বাঙালি হিন্দুবীর বিক্রমপুরের কেদার রায়ের গৌরবগাথা

0
417

© শ্রী মেঘনাদ বাগচী

রাস্তার পাশে বড়ই তলা। বড়ই তলায় দুটি সারিতে সাতটা অতি ছোট গর্ত। গর্তের দুপাশে দুটি বালক-বালিকা। তাঁদের হাতভর্তি তেঁতুল বীচি। ওগুলো গর্তে ফেলে ফেলে এক জটিল হিসাবের খেলা খেলছে দুজনে। হঠাৎ এক অচেনা লোক ডেকে ওঠল,
‘এই খোকা, তোমার এই গ্রামের নাম কি?’
খেলায় বাঁধা পেয়ে বিরক্ত হল ছেলেটি। বলল – রায়পুর।

  • আমি আসলে পুটিজুরি গ্রামটা খুঁজছি।
    পেছন থেকে অন্য এক লোক বলে উঠল, ‘এইডাই পুটিজুরি, বুড়ারা এহনো রায়পুরই কয়।’
    ছেলেটি ভীষণ অবাক। তাঁর গ্রামের নাম রায়পুর নয়? হাতে এখনো তেঁতুল বীচি, কিন্তু তাঁর মন চলে গেছে দাদুর কাছে। দাদুর মুখে শুনে এসেছে, গ্রামের নাম রায়পুর। বারোভূঁইয়াদের রায়পুর। বারোভূঁইয়া চাঁদ রায় আর তাঁর ছেলে কেদার রায়ের রায়পুর।
    সেদিন তেঁতুল বীচি হাতে অবাক হওয়া ওই বালকটিই ছিলাম আমি। রায়পুর গ্রামের যুগী বাড়ির বড়ই তলায় বেড়ে ওঠা আমি।
    আজ আর রায়পুর নেই। সেই গ্রামের নাম এখন পুটিজুরি। ওখানকার বাসিন্দারা নিজেদের স্থায়ী ঠিকানা লিখতে আর রায়পুর লেখে না। কিন্তু রায়পুর ছিল। কয়েক শতাব্দী ধরে ছিল। বারো ভূঁইয়াদের চাঁদ রায়, কেদার রায় যখন এই অঞ্চল শাসন করতেন, তখন থেকেই ছিল। ওখানকার বালক-বালিকাদের অবচেতন মন জুড়ে ছিল, ওদের দাদু-ঠাকুরদাদের মুখে ছিল। তাঁদের অন্তরজুড়ে ছিল।
    আজ থেকে প্রায় ৫০০ বছর পূর্বের ষোড়শ শতাব্দীর ভারত। এই সময় বাংলার এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত পর্যন্ত যে সমস্ত বীর ক্ষত্রীয় বাঙালি নরপতি আর ভূস্বামীদের প্রভাবে ভিনদেশী মোগল শাসকদের বঙ্গ বিজয়ের স্বপ্ন ভেস্তে গিয়েছিল সেই মহান মহান বঙ্গ বীরেরা হলেন রাজা প্রতাপাদিত্য রায়, কেদার রায়, রামচন্দ্র, লক্ষণমানিক্য, মুকুন্দ রায়, বীর হামির প্রমুখরা। ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে অধিকার স্থাপনের লক্ষ্যে মোগলদের তুরুপের তাস তখন ভগবান দাস, মান সিংহ, জসবন্ত সিংহ, জয় সিংহদের মত বিশ্বাসঘাতক হিন্দু ভূস্বামীরাই। নিতান্তই পীড়াদায়ক বিষয় যে ভিনদেশী ইসলামিক মোগল আর আফগান সাম্রাজ্য স্থাপনের লক্ষ্যে এই বিশ্বাসঘাতী হিন্দু ভূস্বামীদেরই রানা প্রতাপ, ছত্রপতি শিবাজী, রাজা প্রতাপাদিত্য রায়দের মত স্বদেশ আর স্বধর্ম প্রেমী বীর ক্ষত্রীয় নরেশদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করে এসেছে ভিনদেশী তুর্কি হানাদাররা। বিষয়টা অনেকটা এরকম এক হিন্দু ভারতবাসী লড়ছে অপর হিন্দু ভারতবাসীর বিরুদ্ধে ভারতবর্ষের বুকে ভিনদেশী তুর্কি সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে।

চাঁদ রায় আর তাঁর ছেলে কেদার রায় শাসন করতেন পদ্মার দুইপারের বিস্তীর্ণ জনপদ। শ্রীপুর ছিল তাঁদের রাজধানী। বিক্রমপুর, ইদ্রাকপুর জুড়ে ছিল তাঁদের রাজত্ব। এই ইদ্রাকপুরই এখন বাংলাদেশের শরীয়তপুর জেলা। কিছুকাল আগেও এটি বৃহত্তর ফরিদপুরের অধীনে ছিল। এই শরীয়তপুরেরই একটি গ্রাম রায়পুর। বাংলার বারোভূঁইয়াদের একজন কেদার রায় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন গ্রামটি। তাঁদের রায়বংশ অনুসারেই নাম হয়েছিল রায়পুর। রায় নরেশদের প্রভাব ও প্রতিপত্তি বৃদ্ধির সাথে সাথে শ্রীপুরের প্রসিদ্ধিও বাড়তে থাকে। শ্রীপুর তখন পূর্ববঙ্গের একটি নামকরা বন্দর নগরী। বর্তমানে শ্রীপুর কীর্তিনাশা নদীগর্ভে বিলীন। বীর ক্ষত্রীয় রায় রাজাদের কীর্তিনাশ করেছে বলেই হয়তো নদীর এইরূপ নাম। বিক্রমপুর প্রদেশের সবচেয়ে বড় বিশেষত্ব এই অঞ্চল অসংখ্য নদ নদী দ্বারা বিভক্ত ও চর-দ্বীপে পূর্ণ। ফলে বৈদেশিক শত্রুর পক্ষে এই অঞ্চল ছিল প্রায় দুর্ভেদ্য আর অজেয়। তার উপর আবার ছিল রাজা কেদার রায়ের বিখ্যাত নৌবাহিনী। বার বার মোগলসেনা কেদার রায়ের উপর আক্রমন হানলেও তাঁর সাথে কোনভাবেই এঁটে উঠতে পারছিল না। ফলে মোগলরা রনে ভঙ্গ দেয়। একদিন কেদার রায় বঙ্গোপসাগরের উপকূলে মোগল অধিকৃত সন্দ্বীপ নামক অঞ্চলের উপর আচমকা হামলা চালিয়ে সেটি অধিকার করে নেন। সন্দ্বীপ দখল শ্রীপুরের সুরক্ষার জন্য জরুরি ছিল। সন্দ্বীপ হাতছাড়া হবার সংবাদ পেয়ে মোগলরা উত্তেজিত হয়ে পড়ে। “মহামতি” জালালউদ্দিন আকবরের নির্দেশে মান সিংহের নেতৃত্বে বিশাল বাহিনী বাংলার দিকে অগ্রসর হয়। খবর পেয়ে কেদার রায়ও যুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু করেন। মোগল ও কেদারের দ্বন্দ্বের সুযোগে আরাকানের মগ রাজা সন্দ্বীপের উপর হামলা করতে এগিয়ে আসে। মগদের নেতৃত্বে ছিল প্রায় দেড়শ রণতরী। কেদারও একশো যুদ্ধজাহাজ পাঠান সন্দ্বীপ রক্ষায়। 1602 খ্রিষ্টাব্দের ১০ নভেম্বর বাঙালী ও মগ বাহিনীর মধ্যে ভয়ানক যুদ্ধ শুরু হয়। কেদারের পর্তুগীজ সেনাদলও কার্ভালোর নেতৃত্বে এই যুদ্ধে যোগ দেয়। শেষপর্যন্ত বাঙালী সেনা যুদ্ধে জয়লাভ করে। শোনা যায় সেদিনের সেই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে মাত্রই হাতে গোনা কয়েকজন মগ সেনা প্রান হাতে নিজেদের স্বভূমে প্রত্যাবর্তন করতে সমর্থ হয়। আরাকান রাজের বহু তীর, বন্দুক, কামান বিজয়ী বাঙালী সেনাদলের হাতে আসে। পরাজয় বার্তা শুনে স্বয়ং আরাকান রাজ ক্রোধে অন্ধ হয়ে এক হাজার রণতরী সহ শ্রীপুর রাজের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিতে সন্দ্বীপের দিকে অগ্রসর হন। কিন্তু সেবার বাঙালী সেনা বিজয়ী হয়। দেশ জুড়ে রায়বাহাদুর কেদারের নাম বীরত্বের সংবাদ ছড়িয়ে পড়ে।

“মহামতি” মোগল বাদশাহ পড়লেন বিপদে। একে বৃদ্ধ বয়সে পরাজয়ের অপমান, তার উপর ক্রমে কেদারের শক্তি বৃদ্ধি আকবরের কপালে ভাঁজ ফেলে। তিনি এবারে তাঁর বিশ্বস্ত সেনাপতি মান সিংহকে শ্রীপুর অভিযানে পাঠান। তার সাথে মন্দা রায় নামক অপর একজন বিশ্বাসঘাতক বাঙালীকেও সেনাধক্ষ করে সেখানে প্রেরণ করেন। মেঘনা নদীর উপকূলে দুই বাহিনীর মধ্যে ভীষণ যুদ্ধ শুরু হল। রায় বাহিনীর প্রবল পরাক্রম আর শৌর্যের সামনে মোগল সেনাধক্ষ মন্দা রায় পরাজিত ও নিহত হন। পরাজয় বার্তা পাওয়া মাত্র মান সিং ক্রূদ্ধ হন। অপমানের জালায় এবারে নিজেই এক বিশাল বাহিনী সহ শ্রীপুরের দিকে ধেয়ে আসেন। কৌশলী সমরনীতিতে প্রসিদ্ধ কেদার কিছুটা সময় নেবার জন্য মান সিংহের সাথে আপাত সন্ধি করেন। কিছুটা সন্ত্রস্ত মান সিংহও তাই চাইছিলেন যাতে কোনক্রমে তার মান বাঁচে। কিন্তু বছরের শেষে স্বাধীনতা প্রিয় কেদার মোগল দরবারে কোনরকম কর পাঠাতে অস্বীকার করেন। এবারে মান সিংহ তার সেনাপ্রমুখ কিলমককে স্রিপুরে প্রেরণ করেন। শ্রীনগর নামক কেদারের রাজ্যভুক্ত সমৃদ্ধনগরে মোগল বাহিনী হামলা করলে, পুনরায় বাঙালী সেনার সাথে তাদের ভীষণ যুদ্ধ শুরু হয়। এই যুদ্ধেও মোগল সেনাধক্ষ রায় বাহিনীর হাতে পরাজিত ও নিহত হয়। এবারে ক্রোধে উন্মত্ত মান সিংহ এক বিশাল বাহিনী সহ নিজেই যুদ্ধে এগিয়ে আসেন। জলে, স্থলে লাগাতার সাতদিন ভয়ানক যুদ্ধ চলে। বাঙালী সেনার দাপটে বিদেশী মোগলদের প্রান যায় যায় অবস্থা। এমন সময় দুর্ভাগ্যক্রমে মোগলদের গোলার আঘাতে কেদার প্রান হারান। ফলে নেতৃত্বহীন বাঙালী বাহিনী ছত্রভঙ্গ হয়। বিক্রমপুরের ক্ষত্রীয় সূর্য চিরতরে অস্তাচলে যায়। এরপর তাঁর রাজ্য লুণ্ঠন করল মুঘল সৈন্যরা। মাটিতে মিশে গেল তাঁর রাজধানী শ্রীপুর। আর মানসিংহ নিজে নিয়ে গেলেন চাঁদ রায়, কেদার রায়ের অধিষ্ঠিত দেবী শিলাময়ীর মূর্তি। রায়দেরকে, বারোভূঁইয়াদেরকে ভুলিয়ে দেবার ব্যবস্থা মুঘলরাই করেছিলেন। আর পরবর্তী নবাবদের, ব্রিটিশদের কি কোন দায় ছিল তাঁদেরকে ইতিহাসে রাখার? তাঁরা রাখেননি। আর সেই ধারা বজায় রেখে স্বাধীন বাংলাদেশেও বারোভূঁইয়ারা উপেক্ষিত। বিশেষত চাঁদ রায়, কেদার রায়দের আমরা একেবারেই ভুলে গেছি।

এই ভুলে যাওয়া, এই উপেক্ষার প্রবাহকে পদ্মানদী টেনে এনেছে তাঁর অপর পাড়েও। কেদার রায়ের রাজধানী শ্রীপুর পদ্মার যে তীরে ছিল, তার উল্টো পাড়ে বর্তমানে রয়েছে একটি গ্রাম। পূর্বে গ্রামটির নাম ছিল রায়পুর। ইতিহাসের উপেক্ষায় সেই নামও পাল্টে ফেলা হেয়েছে। আজ আর চাঁদ রায়, কেদার রায়দের কোন চিহ্নমাত্র নেই সেখানে। শুধু পাশের গ্রামে তাঁদের খনন করা দুটি বিশাল দীঘি রয়ে গেছে। এখনো দিগম্বরী দেবীর পূজা হয় সেখানে। তাই এই দিঘীগুলোর বর্তমান নাম দিগম্বরীর দীঘি। শুধু এই দীঘি দুটিই পদ্মার এপারে বারোভূঁইয়া কেদার রায়কে মনে রেখেছে। স্থানীয় মানুষ আজ জানেও না কে খনন করেছিলেন এই দীঘি। সবাই ভুলে গেছে। ভুলে গেছে বাংলার প্রকৃত স্বাধীনতাকামী এক রাজাকে। ভুলে গেছে তাঁর রায়পুরকে।

কেদার রায়ের খনন করা দিগম্বরীর দিঘির একটু দূরেই এখনও কিছু পোড়া ইট নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে একটা বাড়ি। সেখানে এখন অন্য লোকের বসতি। স্থানীয় লোকেরা বাড়িটাকে বলে ‘ভিয়া বাড়ি’। আসলে ‘ভুঁইয়া বাড়ি’ মানুষের মুখে মুখে অপভ্রংশ হতে হতে ‘ভিয়া বাড়ি’ হয়ে গেছে। কিন্তু সেই বাড়ির লোকেরাও আজ জানে না কে বা কারা ছিল এই ভিয়া বা ভুঁইয়া। নিজের বাড়িতেই আজ বিস্মৃত কেদার রায়।

পরিশেষে বিক্রমপুরের সূর্য কেদার রায়ের ঐতিহাসিক কাহিনী থেকে এটুকু নির্ণয় করা যায় তুর্কি-মোগলদের দ্বারা শাসিত মধ্যযুগীয় ভারতবর্ষে শৌর্য, পরাক্রম আর যুদ্ধ বিদ্যায় হিন্দু বাঙালি জাতি কিন্তু রাজপুত, উৎকল, অহমিয়া আর মারাঠাদের চেয়ে কোন অংশে কিছু কম ছিল না। কেদার রায়ের গৌরব গাঁথা দিনের আলোর মতই পরিষ্কারভাবে প্রমান করে যে মধ্যযুগে আধুনিক ভারতীয় নৌবাহিনী বীর ক্ষত্রীয় বাঙালী হিন্দু যোদ্ধা শ্রী কেদার রায়েরই সৃষ্টি। ছত্রপতি শিবাজী নামক কোন মারাঠা বীরের সৃষ্টি নহে। বিপুলসংখ্যক রণতরীর অধিকারী কেদার রায় সর্বপ্রথম একটি সুশিক্ষিত নৌবাহিনী গড়ে তোলেন। তিনি কতিপয় ভাগ্যান্বেষী পর্তুগিজকে তাঁর রণতরীর অধ্যক্ষ নিয়োগ করেন। এঁদের মধ্যে বিখ্যাত ছিলেন কার্ভালো।

তথ্যসূত্রঃ বাংলার বারো ভুঁইয়া

We are not big media organisation. Your support is what keeps us moving. Don't hesitate to contribute because, work, for society needs society's support. Jai Hind.