১৯৫০-এর বরিশাল হিন্দু গণহত্যা

১৯৫০-এর বরিশাল হিন্দু গণহত্যা সম্পর্কে জেনে নিন ,বাংলাদেশ থেকে ভারতে আসা অনেক হিন্দুই জানে না তাদের পূর্বপুরুষদের উপর উন্মত্ত দাঙ্গাবাজ মুসলিমরা কিভাবে কচুকাটা করেছিল ! 
স্থান: পূর্ববঙ্গ বা পূর্ব-বাংলা(বর্তমান বাংলাদেশ)তারিখ: ফেব্রুয়ারি-মার্চ ১৯৫০লক্ষ্য: বাঙালি হিন্দুহামলার ধরন: হত্যাযজ্ঞ, জোরপূর্বক ধর্মান্তর, লুটপাট, অপহরণ, অগ্নিসংযোগ,ধর্ষণহামলাকারী : সেনাবাহিনী, ইস্টপাকিস্তান রাইফেলস,স্থানীয় মুসলিম জনগোষ্ঠী !
কারণ: ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা, মুসলিম জনগোষ্ঠী দ্বারা হিন্দু জনগোষ্ঠীর উপর নির্মম হত্যাযজ্ঞ ধর্মীয় কারণে !
পূর্ববঙ্গের পঞ্চাশের গণহত্যা বা ১৯৫০ ‘র বরিশাল দাঙ্গা ১৯৫০ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান বা পূর্ববঙ্গ বর্তমানে বাংলাদেশের বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম সম্প্রদায়ের চালিত একটি বিরামহীন ধারাবাহিক গণহত্যা। এই গনহত্যায় হিন্দু জনগোষ্ঠীর উপর মুসলিম জনগোষ্ঠী এবং পাকিস্তানি পুলিশ, প্যারা মিলেটারি বাহিনী ইচ্ছাকৃত ভাবে হত্যা, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ, নির্যাতন, অপহরণ, ধর্ষণ চালায়। ১৯৫০ সালের ফেব্রুয়ারি এবং মার্চ মাস জুড়ে এই গণহত্যা চলতে থাকে।
পটভূমি: ১৯৪৭ সালের আগস্ট মাসে ব্রিটিশ শাসিত ভারতবর্ষ ধর্মের ভিত্তিতে ভাগ হয়ে ভারত এবং পাকিস্তান নামক দুটি দেশে পরিনত হয়। ব্রিটিশ ভারতের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিমদের নিয়ে গঠিত হয় পাকিস্তান। অবিভক্ত বাংলা প্রদেশে জনসংখ্যার দিক দিয়ে মুসলিমরা হিন্দুদের চেয়ে সামান্য ব্যবধানে এগিয়ে ছিল। কিন্তু অবিভক্ত বাংলারও বিভাজন হয়; মুসলিমগরিষ্ঠ পূর্ববঙ্গ (বর্তমান বাংলাদেশ) যুক্ত হয় পাকিস্তানের সাথে এবং হিন্দু গরিষ্ঠ পশ্চিমবঙ্গ যুক্ত হয় ভারতের সাথে। আসাম প্রদেশের অন্তর্গত বৃহত্তর সিলেট গণভোটের মাধ্যমে পাকিস্তানের সাথে যুক্ত হয়। ১৯৪১ সালের আদমশুমারি অনুসারে পূর্ববঙ্গের জনসংখ্যার ২৪.৫% অমুসলিম, যাদের অধিকাংশ বাঙালি হিন্দু। আবার পশ্চিমবঙ্গের ৩০.২%ছিল মুসলিম এবং বাকিরা সবাই ছিল হিন্দু।
দেশ বিভাগের পর পুরো দশক জুড়ে পূর্ববঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চল বিশেষ করে ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগ জাতিগত ভাবে হিন্দুদের নির্মূলীকরণের সাক্ষী হয়ে ওঠে।দেশবিভাগের মাধ্যমে পাকিস্তান রাষ্ট্রকে অনিবার্য করে তোলার জন্য ১৯৪০ এর দশকে এই হিন্দু হত্যার মাত্রা তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে ওঠে। ১৯৪৬ এর শেষ ভাগে পূর্ববঙ্গের (বর্তমান বাংলাদেশ) নোয়াখালী এবং ত্রিপুরা জেলার বাঙ্গালী হিন্দুরা ধারাবাহিক ভাবে নির্মম গনহত্যা, ধর্ষণ, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ, ধর্মান্তরকরণের শিকার হয় মুসলিমদের দ্বারা যা নোয়াখালী গণহত্যা নামে পরিচিত।
বরিশাল

১৩ ফেব্রুয়ারি তারিখে বরিশালে শুরু হওয়া গনহত্যায় হিন্দুদেরকে নির্বিচারে হত্যা, ধর্ষণ, অপহরণ, নির্যাতন করা হয়। সম্পূর্ণ পরিকল্পনা করে হিন্দু বিরোধী দাঙ্গা শুরু করা হয়। পূর্ব-বাংলা প্রাদেশিক সরকারের প্রেস নোট অনুসারে, দুই অজ্ঞাতপরিচয় যুবক ১৩ ফেব্রুয়ারি দুপুর হতে উত্তেজনাপূর্ণ গুজব ছড়াতে শুরু করে বরিশাল শহর জুড়ে। ফলে বরিশালের দোকানপাট বন্ধ করে দেওয়া হয়। আরও একটি গুজব ছড়ানো হয় যে, শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হককে কোলকাতায় খুন করা হয়েছে।

বরিশালের আকাশে সন্ধ্যা নেমে আসতেই কমপক্ষে আট জায়গাতে অগ্নি সংযোগ করা হয়। বেছে বেছে হিন্দু পাড়ায় আগুন লাগানো হয়। হিন্দুদের ত্রিশটি বাড়ি আগুনে পুড়িয়ে ভস্ম করে দেওয়া হয় এবং কমপক্ষে দশ জন আগুনে দগ্ধ হয়।

পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে শুরু করে যখন ১৬ ডিসেম্বরে বরিশাল জেলার অন্তর্গত গৌরনদী, ঝালকাঠি, নলছিটি সাব-ডিভিশন গুলোতে নির্বিচারে হিন্দুদের উপর হত্যা, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ শুরু করা হয়। এমনকি বরিশাল-ঢাকা যাত্রাপথের স্টিমারগুলোতেও হিন্দু যাত্রীদেরকে হত্যা করে মেঘনা নদীতে ফেলা দেওয়া হয়। নির্যাতনের বীভৎসতা সহ্য করতে না পেরে বরিশালের নৌ বন্দর এলাকা মুলাদী পুলিশ স্টেশনে শত শত হিন্দু এসে আশ্রয় গ্রহন করে।কিন্তু নিজেদের এলাকা থেকে প্রাণ বাঁচাতে আশ্রয় নেয়া হতভাগ্য হিন্দুদেরকে পুলিশ স্টেশন কম্পাউণ্ডের মধ্যেই নির্মম ভাবে হত্যা করে আশেপাশের মুসলিমরা।
একজন হিন্দু স্কুলশিক্ষককে তারই ছাত্ররা জ্যান্ত আগুনে পুড়িয়ে কাবাব তৈরি করে এবং জলন্ত আগুনের চারপাশে তারা নৃত্য করে হত্যা উদযাপন করে। 

বাবুগঞ্জ পুলিশ স্টেশনের অন্তর্গত মাধবপাশা গ্রামে প্রায় তিনশ হিন্দুকে ধাওয়া করে আটক করে মুসলিমরা।এরপরে তাদেরকে সারিবদ্ধ করে দাঁড় করিয়ে রাম দা দিয়ে মাথা কেটে নেয় উন্মত্ত দাঙ্গাকারীরা। 

মাধবপাশা জমিদার বাড়ীতে ২০০ জন হিন্দুকে হত্যা করা হয় এবং আরও ৪০ জন হিন্দু মারাত্মক ভাবে আহত হয়। 
ভোলা শহর থেকে মেঘনা তীরবর্তী ইলিশা স্টিমারঘাট প্রায় ৭ কি.মি. দূরে অবস্থিত।বরিশাল-চট্টগ্রাম জলপথে এই স্টিমার ঘাট পার হয়ে যেতে হয়।১৯৫০ সালের ১৬ই ফেব্রুয়ারি, রয়েল স্টিম নেভিগেশন কোম্পানির এস.এস.সীতাকুণ্ড চট্টগ্রাম যাবার পথে ইলিশাঘাটে নোঙ্গর করে। স্টিমারের নাবিকদল হিন্দু যাত্রীদের কাছ থেকে সর্বস্ব হাতিয়ে নিয়ে যায়। আনুমানিক রাত ৮টার দিকে উন্মত্ত মুসলিমরা স্টিমারের হিন্দু যাত্রীদের উপর চড়াও হয়,যদিও তখন স্টিমার ঘাটে নোঙ্গরকৃত অবস্থায় ছিল।তারা নিরস্ত্র হিন্দু যাত্রীদেরকে নৃশংসভাবে হত্যা করে এবং মৃতদেহ গুলো নদীতে নিক্ষেপ করে।কমপক্ষে ৩০ জন হিন্দু সেদিন নিহত হয় এবং ভাগ্যক্রমে তিন জন হিন্দু আহত অবস্থায় বেঁচে যায়।

বরিশালের সে সময়কার মুসলিম প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, বরিশালে বেশ কয়েক হাজার হিন্দুকে হত্যা করা হয় এবং ২,০০০ হিন্দুর আর কোন হদিস পাওয়া যায়নি। গবেষক শুভশ্রী ঘোষের মতে, বরিশাল জেলায় কমপক্ষে ২,৫০০ জন হিন্দুকে হত্যা করা হয়। তথ্যচিত্র নির্মাতা সুপ্রিয় সেন ধারণা করেন, ৬৫০,০০০ জন হিন্দু বরিশাল থেকে ভারতে পালিয়ে যায় এবং ওই শরণার্থীরা তাদের যাত্রা পথেও হত্যা, ধর্ষণ, অপহরণ ও লুটপাটের শিকার হয়। রবীন্দ্রনাথ ত্রিবেদীর মতে ৩৫ লক্ষ হিন্দু শরণার্থী ১৯৫০ সালে ভারতে পালিয়ে আসে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!