি ঈদকে বাঙালির উৎসব বলে আখ্যায়িত করেছেন। কিন্তু সত্যিই কি বকরি ঈদ বাঙালির উৎসব নাকি এটি উৎসবকে উপলক্ষ্য করে বাঙালির ভাবাবেগকে আঘাত করার একটি প্রচেষ্টা।

প্রথমত যখন বলছি বাঙালির ভাবাবেগ, তখন আগে নির্দিষ্ট করা দরকার বাঙালি কে? বাঙালি আর বাংলাভাষী কি এক?

এই প্রশ্নগুলির একটিই উত্তর বাঙালি এবং বাংলাভাষী কখনই এক নয়। বাংলাভাষী মাত্রেই কখনও বাঙালি হতে পারেনা। বাঙালি হতে গেলে সবার আগে তাকে এই বাংলার সংস্কৃতি, শিক্ষা, ইতিহাস, ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। এবার কেউ বাংলাভাষায় কথা বলছেন মানেই যদি আমরা ধরে নিই তিনি বাঙালির এই সংস্কৃতি, শিক্ষা, দর্শন, ইতিহাস, ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল তাহলে তা একেবারেই ভ্রান্ত ধারণা বা বলা চলে ইউটোপিয়া। বিশেষত যারা বাংলাভাষার মধ্যে অগুন্তি আরবি-উর্দু মিশ্রিত শব্দের অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে, এমনকি নিজেদের সন্তান সন্ততিদের নামও আরবী ভাষা অনুযায়ী রেখে নিজেদের জাতি পরিচয় অপেক্ষা নিজেদের ধর্ম পরিচয়কে প্রকাশ করতে অধিক আগ্রহী তারা কখনই বাঙালি নয়।

বাঙালির লাল পেড়ে সাদা শাড়ি আছে, তুলসীতলা আছে, তুলসীতলায় সন্ধ্যার শঙ্খধ্বনি আছে, ধানের মড়াইতে মঙ্গল চিহ্ন আছে। বাঙালির দুর্গা পুজোর অষ্টমীতে লুচি আছে, দশমীর কোলাকুলি, প্রণাম আছে, সরস্বতী পুজোর হলুদ শাড়ি আছে, কালিপুজোর নিরামিষ পাঁঠার ঝোল আছে। বাঙালির মঙ্গলকাব্য আছে। এই সব নিয়েই বাঙালি। যারা এগুলিকে নিজেদের আচার, রীতি, নীতি থেকে বাদ দিতে চায় তারা বাংলাভাষী হতে পারে কিন্তু বাঙালি নয়। এই যুক্তি অনুসারে আমি অবশ্যই বলতে পারি বকরী ঈদ কখনই বাঙালির উৎসব নয়। বকরি ঈদ আসলে এখন উৎসব উপলক্ষ্যে বাঙালির ভাবাবেগকে আঘাত করার এক মাধ্যমে পরিণত হয়েছে এদেশীয় বা ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলিমদের কারনে।

ইসলামিক ক্যালেন্ডার অনুযায়ী বছরে দুইটি ঈদ পালন হয়। একটি ঈদ আল ফিতর, আরেকটি ঈদ আল আদাহ। এই ঈদ আল আদাহকেই বকরি ঈদ বলা হয় ভারতীয় উপমহাদেশে। সাধারনত ইসলামিক চন্দ্র ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ধু আল হিজ্জাহর দশম দিনে বকরী ঈদ পালন করা হয়। ইসলামিক পুরাণ অনুযায়ী ইব্রাহিম যখন আল্লাহর উদ্দেশ্যে কুরবানী দেওয়ার জন্য তার ছেলে ইসমাইলকে কুরবানী করতে উদ্যত হন তখন আল্লাহ ইসমাইলের পরিবর্তে একটি একটি ভেড়া প্রদান করেন ইব্রাহিমকে। সেই ঘটনাকে উপলক্ষ্য করেই বকরী ঈদের প্রচলন।

নানা ভাষায় বকরী ঈদকে নানা নাম দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের বলা হয় কোরবানীর ঈদ, আফগানিস্তান, ইরাণে একে বলা হয় কুরবান ব্যেরাম। মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়ায় একে বলা হয় হারি রায়া আইদিলআধা। আবার আফ্রিকার সেনেগাল, গাম্বিয়ার মতো দেশগুলিতে একে বলা হয় তোবাস্কি।

ইসলামিক শাস্ত্র অনুযায়ী এই অনুষ্ঠানের উপলক্ষ্য রক্তপাত নয়। এই আচারের মূল কথা হোল আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসী ব্যক্তি তার সব থেকে প্রিয় জিনিষটি আল্লাহর প্রতি উৎসর্গ করবে আল্লাহর প্রতি তার আত্মনিবেদনের নিদর্শন হিসাবে। সাধারন আচার অনুযায়ী কোন প্রানীকে বলি দিয়ে তার এক তৃতীয়াংশ নিজের পরিবারের জন্য রেখে বাকী অংশ গরীব, আত্মীয় পরিজন ও বন্ধু বান্ধবদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়। বলা হয় কুরবানী দেওয়া প্রানীর রক্ত বা মাংস পরম করুণাময় আল্লাহর কাছে পৌছাবেনা। পৌছাবে ভক্তের ভক্তি।

তাহলে দেখা গেল মূল কথাটি হচ্ছে নিজের প্রিয় কোন বস্তুকে পরম করুণাময় আল্লাহর উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করাই হচ্ছে এই আচারের মূল কথা। তাহলে যখন এই আচার উপলক্ষ্যে গোরু কুরবানী করা হচ্ছে তাহলে কি গোরু মুসলিমদের সব থেকে প্রিয় বস্তু বা সবথেকে প্রিয় প্রানী? এর উত্তর আমার জানা নেই। এর উত্তর একজন মুসলিমই দিতে পারবেন যিনি নিজে গোরু পালন করেন। আমরা বরং একটু ইতিহাস ঘেঁটে এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার চেষ্টা করি।

ভারতীয় উপমহাদেশের হিন্দু সমাজ বরাবরই গোরুকে গোমাতা হিসাবে পূজা করে এসেছে। তার কিছু নির্দিষ্ট কারন আছে। মূল কারন প্রাচীন কাল থেকে ভারতীয় উপমহাদেশের অর্থনীতিতে গোরুর প্রভাব। গো সম্পদের কদর প্রাচীন কাল থেকেই হিন্দু সমাজে বিরাজমান। সম্ভবত গৃহপালিত গবাদি পশুর মধ্যে গোরুর কদর সবথেকে বেশী। সেই কারনেই হিন্দুদের অন্যতম যুগপুরুষ শ্রীকৃষ্ণ একজন রাখাল বালক হিসাবে চিত্রায়িত হয়েছেন। সম্ভবত সেই সময়ের সমাজে গোসম্পদ এবং গোয়ালাদের সামাজিক অবস্থানকে চিহ্নিত করতেই এই চরিত্রায়ন। ঠিক যেভাবে আমরা সম্পদ্ এবং সমৃদ্ধির সাধনায় মা লক্ষ্মীর পুজা করি তেমনই গোরুকেও পূজণীয় বলে মনে করি।

যেমন মা তার সন্তানের জন্মের পরে তাকে মাতৃদুগ্ধ দিয়ে লালন পালন করে। তেমনই গোরু দুধও তার পুষ্টিগুনের কারনে সমান প্রয়োজনীয়। এছাড়াও কৃষি কাজে, এমনকি আমাদের দেশের বহু অংশে গোরুকে বাহন হিসাবেও ব্যবহার করা হতো খুব সাম্প্রতিক অতীতেও। এখনও যদি আপনারা গ্রামীন বাংলার সমাজে দেখেন দেখবেন সেখানে যার একটি গোরু আছে সে গোরুর দুধ দিয়ে নিজের সন্তানকে যেমন প্রতিপালন করছে, তেমনই সেই দুধ বিক্রি করে তার কিছু আর্থিক সংস্থানও হচ্ছে। ফলে গোরুর কদর এখনও একই রকম আছে আমাদের সমাজে। সেই কারনেই চামড়া ইত্যাদির প্রয়োজনের জন্য মৃত গোরুকে ব্যবহার করা হয়। কিন্তু মুসলিম সমাজেও কি গোরুর একই কদর? এমন নয় যে মুসলিম পরিবারে তারা গোরু পালন করেননা বা তারা গোরুর দুধ খাননা। কিন্তু গোরুর সাথে মুসলিমদের সম্পর্ক ঠিক আমাদের বামপন্থীদের সাথে তাদের সম্পর্কের মতো। শুধুই প্রয়োজনের।

ভারতবর্ষে গোরু খাওয়ার প্রচলন ইসলামিক আমল থেকে। তার আগে পুরাণে গোরু খাওয়ার উল্লেখ আছে বলে যে বিভিন্ন “পন্ডিত ব্যক্তিরা” মাঝেমাঝেই যুক্তি খাড়া করতে চান, তারা আসলে গোরু এবং মহিষের মধ্যে পার্থক্যটি জানেননা বা জানলেও ইচ্ছা করে গুলিয়ে দিতে চান। আমার ঠিক জানা নেই, তবে মনে হয় মোষের মাংস খাওয়ার রীতিটি সম্ভবত চালু হয়েছে অসুর শক্তিকে মহিষের সাথে তুলনার মাধ্যমে। কিন্তু গোরুর মাংস খাওয়ার প্রচলন হিন্দু সমাজে কোনদিনই ছিলনা, তার কারন গোরু শুধুমাত্র একটি পালিত প্রানীই নয়। তার সামাজিক, অর্থনৈতিক গুরুত্বও অপরিসীম আমাদের সমাজে। সেই কৃতজ্ঞতাবশতই হিন্দুদের গোরুকে গোমাতারূপে পুজোর প্রচলন।

ইসলামিক আগ্রাসন যখন প্রথম আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশে ঘটে সেই সময় ইসলামিক শাসকরা অনুধাবন করেন হিন্দুদের মূল শক্তি তাদের অস্ত্রবল, সৈন্যবল নয়। তাদের মূল শক্তি তাদের ধর্ম ও দর্শন। কাজেই হিন্দু সমাজকে যদি সম্পূর্ণরূপে পরাভূত করতে হয় তাহলে এই দর্শনকে আক্রমন করতে হবে। সেই ভাবনা থেকেই গো হত্যার প্রচলন ঘটান তারা ভারতবর্ষে। ঠিক যেমন হিন্দু দর্শনকে ধ্বংস করার জন্য হিন্দু ধর্ম ও দর্শনের প্রতীক মন্দিরগুলিকে ধ্বংস করা হয়েছিল।

আজও মুসলিম সমাজ সেই রীতিই মেনে চলেছে। এদের কাছে বকরী ঈদ শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় আচার নয়। এঁদের কাছে এটি হিন্দু সমাজকে আঘাত করারও একটি পথ। নিজেদের শক্তি, ক্ষমতাকে জাহির করার পন্থা। ঠিক যেমন মহরম শিয়া মুসলিমদের উৎসব, কিন্তু সুন্নী মুসলিমরাও সেই উপলক্ষ্যে নিজেদের শক্তি প্রদর্শন করা থেকে বিরত থাকেননা। তবে ধর্মীয় আচারকে উপলক্ষ্য করে ক্ষমতার প্রদর্শন অন্য আলোচনা। এই লেখার বিষয়বস্তুও তা নয়। আমরা বরং একটু উদাহরন সহযোগে দেখি গোরুর প্রতি কতোটা প্রেম কিছু মুসলিম দেখিয়েছেন। গোরুর কি তাদের কাছে শুধুমাত্র একটি খাদ্য নাকি গো-মাংস আসলে হিন্দুদের ভাবাবেগে আঘাত দেওয়ার একটি অস্ত্র তাদের কাছে। এই বাংলার কিছু উদাহরন ঘেঁটেই দেখা যাক প্রথমে।

একদম হালের একটি ঘটনা দিয়েই উদাহরনমালা শুরু করা যাক। ফেব্রুয়ারী ২০২০ তে শিবরাত্রির দিনে উত্তর দিনাজপুরের ইসলামপুরে যথেষ্ট চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয় মন্দিরে গোমাংস ফেলে রাখার অভিযোগকে কেন্দ্র করে। স্থানীয়দের অভিযোগ শুক্রবার সকালে যখন তারা মন্দিরে শিবরাত্রি উপলক্ষ্যে পুজো দিতে যান তখন দেখেন মন্দিরে গোমাংস ফেলে রাখা হয়েছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে যথেষ্ট চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। এই ঘটনার জেরে এলাকায় উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। স্থানীয়রা এনএইচ ৩১ অবরোধও করেন। পুলিশ লাঠিচার্জ করে। (১)

২৩শে জানুয়ারি, ২০১৭ সালের ঘটনা। মেটিয়াবুরুজের আলমপুরে এক মন্দিরে গোমাংস ফেলার অভিযোগকে কেন্দ্র করে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। (২)

একইভাবে ৩রা মার্চ, ২০১৮ সালে উত্তর চব্বিশ পরগণার দত্তপুকুরের চালতাবেড়িয়া এলাকায় এক মন্দিরে গোমাংস ফেলার অভিযোগকে কেন্দ্র করে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়।যার জেরে এলাকায় কারফিউ জারি করা হয়।(৩)

এবার আমাদের সম্প্রীতিবাজরা বলবেন, “ওরা” কখনই ওরকম নয়। এসবই বিজেপি, আরএসএসের চক্রান্ত। সেক্ষেত্রে আরও একটু পিছিয়ে যাই। যখন বিজেপি ছিলনা। ধরুন সাল ১৯৪৬। আর স্থান পশ্চিমবঙ্গ নয়, পূর্ববঙ্গের নোয়াখালি।

১৯৪৬ সালের ১৩ই অক্টোবর তারিখে নোয়াখালি জেলার রায়পুরে ব্যাপক লুঠতরাজ এবং অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটতে থাকে। ১০ জন মুসলমান গুন্ডা রায়পুরে এসে বলে যে সকল হিন্দু যদি অবিলম্বে ইসলাম ধর্ম গ্রহন না করে তাহলে তাদের আর বাঁচিয়ে রাখা হবেনা। ১৪ই অক্টোবর তারিখে ৫০০ জন সশস্ত্র দুর্বৃত্ত লাঠি, বল্লম, দাঁ, কেরোসিন ও পেট্রোল নিয়ে “আল্লাহ আকবর” এবং “পাকিস্তান জিন্দাবাদ” ধ্বনি তুলে রায়পুরের একটি পর একটি হিন্দু বাড়িতে আক্রমণ চালায়। তারা বাড়ি থেকে সমস্ত জিনিষ লুঠ করে। হিন্দুদের মন্দির ধ্বংস করে। গৃহস্থের গৃহদেবতা, শালগ্রাম শিলা এবং অন্যান্য দেবদেবীর মূর্তি ভেঙে গুড়িয়ে দেয়। তারপর কেরোসিন ও পেট্রোল ঢেলে গোটা গ্রাম জ্বালিয়ে দেয়। এই আক্রমণের মুখে রায়পুরের কংগ্রেস কমিটির সম্পাদক হরেন ঘোষ এই আক্রমণ থেকে বাঁচতে জঙ্গলে লুকোন। কোন কোন সময় দিনের বেলা তিনি পুকুরে ডুবে বসে থাকতেন এবং ধানগাছের মধ্যে আত্মগোপন করে থাকতেন। রাত্রে তিনি দুজন মুসলমান শ্রমিকের বাড়িতে গিয়ে উঠতেন। ঐ দুজন শ্রমিক তাকে বলেছিল, যদি তিনি স্বেচ্ছায় ইসলাম ধর্ম গ্রহন করেন তবেই প্রানে বাঁচবেন। তাকে বাধ্য হয়ে ঐ প্রস্তাব মেনে নিতে হয়। মুসলিম দুর্বৃত্তরা একটি চুক্তিপত্রে তাকে দিয়ে সই করায়। ১৫ই অক্টোবর তারিখে তারা হরেনবাবুকে রায়পুর মসজিদে নিয়ে যায় এবং ধর্মান্তকরন করে। তাকে ঐ মসজিদে টানা ১২দিন আটকে রাখা হয়। তিনি বলেছেন – “আমার প্রতিদিনের খাদ্য ছিল ভাত ও গোরুর মাংস। যা প্রতিদিন আমাকে খেতে বাধ্য করা হোত। আমাকে নামাজ পড়ার নিয়ম নীতি শিখিয়ে দেওয়া হয়”। (৪)

এই ঘটনা থেকেই খুব পরিষ্কার ভাবে উঠে আসছে কিভাবে গোমাংসকে হিন্দুদের বিরুদ্ধে একটি অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করা হয়। নোয়াখালির মুসলিমরা কি গোরুর মাংস ছাড়া অন্য কিছু খেতনা। তারা কি রোজ দুবেলা গোরুর মাংস ভাতই খেত খালি? তা তো নয়। তারপরেও হরেন ঘোষকে রোজ দুবেলা গোরুর মাংস খেতে বাধ্য করা হোল তার আত্মসম্মানকে সম্পূর্ণ নষ্ট করার জন্য। তার মনোবল সম্পূর্ণ ভেঙে দিতে। অন্য অনেক হিন্দুদের সাথেও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটেছিল। উদ্দেশ্য হিন্দুদের মনোবল সম্পূর্ণ ভেঙে দেওয়া, যাতে তারা কোনভাবেই আর প্রত্যাঘাত করতে না পারে। যারা রাজী হয়নি তাদের খুন করা হয়েছিল নির্মমভাবে। নিচে সেরকমই একটি ভয়ংকর অভিজ্ঞতা বিবৃত করলাম –

“এই সকল মুসলমান দুর্বৃত্তরা তাদের প্ররোচনায় স্থানীয় মুসলমানদের সাহায্য নিয়ে আমাদের গ্রামে ঢুকে পড়ে। তারা অনৈতিক কাজ করতে থাকে। স্থানীয় মুসলমান জনগণ উত্তেজিত হয়ে ওঠে। একটির পর একটি বাড়ি লুঠ করা হয়। অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। এই কাজ করার সময় দুর্বৃত্তরা আমার পুত্র পরলোকগত যশোদা কুমার রায়, প্রসন্ন কুমার রায় এবং চিত্তরঞ্জন রায় ও আমার জামাতা বিনোদবিহারী রায় মজুমদার (বাবুপুর) –এর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। তাদের অবিলম্বে ইসলাম ধর্ম গ্রহন করতে ও গোরুর মাংস খেতে আদেশ করে। তারা এই ব্যাপারে রাজি না হওয়ায় মেন্দি মিঞা (আবিরপাড়া) আমার জেষ্ঠ্য পুত্র যশোদা কুমার রায়ের গলা কেটে দেয়। ঠিক যেভাবে পশু হত্যা করা হয় তাকেও সেইভাবে হত্যা করা হয়। একইভাবে আমার বাকি দুই সন্তানকেও হত্যা করা হয়”। (৫)

অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে যখন বিজেপি, আরএসএস ছিলনা তখনও গোমাংস ছিল এবং গোমাংসকে হিন্দুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করা হতো এবং এই তাদের এই স্বভাব সেই ইসলামিক আগ্রাসনের শুরুর সময় থেকেই। ১৭৮৮ সালের জুলাই মাসে টিপু সুলতান ২০০ ব্রাহ্মণকে গোমাংস খেয়ে ইসলাম কবুল করতে বাধ্য করেন। মুঘল সম্রাট আওরংজেবও কাশ্মীরি পন্ডিতদের সাথে প্রায় একই ঘটনা ঘটিয়েছিলেন। তাহলে যারা সেই শুরুর সময় থেকে গোমাংস খাইয়ে হিন্দুদের ধর্মান্তরকরন করার চেষ্টা করেছেন তারা যখন সেই গোরুকেই কুরবানী দেন বকরী ঈদ উপলক্ষ্যে তখন তা কতোটা আল্লাহর উপাসনায় নিবেদিত হয়ে করেন আর কতোটা হিন্দুদের প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেওয়ার জন্য, নিজেদের ঔদ্ধত্য দেখানোর জন্য করেন সে প্রশ্ন উঠতে বাধ্য। আর ইতিহাস ঘেঁটে যে উত্তর পাওয়া যায় তাতে দেখা যায় যে এখানে হিন্দুদের ভাবাবেগকে আঘাত করার চেষ্টাই অধিক।

কোরান যা কিনা যে কোন ইসলাম ধর্মাবলম্বীর জীবনচর্যার মূল, সেই গ্রন্থে খাদ্যাভ্যাস নিয়ে বিশেষত মাংস সম্পর্কে কি বলা আছে একটু দেখে নেওয়া যাক।

সুরা ২, আয়াত ১৭৩ এ বলা হয়েছে আল্লাহ মৃত জন্তু, রক্ত, শূকর মাংস এবং যাহার উপর আল্লাহর নাম ব্যতীত অন্যের নাম উচ্চারিত হয়েছে তাহা তোমাদের জন্য হারাম করিয়াছেন।

এই কথাটিই আরও বিশদে বলা হয়েছে সুরা ৫, আয়াত ৩-এ। সেখানে বলা হয়েছে তোমাদের জন্য হারাম করা হইয়াছে মৃত জন্তু, রক্ত, শূকর মাংস, আল্লাহ ব্যতীত অপরের নামে যবেহকৃত পশু আর শ্বাসরোধে মৃত জন্তু, প্রহারে মৃত জন্তু, পতনে মৃত জন্তু, শৃংগাঘাতে মৃত জন্তু এবং হিংস্র পশুতে খাওয়া জন্তু; তবে যাহা তোমরা যবেহ করিতে পারিয়াছ তাহা ব্যতীত, আর যাহা মূর্তি পূজার উপর বেদীর উপর বলি দেওয়া হয় এবং জুয়ার তীর দ্বারা ভাগ্য নির্ণয় করা – এইসব পাপকাজ। আজ কাফিররা তোমাদের দীনের বিরুদ্ধাচারনে হতাশ হইয়াছে; সুতরাং তাহাদিগকে ভয় করিওনা। শুধু আমাকে ভয় করিও। আজ তোমাদের জন্য দীন পূর্ণাঙ্গ করিলাম ও তোমাদের প্রতি আমার অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করিলাম এবং ইসলামকে তোমাদের দীন মনোনীত করিলাম। তবে কেহ পাপের দিকে না ঝুকিয়া ক্ষুধার তাড়নায় বাধ্য হইলে তখন আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।

সুরা ২২ আয়াত ৩০-এ বলা হয়েছে সমস্ত গবাদিপুশু যা কিছুকে হারাম বলেননি আল্লাহ সেসবই খাদ্য হিসাবে গ্রহন করা যাবে। সুরা ৫ আয়াত ৯৬-তে বলা হয়েছে সমুদ্রের সমস্ত মাছ হালাল খাদ্য।
উপরের আয়াতগুলিকে আলোচনা করলে দেখা যায় কোথাওই গোরুর কথা স্পষ্ট করে বলা নেই। বলা সম্ভবও নয় কারন ইসলামের উৎপত্তিস্থল আরবে কোন গোরু ছিলনা। ফলে গোরু নিয়ে কোন নির্দেশও কোরানে নেই। বরং বলা আছে যাহার উপরে আল্লাহর নাম ব্যতীত অন্যের নাম উচ্চারিত হইয়াছে বা যা মূর্তি পুজোর বেদীর উপরে বলি দেওয়া হয়, তা খাওয়া হারাম। এবার মজা দেখুন একদিকে যারা কোরান মেনে বকরী ঈদ পালন করছেন তারাই আবার সেই বকরী ঈদে গোরু জবাই করছে।যদিও কোরান অনুযায়ী যার উপরে আল্লাহ ব্যতীত অন্যের নাম উচ্চারিত হইয়াছে। সেক্ষেত্রে গোরু গোমাতা হিসাবে পূজিত হয়। তাহলে তা হারাম। কিন্তু যারা ধর্মের আগ্রাসনে অধিক বিশ্বাসী তাদের কাছে ক্ষমতা প্রদর্শনই যেহেতু মূল কথা তারা এতো যুক্তির কথা ভাববেননা। বরং এই যুক্তির অপরাধে দুই চারজনের কল্লা নিয়ে নিতে পারেন।

কতোক সেই ভয় এবং কতোক ব্যবসায়ীক বাধ্যবাধকতা থেকেই বিভিন্ন তথাকথিত “পশুপ্রেমিক” সংগঠন বা “পশুপ্রেমীরা” গোহত্যা নিয়ে চুপ থাকেন। কারন তাদের বক্তব্য এতে সম্প্রীতি নষ্ট হবে। অর্থাৎ সম্প্রীতি রক্ষার দায় শুধুমাত্র হিন্দুদেরই। তাদেরই সম্প্রীতি রক্ষার দায়ে গোমাংস খেয়ে ধর্মান্তরিত হতে হবে। তাদের মন্দিরে গোমাংস ফেলা হলে তাদের চুপ থাকতে হবে। আর তারা রুখে দাঁড়ালেই তারা সাম্প্রদায়িক।

এতো গেল যুক্তির কথা। তবে এর বাইরে আইনের কথাও একটি আছে। পশ্চিমবঙ্গে ১৯৫০ সালে মূলত দুধের চাহিদার কথা মাথায় রেখে THE WEST BENGAL ANIMAL SLAUGHTER CONTROL ACT, 1950 লাগু করা হয়। এই আইন মোতাবেক কোন ব্যক্তি যদি গোরু জবাই করতে চান তাহলে তাকে মিউনিসিপ্যালিটি বা পঞ্চায়েতের পশুপালন দপ্তর থেকে সার্টিফিকেট জোগাড় করতে হবে, তবেই সে গোরু জবাই করতে পারবে। এই সার্টিফিকেট শুধুমাত্র যেক্ষেত্রে গোরুর বয়স ১৪-এর বেশী বা স্থায়ীভাবে দুগ্ধ উৎপাদনে বা গোশাবকের জন্ম দিতে অক্ষম বা কোন দুরারোগ্য অসুখে ভুগছে সেই ক্ষেত্রেই দেওয়া হবে। (৬) এবার আপনারাই বলুন আপনাদের কি ধারণা বকরী ঈদ উপলক্ষ্যে যারা পশ্চিমবাংলায় গোরু জবাই করেন তাদের কয়জন এই সার্টিফিকেট সংগ্রহ করেন? অর্থাৎ আইনকেও অগ্রাহ্য করা হচ্ছে।

একদিকে যেমন বকরী ঈদ ধর্মের আগ্রাসন এবং ক্ষমতার আস্ফালন অপরদিকে আইন অমান্যও বটে। ভারতবর্ষের যেকোন নাগরিক তিনি যে ধর্মেরই হন না কেন, তার দায়বদ্ধতা সবার আগে দেশের আইনের প্রতি। নিজের ধর্মের প্রতি নয়। কিন্তু যারা ধর্মের ভিত্তিতে নিজেদের ক্ষমতার আস্ফালন করতে চান তারা আইনকে গ্রাহ্য করেননা। অপরদিকে আমাদের সরকারও এই নিয়ে নিশ্চুপ।

আমাদের তথাকথিত বুদ্ধিজীবীরা দেখেও দেখেননা। তারা বরং বেশী আগ্রহী একে বাঙালির সর্বজন গ্রাহ্য উৎসব বলে আখ্যায়িত করতে। অথচ হিন্দুদের পুজোয় বলি প্রথা উঠে গেলেও প্রতি কালীপুজো বা দুর্গা পুজোর আগে ঘটা করে তারা নানা বক্তব্য রাখবেন পশু হত্যার বিরুদ্ধে। পেটার মতো “পশুপ্রেমী” সংগঠন রাখীর আগে আমাদের কাছে আবেদন জানাবে চামড়ার রাখী ব্যবহার না করতে। এনারা এতোই উন্নাসিক যে জানেনওনা রাখীর মতো শুভ উৎসবে হিন্দুরা চামড়ার দ্রব্য ব্যবহার করেনা। ফলে সেখানে পশু হত্যার প্রশ্নও আসছেনা। কিন্তু পশু হত্যা যখন চোখের সামনে ঘটছে তখন কিন্তু তারা চুপ।

কি করে বকরী ঈদ বাঙালির সর্বজন গ্রাহ্য উৎসব হতে পারে যখন এই উৎসব আসলে ক্ষমতা প্রদর্শনের এক মাধ্যমে পরিণত হয়েছে। যা বাংলার হিন্দুদের অর্থাৎ বাঙালিদের দিকে প্রতিনিয়ত ছুঁড়ে দেওয়া চ্যালেঞ্জেরই এক রূপ তা কখনই বাঙালির উৎসব নয়। এ আসলে বাঙালির বাঙালিয়ানার প্রতি অবমাননা। সেই জন্য বকরী ঈদ বাঙালির উৎসব নয়। আসলে তা ক্ষমতাশীল মুসলিমদের ক্ষমতা প্রদর্শনের হাতিয়ার। বাঙালির উৎসব তাই যে উৎসবে বাংলার মাটির স্বাদ গন্ধ মিশে আছে। যে উৎসব বাংলার একান্ত নিজস্ব উৎসব। বাঙালির ঐতিহ্যময় সংস্কৃতি এবং দর্শন তাকে নানাবিধ এমন নিজস্ব উৎসব দিয়েছে। তাই বাঙালির আরব থেকে ধারকরা উৎসবে মেতে ওঠার প্র্য়োজন নেই। বিশেষত যে উৎসবের মাধ্যমে বাঙালিকে তার রক্তাক্ত ইতিহাস মনে করিয়ে দেওয়া, তাকে ক্ষমতার স্পর্ধা দেখানোই এক শ্রেনীর মানুষের মূল উদ্দেশ্য। বাঙালির উৎসব নতুন ধানের আঘ্রাণে, ষোড়শী মেয়েটার সরস্বতী পুজোর দিনের হলুদ শাড়িতে বা অষ্টমীর অঞ্জলিতে মায়ের লাল পেড়ে সাদা শাড়িতে।

(মতামত লেখকের নিজস্ব)

তথ্য ঋণ:-

১) https://www.opindia.com/2020/02/west-bengal-islampur-hindu-temple-animal-meat-beef-shivaratri/

২) https://www.hindustantimes.com/india-news/beef-thrown-in-temple-bengal-govt-worried-as-communal-clashes-spread-to-kolkata/story-yIsnXKOm1R6NHJ4SYQ6myN.html

৩) https://indianexpress.com/article/cities/kolkata/west-bengal-north-24-parganas-rumour-of-meat-thrown-at-temple-sparks-tension-5084218/

৪) ১৯৪৬, কোলকাতা হত্যা এবং নোয়াখালি গণহত্যা, পৃষ্ঠা – ৩১২

৫) ১৯৪৬, কোলকাতা হত্যা এবং নোয়াখালি গণহত্যা, পৃষ্ঠা – ৩১৫

৬) https://wbard.gov.in/files/PDF/WB%20Animal%20Slaughter%20Control%20Act%201950.pdf

We are not big media organisation. Your support is what keeps us moving. Don't hesitate to contribute because, work, for society needs society's support. Jai Hind.