আমাদের আত্মসমালোচনা: ইসলাম ও কম্যুনিজম থেকে আমরা কি শিক্ষা নিতে পারি?

0
178

© সায়ণ পাল

দাঁড়ান, দাঁড়ান, হেডলাইনটা দেখেই আমাকে মাকু ও মুমিনদের দালাল বা ঐ জাতীয় কিছু বলে খিস্তি দেওয়ার আগে ক্ষণকাল তিষ্ঠোন ওখানেই।

সামাজিক মাধ্যমের দৌলতে এখন মোটামুটি কম্যুনিজম আর ইসলামের অবৈধ সম্পর্কের কথা সর্বজনবিদিত। তাদের Modus Operandi অর্থাৎ কার্যপদ্ধতিও যে প্রায় সম্পূর্ণই এক — সেটাও বর্তমানে সর্বজনবিদিত। তাদের রেজিমেন্টেশন, তাদের অনুশাসন, হাইকমান্ডের সিদ্ধান্ত বা নির্দেশের উপর তাদের প্রশ্নাতীত ভক্তি ও বিশ্বাস (No question to the High Command) — এককথায় বিরলের মধ্যে বিরলতম দ্রষ্টব্য। আর সেখানে আমরা, মানে জাতীয়তাবাদী বা হিন্দুত্ববাদীরা এখনও তাদের থেকে কয়েকশো আলোকবর্ষ পিছিয়ে রয়েছি।

বিশ্বাস হচ্ছে না তো? অতি সম্প্রতি কিছু ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার উদাহরণ দি?

বিগত ২০ শে জুন পালিত হলো “পশ্চিমবঙ্গ দিবস”। আমাদের “পশ্চিমবঙ্গের জন্য”-এর পক্ষ থেকে এই বছর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিলো যে এই বছর ট্যুইটারে হ্যাশট্যাগকে ট্রেন্ড করানো হবে। প্রসঙ্গতঃ, ট্যুইটারে হ্যাশট্যাগ ট্রেন্ড করানোর কিছু নিয়ম আছে। সাধারণতঃ কিছু অত্যাবশ্যকীয় নিয়ম পালন করার মাধ্যমে হ্যাশট্যাগ ট্রেন্ড হয়। প্রথম ফ্যাক্টর হলো Quantity, অর্থাৎ কোনো নির্দিষ্ট হ্যাশট্যাগকে ব্যাপকহারে ট্যুইট করলে সেটা ট্রেন্ড করতে পারে। দ্বিতীয় ফ্যাক্টরটি হলো Quality, অর্থাৎ যার ট্যুইটারে ফলোয়ার্স বেশি আছে ও যার ট্যুইটে রি-ট্যুইট বেশি হয়, তার একটা পৃথক weightage আছে। মানে একই ট্যুইট যদি আমিও করি আর সেলিব্রিটি কেউ একজনও করেন, তাহলে জনৈক সেলিব্রিটি দ্বারা কৃত ট্যুইটেই কিন্তু সেই হ্যাশট্যাগের ট্রেন্ড হওয়ার সম্ভাবনা বৃদ্ধি পাবে। কারণ, সেই সেলিব্রিটির ফলোয়ার আমার থেকে অনেক বেশি, অধিকতর তার ট্যুইটে রি-ট্যুইটও আমার থেকে অনেক বেশি হবে। তৃতীয় ফ্যাক্টর হলো, টাইমিং। সারাদিন একই হ্যাশট্যাগ দিয়ে ট্যুইট চললেও যদি তার পরিবর্তে নির্দিষ্ট একটি বা দুটি ঘন্টায় সারাদিনে যে পরিমাণ ট্যুইট হয়েছে, তার থেকে কম পরিমাণেও ট্যুইট করানো যায়, তাহলেও সেই ক্ষেত্রে হ্যাশট্যাগ ট্রেন্ড হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বৃদ্ধি পাবে।

এইবার আসল কথায় ফিরে আসি। ২০ শে জুন উপলক্ষ্যে আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম #WestBengalDay-কে ট্রেন্ড করানো হবে এবং মোটামুটি সকাল দশটার মধ্যেই ট্যুইট করানো হবে সকলকে দিয়ে। মনে রাখবেন, কেন্দ্রে জাতীয়তাবাদী সরকার; রাজ্যে তথাকথিত জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক দলটাই বর্তমানে বিরোধী আসনে, লোকসভার ৪২ টি আসনের মধ্যে ১৮ টিই তাদের দখলে। এ ছাড়াও তো অজস্র জাতীয়তাবাদী ও হিন্দুত্ববাদী সংগঠন ও তাদের নেতা ও কার্যকর্তারা আছেনই। এইবার ২০ শে জুন সারাদিনের চিত্রে দেখা গেলো, কেউ সকাল ন’টায় ট্যুইট করেছেন তো কেউ সকাল সাড়ে দশটায়, কেউ বেলা বারোটায় ট্যুইট করেছেন তো কেউ দিবানিদ্রা সম্পূর্ণ করে বিকেল পাঁচটায়, কেউ দশটা ফোনের পরেও ট্যুইট করেননি তো কেউ ট্যুইট করেছেন বটে, কিন্তু হ্যাশট্যাগটাই দেননি। অর্থাৎ নিয়মানুবর্তিতা, অনুশাসনের ধারকাছ দিয়েও কেউ অগ্রসর হননি। ফলাফল যা হওয়ার ছিল, সেটাই হয়েছিল। সর্বভারতীয় ট্যুইটার ট্রেন্ডে #WestBengalDay একবারের জন্যও জায়গা পায়নি, তাকে সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছে কলকাতা লোকেশনে একবার কয়েক মিনিটের জন্য দ্বিতীয় অবস্থানে থেকে, অবশ্য প্রথম পাঁচের মধ্যে কয়েক ঘন্টা ঘোরাফেরা করেছিলো।

কাট টু কম্যুনিজম। বিগত ৮ ই জুলাই ছিল মরিচঝাঁপি ভূমি সংস্কারক জ্যোতি পশুর জন্মদিন। সামাজিক মাধ্যমে আমরা তাদেরকে ৭% বলে সব সময় খিল্লি করি বা সামাজিক মাধ্যমে জাতীয়তাবাদী ও হিন্দুত্ববাদীদের তাণ্ডব নিয়ে আমরা অহঙ্কার করি, অথচ এই মরা বাজারেও ওরা ট্যুইট করা শুরু করলো ঠিক রাত আটটা থেকে — ব্যাপকহারে ও ওদের সেলিব্রিটিদের দ্বারা। রেজিমেন্টেশনের সুফল ওরা পেলো। সর্বভারতীয় লোকেশনে #BengalSalutesJoytiBasu স্থান পেলো তিন নম্বরে।

হ্যাঁ, এটাই হলো ওদের রেজিমেন্টেশন, এটাই হলো ওদের অনুশাসন!!!

শেষপাতে একটু আমাদের ঐক্যের কথা তুলে ধরি একই অভিজ্ঞতা থেকে?

আমাদের “পশ্চিমবঙ্গের জন্য”-এর পক্ষ থেকে আরেকটি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিলো যে ২০, ২১ ও ২২ শে জুন — নিদেনপক্ষে এই তিনদিন একটি নির্দিষ্ট ফেসবুক ফ্রেম নিজেদের প্রোফাইল পিকচারে সেট করতে হবে। কারোর অভিযোগ, ফেসবুক ফ্রেমটা লাগালে প্রোফাইল পিকচারের রিচ কমে যাচ্ছে (আগে যেখানে ৫০০-৭০০ লাইক পড়তো, সেখানে ওই ফেসবুক ফ্রেমসহ প্রোফাইল পিকচারটা লাগালে রিচ মাত্র ৫০-এর কোঠায় ঘোরাফেরা করছে, অতএব, ফ্রেম লাগাবো না); কারোর অভিযোগ, ফেসবুক ফ্রেমটা লাগালে প্রোফাইল পিকচারের রেজোলিউশন কমে যাচ্ছে, অতএব, ফ্রেম লাগাবো না; কারোর অভিযোগ, ফেসবুক ফ্রেমটা লাগালে প্রোফাইল পিকচারের কিছু অংশ ঢাকা পড়ে যাচ্ছে, অতএব, লাগাবো না — এরকম হাজারখানেক কু’যুক্তির সম্ভার নিয়ে তারা উপস্থিত হলো। কেউ কেউ তো আবার দেখা গেল, নিজেদের মতো করে তারা একটি ফেসবুক ফ্রেম বানিয়ে তারপর তাদের তিন-চারজনের বৃত্তে তাদের নিজেদের তৈরী সেই ফেসবুক ফ্রেমসহ নিজেদের ছবি তারা আপলোড করেছে।

অথচ এই একই কাজ সামান্য লোক্যাল কমিটি (LC) থেকে বলে দিলেও পার্টির ক্যাডারদের আর সাহস হতো না তার বিরোধিতা করার।

হ্যাঁ এটাই ওদের ঐক্য, এটাই ওদের অনুশাসন।

ওদের এই মরা বাজারে এখনও যদি ওরা একটা সেমিনার বা র‍্যালির আয়োজন করে, তাতেও সেই সেমিনার বা র‍্যালিতে যোগদান করার জনা সত্তর থেকে আশিজন সদস্য/সদস্যা যোগদান করবেই; আর সেখানে আমাদের এই ভরা বাজারেও আমাদের দ্বারা আয়োজিত কোনো সেমিনার বা র‍্যালিতে যদি ভুলক্রমে ১০০ জনও চলে আসে, তাতেও আমরা নিজেদেরকে বিরাট বড়ো “রকস্টার” বা “সুপারস্টার” বলে মনে করে ফেলি।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে এটা সত্যি যে আমাদের মধ্যে বেশিরভাগেরই টিম ওয়ার্ক বা গ্রূপ ওয়ার্কের মন-মানসিকতা নেই। আমরা আমাদের নিজস্ব প্রোফাইল থেকে কৃত পোস্টে ৫০০ টা লাইক, ১০০ টা কমেন্ট ও ৩০০ টা শেয়ার পেলেই উৎফুল্লিত। তাহলে আমরা কেন টিম ওয়ার্ক বা গ্রূপ ওয়ার্কে আগ্রহী/আগ্রহিনী হবো? “আমরা সবাই রাজা আমাদেরই রাজার রাজত্বে” — কথাটা আমাদের ক্ষেত্রে একদম সঠিকভাবে প্রযোজ্য। আমাদের মধ্যে সবাই নেতা, সবারই নিজস্ব লবি আছে (এমনকি সেই লবিতে হয়তো আমি ছাড়া আর কেউই নেই, তবুও আমার লবি আছে), আমরা সবাই নিজেকে একেকজন পিলার বলে মনে করি, আমাদের সবারই মন কয়েক মণ ইগো ও কয়েক কুইন্টাল অ্যাটিটিউড দ্বারা পরিপূর্ণ — অতএব, আমাদের মধ্যে কে কার কথা শুনবে? কেনই বা শুনবে?

৭১২ সাল থেকে ২০২০ অবধি তার ফলাফল আমরা প্রত্যক্ষ করেই চলেছি, তবুও আমরা শোধরাচ্ছি না আর না কস্মিনকালেও শোধরাবো!!!

সত্যিই ওদের সাথে আমাদের পার্থক্য ছিলো, আছে এবং থেকেও যাবে।

(মতামত লেখকের ব্যক্তিগত)

We are not big media organisation. Your support is what keeps us moving. Don't hesitate to contribute because, work, for society needs society's support. Jai Hind.