দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গ- শ্রীমল্লিকার্জুন

0
108

    ©  শ্রী সূর্য শেখর হালদার

 পর্ব : ২ ( শ্রীমল্লিকার্জুন )

শ্রীমল্লিকার্জুন ( শ্রীশৈলম)

এই পবিত্র জ্যোতির্লিঙ্গ অন্ধ্রপ্রদেশের কৃষ্ণা নদীর তটে শ্রীশৈলম পর্বতের উপর অবস্থিত। এই পর্বত কে দক্ষিণে কৈলাস বলা হয়। মহাভারত শিব পুরাণ এবং পদ্মপুরাণ ইত্যাদি
ধর্মগ্রন্থাদিতে এর মহিমা এবং মাহাত্ম্য বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করা হয়েছে।

এই জ্যোতির্লিঙ্গের আবির্ভাব নিয়ে নানা কাহিনী প্রচলিত রয়েছে। একবার ভগবান শংকর এর দুই পুত্র শ্রী কার্তিক ও শ্রী গণেশ বিবাহের জন্য পরস্পরের সঙ্গে কলহে লিপ্ত হন। প্রত্যেকে নিজের বিবাহ যাতে আগে হয় তার জন্য আগ্রহী ছিলেন। তাঁদের দুইজনকে বিবাদ করতে দেখে ভগবান শংকর এবং মাতা ভবানী বলেন,

” তোমাদের মধ্যে যে আগে সমস্ত পৃথিবী পরিক্রমা করে এখানে ফিরে আসবে তার বিবাহ প্রথম দেওয়া হবে।”

মাতা ও পিতার এই কথা শুনে শ্রী কার্তিকেয় দ্রুত পৃথিবী পরিক্রমা করতে বেরিয়ে পড়লেন। কিন্তু শ্রী গনেশ এর পক্ষে এই কাজ ছিল বড় কঠিন। আকৃতিতে তিনি স্থূলকায়, তাছাড়া তাঁর বাহন হলো মূষিক । তিনি কিভাবে কার্তিকের সঙ্গে দৌড়ে সমকক্ষ হবেন? কিন্তু শ্রী গণেশ ছিলেন বুদ্ধিমান। তিনি অবিলম্বে পৃথিবী পরিক্রমার এক সহজ উপায় বার করলেন। তিনি উপবিষ্ট মাতা-পিতাকে পূজা করে তাঁদের সাত বার প্রদক্ষিণ করে পৃথিবী পরিক্রমার কাজ সম্পূর্ণ করে নিলেন। এই কাজ ছিল শাস্ত্র অনুমোদিত।

” পিত্রোশ্চ পূজনং কৃত্বা প্রক্রান্তিং চ করোতি য: ।
তস্য বৈ পৃথিবীজন্যং ফলং ভবতি নিশ্চিন্তম ।।”

সমগ্র পৃথিবী পরিক্রমা করে শ্রী কার্তিক যখন ফিরলেন, ততদিনে সিদ্ধি এবং বুদ্ধি নামধারী দুটি কন্যার সঙ্গে শ্রী গণেশের বিবাহ সম্পন্ন হয়েছে এবং ক্ষেম ও লাভ নামক দুটি পুত্র ও হয়েছে। এইসব দেখে শ্রী কার্তিকেয় অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হলেন এবং ক্রৌঞ্চ (শ্রীশৈলম) পর্বতের উপরে চলে গেলেন। শিব ও পার্বতী তখন চললেন তাঁদের পুত্র শ্রী কার্তিকের মান ভঙ্গ করতে, কিন্তু গিয়ে দেখলেন শ্রী কার্তিক সেখান থেকে চলে গেছেন। ভগবান শংকর বললেন যে তিনি সেখানেই থাকবেন এবং অপেক্ষা করবেন শ্রী কার্তিকের জন্য। তখন তিনি লিঙ্গ মূর্তি ধারণ করে সেখানে রয়ে গেলেন। সেই লিঙ্গ মূর্তি দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গের অন্যতম শ্রী মল্লিকার্জুন। এনাকে সর্বপ্রথম মল্লিকা পুষ্প দ্বারা অর্চনা করা হয় বলে এনার নাম মল্লিকার্জুন ।

দ্বাপর যুগের একটি কাহিনী অনুযায়ী একবার নাল্লামালাই পাহাড়ে শিলাদি মুনি কঠিন কঠোর তপস্যা করছিলেন বছরের পর বছর ধরে। মহাদেব সেই সাধনায় তুষ্ট হয়ে শব্দব্রহ্ম রূপে উপস্থিত হলেন শিলাদি মুনির সামনে । ভগবান শংকর জিজ্ঞাসা করলেন ,

” কী বর চাও?”

শিলাদি মুনি বর হিসেবে একটি পুত্র সন্তান কামনা করলেন। যথারীতি শিলাদি মুনি একটি পুত্র সন্তান লাভ করলেন। সেই পুত্র ছোটবেলা থেকেই ছিল শিব ভক্ত। সেও চায় শিবের দর্শন। কিন্তু মানব দেহের পক্ষে মহা জ্যোতি র তেজ সহ্য করা সম্ভব ছিল না। তাই বারবার দৈববাণী দিয়ে তাঁকে সাবধান করতে লাগলেন দেবাদিদেব। কিন্তু শিলাদি পুত্র সে কথা শুনল না। তপস্যায় সন্তুষ্ট হয়ে মহাদেব আবির্ভূত হলেন। সে এক তেজোময় মহাজ্যোতি ! তার প্রভাবে অন্ধ হয়ে গেলেন শিলাদি মুনির ছেলে, আর বিলীন হয়ে গেলেন সেই মহা জ্যোতির মধ্যে । সেই মহাজ্যোতি জ্যোতির্লিঙ্গ রূপে রয়ে গেল শ্রীশৈলম পাহাড়ের উপরে।

এই জ্যোতির্লিঙ্গ বিষয়ে আরো একটি কাহিনী আছে। এই কাহিনী অনুযায়ী শ্রীশৈলম পর্বতের কাছে কোন সময়ে রাজা চন্দ্রগুপ্তের রাজধানী ছিল। কোন বিপত্তি নিবারণের জন্য রাজার এক কন্যা রাজকুমারী চন্দ্রাবতী মহল থেকে বেরিয়ে এসে পর্বত রাজের আশ্রয় গ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন শিব ভক্ত। তাঁর সঙ্গে ছিল একটি অতি সুলক্ষণযুক্ত, সুন্দর শ্যাম বর্ণের গাভী। এই গাভীর দুধ কেউ রাত্রে দোহন করে চুরি করে নিয়ে যেত। একদিন রাত্রে রাজকন্যা চোরকে দুধ দোহন করতে দেখে ফেলেন এবং ক্রুদ্ধ হয়ে তাকে হাতেনাতে ধরতে দৌড়ে যান। কিন্তু গাভীর কাছে পৌঁছে তিনি দেখেন যে সেই স্থানে শুধুমাত্র একটি শিবলিঙ্গ রয়েছে, তা ছাড়া আর কিছুই নেই। রাজকুমারী কিছুকাল পরে সেই শিবলিঙ্গের ওপরে এক বিশাল মন্দির নির্মাণ করান। এই শিবলিঙ্গ মল্লিকার্জুন নামে প্রসিদ্ধ।

শিবরাত্রির সময় এখানে বিশাল মেলা বসে।

শ্রী মল্লিকার্জুন দক্ষিণ ভারতের অন্যতম শৈবতীর্থ। এর অবস্থান যে শ্রীশৈলম পর্বতে, সেই পর্বত অন্ধ্রপ্রদেশের গুন্টুর নগরের কাছে অবস্থিত। শ্রীশৈলম পর্বতের পাশ দিয়েই চলে গেছে কৃষ্ণা নদী। এই নদী যা এখানে পাতালগঙ্গা নামে পরিচিত তিন দিক দিয়ে ঘিরে রেখেছে শ্রীশৈলম
পর্বতকে।

শ্রী মল্লিকার্জুন এর আদি মন্দির টি ছোট, পর্বত শীর্ষে একটি বটগাছের নিচে অবস্থিত। বিজয়নগর রাজ্যের রাজা শ্রী হরিহর রায় বর্তমান মন্দিরটি তৈরি করিয়েছিলেন পঞ্চদশ শতাব্দীতে। সারা মন্দিরেই বিজয়নগর স্থাপত্যের নিদর্শন ছড়িয়ে রয়েছে। আর মন্দিরের মধ্যে রয়েছে ব্রোঞ্জের তৈরি নটরাজ মূর্তি।

এই শ্রীশৈলম পাহাড়ের নিচেই অবস্থিত ৫১টি সতীপীঠ এর একটি। শ্রী বিষ্ণু যখন সুদর্শন চক্র দিয়ে সতী দেহ খন্ড খন্ড করে ফেললেন, তখন মায়ের চিবুক পড়েছিল এই শ্রীশৈলম পর্বতের পাদদেশে, কৃষ্ণা নদীর তীরে। সতীর অঙ্গ পড়েছিল কিছুটা জলে কিছুটা স্থলে। আর সেখানেই তৈরি হয়েছে মায়ের মন্দির। দেবীর নাম ভ্রামরী বা ভ্রমরম্ভা । এখানে ভৈরব হিসাবে বিরাজ করছেন শ্রীমল্লিকার্জুন। একটি গাছের নিচে অবস্থিত ছিল এই জ্যোতির্লিঙ্গ।

আলাউদ্দিন খিলজির সেনাপতি মালিক কাফুর দাক্ষিণাত্য অভিযানের সময় তরবারি দিয়ে আঘাত করেছিলেন সেই জ্যোতির্লিঙ্গ কে। বিকৃত সেই জ্যোতির্লিঙ্গ তখন থেকে বিকৃতাক্ষ নামে পরিচিত । দেবী ভ্রামরী কালিকার ভৈরব বিকৃতাক্ষ ।

পুরণাদিতে এই মল্লিকার্জুন শিবলিঙ্গ এবং তীর্থক্ষেত্রের অতীব মহিমা বর্ণনা আছে। এই শিব লিঙ্গের দর্শন, পূজা ও অর্চনা করলে ভক্ত গনের সকল সাত্বিক মনোকামনা পূর্ণ হয়। দৈহিক, দৈবিক , এবং ভৌতিক সর্বপ্রকার বাধাবিঘ্ন থেকে ভক্তগণ মুক্ত হন।

সর্বসুগন্ধিসুলেপিত লিঙ্গং
বুদ্ধিবিবর্ধিতকারণ লিঙ্গং
সিদ্ধসুরাসুরবন্দিত লিঙ্গং
তৎ প্রণমামি সদা শিবলিঙ্গং ।

তথ্য ঋণ:

১. শিব ঠাকুরের বাড়ি: সোমনাথ: দেব সাহিত্য কুটির

২. ওম নমঃ শিবায়: গীতা প্রেস , গোরক্ষপুর।

🚩🙏 জয় মহাকাল🚩🙏

We are not big media organisation. Your support is what keeps us moving. Don't hesitate to contribute because, work, for society needs society's support. Jai Hind.