বাঙ্গালী হিন্দুর জীবনে ২০ শে জুনের তাৎপর্য

1
154

© অব্জ কেশর কর

২০ শে জুন “পশ্চিমবঙ্গ দিবস” হিসেবে উদযাপিত হয়, যা প্রত্যেক বাঙ্গালী হিন্দুর জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিবস। প্রায় পৌঁনে দেড়’শ কোটির ভারতে বাঙ্গালী হিন্দুর অবস্থান বেশ সম্মানের। ভারতের রাজনীতি, সংস্কৃতি, ভাষা, সাহিত্য, আধুনিক শিল্পকর্ম, সিনেমা এবং নাট্য জগতে বাঙ্গালীর অবদান অনস্বীকার্য। কিন্তু এই সবই সম্ভব হয়েছে ভারতের মধ্যে বাঙ্গালীর একটি নিজস্ব হোমল্যান্ড রয়েছে বলে। বাঙ্গালী যদি ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে উদ্বাস্তু হিসেবে জীবন কাটাতো, তাহলে কখনই বাঙ্গালী নিজেকে ভারতের বুকে বিকশিত ও প্রতিষ্ঠিত করতে পারতো না। কারণ, যে জাতির হোমল্যান্ড নেই, তার কোনো মৌলিক অধিকারই নেই; নেই মাতৃভাষায় পঠনপাঠনের অধিকার, নেই নিজস্ব সংস্কৃতি পালনের স্বাধীনতাও। ভিন রাজ্যে প্রবাসী হয়ে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক জীবন কাটানোর সময় জুটতো শরণার্থী উপমা কিংবা পূর্বপুরুষের যত্নে লালিত সংস্কৃতি খাদ্যাভ্যাস সবকিছু ত্যাগ করে মিশে যেতে হতো ভিন রাজ্যের অবাঙ্গালীদের মধ্যে। বাঙ্গালী হিন্দু ভারতের দ্বিতীয় বৃহত্তম জাতি হলেও পূর্বতন অবিভক্ত বঙ্গের খুবই সংক্ষিপ্ত (সমগ্র অবিভক্ত বাঙ্গালার মাত্র এক-তৃতীয়াংশ) এবং ভাঙ্গাচোরা অংশ নিয়ে বাঙ্গালী হিন্দুর হোমল্যান্ড গঠিত হয়েছিল। ১৯৪৭ সালের ২০ শে জুন বাঙ্গালী হিন্দুর হোমল্যান্ড গঠনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছিলো। ডক্টর শ্যামাপ্রাসাদ মুখার্জীর প্রচেষ্টায়, সর্বোপরি প্রায় শতভাগ বাঙ্গালী হিন্দুর ভোটদানে আরব সাম্রাজ্যের বুক চিরে জন্ম নিয়েছিলো “দক্ষিণ এশিয়ার ইজরায়েলঃ পশ্চিমবঙ্গ”।

ধর্মীয় বিভাজনের ভিত্তিতে ভারতীয় ভূখণ্ড বিভাজন প্রাক্কালে বঙ্গীয় আইন সভায় ১২৬ টি ভোট মুসলিমদের বসবাসের জন্য নব পরিকল্পিত পাকিস্তানের সমর্থনে যায়, আর ৯০ টি ভোট নব ভারতের পক্ষে। উক্ত সভা থেকে নব রাষ্ট্র গঠনের কোনো সিদ্ধান্তই হয়নি। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ এবং পূর্ববঙ্গের আইনসভা আলাদা হয়ে গেলে বাংলাভাষী মুসলিম আধিক্য পূর্ববঙ্গ পাকিস্তানে যোগদান করে। বাঙ্গালী হিন্দুর একমাত্র সুরক্ষা ভূমি ও শেষ আশ্রয়স্থল হিসেবে বঙ্গের পশ্চিমাংশ পশ্চিমবঙ্গ নামে ভারতে সংযুক্ত হয়, উক্ত দিনটি ছিল ২০ শে জুন। আর সেই দিন থেকেই বাঙ্গালী হিন্দুর স্বভূমি ও স্বরাজের উত্থান ঘটে। উল্লেখ্য যদুনাথ সরকার, রমেশ চন্দ্র মজুমদার, মেঘনাদ সাহা, সুনীতি চট্টোপাধ্যায়ের মতো শুভবুদ্ধিসম্পন্ন বিদ্বজনরা এই উত্থানকে পূর্ণ সমর্থন করেন। পরবর্তীকালে তৎকালীন কংগ্রেসও তা সমর্থন করেছিল।

১৯৪৭ সালের ২০ শে জুন বঙ্গীয় আইনসভা ভেঙ্গে তৈরি হয় পূর্ববঙ্গ আইনসভা ও পশ্চিমবঙ্গ আইনসভা। মুসলমান প্রধান অঞ্চল নিয়ে হয় পূর্ববঙ্গ আইনসভা ও অমুসলমান প্রধান অঞ্চল নিয়ে পশ্চিমবঙ্গ আইনসভা। সেই সময় পশ্চিমবঙ্গ আইনসভার সমস্ত হিন্দু সদস্যরা, এমনকি বামপন্থী দলগুলোও পশ্চিমবঙ্গের স্বপক্ষেই ছিলেন। ওইদিনেই পশ্চিমবঙ্গ আইনসভার সদস্যরা ৫৮-২১ ভোটে বাঙ্গালাভাগের পক্ষে ও পাকিস্তানে যোগদানের বিপক্ষে ভোট দিয়ে পশ্চিমবঙ্গ গঠন সুনিশ্চিত করেন। স্থির হয়, পূর্ববঙ্গ যোগ দেবে পূর্ব পাকিস্তানে এবং পশ্চিমবঙ্গ যোগ দেবে ভারতে।

সেই সময় বঙ্গীয় আইনসভায় হিন্দু আসনের এক তৃতীয়াংশ তফসিলি হিন্দুদের জন্য সংরক্ষিত ছিল। পাকিস্তানপন্থী জিহাদী মুসলিমরা তফসিলি হিন্দু ও মুসলমানের জোটের সমর্থনে অনেক প্রচার করে পশ্চিমবঙ্গ সৃষ্টির পথে বাধা দেওয়ার প্রচেষ্টা করতে থাকে। কিন্তু তৎকালীন পূর্ব বাংলার তফসিলি হিন্দুগণ খুব ভালোভাবেই বুঝতেন হিন্দু-মুসলিম ঐক্য সোনার পাথরবাটির মতোই কাল্পনিক ও ভ্রান্ত। কার্যতঃ, পাকিস্তান প্রশ্নে বঙ্গীয় আইনসভায় প্রায় সব তফসিলি হিন্দু প্রতিনিধিরা ভারতে অর্ন্তভুক্তির পক্ষেই সমর্থন দিয়েছিলেন। ১৯৪৭ সালের ২০ শে জুন তৈরী হল পশ্চিমবঙ্গ ও তার আইনসভা। পশ্চিমবঙ্গের প্রতিষ্ঠার সমগ্র পরিকল্পনা ছিল ডক্টর শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের। তৎকালীন বঙ্গীয় কংগ্রেসও তাকে সমর্থন করেছিল।

পশ্চিমবঙ্গ ব্যতীত ভারতের আগামী পথচলা মোটেও সুখদায়ক হতো না। বিশ্বের বুকে ভারত ক্রমশঃ নিজেকে একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে চলেছে। সেক্ষেত্রে ভারতের প্রতিদ্বন্দ্বী হলো নিকটবর্তী প্রতিবেশী রাষ্ট্র চীন। আয়তনে পশ্চিমবঙ্গ ভারতের একটি ছোট রাজ্য হলেও এটি ভারতের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক অবস্থানে রয়েছে। ভারতের অগ্রগতির পিছনে পশ্চিমবঙ্গের এই অবস্থান দারুণভাবে সহায়তা করেছে। পশ্চিমবঙ্গ ভারতে না থাকলে প্রতিদ্বন্দ্বী চীন এবং জিহাদী পাকিস্তানই একচ্ছত্র ক্ষমতাশালী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হত। পশ্চিমবঙ্গ ভারতের এমন একটি রাজ্য, যা তিনটি দেশের সাথে আন্তর্জাতিক এবং পাঁচটি দেশীয় রাজ্যের সহিত অন্তর্দেশীয় সীমানা ভাগ করে নিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ সমগ্র ভারতের উত্তর-পূর্বের সাতটি রাজ্যের সাথে সংযুক্ত করেছে। পশ্চিমবঙ্গ ব্যতীত এই সাতটি রাজ্যের নিয়ন্ত্রণ অনায়াসেই চীনের হাতে চলে যেত। পূর্ব ভারতের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র কলকাতা। এখানেই রয়েছে পূর্ব ভারতের একমাত্র নদী বন্দর, যার উপর দাঁড়িয়ে রয়েছে বিহার, ঝাড়খণ্ড, সিকিম ও সমগ্র উত্তর-পূর্বের বাণিজ্য ব্যবস্থা। পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যটি গঠিত না হলে কলকাতা বন্দর পূর্ব পাকিস্তানে যেতো। অর্থনৈতিকভাবে পাকিস্তান তথা পূর্ব পাকিস্তান আরও সমৃদ্ধ হতো। ভারতের পূর্ব এবং পশ্চিম দুই পারেই নিঃশ্বাস ফেলতো জিহাদী রাষ্ট্র।

স্বাধীনতার প্রাক্কালে পূর্ব বাঙ্গালার ২৯% বাঙ্গালী হিন্দু জনগোষ্ঠী থেকে যায়, তারা নবগঠিত জিন্নার পাকিস্তানে ভয়ানক ধর্মীয় সহিংস্রতার সম্মুখীন হয়। তাদের নির্বিচারে হত্যা করা হয়, ফলে তারা দেশত্যাগে বাধ্য হয় কিংবা ইসলামের কাছে নতিস্বীকার করে ইসলামের অনুসারী হতে বাধ্য হয়। কার্যতঃ, বর্তমান পূর্ব পাকিস্তানে হিন্দু জনসংখ্যা ২৯% থেকে কমে ৮%-এ নেমে আসে। ইসলামিক বর্বরতায় পৃথিবীর যে কোনো অমুসলিম জাতিই মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ উপত্যকায় সংখ্যালঘু হিসেবে অভিশপ্ত জীবনযাপন করে, সমগ্র পৃথিবীতে তার একাধিক উদাহরণ রয়েছে। ১৯৪৭-এর পর থেকে বিভিন্ন সময় পূর্ব বাংলার ছিন্নমূল বাঙ্গালী জনগোষ্ঠী উদ্বাস্তু হিসেবে পশ্চিমবঙ্গে আশ্রয় নেয়, কারণ এটাই সমগ্র পৃথিবীর বাঙ্গালী হিন্দুর একমাত্র নিরাপদ আশ্রয়স্থল। পশ্চিমবঙ্গ দিবস উদযাপন যতটা জরুরী, তার চেয়েও অধিক জরুরী প্রত্যেক বাঙ্গালী হিন্দুর শিশুর এই দিবসের তাৎপর্য সম্পর্কে যথাযথ ধারণা পোষণ করা। যাতে বাঙ্গালী শিশুটি তাঁর পূর্বপুরুষের সাথে ঘটে যাওয়া ইসলামিক বর্বরতার ইতিহাস সম্পর্কে অবগত হয় এবং নিজের মাতৃভূমি তথা পশ্চিমবঙ্গের আগামী ভবিষ্যৎ নিশ্চিত এবং জিহাদীমুক্ত করতে সক্ষম হয়।

কাজেই পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যটি গঠিত হয়েছিলো বাঙ্গালী হিন্দুর হোমল্যান্ড হিসেবেই। তাই রাজ্যটি সর্বতঃভাবে বাঙ্গালী হিন্দুরই। এখানে অসাম্প্রদায়িক বাঙ্গালী জাতীয়তার বা ইসলামিক বাংলাস্থান গঠনের কোনো স্থান নেই। বর্তমান প্রজন্মকে পূর্বের সেই রক্তস্নাত ইতিহাস ভুললে চলবে না। ১৯৪৭ সালের ২০ শে জুন বাঙ্গালী হিন্দুর হোমল্যান্ড গঠনের যে প্রক্রিয়ার ভিত্তি স্থাপন হয়েছিল, কার্যতঃ আজও তার সমাপ্তি ঘটেনি। জিহাদীমুক্ত পশ্চিমবঙ্গ গঠন ও বাঙ্গালী হিন্দুর ভবিষ্যৎ পথ সুরক্ষিত করাই এই দিবস উদযাপনের প্রধান উদ্দেশ্য।
.
.
.
নিবেদনেঃ পশ্চিমবঙ্গের জন্য

We are not big media organisation. Your support is what keeps us moving. Don't hesitate to contribute because, work, for society needs society's support. Jai Hind.

1 COMMENT

  1. কোনো ইতিহাসের বই আছে কি ! যেটাকে সমস্ত ঘটনা টা উল্লেখ আছে? Please জানাবেন

Comments are closed.