শিবাজী মহারাজের জীবনী ও বীরত্বগাথা- (১৬)

0
182

© অরিন্দম পাল

পর্ব ১৬

সুভানমঙ্গল দুর্গ জয়

…এদিকে শিবাজীরাজা ও জননী জিজাবাঈ স্বরাজ‍্যের অন্যান্য কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় নবলব্ধ স্বাধীনতাকে রক্ষা করার ও তাকে আরো বিস্তৃত করে তোলার যথাযথ সুব্যবস্থা কাজে ব্যস্ত ছিলেন। রাজগড়, তোরণা, সুভানমঙ্গল, কোণ্ডানা প্রভৃতি দুর্গগুলিকে দৃঢ়তর করে তোলা, বিভিন্ন স্থানে প্রহরার ব্যবস্থা করা, সীমান্ত এলাকাগুলিকে সুরক্ষিত রাখার জন্য উপযুক্ত টহলদারীর ব্যবস্থা করা, বাদশাহী দুর্গগুলির সর্দার-জায়গীরদারদের কাছ থেকে গোপন সংবাদ সংগ্রহ করে আনা প্রভৃতি অসংখ্য কাজ এবং সেই সঙ্গে নূতন-নূতন দুঃসাহসিক অভিযানে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য শিবাজীর নেতৃত্বে বীর মাবলরা সর্বক্ষণ তৎপর ছিল।

এমন সময়ে ভয়ানক দুঃসংবাদ এসে পৌঁছল যে মুস্তাফাখান এবং বাজী ঘোরপড়েরা শাহাজী রাজার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে তাঁকে বন্দী করে আহত অবস্থায় জিঞ্জী স্থিত মুস্তাফাখানের শিবিরে আটক করে রেখেছে। মধ্য রাত্রে শাহাজীর শিবির আক্রমণ করে তাঁর বহু সৈন্যকে হত্যা করেছে, শিবির পুরোপুরি ধ্বংস করে সর্বস্ব লুন্ঠন করে নিয়ে গেছে। এছাড়া, শাহাজীর দুজন বিশ্বস্ত কর্মচারী কানহোজী নাইক জেধে দেশমুখ ও দাদাজী কৃষ্ণ লোহকরেকে বন্দী করে কণকাগিরির দূর্গে চালান করা হয়েছে ।

এই সময় বাঙ্গালোর শহর ও সেখানকার দুর্গের ভার ছিল শাহাজীর জ্যোষ্ঠপুত্র সম্ভাজীরাজার হাতে। শাহাজীর অন্যান্য পরিবারবর্গও ঐ সময়ে বাঙ্গালোরে ছিলেন। বাঙ্গালোর দখল করার জন্য মুস্তাফাখান এক বিশাল সৈন্যবাহিনী পাঠালো ফত্তেখানের নেতৃত্বে।
জিঞ্জীর দুর্গ এই সময়ে বেঙ্কটনাইক নামক এক স্বাধীন রাজা দখলে ছিল। ঐ দূর্গ অধিকার করার জন্য মুস্তফা নিজে জিঞ্জীর আক্রমণের উদ্যোগ-আয়োজন শুরু করল।
শাহাজী গ্রেপ্তারের সংবাদ জেনে বিজাপুরের আদিলশাহ খুবই খুশি হলেন হলেন। এবার বিদ্রোহী শিবাজী কে শায়েস্তা করার জন্য বাদশাহ এক বিরাট বাহিনী সহ ফ‌ত্তেখানকে যথাশীঘ্র রওনা হওয়ার আদেশ দিলেন‌। শিবাজীকে গ্রেপ্তার করে ওই অঞ্চলে আবার বাদশাহের শাসন বলবৎ করার জন্য ফত্তেখানের সঙ্গে মিনাদশেখ, রতনশেখ,শরীফশাহ, মুসেখান, মালজীরাজে ঘাটগে, বালাজী হৈবৎরাও, বজাজী নাইক, নিম্বালকর প্রভৃতি সর্দারদেরও পাঠানো হল ।

সব খবরই যথাসময়ে রাজগড় এসে পৌঁছল। একদিকে সম্ভাজী রাজার বিরুদ্ধে, অন্যদিকে শিবাজী রাজার বিরুদ্ধে বিশাল বাহিনী দুইটি যাত্রা করার ভয়ানক সংবাদ স্বরাজের উপর যে এক অভূতপূর্ব ভয়ঙ্কর সংকটের পূর্বাভাস বহন করছে, সে কথা রাজগড়ের সকল অভিজ্ঞ মন্ত্রী ও বীর সেনানায়কদের বুঝতে দেরী হলো না। অবশ্য, শিবাজী ও জিজাবাঈ এবং অন্যান্য বিশিষ্ট পদাধিকারীরা আগে থেকে জানতেন এমন সংকট আজ না হোক কাল আসবেই ― এবং তার জন্য প্রস্তুতও হচ্ছিলেন। এই ধরণের সঙ্কটের সম্মুখীন হবার সবরকম পরিকল্পনার খুঁটিনাটি শিবাজী প্রস্তুত করে রেখেছিলেন। দাদাজী কোণ্ডদেবের কাছেই তিনি এই শিক্ষা পেয়েছিলেন । তাই পূর্ব-পরিকল্পনা ছাড়া কোন কাজ তিনি প্রায় কখন‌ই করতেন না।

কিন্তু এ সঙ্কট বাস্তবিক‌ই অভূতপূর্ব, অকল্পনীয়। একদিকে পিতা বন্দী শত্রুর কারাগারে, জ‍্যেষ্ঠ ভ্রাতা ও পরিবারের অন্য সকলে বাঙ্গালোরে শত্রুর আক্রমণের সম্মুখীন, অপর দিকে, তিল-তিল করে গড়ে তোলা স্বাধীনতার নব নির্মিত মন্দিরই ধূলিস্মাৎ হতে চলেছে। আদিলশাহ যেন পরোক্ষভাবে আজ তাঁর সামনে এই প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছে। ― “বল্, বাবাকে বাঁচাতে চাস, না তোর এই স্বরাজকে ? অবশ্য স্বরাজ তো থাকবেই না, তার ওপর পিতাকেও হারাবি।” জননী জিজাবাঈয়ের সামনেও বুঝি সেই একই ভয়ঙ্কর প্রশ্ন ― স্বামীকে রক্ষা করতে চাও না স্বরাজকে ? ছেলেকে বিদ্রোহী করার ফল যদি ভুগতে না চাও তাহলে ছেলেকে নিয়ে এসে ক্ষমা চাও ― স্বামীর প্রাণ ভিক্ষার জন্য করজোড়ে এসে প্রার্থনা কর !
সকলেই দারুন চিন্তায় পড়লেন। কিন্তু আর বেশী চিন্তার সময় নেই। ফত্তেখান তার বিশাল বাহিনী নিয়ে স্বরাজের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। যা হবার হোক, আগে ফত্তেখানকে রুখতে হবে। এই স্বরাজ বেঁচে থাকুক ― তাই যদি বাস্তবিক মা দুর্গার অভিপ্রেত হয় তাহলে খানের সৈন‍্যকে আমরা অবশ্যই পরাস্ত করব। তবে তাই হোক ― সবাই তৈরি হও যুদ্ধের জন্য। আর সময় নেই, শত্রুদের বাধা দিতে ঝাঁপিয়ে পড় ।

অত‌এব রাজগড়ে যুদ্ধ-দামামা বেজে উঠল। কিন্তু শিবাজীর সৈন্য কত ? খুব জোর হাজার, কি বারোশো ! ওদিকে শত্রুপক্ষের আছে কম করেও পাঁচ হাজার। কিন্তু সেই কারণে শিবাজী কখনো পিছু হটেননি। জয়ী তাঁকে হতেই হবে, অতএব তার জন্যই তাঁকে এগিয়ে যেতে হবে।

শিবাজী সসৈন্যে পুরন্দর দুর্গের দিকে যাত্রা করলেন। যাবার আগে দেবীকে ও মাকে প্রনাম করে গেলেন।
রাজগড় থেকে প্রায় দশ ক্রোস দূরে বিশাল দুর্গ পুরন্দর। কিন্তু এই দুর্গ তখনও স্বরাজের অন্তর্ভুক্ত হয় নি। দুর্গে কাজকর্মের দায়িত্বে ছিলেন মহাদাজী নীলকন্ঠরাও সরনাইক নামক এক প্রবল পরাক্রান্ত বৃদ্ধ ব্রাহ্মণ। তিনি ছিলেন শাহাজীর বন্ধু, কিন্তু আবার বাদশাহের সেবক। তবে শিবাজীর সাহস ও বুদ্ধির প্রশংসা তিনি প্রকাশ‍্যেই করতেন। তবু, পুরন্দরে কেমন করে প্রবেশ করা যায় ? অথচ পুরন্দর না হলে এই সঙ্কট মুহূর্তে শিবাজীর চলবে না, কারণ সেখান থেকে মাত্র পাঁচ ক্রোশ দূরে বেলসর গ্রামে শিবির স্থাপন করেছে ফত্তেখান। শিবাজী বৃদ্ধ মহাদাজীর কাছে খবর পাঠালেন― ভয়ঙ্কর বিপদে পড়েছি, আমাদের পুরন্দরে প্রবেশের অনুমতি দেবেন কি ? আর কী আশ্চর্য। এতকালের দাসত্বের শৃঙ্খল ছুঁড়ে ফেলে মহাদাজী সদলবলে শিবাজীকে পুরন্দরে প্রবেশের অনুমতি দিলেন।

এমন সময় খবর এলো যে ফাত্তেখানের নির্দেশে বালাজী হৈবৎরাও সৈন্য নিয়ে শিরবল থানা দখল করে সুভানমঙ্গল দূর্গে প্রবেশ করেছে। এই খবর শুনে কেউ বিস্মিত বা বিচলিত হয়নি।

শিবাজী তাঁর সহকর্মীদের ডেকে সহকর্মীদের ডেকে একত্র করলেন এবং বললেন ― “বিশ্বাসঘাতক মুস্তফাখান বাদশাহের হুকুমে আমার পিতাকে গ্রেপ্তার করেছে। এইসব বিশ্বাসঘাতকদের কখনো বিশ্বাস করতে নেই। পিতৃদেব এই তুর্কীদের সেবা করেছেন, তবু আজ তাঁকে কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়েছে। কিন্তু তাঁকে আমরা মুক্ত করবই। দাদা সম্ভাজীরাজা বাঙ্গালোর থেকে এবং এদিক থেকে আমরা যুগপৎ যুদ্ধ করে পিতৃদেবকে শত্রুদের কবল থেকে উদ্ধার করবই।

শিবাজীর এই উৎসাহ-ব্যঞ্জক বাণী শুনে তাঁর বীর জাওয়ানদের মনে বিপুল উৎসাহ জেগে উঠল। “হর হর মহাদেব”, “জয় তুলজা ভবনী” বলে তারা প্রচন্ড সিংহগর্জন করে উঠল।

শিবাজী আদেশ দিলেন এখনই শিরবল মুক্ত করতে হবে, সুভানমঙ্গল দুর্গ দখল করে বালাজী হৈবৎরাওকে গ্রেপ্তার করতে হবে।

জোর কদমে প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেল এবং অতি অল্প সময়ের মধ্যেই কাওজী, ভিখাজী ওয়াঘ, গোদাজী জগতাপ, শিবাজি ইংলে, ভিকাজী, ভৈরোজী প্রভৃতি বীরদের নেতৃত্বে মাবলদের নিয়ে গঠিত সৈন্যদল বিপুল বেগে সুভানমঙ্গলের দিকে রওনা হয়ে গেল।

অন্যান্য দুর্গের তুলনায় সুভানমঙ্গল অনেকটা কম উচ্চতায় অবস্থিত ছিল। খুব একটা সুরক্ষিত‌ও ছিল না। দুর্গের চারিদিকের খাল বা পরিখাগুলি তেমন গভীর ছিলনা। দুর্গের ভিতর বালাজী হৈবৎরাও এবং তার দুই সর্দার ফাজল শাহ ও অশরফ শাহ সৈন্য সামন্ত নিয়ে অবস্থান করেছিল।

কাওজী তাঁর সৈন্যদল নিয়ে শিরবলের দিকে ধেয়ে এলেন এবং অনতিবিলম্বে নীরা নদী পার করে করে একেবারে দুর্গের মুখে এসে সোজা দুর্গ আক্রমণের নির্দেশ দিলেন। বালাজী হৈবৎরাও ও তাঁর সৈন্যরা দেখল যে কাওজীর সৈন্যরা বীর বিক্রমে দুর্গ আক্রমণের জন্য এগিয়ে আসছে। বালাজীর সৈন্যরা “হর হর মহাদেব” -এর সিংহ গর্জন শুনে এবং শিবাজীর বীর মুক্তি-যোদ্ধাদের অমিত তেজ দেখে ভীষণ ভীত ও বিচলিত হয়ে পড়ল। সৈনিকদের এই অবস্থা দেখে হৈবৎরাও তাদের সাহস ফিরিয়ে আনার উদ্দেশ্যে বলল ― “শিবাজীর এই বিদ্রোহী সৈনিকদের দেখে ভয় পাওয়ার কিছুই নেই। বাদশাহের আদেশে আমরা শিবাজীকে দমন করতে এসেছি। আমরা সৈনিক, মরতে আমরা ভয় পাইনা। লড়াই করতে গিয়ে যদি আমাদের প্রাণ দিতে হয়, তবু শিবাজীকে আগে ধ্বংস করে তবেই মরব।”

দুর্গের উপর থেকে মারাঠা সৈন্যদের বাধা দেওয়ার জন্য জ্বলন্ত কাঠ, ও তীরের বর্ষণ চলল। কিন্তু সব বাধাকে প্রচন্ড বিক্রমে উড়িয়ে দিয়ে কাওজী তাঁর বীরদের নিয়ে দুর্গের সিংহদ্বার ভেঙে ভিতরে ভিতরে প্রবেশ করলেন এবং প্রত্যক্ষ সংঘর্ষ শুরু হয়ে গেল। শিবাজী ইংলে, ভিমাজী ওয়াঘ, কাওজী প্রভৃতির পরাক্রমী নেতৃত্বে তাঁদের এক-একজন সৈনিক যেন হাজার সৈনিকের শক্তি নিয়ে যুদ্ধ করতে লাগল। প্রাণ ভয়ে হৈবৎরাওয়ের সৈনিকরা যে যেদিকে পারল পালাতে শুরু করল । তাদের মনোবল ফিরিয়ে আনার সাধ্য তখন আর হৈবৎরাওয়ের মধ্যে ছিলনা। হঠাৎ কাওজীর সামনে এসে পড়ল হৈবৎরাও এবং তাঁর বর্শার এক আঘাতেই বালাজী হৈবৎরাওয়ের ইহলীলা শেষ হয়ে গেল। সঙ্গে-সঙ্গে মারাঠা বীরদের জয়ধ্বনিতে সুভানমঙ্গল কেঁপে উঠল। বালাজীর সৈন্যরা আত্মসমর্পণ করল। সুভানঙ্গল মুক্ত হল। স্বরাজ প্রতিষ্ঠার জন্য এটাই ছিল প্রথম যুদ্ধ।
আহত সৈনিকদের শুশ্রষার ব্যবস্থা করে কাওজী বায়ুর গতিতে তাঁর বিজয়ী সৈন্যদলকে নিয়ে ফিরে এলেন পুরন্দর দুর্গে। সঙ্গে নিয়ে এলেন শত্রুর কাছ থেকে উদ্ধার করা অমূল্য সম্পদরাশি। রাজা শিবাজী নিজে এগিয়ে এসে তাঁর বীর সেনাপতি ও সৈন্যদলকে সম্বর্ধনা জানালেন ।

(ক্রমশ)

We are not big media organisation. Your support is what keeps us moving. Don't hesitate to contribute because, work, for society needs society's support. Jai Hind.