প্রাচীন ভারতে বিজ্ঞান ও গণিত চর্চা

0
2073

© সূর্যশেখর হালদার

 

ভারতীয় মাত্রই আপন সনাতন সংস্কৃতি সম্পর্কে গর্বিত। কিন্তু খুব কমজনই আছেন যাঁরা জানেন ভারতীয় সংস্কৃতি বলতে শুধুমাত্র সাহিত্য, সঙ্গীত, নৃত্যকলা বা ভাস্কর্য বোঝায় না। বিজ্ঞান, গণিত ও চিকিৎসা বিদ্যার চর্চাও ভারতীয় সনাতন সংস্কৃতির অন্তর্ভুক্ত। প্রাচীন ভারত যে বিজ্ঞান, গণিত ও চিকিৎসা বিদ্যা চর্চায় পৃথিবীর অনেক জাতির থেকেই এগিয়ে ছিল সে বিষয়ে আধুনিক ভারতীয়দের অজ্ঞতা দীর্ঘ বিদেশী শাসনেরই কুফল মাত্র। প্রাচীনকাল থেকেই ভারতমাতা বৈদেশিক আক্রমনের শিকার হয়েছে। শক বা হুণরা ভারত আক্রমন করেছে শুধুমাত্র রাজ্য জয়ের নেশাতে, কিন্তু পরবর্তীকালে পাঠান, মোঘল ও ইউরোপীয় বণিকগণ ভারত আক্রমণ ও দখল করে; নিজেদের কৃষ্টি ও সংস্কৃতি ভারতীয়দের উপর চাপিয়ে দিতে সচেষ্ট হয়েছে। এইসব বহিরাগত বৈদেশিক লুটেরাদের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ ছিল ইংরেজ সাম্রাজ্যবাদীরা। তারা নিজেদের তৈরী শিক্ষা ব্যবস্থায় উচ্চ বর্ণের ও উচ্চ কোটির শহুরে ভারতীয়দের অন্তর্ভুক্ত করে ও তাদের শেখায় কলা, বিজ্ঞান ও বানিজ্য – সর্বক্ষেত্রেই পাশ্চাত্য বাসীরা ( ইউরোপীয়রা ) ভারতীয়দের থেকে অনেক এগিয়ে। প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য Macaulay’s Minute ( 1835 ) ( মেকলের মিনিট ) এর কথা যেখানে ব্রিটিশ সাংসদ টমাস মেকলে প্রস্তাব পেশ করেছিলেন ভারতে পাশ্চাত্য শিক্ষা বিস্তারের, কারন ভারতীয় শিক্ষা – সংস্কৃতি পাশ্চাত্য শিক্ষা – সংস্কৃতির চাইতে অনেক নিম্নমেধার ও নিম্নমানের। শ্রীমতি গৌরী বিশ্বনাথন রচিত Masks of Conquest ( কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটি প্রেস দ্বারা প্রকাশিত ) বইটিতে আমরা দেখতে পাই কিভাবে পাশ্চাত্য শিক্ষা ব্যবস্থা উচ্চবর্ণের ভারতীয়দের পাশ্চাত্য দৃষ্টি ভঙ্গীতে ভাবতে শিখিয়ে ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে প্রলম্বিত করেছিল।

তবে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী ঐতিহাসিকরা যাই বলুন না কেন ইতিহাস বলছে খ্রীষ্টপূর্ব ৩০০০ অব্দে গড়ে ওঠা হরপ্পা – মহেঞ্জোদারো সভ্যতার নগর পরিকল্পনা ভারতীয় কারিগরী বিদ্যার জ্ঞানের প্রমাণ দেয়। আর্য ঋষিরাই প্রথম বলেন ক্ষিতি ( পৃথিবী ), অপ ( জল ), তেজ ( অগ্নি ), বায়ু ( বাতাস ) এবং ব্যোম ( আকাশ ) নিয়ে মানুষের দেহ তৈরী। তাঁরা বিভিন্ন গ্রহ, উপগ্রহ, নক্ষত্রের অবস্থান নিয়েও চর্চা করতেন। উদাহরন স্বরূপ বলা যায় মহাভারতে ভীষ্ম ইচ্ছামৃত্যু গ্রহন করেন উত্তরায়ণের দিন। পৃথিবীর পরিভ্রমণ না জানলে এরূপ গণনা অসম্ভব। গণিতের বিষয়েও অবাধ জ্ঞন ছিল এই আর্য ঋষিদের। যখন গ্রীকরা ১০৪ পর্যন্ত আর রোমানরা ১০৮ পর্যন্ত গণনা করতে পারত। তখন ভারতীয়রা গণনা করতে পারত ১০১২ পর্যন্ত। বিভিন্ন বৈদিক গ্রন্থ পাঠ করলে বোঝা যায় ভারতীয় ঋষিরা অমূলদ সংখ্যা ( Irrational Number ) যেমন ∙২, ∙৩ এবং বিন্যাস ও সমবায় ( Permutation and Combination ) সম্পর্কেও অবহিত ছিলেন। কৃষিকার্যে ফলন বৃদ্ধির জন্য ও কৃষিজমির উর্বরতা রক্ষা করার জন্য কৃষি জমি গুলিতে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে চাষ করার রেওয়াজও প্রাচীন ভারতের ইতিহাসে পরিলক্ষিত হয়। আর চিকিৎসা বিজ্ঞানে প্রাচীন ভারতের অবদান আয়ুর্বেদশাস্ত্র তো আজ সমগ্র বিশ্বে সম্মানিত। আমরা স্মরন করতে পারি বৃক্ষকে দেবতা হিসাবে পূজা করা ভারতীয় সংস্কৃতির অঙ্গ। আর এই বৃক্ষ থেকে প্রস্তুত ঔষধের গুনাবলী প্রমাণিত হয় ভারতের সুপ্রাচীন গ্রন্থ রামায়ণের যুদ্ধকান্ডে। মৃতসঞ্জীবনী, বিশল্যকরণী, সাধন্যকরণী ও সন্ধানী – এই চার বনৌষধির প্রভাবেই বৈদ্যরাজ সুষেনের চিকিৎসায় মেঘনাদের বানে অচৈতন্য রাম – লক্ষণ ফিরে পান তাঁদের চৈতন্য।

প্রাচীন ভারতে বিজ্ঞান চর্চা বিষয়ে আলোচনা অসম্পূর্ণ থেকে যায় যদি না প্রাচীন ভারতের বিশিষ্ট গণিতজ্ঞ, চিকিৎসক ও বিজ্ঞানীদের আমরা স্মরন করি। তাই এই নিবন্ধে চেষ্টা করলাম কয়েকজন বিখ্যাত ভারতীয় বিজ্ঞানীদের অবদান আলোচনা করতে। আধুনিক ভারতের নতুন প্রজন্মের কাছে এইসব বিজ্ঞানীদের অবদান তুলে ধরা প্রায় হয় না বললেই চলে। এর কারণ হল সেই মেকলে প্রবর্তিত ঔপনিবেশিক শিক্ষা ব্যবস্থা যা আমাদের ভাবতে শেখায় বিজ্ঞান মানেই ইউরোপীয় জ্ঞান ও সংস্কৃতি, আর ভারতীয়দের কাছে বিজ্ঞান মানে এক দুর গ্রহের দুর্বোধ্য বিষয়।

সুশ্রুত:
সুশ্রুত ছিলেন প্রাচীন ভারতের এক খ্যাতনামা শল্যচিকিৎসক । তাঁর জন্ম হয় খ্রীঃ পূঃ ছয় শতকে এবং তিনি ছিলেন বৈদিক ঋষি বিশ্বামিত্রের বংশধর, তিনি বারানসীতে দিবদাস ধন্বন্তরীর কাছে চিকিৎসাবিদ্যা অধ্যয়ন করেন এবং জীবদ্দশাতেই শল্য চিকিৎসার এক কিংবদন্তী হয়ে ওঠেন। আজ যে সিজারিয়ান ( Caesarian ) অপারেশন করা হয়, তা তিনি প্রথম উদ্ভাবন করেছিলেন। এছাড়াও প্লাস্টিক সার্জারী, ইউরিনারি স্টোন বের করার অপারেশন, হাড়ভাঙা নির্ণয় ও তার চিকিৎসা, চোখের ছানি অপারেশন ইত্যাদি বিষয়েও তাঁর জ্ঞান ছিল। তিনি অপারেশনের পূর্বে রোগীকে মদের প্রভাবে আচ্ছন্ন করার পদ্ধতিও আবিষ্কার করেন। তিনি তাঁর রচনায় ১০১ ধরনের শল্য চিকৎসায় ব্যবহৃত যন্ত্রপাতির কথা লিখে গেছেন, যেগুলির ব্যবহার বর্তমান চিকিৎসা বিজ্ঞানেও দেখা যায়। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ সুশ্রুতসংহিতম্ অষ্টম শতকে আরবি ভাষায় কিতাব-শ-শুন-এ-হিন্দ এবং কিতাব-ই-মুশ্রুদ নামে অনূদিত হয়।

চরক:

আজকের দিনে আমরা সবাই জানি যে চিকিৎসা তখনই সফল হয়, যখন চিকিৎসক তাঁর জ্ঞানের আলো নিয়ে রোগীর দেহে প্রবেশ করে, রোগীর রোগ সঠিকভাবে নির্ণয় করতে পারে। আমরা এটাও জানি যে রোগ প্রতিরোধ, প্রতিকারের চেয়ে অনেক বেশী গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এইসব মূল্যবান আলোচনা আমরা পাই আজ থেকে বিশ শতক আগে লেখা এক গ্রন্থে যার নাম
চরক সংহিতা* । শুধু তাই নয় প্রাচীন ভারতের বিশিষ্ট চিকিৎসা বিজ্ঞানী চরক এই গ্রন্থে দেহতত্ত্ব ( Physiology ), নিদানতত্ত্ব ( Etiology ) এবং ভ্রূণতত্ত্ব ( Embryology ) বিষয়েও তাঁর যে জ্ঞান লিপিবদ্ধ করেন, তা আজকের দিনেও প্রাসঙ্গিক। চরক ছিলেন প্রথম চিকিৎসক যিনি হজম, শ্বসন ( Metabolism ) এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বিষয়ে ধারনা দেন। তিনি আমাদের দেহের কার্যপ্রনালীর জন্য তিনটি ‘দোষ’ বা Humour কে দায়ী করেন। এগুলি হল পিত্ত, কফ এবং বায়ু। সমপরিমাণ আহার করেও এক ব্যক্তির শক্তি, ওজন ও ক্ষমতা আরেকজনের থেকে কিভাবে কম বা বেশী হতে পারে তার ব্যাখ্যাও দেন এই খ্যাতিমান চিকিৎসা বিজ্ঞানী।

আবার তিনিই বলেন মানবদেহে রোগের কারণ হল তিনটি দোষের ভারসাম্যের ব্যাঘাত। আজকের দিনে আমরা সবাই জানি অন্ধত্ব বা পঙ্গুত্ব বাবা – মায়ের দোষে হয় না, বরং তা হয় শুক্রানু বা ডিম্বানুর দোষে। জিনতত্ত্বের ( Genetics ) গভীর এই জ্ঞান সম্পর্কেও অবহিত ছিলেন চরক। এছাড়াও মানবদেহের হাড় গণনা, হৃৎযন্ত্রের গুরুত্ব বিষয়েও তিনি মতামত রাখেন। যদিও এই বিষয়ে তাঁর জ্ঞান সঠিক ছিল না। ভ্রাম্যমান এই চিকিৎসা বিজ্ঞানীর ব্যক্তিগত জীবন বিষয়ে বেশী কিছু জানা যায় না।

কণাদ:
পরমানু বিজ্ঞানের নাম শুনলেই আমাদের মাথায় আসে জন ডাল্টন, নীলস বোর প্রমুখ পাশ্চাত্যের বিজ্ঞানীদের। কিন্তু এনাদের বহু পূর্বে ভারতীয় বিজ্ঞানী কণাদ পরমানুর ধারনা দেন তাঁর বিখ্যাত বৈশেষিকাসত্র গ্রন্থে যা প্রায় ৬০০ খ্রীঃ পূঃ তে প্রভাস নগরীতে বসে তিনি রচনা করেন। তিনি পরমাণু বলতে বোঝান পদার্থের ক্ষুদ্রতম কণা যাকে আর ভাঙা যায় না এবং যা মানুষের ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য নয়। তিনি শুধু বিজ্ঞানীই নয়, দার্শনিকও ছিলেন। তাই তিনি উপলব্ধি করেন পরমানু কোনদিন ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় না, এটি চিরন্তন। তিনি আরও বলেন যে পরমাণুরবৈচিত্র্যের ও বিশেষত্তের জন্যই এক পদার্থের থেকে অন্য পদার্থ পৃথক হয় এবং দুটি সমধর্মী বা ভিন্নধর্মী পরমানুর মধ্যে সংযোগ ঘটতে পারে। শুধু পদার্থবিজ্ঞান নয় রাসায়নিক পরিবর্তন বিষয়েও কণাদ তাঁর মতামত প্রকাশ করেন। তাঁর মতে তাপ ( Heat ) প্রয়োগের ফলে পরমাণুর স্বভাব বা বৈশিষ্ট্যের পরিবর্তন হয়ে থাকে।

পতঞ্জলী:
প্রাচীন ভারতের অন্যতম জ্ঞান ভান্ডার উপনিষদ এবং অথর্ববেদে যোগ শাস্ত্রের উল্লেখ আছে। কিন্তু এই যোগের মৌলিক ধারণা এবং ক্রিয়াপদ্ধতির বিশদ বর্ণনা যিনি দেন, তিনি হলেন পতঞ্জলী। পতঞ্জলীর জন্ম খ্রীঃ পূঃ দ্বিতীয় শতাব্দীতে। তিনি তাঁর যোগসূত্র গ্রন্থে যোগের ক্রিয়াকলাপ ও পদ্ধতি বর্ণনা করেন। তাঁর মতে মানুষের শরীরের যে শিরা – উপশিরা আছে, তা হল নদী; যে কেন্দ্রগুলি আছে, সেগুলি হল চক্র –তার এই নদী ও চক্রগুলিকে যদি আমরা যোগের মাধ্যমে জাগাতে পারি, তাহলে আমাদের শরীরে লুক্কায়িত শক্তি ( পতঞ্জলীর ভাষায় কুন্ডলীনি ) জেগে উঠবে এবং আমরা অতিপ্রাকৃতিক ( Supernatural ) শক্তি লাভ করতে পারব। এভাবে অতিপ্রাকৃতিক শক্তি জাগানোর আটটি পর্যায়ও তিনি তাঁর গ্রন্থে ব্যাখ্যা করেন। এগুলি হল – ‘য়ম’ ( Universal Moral Commandments ), ‘নিয়ম’ ( Self Purification through discipline ), ‘আসন’ ( Posture ), ‘প্রানায়াম’ ( breath control ), ‘প্রত্যাহার’ ( withdrawal of mind from external objects )। শেষ পর্যায় হল সবচেয়ে কঠিন এবং ঈশ্বরত্ব প্রাপ্তির পর্যায়। দীর্ঘ অবজ্ঞা ও অবহেলার পর আজ যোগ সারা বিশ্বে সমাদৃত। যোগীদের পরীক্ষা করে দেখা গেছে যে তাঁরা অক্সিজেন ও খাবার ছাড়াও অনেকক্ষন নিজেদের অস্তিত্ব বাঁচিয়ে রাখতে পারেন, আর যোগের সাহায্যে রোগ সারানোর কেন্দ্র তো আজ সর্বত্র। তাই বলা বাহুল্যমাত্র যে প্রাচীন ভারতের অন্যতম শাস্ত্র যোগ আজ বিজ্ঞান হিসাবে স্বীকৃত।

আর্যভট্ট:
প্রাচীন ভারতে জ্যোতির্বিজ্ঞান চর্চার সঙ্গে যে মানুষটির নাম জড়িয়ে আছে, তিনি হলেন আর্যভট্ট। ৪৭৬ খ্রীষ্টাব্দে কেরালাতে জন্ম হয় নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ছাত্র তথা অধ্যক্ষের। তাঁর গ্রন্থ *
আর্যভাটিয়া* জ্যোতির্বিজ্ঞানের উপর রচিত প্রাচীন ভারতের সেরা গ্রন্থ। তিনিই বিশ্বের প্রথম বিজ্ঞানী যিনি বলেন পৃথিবীর আকৃতি গোলাকার এবং পৃথিবী তার নিজের কক্ষপথে ঘুরছে। পৃথিবীর এই ঘুর্ণনকে তিনি দিন ও রাত্রির জন্যও দায়ী করেন, যা বর্তমান বিজ্ঞানের প্রতিষ্ঠিত সত্য। সূর্যগ্রহণ ও চন্দ্রগ্রহণের কারণও তিনি সঠিকভাবে ব্যাখ্যা করেন। তবে তিনি টলেমির মত পৃথিবীকেন্দ্রিক সৌরজগতের ব্যাখ্যা দেন যা সঠিক নয়।
গণিত বিষয়েও তিনি ছিলেন পারদর্শী। π এর মান আবিষ্কার, অনির্দ্দিষ্ট সরলের ( ax – by = c ) মান নির্ণয়, ১০০,০০০,০০০,০০০ – এর মত বড় সংখ্যাকে কথায় লেখার পদ্ধতি তিনিই প্রথম আবিষ্কার করেন।

বরাহমিহির:
সম্রাট বিক্রমাদিত্যের রাজসভার নবরত্নের একজন ছিলেন বরাহমিহির। তাঁর জন্ম হয় ৪৯৯ খ্রীষ্টাব্দে উজ্জয়িনী নগরের সন্নিকটস্থ এক গ্রামে। তিনি তাঁর জ্যোতির্বিজ্ঞান ও সমুদ্রজ্ঞানের পারদর্শীতার জন্য সম্রাট বিক্রমাদিত্যের থেকে বরাহ চিহ্ন ( মগধ সাম্রাজ্যের শ্রেষ্ঠ সম্মান ) উপহার পান, এবং তাঁর নাম হয় বরাহমিহির। তিনি তাঁর সমসাময়িক এবং বরিষ্ঠ বিজ্ঞানী আর্যভট্টের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। বিজ্ঞানে তাঁর অন্যতম আবিষ্কার হল পৃথিবীকে গোলাকার বলে ঘোষণা করা এবং দাবি করা যে একটি বিশেষ শক্তিই সকল বস্তু ও দেহকে পৃথিবীর দিকে টেনে রাখে। যদিও তাঁর পর্যবেক্ষণে একটি বড় ভুল ছিল পৃথিবীর ঘুর্ণন মানতে না চাওয়া।

বরাহমিহিরের আর একটি অন্যতম পর্যবেক্ষণ – কোন অঞ্চলের অনুভূমিক জলের অস্তিত্ব বোঝা যায় ঐ অঞ্চলের উদ্ভিদ এবং পোকা – মাকড়দের দেখে। বিজ্ঞান বিষয়ে তাঁর কয়েকটি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ হল –
পঞ্চসিদ্ধান্তটিকা, বৃহৎসংহিতা ইত্যাদি।

ব্রহ্মগুপ্ত:
প্রাচীন ভারতের যে গণিতজ্ঞ শূন্যের ব্যবহারের নিয়ম তৈরী করেন, তিনি হলেন ব্রহ্মগুপ্ত। ৫৯৮ খ্রীষ্টাব্দে গুজরাট রাজ্যে তিনি জন্মগ্রহন করেন। তিনি ছিলেন রাজা ব্যাঘ্রমুখের রাজসভার জ্যোতির্বিজ্ঞানী। তাঁর খ্যাতনামা গ্রন্থ হল – ব্রহ্মস্ফুতসিদ্ধান্ত যেটি আসলে একটি জ্যোতির্বিজ্ঞান বিষয়ক পুরানো বই ব্রহ্মসিদ্ধান্তের সংশোধিত রূপ। এই গ্রন্থে তিনি পাটীগণিত ও বীজগণিতের উপর অধ্যায় রচনা করেন এবং ঘোষনা করেন শূন্যকে ধনাত্মক বা ঋণাত্মক সংখ্যার সঙ্গে যোগ করলে বা কোন ধনাত্মক বা ঋণাত্মক সংখ্যা থেকে বিয়োগ করলে ফলাফলে কোন পরিবর্তন ঘটবে না। তিনি আরও লেখেন যে শূন্যের সঙ্গে কোন সংখ্যা গুন করলে ফলাফল হবে শূন্য; আর শূন্য দিয়ে কোন সংখ্যাকে ভাগ করলে তার ফলাফল হবে অসীম ( Infinity )। তবে তাঁর গণনার একটি ভুল ছিল যে শূন্যকে শূন্য দিয়ে ভাগ করলে ফলাফল শূন্য হবে। এছাড়াও তিনি ছিলেন প্রথম গণিতজ্ঞ যিনি পাটীগণিত ও বীজগণিতের পার্থক্য করেন। পৃথিবীর আবর্তন বা ঘুর্ণন তিনি না মানলেও পৃথিবীর গোলাকৃতি নিয়ে তাঁর সন্দেহ ছিল না। পরবর্তীকালে বিখ্যাত গণিতজ্ঞ ভাস্কর তাঁকে যথার্থভাবেই গণকচক্রচুড়ামনি উপাধিতে ভূষিত করেন।

নাগার্জুন:
প্রাচীন ভারতের অন্যতম রসায়নবিদ নাগার্জুন জন্মগ্রহন করেন গুজরাটের সোমনাথের নিকট একটি দুর্গে ৯৩১ খ্রীষ্টাব্দে। তাঁর সম্পর্কে বিভিন্ন গল্প কথিত ছিল। শোনা যেত তিনি দেবতাদের সঙ্গে বাদানুবাদ করতেন। তাঁকে ঘিরে যে জনশ্রুতি ছিল তাতে তিনি বিন্দুমাত্র বিব্রত ছিলেন না, বরং জনশ্রুতিকে বৃদ্ধি করে তিনি ঘোষনা করেন যে তাঁর গ্রন্থ ‘ রসরত্নাকর’ তিনি রচনা করেন দেবদূত হিসাবে। গ্রন্থটি রচিতও হয় বিভিন্ন দেবতা ও নাগার্জুনের কথোপকথনের আকারে। তাঁর গ্রন্থ ‘রসরত্নাকর’ ধাতুতত্ত্ব ( Metallurgy ) নিয়ে আলোচনা করেছে, বিভিন্ন ধাতু যেমন সোনা, রূপা, টিন, তামা ইত্যাদি কিভাবে আকরিক থেকে নির্গত করা হয়, এবং কিভাবে তাদের শুদ্ধিকরণ ঘটানো হয় সেইসব বিষয়েও আলোচনা করেন। তিনি স্পর্শমণি( elixir of life ) এবং পারদ থেকে অন্যান্য বস্তু তৈরী করার জন্য খনিজ এবং ক্ষার ছাড়াও বিভিন্ন উদ্ভিজ ও প্রাণীজ পদার্থের ব্যবহারের কথা বলেন। হীরা, মুক্তো বা অন্যান্য ধাতু গলানোর জন্য তিনি উদ্ভিদ নির্গত অ্যাসিড, ফলের রস এবং কিছু গাছের কথা লিখে গেছেন তাঁর রচনাতে।
তিনি পাতন ( Distillation ), দ্রবণ ( Liquefaction ), ঊর্ধপাতন ( Sublimation ) ইত্যাদির পদ্ধতিও ব্যাখ্যা করেন। অন্যান্য ধাতু থেকে স্বর্ণলাভের ব্যাপারেও তিনি আলোচনা করেন। তবে এই পদ্ধতিতে সোনার মত হলুদাভ একটি পদার্থ পাওয়া গেলেও তা সোনা নয়। তাঁর রচিত *উত্তরতন্ত্র ‘ *শুশ্রুতসংহিতা’র* সম্পূরক। এখানে তিনি বিভিন্ন ঔষধ তৈরীর প্রক্রিয়া আলোচনা করেন।

ভাস্কর ও লীলাবতী:
গণিতবিদ ও জ্যোতির্বিজ্ঞানী ভাস্কর জন্মগ্রহণ করেন ১১১৪ খ্রীষ্টাব্দে বর্তমান কর্ণাটকের বিজাপুরে, তিনি গণিতশাস্ত্র অধ্যয়ন করেন তাঁর ঋষিকল্প পিতার থেকে। ব্রহ্মগুপ্তের কাজ তাঁকে গণিত বিষয়ে চর্চা করতে উৎসাহিত হয়ে গণিতশাস্ত্রের উপর তাঁর বিখ্যাত রচনা ‘ সিদ্ধান্তশিরোমণি ’ তিনি রচনা করেন তিরিশ বৎসর বয়সে। এই গ্রন্থ এতটাই জনপ্রিয় ছিল যে পার্সী ভাষায় দুবার অনূদিত হয়। তিনি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ঘোষনা করেন যে কোন সংখ্যাকে শূন্য দিয়ে ভাগ করলে উত্তর অসীম হবে, আর কোন সংখ্যার সঙ্গে অসীম যোগ করলেও উত্তর অসীম হবে। বীজগণিতে ব্রহ্মগুপ্তের এই শিষ্যের আবিষ্কার হল চক্রবাল ( Cyclic method ) যা ব্যবহৃত হয় বীজগণিতের সমীকরণ সমাধানে। অন্ততঃ ছয় শতাব্দী বাদে – Galois, Euler, Lagrange এর মত গণিতজ্ঞরা এই পদ্ধতিকেই ‘Inverse Cyclic’ নামে পুনারাবিষ্কার করেন। তিনি ক্যালকুলাসের আবিষ্কর্তা হিসাবেও প্রসিদ্ধ। নিউটন বা লাইবনিজ এর বহু আগেই তিনি ‘Rolle’s Theorem’ এর মূল ধারণা দেন এবং ‘Differential Coefficient’ এর উদাহরণ দেন, যদিও সে সময় কেউই ভাস্করের আবিষ্কারকে লক্ষ্যই করেন নি। জ্যোতির্বিজ্ঞানে তাঁর অবদান তৎকালিক গতির ধারণা প্রদান করে যা জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের গ্রহের গতি নির্ধারনে সাহায্য করে।

লীলাবতী ছিলেন ভাস্করের কন্যা। তিনি অকালেই ( মাত্র ছয় বৎসরে ) বিধবা হন। পিতা তখন তাঁর দুঃখ ভোলানোর জন্য তাঁকে গণিতে আগ্রহী করে তোলেন, আর তাই আমরা পাই প্রাচীন ভারতের এক বিশিষ্ট গণিতজ্ঞকে। তাঁর গণিতে পারদর্শীতা এতটাই ছিল যে পিতা ভাস্কর তাঁর ‘ সিদ্ধান্তশিরোমনি’ গ্রন্থের একটি অধ্যায় মেয়ের নামে নামকরণ করেন। এটি ছিল পাটীগণিতের অধ্যায়। লীলাবতী গণিতে এতটাই তুখোড় ছিলেন যে জনশ্রুতি ছিল যে লীলাবতী জানলে একজন গাছের পাতাও গুনতে পারে।

পরিশেষে এই প্রশ্ন তোলা যায় যে এত জ্ঞান – বিজ্ঞান সমৃদ্ধ জাতি হয়েও ভারতীয়রা বারংবার পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ হয়েছে কেন? এর কারণ হল সনাতন সংস্কৃতিতে বিশ্বাসী ভারতীয়দের সংঘবদ্ধতার অভাব আর আপন সংস্কৃতি, জ্ঞান – বিজ্ঞানকে বিস্মৃত হওয়ার স্বভাব। আজ ৭০ বছরের বেশ কিছু সময় আগে ভারত কিছু অসাধু, অসংস্কৃতিবান নেতা আর ইংরেজ সাম্রাজ্যবাদীদের চক্রান্তে দ্বিখন্ডিত হয়ে স্বাধীনতা অর্জন করেছে। আর সেই স্বাধীন ভারতে মেকলের আত্মঘৃণাউদ্রেককারী শিক্ষাপদ্ধতি চলছে রমরমিয়ে । তবে আশার বিষয় অনেক ভারতীয় জেগে উঠেছে। তারা চায় ভারতের সনাতন বৈভব বিশ্বের দরবারে প্রতিষ্ঠিত হোক, যাতে করে পরবর্তী প্রজন্মের মনে রাষ্ট্রচেতনা ও দেশপ্রেম জন্মায়।

তথ্যসূত্র: Scientists of India by Dilip M. Salvi, Children’s Book Trust New Delhi ( 1986)।
ISBN 81-7011-318-0

We are not big media organisation. Your support is what keeps us moving. Don't hesitate to contribute because, work, for society needs society's support. Jai Hind.