শিবাজী মহারাজের জীবনী ও বীরত্বগাথা- (২১)

0
206

© অরিন্দম পাল

পর্ব-২১

জাওলীর অরণ্যে

…মহাবলেশ্বর, মকরন্দগড়, মঙ্গলগড় এবং পারঘাটের উত্তুঙ্গ পর্বতগুলি দিয়ে ঘেরা অতি দুর্গম অরণ্য প্রদেশই “জাওলী” নামে খ্যাত । খানা-খন্দ, গভীর খাদ ও নিবিড় জঙ্গলে ভরা জাওলী যে কোন মানুষের পক্ষে অত্যন্ত ভয়ঙ্কর । বাঘ, ভালুক, চিতা, নেকড়ে প্রভৃতি ভীষণ হিংস্র জন্তু-জানোয়ার, বিষধর সাপ-সরীসৃপ, পোকামাকড়ে পরিপূর্ণ জাওলীর জঙ্গলে, সূর্যের আলো দিনের কোন সময়েই সর্বত্র পৌঁছায় না । ঐ পার্বত্য-অরণ্য প্রদেশে বৃষ্টিও হয় প্রচন্ড। অত্যন্ত সাহসী শাসক ব্যতীত ঐ দুর্গম অঞ্চলে বসবাস করে, শাসনকার্য পরিচালনা করা ছিল প্রায় অসম্ভব ব্যাপার । ‘চন্দ্ররাও’ উপাধি গ্রহণ করে মোরে বংশের বীর শাসকরা বংশ-পরম্পরায় আদিলশাহীর কর্মচারী হিসেবে ঐ প্রদেশে শাসনকার্য চালাতেন। ঠিক এই সময়ে জাওলীর দৌলতলাও চন্দ্ররাও মোরের মৃত্যু হয় (১৬৪৭ খ্রীঃ) । জাওলী, কোকণ ও কৃষ্ণকাঠের জনসাধারণ তাঁকে রাজা বলে মনে করত । কিন্তু তিনি ছিলেন বিজাপুরের বাদশাহেরই এক সর্দার । অপুত্রক চন্দ্ররাও-এর বিধবা পত্নী, বুঝতে পেরেছিলেন যে তাঁর আত্মীয়-স্বজনরা এবং উচ্চপদস্থ কর্মচারীরা তাঁর ভূ-সম্পত্তি জবর দখল করার সুযোগ নিতে ছাড়বে না । তাই তিনি তাড়াতাড়ি শিবাজীর কাছে লোক পাঠালেন তাঁকে ও তাঁর জাওলীকে রক্ষা করার আবেদন জানিয়ে ।

শিবাজী নিজেও জাওলীর ওপর নজর রেখেছিলেন । ‘চন্দ্রারাও’ এর বিধবা পত্নীর আবেদনে সাড়া দিয়ে তৎক্ষণাৎ তিনি অশ্বরোহী ও পদাতিক বাহিনী সহ সেখানে প্রবেশ করেছিলেন। শিবাজীর স্বাধীন রাজ্যের সীমান্তের সঙ্গে লাগোয়া জাওলী ছিল ঘন জঙ্গলের মধ্যে অবস্থিত। জাওলীতে প্রবেশ করে, শিবাজী সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থান নিজের সৈন্যদের পাহারায় বসিয়ে দিয়েছিলেন ।

এই সময় জাওলীর বর্তমান ‘চন্দ্ররাও’ অর্থাৎ যশবন্তরাও মোরে, শিবাজী মহারাজের অনুগ্রহে সেখানকার শাসক হয়েছে । আফজল খাঁ যদি এসে পড়ত, তাহলে অবশ্যই তাকে পদচ্যুত করে বাদশাহের বিশ্বস্ত কোন সর্দারকে সেখানে প্রতিষ্ঠিত করত । কিন্তু সেই বিপদ কেটে যাওয়ায় যশবন্তরাও মোরে ও তার আত্মীয় হনুমন্তরাও মোরে, তখন নিশ্চিত কিন্তু মনে শাসন কার্য চালাচ্ছিল । আনুষ্ঠানিকভাবে জাওলী স্বরাজ‍্যের অন্তর্ভুক্ত হয়নি। স্বরাজ‍্যে তখন প্রায় শৈশবকাল চলছিল, মাত্র কয়েকটি দুর্গ স্বরাজ্যের দিকচিহ্ন রূপে বিরাজ করছিল। মহারাজের ইচ্ছা ছিল জাওলীও স্বরাজের অন্তর্ভুক্ত হোক। কিন্তু শিবাজী মহারাজের প্রতি কৃতজ্ঞতা বিস্মৃত হয়ে চন্দ্রারাও ক্রমেই স্বেচ্ছাচারীতার পথে এগোতে শুরু করে । তার লোভ ও ক্ষুধা বাড়তে থাকে । কয়েকটি মাবল অঞ্চলকে সে জোর করে দখল করে নেয় । বহু চাষের ক্ষেত থেকে তৈরি ফসল কেটে নেয় । শিবাজীর রাজ্যের মধ্যে ভয়ঙ্কর অপরাধ কর্মে লিপ্ত আসামীকে চন্দ্ররাও আশ্রয় দিয়েছিল । শুধু অন্যদের উপরেই নয়, স্বয়ং কানহোজী জেধের তথা স্বরাজের সীমার মধ্যে অনুপ্রবেশ করে চন্দ্ররাও চিখলী গ্রামের রামাজী ওয়াডকর পাটিল এবং তাঁর পুত্র লুনাজী পাটিলকে হত্যা করে । এইভাবে চন্দ্ররাও, স্বয়ং শিবাজী মহারাজের সঙ্গেই সংঘাত বাধিয়ে বসে । প্রথমে তাকে ভালো কথায় বুঝিয়ে এই সব অনাচার থেকে নিরস্ত করার জন্য, শিবাজী মহারাজ তার কাছে চিঠি পাঠান, কিন্তু তাতে কাজ হয়নি কিছু । চন্দ্ররাও ও হনুমন্তরাওয়ের দুঃসাহস বেড়েই চলে । যথেষ্ট ক্ষমতা থাকায় এবং অতি দুর্গম মঙ্গলগড়, মকরন্দগড়, রায়রীরগড় প্রভৃতি দখলে থাকায় চন্দ্ররাও শিবাজীকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে যথেচ্ছাচার চালিয়ে যেতে থাকে । সে নিজেকে ‘কোকণের রাজা’ বলেও ঘোষণা করে । এরপর শিবাজী চন্দ্ররাওকে বেশ কঠোর ভাষায় চিঠি লেখেন । যার মর্মার্থ ছিল, “ভগবান শিব-শম্ভুর আশীর্বাদ নিয়ে আমি যে স্বাধীন স্বরাজ প্রতিষ্ঠার ব্রতী হয়েছি, তুমি এখানে উপস্থিত হয়ে তারই এক সর্দার হিসাবে, আমার অনুগত হয়ে শাসন কর । এই পত্র পাওয়া মাত্রই তুমি এখানে এসে আমার সঙ্গে দেখা কর ।”
শিবাজী মহারাজের পত্র পেয়ে চন্দ্ররাও জবাব দিল― “তুমি কোথাকার রাজা ? কে তোমাকে রাজা করল ? আমি বাদশাহের কৃপায় ‘রাজা’ খেতাব পেয়েছি । পুরুষানুক্রমে আমরা ‘চন্দ্ররাও মোরে’ রূপে জাওলীতে রাজত্ব করছি । আমাকে বেশি ঘাঁটালে তার ফল ভালো হবে না ।” চন্দ্ররাওয়ের ওই ঔদ্ধত্যপূর্ণ জবাবে শিবাজী স্বভাবতই অত্যন্ত অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন এবং তাকে চরম পত্র দিয়ে জানিয়ে দিয়েছিলেন যে, এখন‌ও যদি সে তাঁর নির্দেশ পালন না করে তাহলে সে যেন জেনে রাখে যে, তার দিন ফুরিয়ে এসেছে। পরিশেষে তিনি লিখলেন, জাওলী খালি করে চন্দ্ররাও যেন অবিলম্বে মহারাজের অধীনে চাকুরী করতে এখন‌ই চলে আসে ।
মহারাজের এই কঠোর আদেশ পেয়ে চন্দ্ররাওয়ের দম্ভ আরো বেড়ে গেল । সে জবাব পাঠাল― জাওলীতে আসতে ইচ্ছে হলে আসতে পার । এখন যথেষ্ট গোলা-বারুদ মজুদ আছে ।”
চন্দ্ররাওয়ের এই বার্তা প্রেম মহারাজ অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়েছিলেন । তিনি সিদ্ধান্ত নিয়ে নেন যে, জাওলীকে অবিলম্বে স্বরাজের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে । মহারাজের আদেশ পেয়ে কানহোজী জেধে, হৈবৎরাও শিলমকর, সম্ভাজি কাওজী কোনঢালকর, বাদল নাইক এবং রঘুনাথ পন্ত সবনীস দরবারে হাজির হন ।
শিবাজী মহারাজ বললেন ― “চন্দ্ররাওকে উপযুক্ত শিক্ষা দেওয়া দরকার । পন্ত, এ ব্যাপারে আপনিই নেতৃত্ব দান করুন এবং যথাচিত ব্যবস্থা গ্রহণ করুন ।”
আদেশ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রঘুনাথ পন্তের নেতৃত্বে জাওলীর অতিদুর্গম পথে একটি বাহিনী রওনা হয়ে যায় । পন্ত চন্দ্ররাওয়ের কাছে সংবাদ পাঠান যে, মহারাজের আদেশ পালনের জন্য সে যেন এই মুহূর্তে তাঁর সঙ্গে শিবাজীর দরবারে হাজির হয় । আদেশ অমান্য করলে তাকে শাস্তি পেতে হবে । কিন্তু চন্দ্ররাওয়ের মাথায় তখন ক্ষমতার ভূত চেপে বসেছে । সে শিবাজীরাজার প্রতি অশালীন বাক্য প্রয়োগ করে রঘুনাথ পন্তের দূতকে ফেরত পাঠিয়ে দেয় । পন্ত প্রস্তুত হয়েই এসেছিলেন এবং দূত ফিরে আসার সঙ্গে সঙ্গে একযোগে চতুর্দিক থেকে আক্রমণ শুরু করে দেন । হনুমন্তরাও, চন্দ্ররাও এবং সমস্ত মোরে সর্দারগণ বিপুল বিক্রমে আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য ছুটে আসে । রণদামামা বেজে ওঠে । মহারাজা শিবাজীর বীর সৈনবাহিনী জাওলীর সমগ্র দুর্গ অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে । ভিতর থেকে যারাই বাইরে বেরিয়ে এসে আক্রমণ প্রতিরোধের চেষ্টা করে, তারাই স্বরাজের বীর সৈনিকদের হাতে নিহত নয়তো গুরুতর আহত হয়ে জঙ্গলের মধ্যে পড়ে থাকে । মোরেদের উপর চতুর্দিক থেকে আক্রমণ শুরু হয় । এমন সময় সম্ভাজি কাওজী কোনঢালকরের তরবারির আঘাতে, হনুমন্তরাও নিহত হয় এবং এর ফলে মোরেদের মধ্যে প্রচন্ড ভীতি ও ত্রাসের সঞ্চার হয় । জাওলী হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে বুঝতে পেরে স্বয়ং চন্দ্ররাও পালিয়ে যায় । এই গণ্ডগোলের মধ্যে চন্দ্ররাও-এর ভাই প্রতাপরাও মোরে ঘন ঝোপঝাড়ের মধ্যে গা-ঢাকা দিয়ে পালিয়ে সোজা বিজাপুরের রাস্তা ধরে নেয় ।
সংবাদ পেয়ে শিবাজী মহারাজ স্বয়ং জাওলী আসেন । চন্দ্ররাও-এর সর্দারদের মধ্যে এক অত্যন্ত তেজস্বী বীর সর্দার মুরারবাজী দেশপাণ্ডের বীরত্বের বিবরণ শিবাজী আগেই শুনেছিলেন । ১৬৫৬ সালের ১৫ ই জানুয়ারী, জাওলী দখল করার পর শিবাজী মুরারবাজীকে কাছে ডাকেন এবং অত্যন্ত স্নেহের সঙ্গে তাকে বোঝান যে, স্বরাজের প্রতিষ্ঠা ও বিস্তারের জন্য তার মত বীরের বিশেষ প্রয়োজন । শিবাজী শুধু মোরেদের প্রতি শত্রুতাবশতঃ যুদ্ধ করেননি, তিনি এক পবিত্র উদ্দেশ্য সাধনের লক্ষ‍্যে, স্বরাজ প্রতিষ্ঠার জন্য যুদ্ধ করেছেন । এক সময় শিবাজী নিজেই এই চন্দ্ররাওকে জাওলীতে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন । মোরে সে কথা বিস্মৃত হয়ে শিবাজীকেই তার শত্রু মনে করতে শুরু করে । মুরারবাজীকে মহারাজ বললেন ― এসো, স্বরাজের জন্য আজ তোমার মত বীরের বিশেষ প্রয়োজন। স্বরাজ প্রতিষ্ঠা এবং একে সুদৃঢ় করে তোলার সংগ্রামে তোমারও বিরাট অবদান থাকবে, তার ফলে তোমার কীর্তি ছড়িয়ে পড়বে দিকে-দিকে ।
স্বয়ং শিবাজী মহারাজের মুখ থেকে এমন প্রেরণাদায়ী কথা শুনে মুরারবাজী নিজেকে ধন্য মনে করে এবং স্বরাজের সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করার প্রতিজ্ঞা নেয় ।
জাওলী দখল করার পর কৃষ্ণাজী বাবাজীকে মহারাজ সেখানকার সুবেদার নিযুক্ত করলেন এবং জাওলীর অধীনস্থ প্রজা ভূমিসত্ব ফিরিয়ে দিয়ে সর্বত্র সুচারু ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ।
চন্দ্ররাও মোরে জাওলী থেকে পালিয়ে রায়রীর দুর্গে আশ্রয় নিয়েছিল । শিবাজী ১৬৫৬ সালের ৬ই এপ্রিল রাইরী পৌঁছান । রায়রীর দুর্গ ছিল সুবিশাল ―তার ক্ষেত্রফল ছিল দৌতলাবাদের দশগুণ । দুর্গটি দেখে শিবাজীর খুব পছন্দ হয় ।
চন্দ্ররাওয়ের ভাগ্নে শিলমকর দেশমুখ মহারাজের বাহিনীতে ছিলেন । তিনি গিয়ে চন্দ্ররাওকে শিবাজীর কাছে ক্ষমা চেয়ে তাঁর নিকট আত্মসমর্পন করতে বলেন । কিন্তু চন্দ্ররাওয়ের অহংকার তখনও ভাঙেনি । পুরো এক মাস রায়রী দুর্গ অবরোধ করে রাখা হয় । অবশেষে একদিন চন্দ্ররাও অস্ত্র সমর্পণ করে শিবাজীর কাছে আসে । শিবাজীর মন ছিল অত্যন্ত উদার । চন্দ্ররাওয়ের বীরত্ব ও অভিজ্ঞতা স্বরাজের কাজে লাগুক, এই চিন্তা করে তিনি তাকে ক্ষমা করে এবং উপযুক্ত সম্মান দিয়ে নিজের কাছে রাখার কথা ভাবেন । দুর্গের নীচে তাঁর সৈন্যদের মধ্যে চন্দ্ররাওয়ের থাকার ব্যবস্থা করে শিবাজী প্রত্যক্ষভাবে দুর্গ পরিদর্শন করতে উপরে ওঠেন ।
মহারাজ দুর্গকে ঠিক মত মেরামত ইত্যাদি শুরু করার আদেশ দেন । তিনি এই দুর্গের নামকরণ করেছিলেন “রায়গড়” । ইতিমধ্যে চন্দ্ররাও গোপনে বিজাপুরের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করে এবং মুঠোলের বাজী ঘোরপড়ের কাছে গুপ্ত চিঠি পাঠায় । কিন্তু মহারাজের গুপ্তচরেরা পথমধ্যে সেই চিঠি ধরে ফেলে । এই সংবাদ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চন্দ্ররাও ছাউনি থেকে পালাবার চেষ্টা করে । কিন্তু পালাবে কোথায় ? তাকে তৎক্ষণাৎ বন্দি করা হয় এবং দেশদ্রোহীর প্রাপ্য শাস্তি অর্থাৎ মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় ।

জাওলীর নিকটস্থ চন্দ্রগড়, মকরন্দগড়, কাংগোরী, সোনগড়, চাম্ভারগড় প্রভৃতি ছোট দুর্গগুলিও শিবাজী মহারাজ স্বরাজের অন্তর্ভুক্ত করেন । (ক্রমশঃ)

We are not big media organisation. Your support is what keeps us moving. Don't hesitate to contribute because, work, for society needs society's support. Jai Hind.