আরোরের যুদ্ধ – মহারাজা দাহির

0
151

© অনিন্দ্য নন্দী
মহারাজা দাহির ছিলেন অধুনা পাকিস্তানের সিন্ধ, পাঞ্জাব ও বালুচিস্তানের শেষ হিন্দু শাসক। তিনি ছিলেন পুষ্কর্ণ ব্রাহ্মণ। আরোরের মহারাজা চাচ এর কনিষ্ঠ পুত্র। মহারাজা চাচ এর মৃত্যুর পর চাচ এর ভাই চন্দ্র আরোরের এর মহারাজা হয়েছিলেন। চন্দ্রের মৃত্যুর পর চাচ এর জ্যেষ্ঠ পুত্র জয়সেনা মহারাজা হন। জয়সেনার অকাল মৃত্যুর পর দাহির সিংহাসনে বসেন। পড়ে তিনি কাশ্মীর থেকে বালুচিস্তান পর্যন্ত সাম্রাজ্য বিস্তর করেন | এই রাজ্য সিন্ধ নামেই পরিচিত হয় | 
আরবের বসরার গভর্নর খলিফা আল হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফ এর সাথে তিনবার যুদ্ধে জয়ী হন মহারাজা দাহির এবং খলিফা সাম্রাজ্যকে সিন্ধু নদের পশ্চিম সীমান্তে আটকে রাখতে সক্ষম হন। অষ্টম শতাব্দীর গোড়ার দিকে যখন হযরত মুহাম্মদ এর সমস্ত আত্মীয়দের নিকেশ করছিল আরব, সেই সময় আরব থেকে পালিয়ে আসা আলাফিদের আশ্রয় দেন মহারাজা দাহির।  হযরত মুহাম্মদ এর পৌত্র হোসেন ইবন আলী কেও আশ্রয় দেন মহারাজা দাহির। হোসেন ইবন আলী প্রাণ বাঁচাতে পূর্বদিকে পালিয়ে এসেছিলেন। যদিও তাকে পরে কারবালাতে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। আলাফিদের সাহায্যে দাহির অনেক যুদ্ধ জয়লাভ করেছিলেন বটে কিন্তু মোহাম্মদ বিন কাসেম যখন দাহিরের রাজ্য আক্রমণ করার পরিকল্পনা করে তখন এই আলাফিরা দাহির কে সাহায্য করতে অস্বীকার করে। খিলাফতের সাথে পরবর্তী যুদ্ধে, আলাফি সামরিক উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করলেও প্রচারে সক্রিয় অংশ নিতে অস্বীকার করেছিলেন; সেই কারণে পরে আলফিদের ক্ষমা করে দেন খলিফা |
৭১১ খ্রিস্টাব্দে সিংহল (আধুনিক শ্রীলঙ্কা) থেকে একটি জাহাজে করে কিছু আরবি মুসলমান আরবে যাচ্ছিল। সিংহলের মহারাজা আরবের খলিফাকে অনেক উপঢৌকন পাঠান সেই জাহাজে করে | সেই সময় সিন্ধের দেবল বন্দর থেকে কিছু জলদস্যু এই জাহাজ কে আক্রমণ করে লুটপাট চালায়। এই দস্যু সর্দারদের আশ্রয় দেন মহারাজা দাহির | এছাড়া মাকরান, বালুচিস্তান এবং সিন্ধু অঞ্চলে উমাইয়া খলিফাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে পার্সিয়ানদের সাথে সিন্ধি সেনাবাহিনীর অংশগ্রহণ (যেমন নাহাওয়ান্দ, সালাসাল ও কাদিসিয়াহে) করার সিন্ধের ওপর আক্রমনের অন্যতম কারণ ছিল । এই দস্যু আক্রমণকে অজুহাত করে মোহাম্মদ বিন কাসেম মহারাজা দাহিরের রাজ্য আক্রমণ করে। কিন্তু আসল কারণ ছিল মহারাজা দাহির দ্বারা হযরত মহম্মদের পৌত্র আর আত্মীয়দের সুরক্ষা আর আশ্রয় প্রদান করা | যে কারবালাতে হুসেন আর হাসানকে হত্যা করা হয়েছিল সেটা আটকাতে মহারাজা দাহির সেনাবাহিনী পাঠিয়েছিলেন | কিন্তু সেনা পৌছানোর আগেই হত্যাকাণ্ড ঘটে যায় | যে দত্ত ব্রাহ্মণরা ইমাম হুসেনকে রক্ষা করেছিলেন তাদেরকেই পরবর্তীকালে নৃশংসভাবে হত্যা করে মহম্মদ গজনবী |

হিন্দুরা চিরকালই নিজেদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে এসেছে। তখনও তাই হয়েছিল। মহারাজা দাহিরের বিরুদ্ধে জাট, ভুট্টো, মেড ইত্যাদি স্থানীয় সম্প্রদায় ও বৌদ্ধদের সাহায্যে আক্রমণ চালায় মোহাম্মদ বিন কাসেম। মহারাজা দাহির ছিলেন একজন ব্রাহ্মণ এবং তাঁর পরামর্শদাতাদের বেশিরভাগই ছিলেন তাঁর পরিবার থেকে। আলোরের শাসক (একজন জাট) বৌদ্ধ ধর্মে ধর্মান্তরীত হয়ে বৌদ্ধধর্ম প্রচার করতে উত্‍সাহী ছিলেন। এই সমস্ত নানা কারণে তাদের মধ্যে “আদর্শিক মতানৈক্য” ছিল | আর এই অন্তর্নিহিত দুর্বলতা আর হিন্দুদের বিশ্বাসঘাতকতা করার প্রবণতাকে হাতিয়ার করেই আরবের খলিফার সেনাপতি মহম্মদ বিন কাসেম এদেরকে মহারাজা দাহিরের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে পেরেছিলেন | দেবল বন্দরের দস্যুদের খতম করে বিন কাসেম নেরুন-এর দিকে যান | নেরুনের সেই সময়ের শাসক একজন বৌদ্ধ ছিলেন | তিনি বিনা যুদ্ধেই নেরুনকে খিলাফত-এর অধীনস্ত বলে মেনে নেন আর বিন কাসেমের কাছে আত্মসমর্পণ করেন | এর পর নেরুনকে সৈন্য ঘাঁটি হিসাবে ব্যবহার করেন বিন কাসেম | এরপরে কাসিমের সেনাবাহিনী ‘সেওয়ান’ দখল করে আর সেখানকার বেশ কয়েকটি হিন্দু উপজাতির প্রধানের কাছ থেকে আনুগত্যও লাভ করে |  এই ভাবে সিন্ধ-এর আশেপাশের অঞ্চলগুলি ঘিরে ফেলে বিন কাসেম | 
যুদ্ধে অবশ্যম্ভাবী পরাজয় হবে দেখে মহারাজা দাহিরের এক পরামর্শদাতা তাঁকে আত্মসমর্পণ করার উপদেশ দেন | কিন্তু উত্তরে মহারাজা দাহির বলেছিলেন :-
“আমি আরবদের সঙ্গে সম্মুখযুদ্ধে লড়তে যাচ্ছি। আমি তাদের সঙ্গে প্রাণপণ লড়াই করব। যদি তাদেরকে ধ্বংস করতে পারি তাহলে আমার রাজ্য শক্ত ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হবে। যদি সম্মানযোগ্য মৃত্যু হয়, তবে ঘটনাটি আরব ও ভারতের ইতিহাসে লেখা থাকবে, জ্ঞানিগুণিরা এটি নিয়ে আলোচনা করবেন। পৃথিবীর অন্যান্য রাজারা এটি জানবেন। সর্বত্র বলা হবে যে শত্রুর সঙ্গে লড়াইপূর্বক সিন্ধুর মহারাজা দাহির তার দেশের জন্য নিজের মূল্যবান জীবন উৎসর্গ করেছেন।”
একথা শুনে তাঁর পরামর্শদাতা তাঁকে তাঁর পরিবাবরের সদস্যদের ভারতের কোনও রাজ্যে সুরক্ষিত জায়গায় পাঠিয়ে দেওয়ার অনুরোধ করেছিলেন | একথার উত্তরে মহারাজা দাহির বলেছিলেন :-
“আমি আমার পরিবারকে নিরাপদ স্থানে পাঠাতে পারিনা যখন আমার ইষ্টদেবতা এবং রাজ্যের জনতার পরিবার এখানেই আছেন।”
মহারাজা দাহির সিন্ধু নদের পূর্ব তীরে সেনা পাঠিয়ে কাসিমকে সিন্ধু নদ অতিক্রম করতে না দেওয়ার জন্য চেষ্টা করেন। বিন কাসেম নদী অতিক্রম করে এবং জিতোরে দাহিরের পুত্র জয়সাহ এর বাহিনীকে পরাস্ত করে। ৭১২ সালে আরোরে (বর্তমান নওয়াবশাহ) কাসিম দাহিরের যুদ্ধ হয় | তীরবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন মহারাজা দাহির সেন। সিন্ধু নদের তীরে মহারাজা দাহিরের মৃত্যুর পর তার মস্তক দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয় এবং হাজ্জাজ বিন ইউসুফ এর কাছে পাঠানো হয়। মহারাজা দাহিরের স্ত্রী জহর ব্রত পালন করেন | আর তাঁর কন্যাদের খলিফার হারেমে পাঠিয়ে দেয় বিন কাসেম | কিন্তু রাজা দাহিরের কন্যারা খলিফাকে বিন কাসেমের বিরুদ্ধে এমনভাবে উসকিয়ে দেন যে খলিফা বিন কাসেম কে প্রাণদন্ড দেন | পরে যখন খলিফা এই কৌশলের বিষয়ে জানতে পারে তখন দাহিরের কন্যাদের দেওয়ালে গেঁথে দেওয়ার আদেশ দেওয়া হয় | নিজেদের মৃত্যুর আগে পিতার হত্যাকারীর মৃত্যুর কারণ হন তাঁরা |


ভারতীয় ইতিহাসে মহারাজা দাহিরের কোনও উল্লেখ নেই | স্বাধীনতা পরবর্তী ভারতের স্কুল কলেজের পাঠ্য ইতিহাস লেখার দ্বায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল কমিউনিষ্ট ঐতিহাসিকদের | ভারতের ইতিহাসের এমন একজন গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় আর এমন একজন বীর দেশপ্রেমী রাজার কথা কেন আমাদের ইতিহাসে স্থান পেল না তার উত্তর পাওয়া মুশকিল হলেও কারণটা অজানা নয় | যদি মহারাজা দাহিরকে একজন বীর যোদ্ধা, দেশপ্রেমী রাজা হিসাবে দেখানো হতো, যদি “আদর্শিক মতানৈক্য” -র কারণে তাঁর সাথে হওয়া বিশ্বাসঘাতকতা আর তার পরিনামের কথা দেশের ছাত্রছাত্রীদের পড়ানো হতো তাহলে হয়তো মুঘল আর বাকি মুসলিম আক্রমণকারীদের কে হিরো হিসাবে দেখাতে অসুবিধা হতো | তাহলে হয়তো “আকবর দি গ্রেট” বলতে কোথাও না কোথাও খটকা লাগতো| তাহলে হয়তো “দে দি আজাদী বিনা খড়গ বিনা ঢাল” গান গাওয়া যেত না | দেশ নতুন করে বাবা বানাতো না | মহারাজা দাহিরের মৃত্যুর পর সিন্ধ আর তার পূর্ব অঞ্চলে যে অকথ্য অত্যাচার, বলপূর্বক ধর্ম পরিবর্তণ, লুট, আর হিন্দু মহিলাদের জোর করে হারেমের গণিকা বানানো হয়েছিল, সেটা যদি পাঠ্য ইতিহাসে লেখা থাকতো তাহলে হয়তো ভারতের সেকুলার ছবি আঁকা হয়ে উঠতো না, তাহলে হয়তো হিন্দুরা কিছুটা হলেও বুঝতো এই “আদর্শিক মতানৈক্য”-এর পরিণাম হিসাবে তারা কী পেয়েছে | তাই বাবর থেকে ঔরঙ্গজেব পর্যন্ত, খিলজী থেকে ফিরোজ শাহ পর্যন্ত প্রতিটা বিদেশীর সব দোষ চাপা দিয়ে তাদের গুণগান করে তাদের নামে রাস্তা, শহর রেল স্টেশন বানালাম | 
যে রাজা ভেবেছিলেন যে তাঁর দেশ, তাঁর দেশের ইতিহাস তাঁর এই বীরগাথাকে, তাঁর এই বলিদানকে মনে রাখবে, সেই রাজাকে আমরা এতো বড়ো প্রতারনা করলাম ! মহারাজা দাহিরের কাহিনী পড়ার পর আমি যে কষ্টটা অনুভব করেছি, জানিনা আমি এই লেখা দিয়ে সেটা ঠিক করে প্রকাশ করতে পারলাম কি না, কিন্তু যতবার আমি মহারাজা দাহিরের ওই উক্তিটা মনে করি ততবার নিজেদের প্রতারক ছাড়া আর কিছু মনে হয় না |

We are not big media organisation. Your support is what keeps us moving. Don't hesitate to contribute because, work, for society needs society's support. Jai Hind.