শিবাজী মহারাজের জীবনী ও বীরত্বগাথা- (২২)

0
299

© অরিন্দম পাল

পর্ব-২২

মামা-ভাগ্না সংবাদ

… ‘সহ‍্যাদ্রির গঙ্গা’ নামে পরিচিত ‘করহা’ নদী সম্পর্কে একটি কিংবদন্তি কথা প্রচলিত আছে । একদা ব্রহ্মা সহ‍্যাদ্রির শিখরে ধ‍্যানমগ্ন ছিলেন, ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির তাঁর যজ্ঞের ব্যাপারে ভীমকে, ব্রহ্মার নিকট কিছু নিবেদন করার জন্য পাঠিয়ে ছিলেন । ভীম কঠোর পরিশ্রম ও অসংখ্য বাধা অতিক্রম করে পর্বত শিখরে আসেন, কিন্তু ব্রহ্মাকে ধ‍্যানস্থ দেখে চিন্তিত হয়ে পড়েন । ব্রহ্মার ধ্যান ভঙ্গ করার জন্য তিনি নানা রকম চেষ্টা করেন, কিন্তু বিধাতাকে কিছুতেই টলানো যায় নি । কী করা যায় চিন্তা করতে করতে ভীমের চোখ পরে ব্রহ্মার কমন্ডলুর উপরে । ভীম জলভর্তি কমন্ডলু তুলে নিয়ে ব্রহ্মার মাথার উপরে ঢেলে দেয় । ঐ শীতল স্বচ্ছ জল ব্রহ্মার মস্তক থেকে গড়িয়ে সহ‍্যাদ্রির গঙ্গা রূপে মাটি-পাথর সিঞ্চিত করে মুক্তোর মত বয়ে যেতে থাকে এবং তার গতি পথে ফল ফুলের বাগান, বন জঙ্গলকে কে সিঞ্চন করে পূব দিকে স্রোতস্বিনী নদীর রূপ নিয়ে প্রবাহিত হতে থাকে । এই জলধারা-ই করহা নদী নামে পরিচিত হল । ব্রহ্মার কমন্ডলুর নাম ‘কর’ । ‘কর’ থেকে জন্ম নেয় আমাদের এই করহা নদী ।

আকস্মিকভাবে কমন্ডুলর জল মাথায় পড়ায় ব্রহ্মার সমাধি ভঙ্গ হয় এবং ভীমের প্রার্থনা শুনে তিনি তৎক্ষণাৎ তাঁর সঙ্গে যাত্রা করেন । কমণ্ডলু সহ‍্যাদ্রির শিখরে একইভাবে কাৎ হয়ে থাকে এবং কলকল করে তার থেকে অবিরাম জল পড়তে থাকল । তারপর কত শত শতাব্দী কেটে গেছে, কত যুগ-যুগান্ত অতীত হয়েছে ― করহা বয়ে চলেছে ।
সহ‍্যাদ্রির এই পর্বত বেষ্টিত উপত্যকার নাম করহা পঠার । একে রক্ষা করার জন্য‌ই যেন সদাসর্তক প্রহরীর মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে পুরন্দর দুর্গ । স্বরাজের অন্তর্ভুক্ত এই দুর্গের দুর্গ-রক্ষক নিযুক্ত হয়েছেন নেতাজী পালকর । তা‌ঁর তীক্ষ্ণ বুদ্ধি, সাহস, প্রশাসন-কৌশল এবং অসাধারণ দূরদৃষ্টি তাঁকে এক বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বে প্রতিষ্ঠিত করেছিল । তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে পুরন্দর দুর্গ সুরক্ষিত থাকলে স্বরাজ ও সুরক্ষিত থাকবে ।
এখানে উল্লেখ করা যায় যে এই সময়েই শিবাজী তাঁর কয়েকটি দুর্গের নূতন নামকরণ করেছিলেন, যেমন― রায়রীর নাম ‘রায়গর’, চাকণের নাম ‘সংগ্রাম দুর্গ’, রোহিড়ার নাম ‘বিচিত্রগড়’ এবং তোরণার নাম ‘প্রচন্ডগড়’ রাখা হয়েছিল । ওদিকে বাদশাহ আদিলশাহ গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ায় বিজাপুর অত্যন্ত উদ্বেগের মধ্যে দিয়ে দিন যাপন করছিল । এই সংবাদ শিবাজী মহারাজ পাওয়ার পর, তখন তাঁর দৃষ্টি ছিল করহা পঠারের সুপে পরগনার দিকে । সুপের শাসনভার যতক্ষণ হস্তগত না করা যাবে ততক্ষণ করহা পঠারের পূর্ব দিক একবারে অরক্ষিত হয়ে থেকে যাবে । এতে স্বরাজের নিরাপত্তা বিপন্ন হতে পারে । শাহাজীরাজা তাঁর জাগীরের অন্তর্গত এই সুপে পরগনার শাসনভার তাঁর সম্পর্কে মামা সম্ভাজি মোহিতের হাতে অর্পণ করেছিলেন । শিবাজী তাঁকে ‘মামা’ বলতেন, কিন্তু ভাগ্নের প্রতি মোহিত মামার বিশেষ সুনজর ছিল না । সেই কারণেই শাহাজী রাজার জাগীরের অন্তর্গত হওয়ার স্বত্ত্বেও সুপে পরগনাকে স্বরাজের অন্তর্ভুক্ত করা যায়নি । মামার কার্যকলাপ সম্বন্ধে নানা অভিযোগ মহারাজের কানে আসছিল । প্রজাদের উপর অকারণে জোর-জুলুম করা বহু খবর তিনি পাচ্ছিলেন । অর্থলোলুপ মোহিত মামা অনেক প্রজার ন্যায়সঙ্গত ভূ-সম্পত্তি হরণ করে নিয়েছিলেন । এমনই এক প্রজার নাম তিমাজী খন্ড কুলকর্ণী । মোহিত মামা এঁকে তিনমাস কারাগারে আটক করে রেখে তাঁর সম্পত্তি বিসাজী ও রামাজী পণদরকর নামক দুই ভাইকে ‘দান’ করে দিয়েছিলেন । তার পরিবর্তে ঐ দুই ভাই তাঁকে একটি ঘোড়া ও সাড়ে সাতান্ন টাকা ঘুষ দিয়েছিলেন । তিনমাস পরে মোহিত মামা তিমাজীকে দিয়ে জোর করে তাঁর ভূসম্পত্তি নিজের নামে লিখে নিয়েছিলেন । ছাড়া পেয়েই তিমাজী সোজা কর্ণাটকে ছুটলেন শাহাজীরাজার কাছে ন্যায়বিচারের জন্য । এই ধরনের বহু অভিযোগ শাহাজীর কানে আসছিল । তিনি তিমাজীর হাতে শিবাজী রাজার উদ্দেশে একটি চিঠি লিখে দিলেন, যাতে তিমাজীর অভিযোগ সম্পর্কে তদন্ত করেন এবং শিবাজী রাজা যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করেন।
কিন্তু তিমাজী শাহাজীর চিঠি নিয়ে পৌঁছুবার আগেই, শিবাজী কিছু অশ্বরোহী সৈন্য নিয়ে সুপা অভিমুখে রওনা হয়ে গিয়েছিলেন । বিজয় দশমীর পনের দিন পরেই দেওয়ালী । মামার সঙ্গে দেখা করে তাঁকে প্রণাম করে উপহার লাভ করার চিরাচরিত প্রথা অনুসারেই শিবাজি ‘মামার বাড়ি’ যাওয়ার সুযোগ গ্রহণ করেছিলেন ।
মহারাজ করহা পঠার পৌঁছলেন । অদূরে সুপের গড় দেখা যাচ্ছে । গড়ের মধ্যে বেশি সৈন্য সামন্ত ছিল না । সদর দরজায় প্রহরী ছিল । শিবাজী মাবল সৈন‍্যদের নিয়ে প্রাসাদের সামনে ঘোড়া থেকে নামলেন আর সোজা ভিতরে প্রবেশ করলেন । স্বয়ং শাহাজীরাজার ছেলেকে বাধা দেবে কে ? ভিতরে গিয়েই তিনি মোহিত মামার কাছে খবর পাঠালেন যে তাঁর ভাগ্নে তাঁর কাছে দেওয়ালীর উপহার চাইতে এসেছে । মামা কল্পনাই করতে পারেননি যে তাঁর ‘গুণধর ভাগ্নে’ এইভাবে তাঁর কাছে এসে উপস্থিত হবে । মোহিত মামা সুপের মালিকানা কিছুতেই দেবেন না ― এটা জানিয়ে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শিবাজীর আদেশে তাকে বন্দী করা হল । শিবাজি প্রাসাদ ও অধীনস্থ সমস্ত এলাকা দখল করে নিলেন । গড়ের মধ্যে তিনশো ঘোড়া, প্রচুর ধন-সম্পদ ও অন্যান্য বহুমূল্য সামগ্রীও স্বরাজের অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল ।

(ক্রমশঃ)

We are not big media organisation. Your support is what keeps us moving. Don't hesitate to contribute because, work, for society needs society's support. Jai Hind.