শিবাজী মহারাজের জীবনী ও বীরত্বগাথা- (১৮)

0
237

© অরিন্দম পাল

পর্ব-১৮

শিবাজীর অকল্পনীয় কূটকৌশল ও শাহাজী রাজার মুক্তি

…ফত্তেখানের আক্রমণকে প্রতিহত করে, তাকে সম্পূর্ণ পরাস্ত করে শিবাজী রাজগড়ে ফিরে আসেন। সেখানে জননী জিজাবাঈ, শাহাজী রাজার জন্য অত্যন্ত দুশ্চিন্তা ও উদ্বেগের মধ্যে দিয়ে দিন যাপন করছিলেন। ফত্তেখানের শোচনীয় পরাজয় অবশ্যই বাদশাহকে আরো ক্রুদ্ধ করে তুলবে এবং সে শাহাজী রাজার উপরে তার প্রতিশোধ নিতে পারে, জিজাবাঈয়ের সঙ্গে শিবাজীও এই আশঙ্কা করেছিলেন । ওদিকে বাঙ্গালোরে সম্ভাজীরাজার বিরুদ্ধে আক্রমণ চালানোর জন্য ফরাদখানের নেতৃত্বে বাদশাহ যে সৈন্যদল পাঠিয়েছিলেন, সেই বাহিনীও সম্ভাজীর কাছে পরাজিত হয়েছে বলে রাজগড়ে সংবাদ আসে । আনন্দের এই সংবাদ‌ও জিজাবাঈ ও শিবাজীর কাছে আশঙ্কার কারণ হয়ে উঠল । এই ঘোর সংকট মুহূর্তে শিবাজীর দূরদৃষ্টি ও তীক্ষ্ণ কূটবুদ্ধি তাঁকে সাহায্য করল। শিবাজী আর দেরি না করে দিল্লির মোগল বাদশাহ শাহজাহানের কাছে এক পত্র প্রেরণ করলেন । তাতে শিবাজী লিখলেন―
“……আমার পূজনীয় পিতা শাহাজীরাজে ভোঁসলে এবং আমি আপনার অধীনে চাকুরী করতে চাই । আপনি আমাদের নিযুক্তির ফরমান পাঠালে সেই অনুযায়ী আমরা চাকরী শুরু করতে পারি । কিন্তু বিজাপুর সুলতান আমাদের এই ব্যাপারে বিরাট বাধা সৃষ্টি করেছে― সে আমার পিতাকে বন্দী করে রেখেছে । আদিলশাহের কারাগার থেকে আমার পিতা মুক্তিলাভ করলেই আমরা আপনার সেবায় আত্মনিয়োগ করতে পারব ।”

শাহজীরাজার মুক্তির জন্য বিজাপুরে সুলতানের উপর দিল্লির মোগল বাদশাহের তরফ থেকে চাপ সৃষ্টির, এই অভিনব কৌশল মাত্র আঠারো বছর বয়সী শিবাজীর মস্তিষ্ক থেকে কেমন করে উৎপন্ন হল, তা ভাবলে আশ্চর্যে অভিভূত হতে হয়।
তিনি যে বিজাপুর বা দিল্লি কোন বাদশাহের অধীনেই চাকরীর জন্য এতটুকু লালায়িত ছিলেন না, সেকথা সকলেরই জানা ছিল । স্বরাজ তথা স্বাধীনতার পতাকা নিয়ে তিনি এই সমস্ত বিদেশী, বিধর্মীদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিলেন এবং মাতৃভূমির স্বাধীনতার জন্য সব রকম কূট-কৌশল অবলম্বন করতে তিনি সর্বতোভাবে প্রস্তুত ছিলেন। কিন্তু শাহাজীরাজের মুক্তির জন্য তাঁর এ হেন রাজনৈতিক চাতুর্য দেখে স্তম্ভিত হতে হয় ।

শাহজাহানের এক পুত্র মুরাদবক্স গুজরাতের আহমেদাবাদে মোগল সুবেদার রূপে নিযুক্ত ছিল‌। শিবাজী তার কাছেই তাঁর এই পত্রটি পাঠালেন । শাহজাহান দাক্ষিণাত্যের সব খবরাখবর‌ই রাখতেন। শাহাজীরাজার বুদ্ধি, বীরত্ব, রণকৌশল সম্বন্ধে তিনি ভালোভাবেই অবহিত ছিলেন, এদিকে শিবাজীর কার্যকলাপের সংবাদ ও তাঁর কাছে পৌঁছাচ্ছিল । এ রকম দুজন বীর, সাহসী ও কর্মঠ সর্দার লাভ করলে, দাক্ষিণাত্যের পুরোটাই হাতের মুঠোর মধ্যে এসে যাবে, ছেলে মুরাদবক্সের মারফৎ শিবাজীর চিঠি পেয়ে এই ব্যাপারে শাহাজাহান খুব আনন্দিত ও নিশ্চিন্ত বোধ করলেন।

ওদিকে বিজাপুরের রাস্তা সেদিন লোকে-লোকারণ্য । শহরের সমস্ত বাড়ির ছাদে, জানলায়, অলিন্দে হাজার হাজার মানুষ উৎসুক হয়ে দেখছে আফজল খানের নেতৃত্বে এক বিরাট শোভাযাত্রা শহরে প্রবেশ করছে। বিজাপুরের প্রধান সেনাপতি খান মহম্মদ জিঞ্জী লুট করেন এবং বিশাল ধন-সম্পদ শতাধিক হাতির পিঠে চাপিয়ে আফজাল খানের সঙ্গে বিজাপুর রওনা হন । কিন্তু একটি হাতির পিঠে ছিল এক অতীব মূল্যবান ‘সম্পত্তি’― শৃঙ্খলিত সিংহ শাহাজীরাজা । এবং তাঁকে ঐ অবস্থায় দেখার জন্য বিজাপুরের রাস্তায়-রাস্তায় ও পাশে সমস্ত বাড়িতে এমন বিপুল সংখ্যক জনতা উৎসুক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সকলে ধরেই নিয়েছে যে বিজাপুরের কারাগারেই শাহাজীকে হত্যা করা হবে। বাদশাহের বিরুদ্ধে শাহাজীর পুত্ৰ বিদ্রোহ করেছে । অতএব, শাহাজীকে কেউই বাঁচাতে পারবে না । এবিষেয়ে জনসাধারনের মনে কোন সন্দেহ নেই।

ইতিমধ্যে শিবাজী দিল্লীর মোগল বাদশাহ শাহজাহানের কাছে যে চিঠি পাঠিয়েছিলেন, সেই বিষয়ে দরবারে কানা-ঘুষো শুরু হয়ে গিয়েছিল। শাহাজীকে বন্দী করে রাখার অজুহাতে এখন যদি মোগল বাদশাহ বিজাপুর আক্রমণ করে, তাহলেই তো সর্বনাশ ! দিল্লি যদি এখনই ফরমান পাঠাই যে মোগল বাদশাহের ‘সর্দার’ শাহাজি রাজাকে তোমরা কোন্ সাহসে বন্দি করে রেখেছ ? এখন যদি বাস্তবিকই শক্তিশালী মোগল বাদশাহ ক্রুদ্ধ হয়ে কিছু একটা করে বসে তাহলে আদিলশাহীর মান-সম্মান সব‌ই ভূলুণ্ঠিত হবে । আর যে কথা শিবাজী পরিষ্কার শাহজাহানকে লিখেছে বলে শোনা যাচ্ছে, সেই মত যদি শিবাজী ও তার দাদা সম্ভাজী মোগল সৈন্যদের সঙ্গে নিয়ে বিজাপুরের উপর হামলা করে, তাহলে তো আর রক্ষে নেই ।

এখানে বলে রাখা দরকার যে মুরাদবক্সের মারফৎ শাহজাহানকে চিঠি পাঠিয়েই শিবাজী রাজা চুপ করে বসে না থেকে বিজাপুরে তাঁর বিশ্বস্ত গুপ্তচর পাঠিয়ে সেখানে গোপনে কিন্তু বেশ কার্যকরভাবে এই কথা কথা প্রচারের ব্যবস্থা করেছিলেন যে তিনি মোগল বাদশাহ শাহজাহানকে চিঠি দিয়েছেন এবং সেই চিঠি পেয়ে বাদশাহ খুব শীঘ্রই বিজাপুর আত্রুমণ করতে পারেন ― যদি শাহাজীরাজাকে অবিলম্বে মুক্তি না দেওয়া হয় । এবং এই প্রচারের ফলে প্রায় সকলেই চিঠির কথা জেনে গেছে। শিবাজীর রাজনৈতিক কৌশল সফল হল। বিজাপুরের বাদশাহ আদিলশাহ, তড়িঘড়ি শাহাজীরাজাকে কারাগার থেকে মুক্ত করে সসম্মানে তাঁকে দরবারে উপস্থিত করার নির্দেশ দিলেন। তারপর শাহাজীরাজাকে নানা বস্ত্রালংকার উপহারাদি বিয়ে আদিলশাহ তাঁকে বললেন― “বড় ভুল বোঝাবুঝি হয়ে গেছে। আপনার শৌর্য-বীর্যের জন্যই আদিলশাহী আজ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। তবে আপনি আপনার ছেলেকে বলুন, সে যেন কোণ্ডাণা দুর্গ আমাকে ফিরিয়ে দেয় । সেই সঙ্গে আপনার জায়গীরের অন্তর্গত বাঙ্গালোর শহর ও কন্দর্পী দুর্গ আমাকে সমর্পন করুন।”

শিবাজী অত্যন্ত প্রিয় কোণ্ডানা দুর্গ, এবং সেই সঙ্গে দুর্গের অমূল্য‌ও আদিলশাহকে ফিরিয়ে দিতে হবে শুনে শাহাজী অত‍্যন্ত মর্মাহত হলেন, কিন্তু উপায় নেই । তাছাড়া, এইটুকু বয়সেই যার বিক্রমে মুসলমান শাসিত রাজ্যগুলি ও তাদের শাসকরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে, সে কোণ্ডনার মত অনেক দুর্গ জয় করে নেবে― এইরূপ চিন্তা করে শাহাজী অনিচ্ছা সত্ত্বেও বিজাপুর সুলতানের শর্ত পূরণে রাজি হলেন ।

বিজাপুর সুলতান কর্তৃক শাহজীরাজাকে নানাভাবে সম্মানিত ও আপ্যায়িত করতে দেখে আফজাল খান ও বাজী ঘোরপড়ের মত শাহাজীর প্রতি শত্রু-ভাবাপন্ন সর্দারা রুষ্ট হলেও মুখে সে কথা প্রকাশ করতে পারল না । যার মৃত্যুদণ্ড ছিল অবধারিত, তাকে সম্মানের সঙ্গে মুক্তি দিয়ে সম্বর্ধনা জানানো হচ্ছে দেখে অন্য সকলেও আশ্চর্য হল।

শাহাজীরাজার মুক্তি সংবাদ শুনে জননী জিজাবাঈ ও শিবাজীরাজা সকলেই অত্যন্ত আনন্দিত হলেন। নানা যুদ্ধে জয়লাভের পর এই মহাসংকট থেকে উদ্ধারলাভ, শিবাজীর অতুলনীয় কূট-বুদ্ধির সাফল্য, স্বরাজের উপর যে মেঘ ঘনিয়ে এসেছিল, সেই মহা বিপদ কেটে যাওয়ার আনন্দ ― সব কিছুই জননী জিজাবাঈয়ের মনে যে তৃপ্তি সঞ্চার করেছিল, তার বর্ণনা করা সম্ভব নয়। স্বয়ং শিবাজীর রাজার আত্মবিশ্বাস বহুগুণ বর্ধিত হল। সেই সঙ্গে তার বিশ্বস্ত সর্দার, বন্ধু ও সৈনিকদের মনোবল বিপুল ভাবে বেড়ে গেল। আর নিজেদের তরুণ নেতা শিবাজী রাজার প্রতি তাদের শ্রদ্ধা ও আনুগত্য আরো বেশী দৃঢ় হল।

যে সমস্ত বীর সর্দার ও সৈনিক স্বাধীনতার এই যুদ্ধে শহীদের মৃত্যুবরণ করেছেন, শিবাজী তাঁদের স্ত্রী, সন্তান ও তাঁদের উপর নির্ভরশীল আত্মীয়দের কাছে বিশ্বস্ত ও প্রবীণ মন্ত্রীদের পাঠিয়ে আন্তরিক সমবেদনা জানালেন এবং তাদের সব রকম আর্থিক সাহায্য দিলেন ।
গৈরিক পতাকা সম্মান রক্ষা করতে গিয়ে গুরুতর রুপে আহত বাজি জেধেকে ‘সার্জরাও’ উপাধিতে ভূষিত করলেন। বাজি পাসলকরের পরিবারে স্বয়ং গিয়ে তাদের সান্ত্বনা ও সহানুভূতি জানিয়ে এলেন এবং ঐ বীর শহীদের পুত্র কৃষ্ণাজীকে ‘সাওয়াই বাজী’ উপাধিতে অলঙ্কৃত করলেন। পরাজিত ফ‌ত্তেখান যে স্থানে শিবির স্থাপন করেছিল, তার নিকটবর্তী মোরগাঁওয়ের ভগ্ন মোরেশ্বর মন্দিরের সংস্কার করালেন এবং মন্দিরে পূজা ইত্যাদি নির্বিঘ্নে চালানোর ব্যবস্থা করার জন্য ছয় বিঘা জমি সমর্পন করলেন।

কিন্তু শাহাজীরাজার পত্র পেয়ে তাঁর সমস্ত আনন্দ উৎসাহ এক ফুৎকারে নিভে গেল। কোণ্ডানা দুর্গ বিজাপুরকে ফিরিয়ে দেবার ব্যাপারে শাহাজী যে শর্ত মেনে নিয়েছেন, তদনুযায়ী পিতার নির্দেশ পেয়ে শিবাজী ক্ষুব্ধ হলেন। তাঁকে এত ক্ষুণ্ন হতে দেখে তাঁর প্রবীণ উপদেষ্টা তথা মন্ত্র সোনাপন্ত ডবীর শিবাজীকে নানা উপদেশ দিয়ে শান্ত করলেন। বললেন ― “রাজা ! প্রভু রামচন্দ্রের বংশে তোমার জন্ম হয়েছে। পিতৃসত্য রক্ষার জন্য শ্রীরাম সিংহাসন ত্যাগ করে বনবাস স্বীকার করেছিলেন। আর তুমি পিতার প্রতিশ্রুতি রক্ষার জন্য একটা দুর্গের জন্য এমন কাতর হচ্ছ ? এটা কি তোমার পক্ষে শোভনীয় ?”

শিবাজী শান্ত হলেন। বললেন ― “হ্যাঁ পন্ত ! আপনি ঠিকই বলেছেন । বিশ্বাসঘাতক শত্রুরা বাবাকে ধোঁকা দিয়ে তাঁকে বন্দি করে কারাগারে নিক্ষেপ করেছিল। ঐ দুষ্ট যবনদের আমি উপযুক্ত শাস্তি দেব‌ই। ঐ অহংকারী বিজাপুরকে স্বরাজ‍্যের কাছে নতি স্বীকার অবশ্যই করতে হবে।” (ক্রমশঃ)

We are not big media organisation. Your support is what keeps us moving. Don't hesitate to contribute because, work, for society needs society's support. Jai Hind.