দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গ- সোমনাথ

1
317

© শ্রী সূর্য শেখর হালদার

ভূমিকা:

দেবাদিদেব মহাদেব সনাতন ধর্মের অন্যতম পূজনীয় দেবতা। তিনি আদিদেব, আদিগুরু। তুলসীদাসের রামচরিত মানস বলছে সমুদ্রে সেতুবন্ধনের পূর্বে শ্রীরাম , স্বয়ং মর্যাদা পুরুষোত্তম, পূজা করেছিলেন দেবাদিদেবের। তিনি হলেন রামেশ্বর অর্থাৎ শ্রী রামের ঈশ্বর।

শিব পুরাণ ও নন্দী উপপুরাণ এ দেবাদিদেব নিজেই বলেছেন যে তিনি সর্বত্র বিরাজমান। কিন্তু বারোটি স্থানে তিনি জ্যোতির্লিঙ্গ আকারে বাস করেন। লিঙ্গ শব্দের অর্থ হলো প্রতীক, বস্তুর সূক্ষ রূপ l বৈদিক ঋষিরা সূক্ষ্ম শরীরকে লিঙ্গদেহ বলতেন। শিব যোগী মহেশ্বর। এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ড তাঁর দেহের কণামাত্র। একদিকে তিনি রুদ্র রুপী, অন্যদিকে মঙ্গলময় l সেই বৈদিক যুগেই তৈরি হয়েছিল শিবলিঙ্গ
মহাজ্যোতির প্রতীক জ্যোতির্লিঙ্গ হিসাবে। এই দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গ ভারতের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে রয়েছেl আজও ধর্মপ্রাণ মানুষ ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়েন দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গ দর্শন করতে।

আজ থেকে শুরু করে, বারোটি পর্বে তুলে ধরতে চেষ্টা করব এই দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গের মহিমা। আজ প্রথম পর্ব।

সোমনাথ (প্রভাস)

প্রজাপতি দক্ষের সাতাশটি মেয়ের সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল চন্দ্রদেবের। তাঁরা সকলেই গুণবতী এবং সুন্দরী। কিন্তু চন্দ্রদেব সবথেকে বেশী ভালোবাসতেন রোহিণীকে। রোহিণী কে নিয়েই তিনি কাটাতেন সময়, অন্যদের দিকে তাকাতেনই না l

দক্ষের কন্যাগণ এতেই কুপিত হলেন এবং নালিশ জানালেন পিতার কাছে। দক্ষ চন্দ্রদেব কে উপদেশ দিলেন সমস্ত স্ত্রীদের মর্যাদা দিতে। চন্দ্র দেব চুপ করে শুনলেন, কিন্তু ব্যবহারে কোন পরিবর্তন
আনলেন না l রোহিণী বাদে অন্য স্ত্রীরা আবার অভিযোগ করলেন পিতার কাছে। এইবার কুপিত দক্ষ অভিশাপ দিলেন চন্দ্রদেব কে :

” দক্ষ: প্রকুপিতশ্চন্দ্রং শশাপ মন্ত্রপূর্বকম দ্রুতং শশুর শাপেন যক্ষাগ্রস্থং বভূব স: ।”

দক্ষ প্রজাপতির অভিশাপে যক্ষ্মা গ্রস্থ হলেন চন্দ্রদেব। অর্থাৎ ক্ষয় রোগ আক্রান্ত হলেন চন্দ্রদেব। চন্দ্রদেবের এই করুণ পরিণতিতে বিচলিত হলেন দেবতারা। ক্ষয় রোগের কারণে চন্দ্রের তেজ কমে গেল, স্নিগ্ধ মনমাতানো রূপ অদৃশ্য হল।

দেবতারা তখন পিতামহ ব্রহ্মার কাছে গেলেন। চন্দ্রের উপর অসন্তুষ্ট তিনিও ছিলেন। তবুও তিনি বললেন প্রভাস তীর্থে গিয়ে শিবের তপস্যা করলে তবেই শিবের আশীর্বাদে চন্দ্র আবার সুস্থ হয়ে উঠতে পারবেন।

চন্দ্র দেব তখন প্রভাস তীর্থ গিয়ে ছয় মাস ব্যাপী দেবাদিদেবের আরাধনা করলেন। গভীর আরাধনার পর প্রকট হলেন দেবাদিদেব। চন্দ্রকে বর প্রার্থনা করতে বললেন তিনি। চন্দ্র বললেন তাঁর অনুপস্থিতিতে মানুষের কষ্ট হচ্ছে ।গভীর অন্ধকারে ডুবে গেছে রাত গুলো ।তাদের সেই স্নিগ্ধ সুন্দর রাত ফিরিয়ে দিতে তাঁকে যেন সুস্থ হয়ে ওঠার বর দেন দেবাদিদেব।

দেবাদিদেব বললেন দক্ষের অভিশাপ পুরোপুরি কাটানো তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। তবে এই অভিশাপ খানিকটা তিনি বদলে দিতে পারবেন। মাসে চোদ্দ দিন চন্দ্রের জ্যোতি পৃথিবীবাসীকে আলো দেবে। তারপর চন্দ্রের জ্যোতি কমে গিয়ে অন্ধকারে কাটবে কয়দিন। তারপর আবার চন্দ্রের জ্যোতি ফিরে আসবে। আর চোদ্দ দিনের শেষ দিনটিতে চন্দ্র পূর্ণ মহিমায় আলোকিত হয়ে উঠবে। প্রত্যেক মাসের এই দিনটিকে পূর্ণিমা বলে মানুষজন অভিহিত করবে এবং এই দিনটি হবে পবিত্র। চন্দ্র আরো সুন্দর হয়ে উঠবে আর পৃথিবী বাসীর আরো বেশি করে সেবা করতে পারবে।

চন্দ্র দেবাদিদেব কে বললেন,

” এই স্থানে আমি তোমার দেখা পেয়েছি। এই স্থানে তুমি অধিষ্ঠান কর। আর আমাকে স্থান দাও তোমার অঙ্গে ।”

চন্দ্রের আরেক নাম
সোমদেব। সোমদেব আরাধনা করেছিলেন বলে এই জ্যোতির্লিঙ্গের নাম হয় সোমনাথ। আর চন্দ্র দেব এইখান থেকেই পুনরায়
প্রভাসিত বা আলোকিত হলেন বলে এই স্থানের আরেক নাম প্রভাস। এই ঘটনার পর থেকেই আমরা শিব ঠাকুরের কপালে চন্দ্র দেবের অবস্থান দেখতে পাই।

প্রভাস তীর্থের মহিমার কথা আমরা পাই মহাভারত, শ্রীমৎ ভাগবত ও স্কন্দপুরাণে। শ্রীকৃষ্ণের পরামর্শে অর্জুন শ্রীকৃষ্ণের ভগিনী সুভদ্রাকে হরণ করেছিলেন এই সোমনাথ মন্দির থেকে। মহাভারতের নায়ক, নররূপী পরমাত্মা শ্রীকৃষ্ণ তাঁর নরলীলা সাঙ্গ করেছিলেন এই সোমনাথ মন্দিরের কাছেই।

সোমনাথের মন্দির প্রথম কবে তৈরি হয় তা আজও অজানা। গজনীর সুলতান মাহমুদ এই মন্দির ধ্বংস ও লুটপাট করেছিলেন ১০২৫ সালে। সৌরাষ্ট্রের রাজা তখন ছিলেন প্রথম ভীম দেব। তাঁর পুত্র কামদেব গজনীর সুলতান কে মন্দিরের সামনে পর্যন্ত ঠেকিয়ে রেখেছিলেন, কিন্তু শেষ রক্ষা করতে পারেননি। সেখানেই বীরগতি প্রাপ্ত হন এই বীর যোদ্ধা।

এর বেশ কিছুদিন বাদে সৌরাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠিত হয় বাঘেলা বংশ ( ১২৯৭ খ্রিস্টাব্দ) । বাঘেলা বংশের শেষ রাজা কর্ণ দেবের সময় আলাউদ্দিন খিলজী আক্রমণ ও লুটপাট করেন সোমনাথ মন্দির। চূর্ণ বিচূর্ণ করা হয় জ্যোতির্লিঙ্গ।

রাজা মহিপাল এর সময় আবার তৈরি হয় মন্দির, প্রতিষ্ঠা করা হয় শিবলিঙ্গ। কিন্তু ১৩৯৪ সালে গুজরাটের মুসলমান শাসনকর্তা আবার সোমনাথ মন্দির আক্রমণ করলেন। উদ্দেশ্য সেই এক সম্পদ লুন্ঠন। সেবার লিঙ্গ মূর্তি ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হল, মন্দিরের উপাদান দিয়ে তৈরি হল মসজিদ। সোমনাথের সেই প্রাচীন মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ এখনো আরব সাগরের তীরে অতীতের অত্যাচারের সাক্ষ্য বহন করে দাঁড়িয়ে আছে।

শেষবার এই মন্দিরের উপাদান দিয়ে মসজিদ তৈরি হয়েছিল মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেবের সময়। ১৭৮৩ সালে হোলকার এর রানী অহল্যা বাঈ আদি মন্দির এর কাছে তৈরি করেন নতুন মন্দির। মাটির নীচে প্রতিষ্ঠিত হয় জ্যোতির্লিঙ্গ। উদ্দেশ্য বিধর্মীদের হাত থেকে জ্যোতির্লিঙ্গ কে রক্ষা করা। কিন্তু তাও শেষ রক্ষা হয়নি। এবারে বন্যা স্রোতে ধ্বংস হয় সোমনাথের মন্দির। বর্তমানে যে মন্দির আছে তা স্বাধীন ভারত সরকার তৈরি করেন।

দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গের অন্যতম সোমনাথ আজও ভারতের এক পবিত্রতম তীর্থ।

সৌরাষ্ট্র দেশে বিশদেহতিরস্যে
জ্যোতির্ময়ং চন্দ্রকলাবতংসম
ভক্তিপ্রদানায় কৃপাবতীর্ণং
তং সোমনাথং শরণং প্রপদ্যে।

💐💐💐💐💐

We are not big media organisation. Your support is what keeps us moving. Don't hesitate to contribute because, work, for society needs society's support. Jai Hind.

1 COMMENT

Comments are closed.