বেদ সম্পর্কে ধারণা- প্রথম পর্ব

0
41

© পন্ডিত সুভাষ চক্রবর্তী

(১)

বেদ কী সে সম্পর্কে বিস্তৃত আলােচনা না করে আগে বেদ কয়টি এবং প্রতিটি বেদসম্পর্কে সংক্ষিপ্ত পরিচয় দেব।

ঋক, যজু, সাম ও অথর্ব- এই চারটি বেদ। প্রতিটি বেদের চারটি করে ভাগ বা অংশ আছে। মন্ত্রাংশ বা সংহিতা, ব্রাহ্মণ সাহিত্য, আরণ্যক ও উপনিষদ।সংহিতায় আছে দেবতাদেরস্তবস্তুতি ও মহিমা এবং ব্রাহ্মণ সাহিত্যেআছে যাগ- যজ্ঞের বিবরণ, মন্ত্রের বিনিয়ােগ, যজ্ঞফল ইত্যাদি। আরণ্যকের প্রতিপাদ্য যজ্ঞেতরতাৎপর্য ও রহস্যময়তা এবংবিভিন্ন দার্শনিক তত্ত্বের আলোচনা। বস্তুত,যজ্ঞের ক্রিয়াবহুলতা ছেড়ে জ্ঞান-যজ্ঞের গাম্ভীর্যের রূপ পেয়েছে আারণ্যক।আরণ্যকের উপলব্ধি গভীর দার্শনিকতত্বরূপে প্রকাশিত হয়েছে উপনিষদে।

(২)

প্রত্যেকটি বেদ ঋষি ও সম্প্রদায়ভেদে নানা শাখা- প্রশাখায় বিভক্ত হয়ে গেছে। আমরা প্রথমেই প্রত্যেকটি বেদের সাথে যুক্ত সংহিতা, ব্রাহ্মণ সাহিত্য, আরণ্যক ওউপনিষদগুলি দেখাবাে। বেদ পাঠ করতে হলে বেদ-সহায়ক গ্রন্থ পাঠ আবশ্যিক, যাকে বলা হয় বেদাঙ্গ। বেদাঙ্গ ছয়টি–শিক্ষা, কল্প, ব্যাকরণ, নিরুক্ত, ছন্দ:,ও জ্যোতিষ। আবার, বেদাঙ্গের পরিশিষ্ট গ্রন্থকে বলা হয় অনুক্রমণী। এছাড়াও আছে উপবেদ। প্রথমেই শুরু করা যাক ঋক বেদ দিয়ে। বন্ধনীতে থাকবে রচনার আনুমানিক সময়কাল(যা নিয়ে মতদ্বৈধতা থাকলে পাঠক যথাতথ্য দিতে পারেন)। আরো থাকবে প্রতিটি বেদের সংহিতার বিষয়গত বিভাগ।

(৩)

 ঋক্ বেদ:- রচনাকাল আনুমানিক খূ:পূ: ২৫০০ থেকে খৃ:পূ:৭৫০ পর্যন্ত। ঋক্ বেদের ২টি শাখা- (ক) শাকল  (খ) বাঙ্কল সংহিতা: মন্ত্রের সংগ্রহ, যা মূলত পদ্যেরচিত।—-শাখা ১.বিষয়গত বিভাগ:(বৈদিক অনুষ্ঠান উপযােগী) ক. মণ্ডল(কয়েকটি অনুবাক নিয়েই মােট ১০টি মণ্ডল।) খ.অনুবাক(কয়েকটি সূক্ত নিয়ে)মােট ৮৫টি অনুবাক।গ. সূক্ত(কয়েকটি ঋক্ নিয়ে)মােট ১০১৭টি সূক্ত।ঘ. ঋক্(প্রতিটি মন্ত্র)মােট ১০৪৭২টি ঋক্২ বিষয়গত বিভাগ :(বেদাধ্যয়ন উপযােগী)ক. অষ্টক (৮টি অষ্টক)খ.অধ্যায়(৬৪টি অধ্যায়)গ.বর্গ (২০০৬টি বর্গ)ঘ.মন্ত্র(১০৪৭২টি মন্ত্র)

(৪)
ব্রাহ্মণ সাহিত্য:-(বৈদিক যাগযজ্ঞের নির্দেশক গ্রন্থ) রচনাকাল আনুমানিক খৃ:পূ: ২০০০ থেকে খৃ: ১৫০০ পর্যন্ত যা মূলত গদ্যে রচিত। প্রতিপাদ্য বিষয়–বিধি, অর্থবাদ, নিন্দা, প্রশংসা, পুরাকল্প,পরকৃতি। ঋক বেদের ব্রাহ্মণ সাহিত্য দুইটি- ১. ঐতরেয় ব্রাহ্মণ ৪০টি অধ্যায় আছে। ২. কৌষীতকি ব্রাহ্মণ(শাঙ্খায়ন ব্রাহ্মণ) ৩০টি অধ্যায় আছে।মূলত পুরােহিত ও হােতার কর্তব্য এবং ঋক্-মন্ত্রের প্রয়ােগবিধি ব্রাহ্মণ সাহিত্যের প্রতিপাদ্য হলেও ঐতিহাসিক দিক থেকে এগুলি মূল্যবান। প্রাচীন ভারতের জাতিভেদ **,জাতির জীবিকা ও বৃত্তি,বিবাহ সংস্কার, স্ত্রীশিক্ষা, কৃষিও বাণিজ্য, অর্থনীতি, রাজনীতি, অভিষেক, সমকালীন পঞ্জিকা, মৃতের সংস্কার প্রভৃতি ভারতের সংস্কৃতি ও সভ্যতার আকর গ্রন্থ ব্রাহ্মণ সাহিত্য।

** বি.দ্র.- ব্রাহ্মণ সাহিত্যে সমকালীনভারতবর্ষের যে জাতির কথা বলা হচ্ছে তাহচ্ছে Community বা সংস্কৃতিগত গােষ্ঠী।যেমন- বাঙালি, রাজস্থানী। কিন্তু বর্ণ (যেমন-ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়)হল পৃথক।

(৫)

আরণ্যক :-পুরােপুরি জ্ঞানও নয়, কর্মও নয়-মধ্যবর্তীস্তরের।আরণ্যকে রয়েছে যজ্ঞে মতের তাৎপর্য, রহস্যময়তা এবং দার্শনিক তত্ত্বের আলােচনা।আরণ্যকের শেষভাগ হলাে উপনিষদ, আরণ্যক উপ-নিষদের পূর্বরূপ। আরণ্যক ও বেদান্ত।ঋক্-বেদীয় আরণ্যক দুটি:-১. ঐতরেয় আরণ্যক (ঐতরেয়ব্রাহ্মণের পরিশিষ্ট)। ঐতরেয় আর: ৫ ভাগে বিভক্ত,যার শেষাংশ ঐতরেয় উপনিষদ। ২.কৌষীতকি আরণ্যক(শাঙ্খ্যায়ন আরণ্যক) এইটি ১৫টি অধ্যায়ে বিভক্ত। ‘৫উপনিষদ:–৫৪শুধু মাত্র দেবস্তুতিও যাগযজ্ঞকল্যাণলাভের একমাত্র পথ বলে মানবমনসন্তুষ্ট হতে পারেনি– ঋষিরা উপলব্ধিকরেছেন তত্ত্বজ্ঞানই শ্রেয়:যার ফলশ্রুতি -উপনিষদ। বৈদিক সাহিত্যের শেষ ভাগেরচিত বলে উপনিষদের অন্য নাম–বেদান্ত। ঋক্-বেদীয় উপনিষদ দুইটি:১. ঐতরেয় উপনিষদ। ঐতরেয় শাখার ২য় আরণ্যকের ৪্থ,৫ম ও ৬ষ্ঠ অধ্যায় ঐতরেয় উপনিষদ। ঐতরেয় মহিদাস এর স্রষ্টা। ২. কৌষীতকী উপনিষদ
(৬)

যজুর্বেদ :-ছন্দোবদ্ধ ঋক্ ও গীতিময় সামমন্ত্র ছাড়া অবশিষ্ট বৈদিক মন্ত্রকে বলা হয় যজু:। যজুর্বেদ সংহিতায় গদ্য ও পদ্য দুই শ্রেণীর মন্ত্র থাকলেও পদ্যময় মন্ত্রগুলি ঋক্ এবং গদ্যময় মন্ত্রগুলি যজু: সংহিতার নিজস্ব মন্ত্র। যজ্ঞে ঋক্ মন্ত্রদ্বারা দেবতাকে আহ্বান করা হয়, সামমন্ত্রদ্বারা দেবতার স্তুতিগান করা হয় এবং যজু:মন্ত্রদ্বারা যজ্ঞের সমস্ত কর্ম ও স্তুত দেবদেবীর উদ্দেশ্যে আহুতি প্রদান করা হয়। বৈদিক যজ্ঞানুষ্ঠানের যাবতীয় প্রক্রিয়া ও পদ্ধতি এই বেদে নিবদ্ধ। যজুর্বেদের পুরােহিতের নাম অধ্বর্যু এবং যজ্ঞে এর ভূমিকা অপরিহার্য। মহাভাষ্যকার পতঞ্জলি যজুর্বেদের ১০১টি শাখার উল্লেখ করেছেন (বিষ্ণুপুরাণে ২৭টি শাখার কথা বলা হয়েছে)। বর্তমানে ২টি শাখা পাওয়া যায়–১) কৃষ্ণযজুর্বেদ এবং ২)  শুর্লযজুর্বেদ । কৃষ্ণযজুর্বেদের সংহিতার নাম তৈত্তিরীয় সংহিতা এবং শুরুলযজুর্বেদেরসংহিতার নাম বাজসনেয়ী সংহিতা।#যজুর্বেদের এই দুই শাখার উদ্ভব ও নাম প্রসঙ্গে পুরাণে যে কাহিনী বিবৃত হয়েছে সেই কাহিনীটি সংক্ষেপে যজুর্বেদ সম্পর্কে পর্যালােচনার পর পরিশিষ্টে দেওয়া হয়েছে।

(৭) .

কৃষ্ণযজুর্বেদ: কৃষ্ণ ও শুক্ল– যজুর্বেদের এই দুই শাখার মধ্যে কৃষ্ণের প্রাচীনতা সর্বসম্মত। কৃষ্ণযজুর্বেদের তৈত্তিরীয় সংহিতা ৭টি কাণ্ডে বিভক্ত। প্রতি কাণ্ডে রয়েছে কয়েকটি প্রপাঠক বা প্রশ্ন নামক বিভাগ। প্রতি প্রপাঠক বা প্রশ্ন বিভক্ত কতকগুলি অনুবাকে। প্রতিটি অনুবাক কতকগুলি মন্ত্রের সমষ্টি। সাকুল্যে তৈত্তিরীয় সংহিতায় পাওয়া যায় ৭টি কাণ্ড, ৪৪টিপ্রপাঠক বা প্রশ্ন, ৬৪৪টি অনুবাক এবং ২১৮৪টি মন্ত্র। মন্ত্রগুলি ৩ ভাগে বিভক্ত—-অধ্বর্যুর পাঠ্য মন্ত্র, যজমানেরপাঠ্য মন্ত্র এবং হােতার পাঠ্য মন্ত্র। এইসংহিতায় প্রথম থেকে বিবৃত হয়েছে  অমাবস্যা ও পূর্ণিমা তিথিতে যে”দর্শপূর্ণমাস” নামে ইঞ্টিযাগঅনুষ্ঠিত হয় তার বিবরণ।যেহেতু সমস্ত শ্রৌতযজ্ঞের বিবরণ এতে নেই তাই অনেকে কৃষ্ণযজুর্বেদকে অসম্পূর্ণ মনেকরেন।কৃষ্ণযজুর্বেদের ৪টি শাখা বা সম্প্রদায়রয়েছে।১. তৈত্তিরীয়/আপস্তম্ভ২.কঠ/কাঠক৩.কপিষ্ঠল৪.মৈত্রায়নী/কলাপ।

(আগামী পর্বে সমাপ্য)

We are not big media organisation. Your support is what keeps us moving. Don't hesitate to contribute because, work, for society needs society's support. Jai Hind.

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here