শিবাজী মহারাজের জীবনী ও বীরত্বগাথা- (১১)

0
327

© অরিন্দম পাল

পর্ব-১১

সহ্যাদ্রির বুকে

…মহারাষ্ট্রের পশ্চিম উপকূলের অদূরে অবস্থিত সহ্যাদ্রি পর্বতমালা। হিমালয়ের মতই সুদৃঢ় ও বলিষ্ঠ ― চিরজাগ্রত প্রহরীর মত রক্ষা করছে ভারতবর্ষকে । সহ্যাদ্রির বিশাল বক্ষ জুড়ে গভীর অরণ্যে, গিরি-অঞ্চলে, গুহা-কন্দরায়, পার্বত্য নদী-নালার আশে-পাশে বাস করে মাবল অধিবাসীরা। সহ্যাদ্রির মতই তারাও বলিষ্ঠ, সাহসী, বীর এবং হৃদয়বান ।

শিবাজী যখন প্রথম এই সব অঞ্চলের অধিবাসী দের সঙ্গে পরিচয় করার জন্য ঘুরে বেড়াতেন, তখন ভয়ে এখানকার মাবলরা কাছে আসত না, কারণ রাজারা বড় অত্যাচারী, দুরাচারী হতো ― তারা সব সময়ে দরিদ্র গ্রামবাসীদের আতঙ্কের কারণ। কিন্তু শিবাজী তাঁর মধুর হাসি, অন্তরঙ্গ ব্যবহার ও লোকসংগ্রহের যাবতীয় সৎ গুণের সদ্ব্যবহার করে তাদের একান্ত আপন করে নিয়েছিলেন । বাস্তবিকই এদের তিনি নিজের ভাইয়ের মতোই ভালোবাসতেন, আর তারাও শিবাজী রাজাকে প্রাণ দিয়ে ভালোবাসত, শ্রদ্ধা করত ।

সহ্যাদ্রির কোলেই তখন আরো দুজন মহাপুরুষের আবির্ভাব ঘটেছিল । তাঁরা হলেন সমর্থ শ্রী রামদাস এবং সন্ত তুকারাম। পাহাড়-পর্বত, গ্রামে, অরণ্যে তারা ঘুরে বেড়াতেন এবং তাদের গভীর ভক্তি-সিক্ত সুরেলা কণ্ঠের প্রাণমাতানো ভজন-কীর্তন গানের সুর শুনে মরে যাওয়া মানুষগুলো যেন নতুন জীবনে বেঁচে উঠতে লাগল ।

সন্ত তুকারাম শুদ্ধভক্তি, সরল অনাড়ম্বর জীবন, নিষ্পাপ ভালোবাসার কথা শোনালেন গানের মাধ্যমে অতি সহজ ভাষায় । সাধারণ গ্রামবাসী যারা ধর্মের নামে কতগুলি মিথ্যা আচার ও কুসংস্কার এবং সামাজিক অনাচারের পাঁকে ডুবে প্রকৃত ধর্মকে ভুলতে বসেছিল, তাদের কাছে গিয়েও তুকারাম বললেন― ওরে, নিজে যে শুদ্ধ নয়, সারা ত্রিভুবনই তার কাছে খারাপ। এই জন্য আগে তুই নিজেকে সবদিক থেকে শুদ্ধ করে তোল, দেখবি সব খারাপ আপনা থেকেই ভালো হয়ে যাবে ।

একই ভাবে সমর্থ শ্রীরামদাস মানুষের মনের সকল নিরাশা, হীনমন্যতা ও আত্মবিশ্বাসের অবক্ষয়কে যেন ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দিলেন। তাঁর সুমধুর অথচ তোজোদ্দীপ্ত গান অরণ্য-পর্বত অতিক্রম করে দিকে দিকে ভেসে যেত, আর ভাসিয়ে নিয়ে যেত সকল শ্রেণীর জনসাধারণকে এক অনাস্বাদিত আনন্দের স্রোতে ― তার ফলে সমস্ত অবসাদ বাষ্প হয়ে উড়ে যেত, মনের মধ্যে নতুন বল, নব বীর্য, নতুন ভক্তি ও দারুণ উৎসাহ- উদ্দীপনার সঞ্চার হত । ধর্মের পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য জন্য তিনি এমন সাড়া জাগিয়ে তুললেন যে হেরে যাওয়া, ভেঙে পড়া মনগুলো যেন তরতাজা হয়ে হয়ে উঠল ― পরাজয়ের সকল গ্লানি ঝেড়ে ফেলে যুবশক্তি নতুন উদ্যমে জেগে উঠল । মুসলমান শাসকদের অত্যাচারে যাদের ঘর-সংসার ভেঙে-গুঁড়িয়ে গিয়েছিল, আবার তাদের নিজ নিজ সংসার-ধর্মে উৎসাহ দিয়ে তাদের জীবনকে সহনীয়, বরণীয় করে তোলার জন্য তিনি সকলকে অনুপ্রাণিত করে তুললেন । নিজে সংসার-ত্যাগী সন্ন্যাসী হয়েও সকলকে শুধু পরলোকের কথা না বলে ইহলোক সংসারী মানুষের কর্তব্যের কথা বললেন।

সামর্থ্য শ্রীরামদাস সাধারণ মানুষের কাছে তাদের সহজে বোধগম্য হয় এমন ভাষায় ছন্দোবদ্ধ সুললিত সুরে গান করে বললেন―
―তোমার জীবনকে সবদিক থেকে থেকে শতগুন সমৃদ্ধ করে তোলো ।
―মূর্খতা ও আলস্য ত্যাগ কর ।
―নিজের ভাগ্য ও দৈবকে দোষ দিয়ে কাঁদতে বস না ।
―কাজ কর, চেষ্টা কর, পরিশ্রম কর।
―প্রচেষ্টাই তোমার পরমেশ্বর ।
―যে যেমন তার সঙ্গে সেই রকম ব্যবহার কর । দুষ্টকে দমন করতে হলে নির্ভয়ে এ দুষ্টতার আশ্রয় গ্রহণ করায় কোন পাপ নেই ।
―বুদ্ধির সঙ্গে, হিসেব করে নিজের কর্তব্য-কর্ম সম্পাদন করে যাও ।
―যাঁরা ভক্তির পাত্র, হৃদয় দিয়ে তাঁদের ভক্তি কর ।
―কখন‌ও ধৈর্য হারিও না ।
―যা কিছু ভাল, তা-ই গ্রহণ কর, যা খারাপ তা তা ত্যাগ কর ।
―ঐক্যের সঙ্গে, মিলে-মিশে কাজ কর । ―বিবেককে ত্যাগ করোনা, শিক্ষাকে ত্যাগ করোনা ।
― শরীর সুস্থ ও সবল রাখ ।
―বৃথা আলস্যে ও নিদ্রায় আয়ু ক্ষয় করো না ।
―ভালোদের সঙ্গ লাভ কর ।
―ভালোভাবে সংসার ধর্ম পালন কর ।
―সতত উদ্যম কর ।
―সর্বদা সাবধানে থেকো ।
―প্রত্যেক মানুষের মধ্যেই ভগবান বাস করছেন, তাঁকে উপলব্ধি কর ।
―কঠিন অবস্থাকে ভয় করো না ।
―পরের উপর নির্ভর না করে নিজেই কষ্ট কর, পরিশ্রম কর ।
―নিজের মধ্যে ঝগড়া-বিবাদ পরিহার কর । ―শত্রু কে আর বন্ধু কে, তার সঠিক নির্ণয় কর । ―সংযমের সঙ্গে চল ।
―কোন মহৎ কাজে জীবনকে সার্থক কর ।

এই ধরনের শত শত সহজ সুন্দর বাণী তিনি তাঁর সরল ভাষায় আর গানের মধ্যে গ্রামে, বনে-পর্বতে, প্রত্যন্ত প্রান্তরের মানুষদের মধ্যে ছড়িয়ে দিলেন । তিনি আরো গাইলেন― “ওরে আগুন জ্বালা, আগুন জ্বালা। জ্বলবে জ্বলবে। কাজ করলে পরে তবেই কাজ হয় রে। আগে কাজ করে দেখা তারপর সেই কাজ করতে বল। রামের প্রতি অক্ষয় ভক্তি মনের মধ্যে রেখে শুধু কাজ করে যা, ওরে তোরা সবাই কাজ করে যা।”

সহ্যাদ্রির অসংখ্য ঝর্ণাধারার মত শ্রী সমর্থ রমদাস ও সন্ত তুকারামের অমূল্য বাণী মহারাষ্ট্রে ঘরে-ঘরে ছড়িয়ে পড়ল।

এসব বাণী শিবাজীকে যেমন তাঁর মহৎ ব্রতে আরো বেশী উদ্বুদ্ধ ও অনুপ্রাণিত করে তুলল তেমনি অলক্ষ্যে থেকে এই দুই দুই মহাপুরুষ শিবাজীকে বিপুল ভাবে সাহায্য করলেন, তাঁর ভবিষ্যৎ ফসলের জমিকে তৈরি করে দিলেন, উর্বর করে তুললেন। শিবাজীকে প্রত্যক্ষভাবে সাহায্য করতে দলে দলে যে হাজার হাজার মাবল বীর তরুণ, যুবক, প্রৌঢ়-বৃদ্ধ ছুটে এল, ঐ মহাপুরুষদের বাণীই তাদের এই মহৎ কাজে অনুপ্রাণিত করেছিল। সমর্থ শ্রীরামদাসকে শিবাজী তাঁর স্বরাজ্য-প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে নিজের গুরু বলে গ্রহণ করেছিলেন

(ক্রমশঃ)

We are not big media organisation. Your support is what keeps us moving. Don't hesitate to contribute because, work, for society needs society's support. Jai Hind.