হিন্দুর উদ্বাস্তু হওয়া ও যোগেন মন্ডল: বর্তমান প্রাসঙ্গিকতা- (১)

0
245

© সূর্য শেখর হালদার

(প্রথম পর্ব)

পশ্চিমবঙ্গের বিদ্যালয়গুলিতে যে ইতিহাস পড়ানো হয়, তাতে শ্রী যোগেন্দ্রনাথ মন্ডলের নাম থাকে না বললেই চলে। তাই অধিকাংশ পশ্চিমবঙ্গবাসী , এমনকি শিক্ষিত সমাজের একাংশও উনিশশো চল্লিশের দশকের এই গুরুত্বপূর্ণ বাঙালি তথা নমঃশূদ্র রাজনৈতিক নেতার জীবন সম্পর্কে অবহিত নয়। কিন্তু আজকের পশ্চিমবঙ্গে যে রাজনৈতিক ও সামাজিক অবস্থা বর্তমান, তাতে করে এই দলিত নেতার কর্ম ও জীবন সম্পর্কে জানা খুব জরুরী। এই নিবন্ধে চেষ্টা করা হচ্ছে তার জীবন ও কর্ম কে সবার সামনে উপস্থাপিত করা, যাতে তার রাজনৈতিক ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে বাঙালি জাতি আগামীদিনে সঠিক পথে চলতে পারে।

 প্রথম জীবন ও রাজনীতি
যোগেন্দ্রনাথ মন্ডলের জন্ম হয় অধুনা বাংলাদেশের বরিশাল জেলাতে ১৯০৪ সালের ২৯শে জানুয়ারি । তাঁর শৈশব সম্পর্কে খুব কম কথা জানা যায়। তিনি ছিলেন আইনের ছাত্র এবং জাতিগতভাবে ছিলেন নমঃশূদ্র সম্প্রদায়ের মানুষ। সেকালে নমঃশূদ্র দের অস্পৃশ্য বলে মনে করা হতো এবং অনেকেই তাদের হিন্দু সমাজের অন্তর্গত বলে ধরত না। তাই নমঃশূদ্ররা তখন হিন্দু সমাজে অন্তর্ভুক্ত হবার চেষ্টা চালাচ্ছিল। 

এই সামাজিক প্রেক্ষাপটে যোগেন বাবু তাঁর রাজনীতি আরম্ভ করেন । তিনি তৎকালীন বাংলা প্রদেশের আইনসভা তে নির্দল প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হন। সালটা ছিল ১৯৩৭ । তিনি অধুনা বাংলাদেশের বাখরগঞ্জ আসন থেকে স্বদেশী আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী জাতীয় কংগ্রেসের অন্যতম নেতা শ্রী অশ্বিনী কুমার দত্তের ভ্রাতুষ্পুত্র শ্রী সরল কুমার দত্ত কে পরাজিত করে নির্বাচিত হন। অর্থাৎ আবির্ভাবেই যোগেন বাবু জাতীয় কংগ্রেসের দীর্ঘ লালিত পারিবারিক রাজনীতির মূলে আঘাত হানেন ।

এই সময় যোগেন বাবু শ্রী সুভাষ চন্দ্র বোস ও শ্রী শরৎ চন্দ্র বোস এর দ্বারা প্রভাবিত হন। কিন্তু ১৯৪০ সালে সুভাষচন্দ্র জাতীয় কংগ্রেস থেকে বহিষ্কৃত হন এবং  যোগেন বাবু  ধীরে ধীরে মুসলিম লীগের কাছাকাছি আসতে থাকেন। তিনি বাংলার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর ( ১৮৯২- ১৯৬৩)  মন্ত্রিসভাতে পদ ও পান। সেইসময় তিনি বাবাসাহেব আম্বেদকর এর অনুগামী ও ছিলেন l তিনি বাবা সাহেবের সঙ্গে একত্রিত হয়ে সিডিউল কাস্ট ফেডারেশনের শাখা বাংলার বুকে প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৪৬ সালে জাতীয় কংগ্রেস প্রদেশে আইনসভার নির্বাচনে বাবাসাহেব কে পরাজিত করতে উদ্যোগী হয়। এইসময় যোগেন বাবু বাবাসাহেব কে মুসলিম লীগের সহায়তায় বাংলা থেকে নির্বাচনে জিতিয়ে দেন। 

এই সময় হিন্দু মহাসভা ও কিন্তু রাজনৈতিক দল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। হিন্দু মহাসভা একটি সংগঠন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে ১৯১৫ সালে, আর রাজনৈতিক দল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৩৩ সালে। হিন্দু মহাসভা নমঃশূদ্র সম্প্রদায় কে কাছে টানতে চায়, কিন্তু যোগেন বাবু মনে করতেন হিন্দুদের সঙ্গে নয় বরং মুসলিমদের সঙ্গে থাকলেই নিম্নবর্ণের শুদ্রদের স্বার্থরক্ষা সম্ভব। এরপর ১৯৪৬ সালে যখন অবিভক্ত বাংলার সরকারের উদ্যোগে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা লাগলো, তখন যোগেন বাবু নমঃশূদ্র বি দের হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা তে অংশগ্রহণ না করতে আহ্বান জানালেন। কারণ তাঁর ধারণা ছিল উচ্চবর্ণের হিন্দুরা লড়াকু নমঃশূদ্র দের দাংগা তে দাবার বোরের মত ব্যবহার করবে। ১৯৪৬ সালে অন্তর্বর্তী সরকারেও মুসলিম লীগ যোগ দিলে যোগেন বাবু মুসলিম লীগের 5 জন প্রতিনিধির একজন হয়ে সরকারে যোগ দেন  এবং আইন মন্ত্রীর দায়িত্ব পান। 
 পাকিস্তানে রাজনীতি
১৯৪৭ সালে পাকিস্তান যখন নির্মিত হয় তার আগেই যোগেন্দ্র নাথ মন্ডল মুসলিম লীগের ঘনিষ্ঠ হয়েছেন। তিনি মনে করেন দীর্ঘ যুগ ধরে দলিতরা ভারতে অত্যাচারিত ও শোষিত হয়েছে। তাই পাকিস্তানে তাঁদের স্বার্থ সুরক্ষিত হবে। তাই অনেক ভেবে তিনি পাকিস্তান প্রস্তাবের সমর্থন করেন। মুসলিম লীগের তৎকালীন সর্বেসর্বা মোহাম্মদ আলী জিন্না ও তাঁকে রাজনৈতিক প্রয়োজনে কাছে টেনে নেন আর নতুন রাষ্ট্র পাকিস্তান গঠন হলে তাঁকে আইন ও শ্রম দপ্তরের মন্ত্রী করে দেন। এছাড়াও জম্মু-কাশ্মীর ও কমনওয়েলথ বিষয় ও  তিনি দেখাশোনা করতেন। তিনি ১৯৪৭ সাল থেকে  ১৯৫০ সাল পর্যন্ত করাচি শহরে বসবাস করেন। উল্লেখ্য করাচি ছিল সেসময় নবগঠিত পাকিস্তানের রাজধানী। কিন্তু যোগেন বাবু আর মুসলিম লীগের এই মধুচন্দ্রিমা বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। ১৯৪৮ সালে জিন্না দেহত্যাগ করেন আর ১৯৫০  সালে ই যোগেন বাবু তাঁর স্ত্রী ও দুই কন্যাসহ ভারতের কলকাতা শহরে প্রত্যাবর্তন করেন। প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য এই কলকাতা শহর সমগ্র বাংলাকে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত করাই ছিল সুরাওয়ারদি তথা জিন্নার পরিকল্পনা। যোগেন বাবু এই পরিকল্পনার শরিক ছিলেন। কিন্তু ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় এর নেতৃত্বে একদল হিন্দু বাঙালি বুদ্ধিজীবী ও রাজনীতিবিদের চেষ্টায় হিন্দু বাঙালির হোমল্যান্ড পশ্চিমবঙ্গের জন্ম হয়। সময়টা ছিল ১৯৪৭ সালের ২০ জুন। ইতিহাসের এমনই করুণ পরিহাস যে একসময় সমগ্র বাংলাকে পাকিস্থানে নিয়ে যাওয়ার দাবিদার যোগেন্দ্রনাথ পাকিস্তান থেকে পালিয়ে এসে  হিন্দু বাঙালির হোমল্যান্ড পশ্চিমবঙ্গে আশ্রয় গ্রহণ করেন। তাঁর দেহান্তর হয় সেই পশ্চিমবঙ্গের বনগাঁ শহরে ১৯৬৮ সালের ৫ই অক্টোবর। (ক্রমশঃ)

We are not big media organisation. Your support is what keeps us moving. Don't hesitate to contribute because, work, for society needs society's support. Jai Hind.