হিন্দুর উদ্বাস্তু হওয়া ও যোগেন মন্ডল: বর্তমান প্রাসঙ্গিকতা- (৫)

0
128

© সূর্য শেখর হালদার

দিল্লী চুক্তি বাস্তবায়নে আন্তরিকতার অভাব


২৩। মার্চের শেষভাগে বিশাল সংখ্যায় হিন্দুরা বাংলা ছাড়তে শুরু করে। মনে হচ্ছিল কিছুদিনের মধ্যেই সকল হিন্দু ভারতে চলে যাবে। ভারতে রণধ্বনি বেজে উঠলো। পরিস্থিতি অত্যন্ত স্পর্শকাতর হয়ে পড়ল। জাতীয় দুর্যোগ অবশ্যম্ভাবী হয়ে দেখা দিল। ৮ এপ্রিলের দিল্লী চুক্তি অবশ্য এই  দুর্যোগকে থামিয়ে দিতে পারল। ভয়ার্ত হিন্দুদের মনোবল পুনরুদ্ধারের আশায় আমি সারা পূর্ব বাংলা চষে বেড়ালাম। আমি ঢাকা, বরিশাল, ফরিদপুর, খুলনা ও যশোরের অনেক স্থান পরিদর্শন করলাম। আমি বহু বড় বড় জনসমাবেশে হিন্দুদের নিকট আহ্বান জানাই তারা যেন তাদের সাহস ধরে রাখে এবং নিজেদের পূর্বপুরুষের ভিটা-মাটি ছেড়ে না যায়। আমি আশা করেছিলাম যে পূর্ব বাংলার সরকার এবং মুসলিম লীগের নেতৃবৃন্দ দিল্লী চুক্তির শর্তসমূহ যথাযথভাবে পালন করবে। কিন্তু যতই সময় গড়াতে লাগল আমি উপলব্ধি করলাম এই দুই পক্ষের কেউই দিল্লী চুক্তির শর্তাদি পালনের ব্যাপারে প্রকৃতরূপে উৎসাহী নয়। দিল্লী চুক্তির শর্ত মোতাবেক একটি সিস্টেম দাঁড় করাতে পূর্ব বাংলার সরকার যে শুধুমাত্র অক্ষম ছিল তাই নয়, সেই বিষয়ে কোনো কার্যকর পদক্ষেপও তারা নিতে চায়নি। দিল্লী চুক্তির পরপর বেশ কিছু হিন্দু তাদের নিজ বাসভূমে ফিরে আসলেও ইতোমধ্যে মুসলিমদের দখলে চলে যাওয়া তাদের জায়গা-জমি ও ঘরবাড়ি আর ফিরে পায়নি।
 মাওলানা আকরাম খানের প্রেরণা
২৪। ‘মোহাম্মাদী’ নামক একটি মাসিক পত্রিকার ‘বৈশাখ’ সংখ্যায় ছাপা হওয়া প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সভাপতি মাওলানা আকরাম খানের সম্পাদকীয় পড়ে লীগের নেতৃবৃন্দের মনোভাব সম্বন্ধে আমার অনুমান যে অভ্রান্ত তা আমি বুঝতে পারি। ঢাকা রেডিও স্টেশন থেকে পাকিস্তানের সংখ্যালঘু বিষয়ক মন্ত্রী ড. এ. এম. মালিকের প্রচারিত প্রথম রেডিও বক্তব্যের প্রেক্ষিতে তিনি এই সম্পাদকীয় লিখেন। ড. মালিক বলেন, “এমনকি নবী হযরত মুহম্মদ(সাঃ)ও আরবের ইহুদীদের নিজ ধর্ম পালনের স্বাধীনতা দিয়েছিলেন”।  ~~মাওলানা আকরাম খান এর প্রেক্ষিতে বলেন, “ড. মালিক তার বক্তব্যে আরবের ইহুদীদের প্রসঙ্গ না টানলেই ভাল করতেন। এটা সত্য যে নবী হযরত মুহম্মদ(সাঃ) আরবের ইহুদীদের নিজ ধর্ম পালনের স্বাধীনতা দিয়েছিলেন; কিন্তু সেটা ছিল ইতিহাসের প্রথম অংশ মাত্র। শেষদিকে তাঁর সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা ছিল এরকম – *আরব থেকে সকল ইহুদীদের বিতাড়িত কর”* । মুসলিম সম্প্রদায়ের রাজনৈতিক, সামাজিক এবং আধ্যাত্মিক জীবনে অতি উচ্চ পদে আসীন একজন ব্যক্তির এহেন মন্তব্যের পরেও আমি আশা করে ছিলাম যে নুরুল আমিন মন্ত্রীসভা এতটা আন্তরিকতাশূন্য হবেনা। কিন্তু দিল্লী চুক্তির শর্ত মেনে নিতে যখন নুরুল আমিন ড. এন. বারারীকে মন্ত্রী মনোনিত করলেন তখন আমার সমস্ত আশা চূর্ণ হয়ে গেল। শর্তে ছিল সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মনে হারানো আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে তাদের একজন করে প্রতিনিধি পূর্ব বাংলা এবং পশ্চিম বাংলার মন্ত্রীসভায় নিয়োগ পাবে।
 নুরুল আমিন সরকারের আন্তরিকতাশূন্য কার্যকলাপ 

২৫। আমার এক সাধারণ বিবৃতিতে আমি ড. এন. বারারীকে মন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেবার ব্যাপারে আমার দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করে বলি যে এর ফলে কোনো বিশ্বাস তো ফেরত আসবেই না বরং নুরুল আমিন সরকারের আন্তরিকতে বিষয়ে যদি সংখ্যালঘুদের মনে কিছু আশার মরীচিকা তখনো জেগে থাকে তবে তাও পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাবে।আমার নিজস্ব মত হল নুরুল আমিনের সরকার যে শুধু আন্তরিকতাহীন কাজ করেছে তাই নয়, তাদের ইচ্ছা ছিল দিল্লী চুক্তির প্রধান প্রধান লক্ষ্যসমূহ অর্জনে বাধা প্রদান করা। আমি আবারো বলতে চাই যে ড. এন. বারারী নিজেকে ছাড়া আর কারো প্রতিনিধিত্ব করেন না। তিনি কংগ্রেসের টিকেটে সংগঠনটির টাকা এবং সাংগঠনিক শক্তির সুবাদে বাংলার আইনসভায় ফিরে আসতে সক্ষম হন। তিনি নমঃশূদ্রদের ফেডারেশনটির প্রার্থীদের বিরোধিতা করেছিলেন। নির্বাচিত হবার কিছুদিন পর তিনি কংগ্রেসের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে ফেডারেশনে যোগ দেন। মন্ত্রী হিসেবে নিযুক্ত হবার কালে তিনি ফেডারেশনেরও সদস্য ছিলেন না। বাঙ্গালী হিন্দুরা আমার সাথে একমত হবেন যে পূর্ববর্তী কার্যকলাপ, চরিত্র এবং বুদ্ধিবৃত্তির দিক থেকে দিল্লী চুক্তি অনুসারে মন্ত্রী নিযুক্ত হবার পক্ষে বারারী বিবেচনার উপযুক্ত নন।
২৬। আমি জনাব নুরুল আমিনকে এই পদের জন্য ৩ জনের নাম সুপারিশ করেছিলাম। এদের মধ্যে একজন ছিলেন এমএ, এলএলবি, অ্যাডভোকেট, ঢাকা হাইকোর্ট। তিনি প্রথম ফজলুল হক মন্ত্রীসভার সময়কালে ৪ বছরেরও বেশি সময় ধরে বাংলার মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি প্রায় ৬ বছর ধরে কোলকাতার কয়লা খনি গুদামজাত বোর্ডের সভাপতি ছিলেন। তিনি নমঃশূদ্রদের ফেডারেশনটির সহ-সভাপতি ছিলেন। আমার দ্বিতীয় সুপারিশ ছিলেন একজন বিএ, এলএলবি। সংস্কার ঘটার আগে তিনি ৭ বছর যাবৎ আইনসভার সদস্য ছিলেন। আমি জানতে ইচ্ছুক ঠিক কোন কারণে জনাব নুরুল আমিন এই দুজন ভদ্রলোককে বাদ দিয়ে এমন একজনকে মন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দিলেন সঙ্গত কারণেই যার নিয়োগের বিরোধিতা আমি করেছিলাম। কোনো প্রতিবাদের মুখোমুখি হবার ভয় ছাড়াই আমি বলতে পারি জনাব নুরুল আমিনের বারারীকে দিল্লী চুক্তি অনুসারে মন্ত্রী হিসেবে বেছে নেয়াই এর চরম প্রমাণ যে পূর্ব বাংলার সরকার এখানকার হিন্দুদের জান-মাল, সম্মান ও ধর্ম ঠিক রেখে জীবনধারণের উপযোগী পরিবেশ তৈরির জন্য সম্পাদিত দিল্লী চুক্তিকে কখনোই গুরুত্ব ও আন্তরিকতার সাথে বিবেচনা করেনি।সরকারী মদতে হিন্দুদের নির্মূল করার চেষ্টা
২৭। আমি এই প্রসঙ্গে আমি আমার পূর্ণ বিশ্বাস এবং সন্দেহ ব্যক্ত করতে চাই যে পূর্ব বাংলা সরকার এই প্রদেশ থেকে হিন্দুদের সম্পূর্ণরূপে উৎখাত করতে চায়। এই বিষয়ে আমি আপনাকে একাধিকবার সাক্ষাতে অনেক কথা বলেছি। আমি বলতে বাধ্য হচ্ছি পশ্চিম পাকিস্তান হিন্দু নিধনে সম্পূর্ণরূপে সক্ষম হয়েছে এবং পূর্ব পাকিস্তানে এই প্রক্রিয়া সফলতার সাথে অগ্রসর হচ্ছে। ডি এন বারারি এর নিয়োগ এবং আমার এই বিষয়ে অসম্মতির পরও পাকিস্তান সরকারের প্রতিক্রিয়া প্রমাণ করে তারা কি অর্থে নিজেদের ইসলামিক প্রজাতন্ত্র দাবি করে। পাকিস্তান না হিন্দুদের বেঁচে থাকার অধিকার দিয়েছে না পূর্ণ নিরাপত্তা দিয়েছে। এখন তারা হিন্দু বুদ্ধিজীবীদের মারতে চায় যাতে পাকিস্তানের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সামাজিক জীবন তাদের দ্বারা আর প্রভাবিত না হতে পারে।
 _যৌথ নির্বাচকমণ্ডলীর বিষয়টিকে এড়িয়ে চলাঃ_ 
২৮। আমি বুঝতে পারি না নির্বাচকমণ্ডলীর ব্যাপারটিতে কেন এখনো সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি। সংখ্যালঘু সাব-কমিটি তৈরির পর ৩ বছর পার হয়ে গেছে। ৩ বার মিটিংও হয়ে গিয়েছে। গত ডিসেম্বরে কমিটির সভায় যৌথ বা পৃথক নির্বাচকমণ্ডলীর ব্যাপারে কথা উঠলে পাকিস্তানের সকল স্বীকৃত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিগণ পশ্চাৎপদ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়গুলোর জন্য সংরক্ষিত আসন রেখে যৌথ নির্বাচকমণ্ডলীর স্বপক্ষে মত দেন। আমরা নমঃশূদ্রদের পক্ষ থেকে আমাদের জন্য সংরক্ষিত আসনের ব্যবস্থা রেখে যৌথ নির্বাচকমণ্ডলীর দাবি জানাই। গত আগস্টের আরেক সভাতেও এই ব্যাপারে কথা উঠে। কিন্তু এর উপ কোনোরূপ আলোচনা ছাড়াই সভা অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করা হয়। এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারে পাকিস্তানী শাসকদের সময়ক্ষেপণের নীতির পেছনে কোন মতলব কাজ করছে তা বুঝতে কারোরই অসুবিধা হবার কথা নয়।

 হিন্দুদের দুঃসহ ভবিষ্যৎ


২৯। এখন আসি দিল্লী চুক্তির ফলে পূর্ব বাংলার হিন্দুদের বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে। আমি বলতে পারি এখন হিন্দুদের অবস্থা শুধু হতাশাজনক নয় বরং সম্পূর্ণ আশাহীন এবং ভবিষ্যৎ অন্ধাকার অমনিশায় আচ্ছন্ন। পূর্ব বাংলার হিন্দুদের ভিতর আস্থা ফিরিয়ে আনতে কিছুই করা হচ্ছে না। চুক্তিটি মুসলিম লীগ কাগজের ভিতরই সীমাবদ্ধ রেখেছে। বিপুল সংখ্যক হিন্দু শরণার্থী বিশেষ করে নমঃশূদ্র সম্প্রদায়ের পূর্ব পাকিস্তানে ফিরে এলেও এটা প্রমাণ করে না যে হিন্দুদের আস্থা ফিরে এসেছে। বরং এটা প্রমাণিত হয় পশ্চিম বাংলা বা ভারতীয় ইউনিয়নের ভিতর তাদের পুনর্বাসনের কোন সুযোগ নেই। উদ্বাস্তু জীবনের বেদনাই তাদের মাতৃভূমিতে ফিরতে বাধ্য করেছে।পাশাপাশি অনেকেই ফিরে আসছে তাদের অস্থাবর সম্পত্তি সাথে নিয়ে যেতে এবং স্থাবর সম্পত্তির একটা গতি করতে। পূর্ব বাংলায় অতি সাম্প্রতিককালে কোনো বড় রকমের সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ঘটে নি, কিন্তু এর কৃতিত্ব দিল্লী চুক্তিকে দিলে তা ভুল হবে। কোনো চুক্তি বা আপস ছাড়াই এটা একসময় বন্ধ হত, সহজভাবে বলতে গেলে এটা এভাবে চলতে থাকা ছিল অসম্ভব।
৩০। স্বীকার করতেই হবে দিল্লী চুক্তি সমস্যায় সমাধানের জন্য যথেষ্ট নয়। এই চুক্তির ভিতর ছিল কিছু শর্ত যাতে ভারত এবং পাকিস্তানের ভিতর বিবদমান সমস্যাগুলো সমাধান করা যায়। কিন্তু চুক্তির ছয় মাস পরেও কিছুই হয় নাই। অন্যদিকে পাকিস্তান ভারতের বিরুদ্ধে দেশে এবং বিদেশে অপ্প্রচার চালিয়েই যাচ্ছে পুরোদমে। মুসলিম লীগ দ্বারা সারা পাকিস্তান জুড়ে কাশ্মীর দিবস পালন করা এর একটি উদাহরণ। পাকিস্তান শাসিত পাঞ্জাবের গভর্নরের সাম্প্রতিক বক্তব্য যাতে তিনি উল্লেখ করেছেন পাকিস্তানের শক্তিশালী সেনাবাহিনী দরকার ভারতের মুসলিমদের রক্ষায়, পাকিস্তানের আসলে চেহারা দেখিয়ে দিয়েছে। এই ধরণের বক্তব্য দুইদেশের ভিতর শুধু উত্তেজনাই বাড়াবে।
 

পূর্ব বঙ্গের বর্তমান চিত্র
৩১। এখন পূর্ব বাংলার অবস্থা কেমন? দেশভাগের পর থেকে প্রায় ৫০ লক্ষ হিন্দু দেশ ছেড়ে গেছে। গত ফেব্রুয়ারীর দাঙ্গা বাদেও এর পেছনে বহু কারণ কাজ করেছে। মুসলিমদের বয়কটের কারণে আইনজ্ঞ, মেডিকেল প্র্যাকটিশনার, দোকানদার, বিক্রেতা ও বণিক সহ প্রায় সব পেশার হিন্দুদেরই জীবিকার খোঁজে পশ্চিম বঙ্গে চলে যেতে হয়েছে। আইনগত পদ্ধতি অনুসরণ না করেই হিন্দু বসতবাড়ির সম্পূর্ণ মালিকানা কিনে নেয়া এবং বাড়ির মালিকদের কোনোরূপ ভাড়া পরিশোধ না করার ফলে তারা ভারতে আশ্রয় খুঁজতে বাধ্য হচ্ছে। হিন্দু জমিদারদের খাজনা দেয়া বহু আগেই বন্ধ হয়ে গেছে। তদুপরি, হিন্দুদের নিরাপত্তার প্রতি সবসময়ের হুমকি হিসেবে আছে আনসার যাদের ব্যাপারে আমি সব জায়গা থেকে অভিযোগ পেয়েছি। শিক্ষা এবং তা প্রদানের ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাজে ইসলামীকরণের নামে হস্তক্ষেপ হাইস্কুল এবং কলেজের শিক্ষকদের তাদের পরিচিত পরিবেশের বাইরে ছুঁড়ে ফেলেছে। তারা এই বাংলা ছেড়ে যাচ্ছে। ফলে বেশিরভাগ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানই বন্ধ হয়ে গেছে। আমি জানতে পেরেছি যে কিছুদিন আগে শিক্ষা কর্তৃপক্ষ একটি সার্কুলার প্রকাশ করেন যাতে সব সম্প্রদায়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের জন্য পবিত্র কোরআন হতে আবৃত্তি বাধ্যতামূলক করা হয়। আরেকটি সার্কুলারের মাধ্যমে প্রধান শিক্ষকদের বিদ্যালয় প্রাঙ্গণের বিভিন্ন ব্লক জিন্নাহ, ইকবাল, লিয়াকত আলী, নাজিমুদ্দীন প্রমুখ ১২ জন পরিচিত মুসলিমদের নামে নামকরণ করতে বলা হয়। অতি সম্প্রতি ঢাকায় অনুষ্ঠিত এক শিক্ষা সম্মেলনে রাষ্ট্রপতি উল্লেখ করেন যে পূর্ব বাংলার ১৫০০ ইংরেজি স্কুলের মধ্যে মাত্র ৫০০টি চালু আছে। মেডিকেল প্র্যাকটিশনারেরা দেশ ছেড়ে যাওয়ায় রোগীদের সঠিক চিকিৎসা প্রাপ্তির আশা দুরাশায় পরিণত হয়েছে। হিন্দু বসতবাড়িতে পূজা-অর্চনা করতেন এমন প্রায় সকল পুরোহিত দেশ ত্যাগ করেছেন। গুরুত্বপূর্ণ মন্দিরগুলো পরিত্যক্ত পড়ে রয়েছে। ফলে পূর্ব বাংলার হিন্দুদের জন্য বিয়ের মত সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলো যেখানে একজন পুরোহিতের উপস্থিতি অত্যাবশ্যক সেসব পালন করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। দেব-দেবীর মূর্তি প্রস্তুতকারী শিল্পীরাও দেশ ছেড়ে চলে গেছেন। পুলিশ এবং সার্কেল অফিসারদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সম্মতিতে দমনমূলক নীতির মাধ্যমে ইউনিয়ন বোর্ডগুলোর সভাপতির পদ থেকে হিন্দুদের মুসলিমদের দ্বারা প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। হিন্দু প্রধান শিক্ষক ও বিদ্যালয়ের সচিবদেরও মুসলিমদের দ্বারা প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। হাতে গোনা যে অল্প কজন হিন্দু সরকারী চাকরিজীবি আছেন তাদের জীবন দুর্বিষহ করে তোলা হয়েছে। হয় তাদের জুনিয়র মুসলিম সহকর্মীরা তাদের পেছনে ফেলে উপরে উঠে যাচ্ছে অথবা যথেষ্ট বা কোনো কারণ ছাড়াই তাদের অব্যাহতি দেয়া হচ্ছে। অতি সাম্প্রতিককালেই একজন হিন্দু পাবলিক প্রসিকিউটরকে কোনো কারণ ছাড়াই চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়। শ্রীযুক্তা নেলি সেনগুপ্ত এর এক বিবৃতিতে ঘটনাটি পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করা আছে। অন্তত তাঁকে কেউ মুসলিম বিদ্বেষী বলে চিহ্নিত করতে পারবে না।হিন্দুরা রীতিমত নিরাপত্তাহীন
৩২। হিন্দুদের সম্পত্তি চুরি-ডাকাতি এবং হত্যাকাণ্ডও আগের মত চলছে। থানা পুলিশ হিন্দুদের অভিযোগ নিচ্ছে না। অবশ্য হিন্দু মেয়েদের জোরপূর্বক অপহরণ এবং ধর্ষণের সংখ্যা আগের থেকে কমে গেছে। এর কারণ হল পূর্ব পাকিস্তানে ১২ থেকে ৩০ বছর বয়সে কোন হিন্দু মেয়ে আর নেই। আর যারা পালাতে পারে নাই তারা মুসলিম গুণ্ডাদের হাত থেকে বাঁচে নাই। আমি অনেক খবর পেয়েছি নিম্নবর্ণের হিন্দু মেয়েদের ধর্ষণের খবর। হিন্দুরা বাজারে পাট এবং কৃষিপণ্য বিক্রি করতে যায়। মুসলিম ক্রেতারা খুব কম সময়ই পুরো দাম দেয়। প্রকৃতপক্ষে পাকিস্তানে আইনের শাসন নেই, বিশেষ করে হিন্দুদের জন্য।
 পশ্চিম পাকিস্তানে জোরপূর্বক ধর্মান্তরকরণ

 ৩৩। পূর্ব পাকিস্তানের কে পাশে সরিয়ে এখন পশ্চিম পাকিস্তান, বিশেষ করে সিন্ধ এর দিকে মনোনিবেশ করা যাক। দেশভাগের পর পশ্চিম পাঞ্জাবে প্রায় লাখ খানেক অস্পৃশ্য জাতিগোষ্ঠীর মানুষ ছিল। এদের মধ্যে একটা বড় অংশকে ইসলামে ধর্মান্তর করা হয়। কর্তৃপক্ষের কাছে বারংবার আবেদনের পরেও অপহৃত ১২ জন নমঃশূদ্র মেয়ের মাঝে কেবল মাত্র ৪ জনকেই এখন পর্যন্ত উদ্ধার করা হয়েছে। অপহৃত মেয়েদের নাম ও তাদের অপহরণকারীদের নাম সরকারের নিকট পৌঁছে দেয়া হয়েছিল। এই অপহরণের ঘটনার অফিসার-ইন-চার্জের সাম্প্রতিকতম উত্তরে ছিল “তার কাজ হল হিন্দু মেয়েদের উদ্ধার করা এবং ‘অচ্ছুতেরা’ (অস্পৃশ্য/নমঃশূদ্র) হিন্দু নয়”। যে ক্ষুদ্র হিন্দু জনগোষ্ঠী এখনো সিন্ধ এবং পাকিস্তানের রাজধানী করাচিতে বসবাস করছে তাদের অবস্থা খুবই শোচনীয়। আমার কাছে করাচি ও সিন্ধ এর ৩৬৩টি হিন্দু মন্দির ও গুরুদুয়ারার একটি তালিকা আছে(যা কোনো উপায়েই সম্পূর্ণ নয়) যারা এখনো মুসলিমদের দখলে রয়েছে। কিছু কিছু মন্দিরকে মুচির দোকান, কসাইখানা এবং হোটেলে পরিণত করা হয়েছে। কোনো নোটিশ ব্যাতিরেকেই হিন্দুদের কাছ থেকে জমিজমা কেড়ে নিয়ে শরণার্থী ও স্থানীয় মুসলিমদের ভাগ করে দেয়া হয়েছিল, তাদের কেউই আর তা ফেরত পায় নি। ব্যক্তিগতভাবে আমি ২০০ থেকে ৩০০ হিন্দুকে চিনি যারা বহুকাল পূর্বেই তত্ত্বাবধায়ক কর্তৃক এই অঞ্চলের অধিবাসী হিসেবে স্বীকৃত হয়েছে। কিন্তু এখনো পর্যন্ত তাদের সম্পত্তি তাদের ফিরিয়ে দেয়া হয়নি। শত্রু সম্পত্তি নয় হিসেবে ঘোষিত হবার পরেও করাচি পিঞ্জিরাপোল এখনো ট্রাস্টিদের কাছে ফিরিয়ে দেয়া হয় নি। করাচিতে আমি বহু হতভাগ্য বাবা ও স্বামীর কাছ থেকে আবেদন পেয়েছি অপহৃত হিন্দু মেয়েদের সম্পর্কে, যাদের বেশিরভাগই ছিল নমঃশূদ্র। এ ব্যাপারে আমি দ্বিতীয় প্রাদেশিক সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করি। কিন্তু এ ব্যাপারে অগ্রগতি ছিল শূন্যের কোঠায়। আমি অত্যন্ত দুঃখ পাই একথা জেনে যে সিন্ধ এ এখনো অব্দি বসবাস করা নমঃশূদ্রদের এক বিরাট অংশকে জোরপূর্বক ইসলামে ধর্মান্তরিত করা হয়েছে।
 পাকিস্তান, হিন্দুদের জন্য অভিশাপ 
৩৪। উপরের সংক্ষিপ্ত চিত্র থেকে এটা বলাই চলে যে সবদিক দিয়েই পাকিস্তানের হিন্দুরা আজ নিজভূমে পরবাসী। তাদের একমাত্র দোষ হল তারা হিন্দু ধর্মের অনুসারী। মুসলিম লীগের নেতৃবৃন্দ বারবার বলছেন পাকিস্তান ইসলামিক রাষ্ট্র আছে এবং থাকবে। ইসলামকে সকল বৈশ্বিক পঙ্কিলতা দূরীকরণের পথ হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। পুঁজিবাদ ও সমাজবাদের পারস্পরিক সাংঘর্ষিক মতবাদের মধ্যে আপনি ইসলামিক গণতন্ত্রের আনন্দজনক সমতা ও ভ্রাতৃত্ববোধকে তুলে ধরছেন। শরীয়ত অনুসারে মুসলিমরা একচ্ছত্র শাসক এবং হিন্দু ও অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায় তাদের নিরাপত্তায় বেঁচে থাকা জিমির মত। এর জন্য তাদের আবার দামও দিতে হয়। এবং অন্য সকলের চেয়ে আপনি ভাল করে জানেন প্রধান মন্ত্রী সাহেব এর পরিমাণ কতটুকু। দীর্ঘ বিবেচনার পর আমি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি যে পাকিস্তান হিন্দুদের বসবাসের পক্ষে উপযুক্ত স্থান নয়। এখানে তাদের ভবিষ্যত হল ধর্মান্তরিত হওয়া অথবা পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়া। উচ্চ বংশীয় এবং রাজনৈতিকভাবে সচেতন অস্পৃশ্য জনগোষ্ঠীর বেশিরভাগই এর মধ্যে পূর্ব বাংলা ছেড়ে গেছে। যেসকল অভিশপ্ত হিন্দু পাকিস্তানে থেকে যাবে আমার আশঙ্কা ধীরে ধীরে পরিকল্পনামাফিক তাদের ইসলামে ধর্মান্তরিত করা হবে নয়ত ধ্বংস করে দেয়া হবে। এটা আসলেই অবাক করার মত ব্যাপার যে আপনার মত একজন শিক্ষিত, সংস্কৃতিমনা, অভিজ্ঞ ব্যক্তি মানবতার প্রতি হুমকিস্বরূপ এবং সকল সমতা ও শুভবোধের ধ্বংসকারী এরূপ মতবাদে পরিপূর্ণ হবার নজির রেখে যাচ্ছেন। আমি আপনাকে এবং আপনার সাথীদের বলতে চাই যে যেরূপ খুশি ব্যবহার করা হোক বা লোভ দেখানো হোক না কেন, হিন্দুরা নিজেদের জন্মভূমিতে নিজেরা জিমি হিসেবে গণ্য হতেও পিছপা হবে না। আজকে হয়ত অনেকে দুঃখে নয় ভয়ে নিজের ভিটেমাটি ছেড়ে যাচ্ছে। কিন্তু আগামীকাল তারা জীবনের অর্থনীতিতে নিজেদের স্থান আদায় করে নেবার জন্য সংঘর্ষে ঝাঁপিয়ে পড়বে। কে বলতে পারে ভবিষ্যত কি লুকিয়ে রেখেছে? যখন আমি নিশ্চিত যে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারে আমার অবস্থান হিন্দুদের কোনো উপকারেই আসছে না তখন নিজের বিবেকের কাছে নিজেকে পরিষ্কার রাখার জন্যই আমি পাকিস্তান এবং বিদেশের হিন্দুদের মনে এমন কোনো মিথ্যে আশার জন্ম দিতে চাই না যে তারা এখানে সম্মান এবং জান-মাল ও সম্পত্তির নিরাপত্তার নিশ্চয়তা সহকারে বসবাস করতে পারবে। হিন্দুদের নিয়ে বলার ছিল এটুকুই।
৩৫। সেই মুসলিমদের কি খবর যারা মুসলিম লীগ এবং তার দুর্নীতিবাজ আমলাতন্ত্রকে সমর্থন করেন না? পাকিস্তানে সামাজিক স্বাধীনতা বলতে কিছু নাই। উদাহরণস্বরূপ খান আবদুল গাফফার খান নামক সেই ধর্মপ্রাণ মুসলিমের কথা চিন্তা করুন। কিংবা তার দেশপ্রেমিক ভাই ডা খান সাহিবের পরিণতি চিন্তা করুন। উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ এবং পূর্ব বাংলার নেতাদের আপনারা বিনা বিচারে আটকে রেখেছেন। বাংলাতে মুসলিম লীগের বিজয় পতাকা বহনকারী জনাব  সোহরাওয়ার্দিকে এখন সরকারের ইচ্ছায় চলতে হয় এবং মুখ খুলতেও অনুমতি লাগে।  বাংলার প্রবীণ বৃদ্ধ নেতা, লাহোর প্রস্তাবের উত্থাপনকারী জনাব ফজলুল হক বর্তমানে ঢাকা হাই কোর্টের চারদেয়ালের মাঝে তার একাকী জমিতে লাঙ্গল চড়াচ্ছেন এবং তথাকথিত ইসলামিক চিন্তাতে লিপ্ত যেটা সম্পূর্ণ অমানবিক। আর পূর্ব বাংলার সাধারণ মুসলিম জনগোষ্ঠীর কথা চিন্তা করুনঃ তারা ভালো আছে বলতে পারবে না। তারা আশ্বাস পেয়েছিল স্বায়ত্তশাসন এবং আঞ্চলিক স্বাধিকারের। কিন্তু তারা আসলেই কি পেয়েছে? যদিও পাকিস্তানের অন্যান্য প্রদেশের মিলিত জনসংখ্যার চেয়ে বেশি মানুষ এখানে থাকে, তবুও পূর্ব বাংলা পশ্চিম পাকিস্তানের উপনিবেশে পরিণত হয়েছে। এই অবিচারের পরও করাচীর কোন অধিকার নেই সেখান থেকে আদেশ জারি করার। পূর্ব বাংলার মুসলিম জনগোষ্ঠীর আগ্রহ এই বিচিত্র ইসলামিক প্রজাতন্ত্র পাথর ছুঁড়ে গুঁড়িয়ে দিয়েছে মরু সিন্ধু এবং পাঞ্জাব থেকে সাহায্য পাওয়ার বদলে।
 আমার নিজের দুঃখভারাক্রান্ত তিক্ত অভিজ্ঞতা
৩৬। পাকিস্তানের সমগ্র চিত্র আর অন্যের প্রতি অবিচার আর শোষণের কথা বাদ দিলেও আমার নিজের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা সুখকর নয়। আপনি প্রধানমন্ত্রী এবং শাসকদলের প্রধান হিসেবে আপনার নিজের অবস্থান ব্যবহার করে আমাকে একটি প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে বলেছিলেন এবং আমি গত ৮ সেপ্টেম্বর তা করেছিও। আপনি জানতেন আমি সম্পূর্ণ মিথ্যা এবং অর্ধসত্যের সংমিশ্রণে কোন বক্তব্য দিতে রাজি না। কিন্তু আমি একজন মন্ত্রী এবং আপনার অধীনে কাজ করছি। তাই আমার পক্ষে এই অনুরোধ রক্ষা করা ছাড়া আর কোন উপায় ছিল না। কিন্তু এই মিথ্যার ভার আর বহন করা আমার পক্ষে বহন করা সম্ভব নয় এবং আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমি আপনার মন্ত্রীসভা থেকে পদত্যাগ করবো। এই পদত্যাগপত্র আমি এখনই আপনার হাতে জমা দিচ্ছি এবং আমি আশা করছি আপনি বিন্দুমাত্র দেরি না করে তা গ্রহণ করবেন। অবশ্যই আপনার পূর্ণ অধিকার রয়েছে এই পদত্যাগপত্র নিয়ে কি করবেন সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার। অথবা আপনার ইসলামী প্রজাতন্ত্রের রীতিনীতি এবং উদ্দেশ্যের সাথে মিলে এমন কোন উপায়ে লুকিয়ে ফেলা।

আপনার বাধ্যগত
এসডি./-জে এন মণ্ডল, ৮ অক্টোবর ১৯৫০

 এখন প্রশ্ন উঠতে পারে ৮ই অক্টোবর ১৯৫০ সালে লিখিত এই চিঠির আজকের দিনে প্রাসঙ্গিকতা কি। 
এই চিঠি বুঝিয়ে দেয় যোগেন বাবু কিভাবে মুসলিম লীগ নেতাদের দ্বারা প্রতারিত হয়েছিলেন। তাঁর পদত্যাগপত্র অনুযায়ী পাকিস্তান হলেই যে সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে একথা তিনি তিনি হয়তো  ভাবেননি, কিন্তু তবুও তিনি পাকিস্তান গঠনের প্রস্তাব সমর্থন করেন এবং সেখানকার মন্ত্রীও হন। কার্যক্ষেত্রে দেখা যায় পাকিস্তানে নিম্নবর্ণের হিন্দুদের উন্নয়ন তো দূরে থাক, তাঁদের ওপর রাষ্ট্রের অনুমোদনে যে সন্ত্রাস হয়, নিদারুণ ও মর্মস্পর্শী। আজ যেসব বুদ্ধিজীবী ভারতে মুসলিম দলিতদের উপর সন্ত্রাসের কথা বলেন, তাঁদের যোগেন বাবুর চিঠিতে যে ঘটনাগুলি রয়েছে তা পাঠ করা প্রয়োজন। তাহলে তাঁরা বুঝতে পারবেন রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস কাকে বলে। ভারত কখনোই এই ধরনের সন্ত্রাস সমর্থন বা আয়োজন করে না। আর ভারতে কোনদিন এরকম পরিস্থিতি আসেনি, হাতে দেখা গেছে লক্ষ লক্ষ সংখ্যালঘু ভারত থেকে পালিয়ে অন্য দেশ আশ্রয় নিচ্ছে; বরং বাংলাদেশ ও পাকিস্তান থেকে সংখ্যাগুরু মুসলিমরা ও ভারতে আসছে চিকিৎসা করাতে, পড়াশোনা করতে কিংবা রোজগার করতে। আর ভারতে এসে বেআইনি প্রক্রিয়ায় ভারতের নাগরিকত্ব গ্রহণ করতেও চাইছে। 
আমাদের রাজ্য পশ্চিমবঙ্গ আজ একটি যুগের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। এই রাজ্য নির্মাণ হয়েছিল মূলত বাঙালি হিন্দুদের জন্য। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে আজ সনাতন হিন্দু সংস্কৃতি বিপন্ন। এখানে মহরম পালনের জন্য দুর্গা মাতার বিসর্জন বন্ধ থাকে; সরকারি বিদ্যালয়ের ভবনে বিদ্যালয় চলাকালীন নামাজ পাঠ হয় ; বিদ্যালয়ে সরস্বতী পুজো করবার জন্য ছাত্র ছাত্রীদের আন্দোলন করতে হয়; বিদ্যালয়ের সিলেবাসের ইতিহাস বইতে লেখা হয় ‘রাম ‘শব্দ এসেছে ইংরেজি ‘roaming’  শব্দ থেকে,  রাম ছিলেন যাযাবর জাতির মানুষ।  আবার বাংলা শব্দ জল বদলে হচ্ছে পানি, রামধনু হচ্ছে রংধনু; বাবা আব্বা। অর্থাৎ পুরোপুরিভাবে সনাতন সংস্কৃতি আজ আক্রান্ত পশ্চিমবঙ্গের বুকে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে একদল তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষ বুদ্ধিজীবীদের উস্কানিমূলক আচরণ। তাঁরা প্রমাণ করতে চাইছেন ভারতে মুসলিম ও দলিত বিপন্ন, মুসলিম দলিত হিন্দুদের বিপক্ষে এক হওয়া উচিত। প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য যোগেন্দ্রনাথ ও ঠিক একই ধরনের ধারণা পোষণ করতেন। কিন্তু তার সেই ধারণার বাস্তবায়ন করতে গিয়ে তিনি হতাশার দুঃখ ছাড়া আর কিছুই পাননি। তিনি বড় আশা করে, স্বজাতির বিরোধিতা করে পাকিস্তান গঠনের দাবি সমর্থন করেছিলেন, কিন্তু মাত্র তিন বছরেই তাঁর সেই আশা দুরাশায় পরিণত হয়। তিনি মাত্র তিন বছর পরেই ভারতে পালিয়ে আসেন, কিন্তু তিনি পালিয়ে আসার সময় একবারও কি ভেবেছিলেন যে তাঁর ওপর বিশ্বাস করে যে নিম্নবর্ণের হিন্দুরা পাকিস্তান দাবি সমর্থন করেছিলেন এবং এবং সেখান থেকে গিয়েছিলেন, তাঁদের কি হবে ?  তাঁর কি উচিত ছিল না পাকিস্তান থেকে আসবার সময় সেই সব সমর্থকদের নিয়ে আসা অথবা পাকিস্তানে থেকে তাঁদের হয়ে আন্দোলন করা । ভয় হয় আজ যেসব দলিত ওই পাকিস্তানপন্থি এবং তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষ বুদ্ধিজীবীদের অঙ্গুলিহেলনে চলছেন, তাঁদেরও না পূর্ববঙ্গের নমঃশূদ্র দের মত করুণ পরিণতি হয় ! 
পরিশেষে বলা যায় সহজ সরল বাঙালি দলিতরা যাতে দিকভ্রান্ত না হয় সেই জন্যই যোগেন বাবুর কথা জানা উচিত। বিগত লোকসভা ভোটের ( ২০১৯) ফলাফল যদি বিশ্লেষণ করা যায়, তাহলে দেখা যাবে পশ্চিমবঙ্গে ৪২ টি লোকসভা আসনের মধ্যে যে দশটি তপশিলি জাতি দের জন্য সংরক্ষিত,আর যে দুটি তপশিলি উপজাতি দের জন্য সংরক্ষিত আসন রয়েছে, আর সিংহভাগই জিতেছে সংঘ পরিবার ঘেঁষা, সনাতন সংস্কৃতি রক্ষা করতে বদ্ধপরিকর একটি রাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা। এই দলটির প্রতিনিধিরা দশটি তফশিলি জাতির জন্য সংরক্ষিত আসনের মধ্যে ছটি আর তপশিলি উপজাতি দের জন্য নির্দিষ্ট দুটি আসন ই জিতে নিয়েছে। অপরপক্ষে ধর্মনিরপেক্ষ দলগুলি জিতেছে মাত্র চারটিতে। অর্থাৎ হিসাব জলের মতন পরিস্কার যে আজকের বাঙালি সমাজের নিম্নবর্ণের হিন্দুরা যোগেন বাবুর ভুলকে মাথায় রেখেছেন। আগামী দিনে যাতে তাঁদের কেউ ভুল বোঝাতে না পারে, তার জন্যই যোগেন্দ্র নাথ মন্ডল এর জীবনী সবার পড়া উচিত।

(সমাপ্ত)

We are not big media organisation. Your support is what keeps us moving. Don't hesitate to contribute because, work, for society needs society's support. Jai Hind.