বেদোত্তর সাহিত্য :- পুরাণ- ১ম পর্ব

0
36

© পন্ডিত সুভাষ চক্রবর্তী

(১)

বৈদিক সাহিত্যের পরম্পরায় পেয়েছি বেদ সংহিতা, ব্রাহ্মণ সাহিত্য, আরণ্যক ও উপনিষদ এবং ষট-বেদাঙ্গ। বেদ সহায়ক হিসাবে পেয়েছি অনুক্রমণী তথা উপবেদগুলি। এইভাবে ‌এক বিশাল সাহিত্য সম্ভার বৈদিক সংস্কৃতির স্বাক্ষর হিসাবে বেদোত্তর যুগের উত্তরসুরীদের কাছে হস্তান্তরিত হয়। 

বৈদিক যাগযজ্ঞের প্রলম্বিত প্রকল্পগুলি ধীরে ধীরে যখন বেদাঙ্গযুগে শ্রৌতসূত্রের যুগ থেকে গৃহ্যসূত্রের যুগে ক্রমস্তিমিত হয়ে এল তখনই বেদজ্ঞ মুনি-ঋষিরা বৈদিক পরম্পরাকে সাধারণ মানুষের মধ্যে ধরে রাখার জন্য নানা কাল্পনিক সুদূর অতীতের কাহিনীআশ্রিত ঘটনার মধ্য দিয়ে বৈদিক সংস্কৃতিকে ফুটিয়ে তুললেন। ইতিহাস (রামায়ণ-মহাভারতাদি) এবং পুরাণ(মহাপুরাণ ও উপপুরাণ) বেদের অর্থকে উপন্যস্ত করার জন্যই সৃষ্টি হয়েছে।

ইতিহাস হচ্ছে অতীতের ঘটনা(বাস্তবাশ্রয়ী কাহিনী)- লোকোত্তর বীরপুরুষদেরবীরত্বব্যঞ্জক কীর্তি কাহিনীরবর্ণনা। পুরাণ হচ্ছে সুদূর অতীতের ঘটনা- সৃষ্টি, ধর্ম, আচার-ব্যবহার প্রভৃতির উপর বিক্ষিপ্ত আলোচনা। বৈদিক যুগের শেষে আর্য-অনার্য সংস্কৃতি-সমন্বয়েরফলে কার্যত সমগ্র ভারত জুড়ে যে হিন্দু জাতির উদ্ভবঘটে, পুরাণেই রয়েছে সেই জাতির মর্মের ইতিহাস, সেই জাতির ধর্মই হচ্ছে পৌরাণিক ধর্ম। ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতির ধারায় স্ত্রীলোক, শূদ্র ও আচারহীন ব্রাহ্মণের বেদে অধিকার ছিলনা। তাই, তাদের শাস্ত্র কথা জানবার জন্য পুরাণ পথ খুলে দেয়।

পুরাণের বক্তারা সুতজাতীয়। গণশিক্ষা চলতো পুরাণের দ্বারা। পুরাণের গল্পে রয়েছে অতিলৌকিক অসম্ভব সব প্রসঙ্গ। অশিক্ষিত মানুষ সর্ব-কালেই অলৌকিকের দিকে আকৃষ্ট হয়। এগুলি যতটা সত্যি, তার চেয়ে বড় লোক-আকর্ষণের জন্য এর সৃষ্টি।এই পুরাণ শেষে এত জনপ্রিয় হয়ে উঠলো যে বেদের চর্চা ঢেকে গেল। পুরাণ গুলি আরো পরে ধর্মশাস্ত্রের উপর প্রভাব বিস্তার করলো।

(২)
পুরাণ কবে রচিত হয়েছিল ?

বৈদিক সাহিত্যে ‛পুরাণ’ শব্দের উল্লেখ পাই না । ‛হরিবংশ’ পুরাণের আকারে রচিত। গৌতম ও আপস্তম্ভ এই দুই ধর্মসূত্রে পুরাণ শব্দের উল্লেখ পাই। দুই ধর্মসূত্র খৃ: পূ: ৫ম বা ৪র্থ শতকে রচিত। অতএব তার কিছু আগে পুরাণ- গুলির আবির্ভাব। রামায়ণের শেষ ভাগ পুরাণের আকারে রচিত। তবে, কিছু কিছু পুরাণে প্রক্ষিপ্ত অংশ পরবর্তীকালে সংযোজিত হয়েছিল।

বস্তুত, সমাজ জীবনের সঙ্গে তাল রাখতে গিয়ে প্রাচীনতর পুরাণ গুলিও  কালক্রমে অনেক পরিবর্তিত হয়েছে। কতকগুলি পুরাণে শিশুনাগ, নন্দ, মৌর্য, শুঙ্গ, গুপ্ত  রাজবংশ এবং অজাতশত্রু ও চন্দ্রগুপ্তের নাম আছে। খৃ:৭ম শতকের বাণভট্ট( কাদম্বরী রচয়িতা), ৮ম শতকের কুমারিল ভট্ট(প্রখ্যাত পূর্ব-মীমাংসা দার্শনিক), ৯ম শতকের শঙ্করাচার্য( বেদান্ত ভাষ্যকার- এরা পুরাণগুলির সঙ্গে পরিচিত ছিলেন।
পুরাণ কয়টি ?
পুরাণ হচ্ছে এক বৃহত্তর ও ব্যাপক সাহিত্য প্রচেষ্টা। তাই পুরাণকে দুই ভাগে ভাগ করা‌হয়-

১. মহাপুরাণ (প্রধান )

২. উপপুরাণ (অপ্রধান )

মহাপুরাণ :—

ক. ব্রহ্মপুরাণ #

খ. পদ্মপুরাণ *

গ. বিষ্ণুপুরাণ *

ঘ. শিবপুরাণ **

ঙ. ভাগবতপুরাণ *

চ. নারদপুরাণ *

ছ. মার্কণ্ডেয়পুরাণ#

জ. অগ্নিপুরাণ**

ঝ. ভবিষ্যপুরাণ#

ঞ. ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণ# 

ট. লিঙ্গপুরাণ** 

ঠ. বরাহপুরাণ * 

ড. স্কন্দপুরাণ **

 ঢ. বামনপুরাণ # 

ণ. কূর্মপুরাণ ** 

ত. মৎস্যপুরাণ ** 

থ. গরুড়পুরাণ * 

দ. ব্রহ্মাণ্ডপুরাণ #
* চিহ্নিত গুলি বৈষ্ণব পুরাণ।

# ‌‌    চিহ্নিত  গুলি ব্রাহ্ম  পুরাণ।

** চিহ্নিত গুলি শৈব পুরাণ।

দেখা যাচ্ছে, বৈদিক দেবতা ইন্দ্র, অগ্নি, বরুণ, যম, বায়ু, সূর্য–এরা ধীরে ধীরে সমাজে প্রভাব হারিয়ে ফেলেছেন এবং এদের জায়গায় ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বর স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। বস্তুত, ব্রাহ্মণ্য সংস্কারের সঙ্গে লৌকিক সংস্কারের মিশ্রণে পুরাণ গুলির উদ্ভব । 

(ক্রমশ)                                              

We are not big media organisation. Your support is what keeps us moving. Don't hesitate to contribute because, work, for society needs society's support. Jai Hind.

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here