পশ্চিমবঙ্গ: বাঙালির অধিকার, আবেগ ও আশ্রয়

0
15

© দীপ্তাস্য যশ

পশ্চিম বঙ্গ, ভারতের পূর্ব প্রান্তের একটি রাজ্য।হিমালয় থেকে বঙ্গোপসাগর অব্দি বিস্তৃত ৮৮৭৫২ স্কোয়ার কিলোমিটার আয়তনের এক ভূখন্ড।কিন্তু এই পশ্চিমবঙ্গের পরিচয় কি এটুকুতেই সারা যায়?এক কথায় উত্তর যায়না।কারন পশ্চিম বঙ্গ শুধুমাত্র ভারতের এক ভৌগোলিক ভূখণ্ড নয়।পশ্চিমবঙ্গ এক আবেগের নাম।পশ্চিম বঙ্গ আশ্রয়ের আরেক নাম।পশ্চিম বঙ্গ বিপ্লবের আরেক নাম।১৯৪৭ সালে অনেক সংগ্রাম, সংঘর্ষের মধ্যে দিয়ে ভারতবর্ষ স্বাধীন হয়।এই স্বাধীনতার আন্দোলনে বাঙালির অবদান অতুলনীয়।আন্দামানের কুখ্যাত সেলুলার জেলে যাবজ্জীবন কারাদন্ড প্রাপ্ত কয়েদিদের মধ্যে বাঙালির সংখ্যা সর্বাধিক।যারা প্রত্যেকেই স্বাধীনতা আন্দোলনে বৃটিশ রাজশক্তির বিরুদ্ধে সংগ্রামের শাস্তি হিসাবে কালাপানির সাজা পেয়েছিলেন।
=====
বাঙালি স্বাধীনতার জন্য বোমা ছুঁড়েছে,গুলি চালিয়েছে,জন্মভূমি থেকে স্বেচ্ছা নির্বাসন নিতে বাধ্য হয়েছে,ফাঁসিতে চড়েছে আর সেসবের প্রতিদানে সব শেষে পেয়েছে এক খণ্ডিত ভূখণ্ড।যাক ভাগ করা হয় ধর্মের নামে।সে বাধ্য হয় নিজের ভিটে মাটি ছেড়ে, নিজের পরিবার পরিজনের রক্তমাখা শরীরকে ফেলে রেখে শিয়ালদা স্টেশানে,কলকাতার ফুটপাথে আশ্রয় নিতে।ওপারে যে ছিল সম্পন্ন চাষী এপারে তার জায়গা হয় কোন উদ্বাস্তু ক্যাম্পে।ওপারে যার ছিল সুখ স্বাচ্ছ্যন্দ স্বপ্নে মোড়া গৃহ, এপারে তার আশ্র্য় হয় জবরদখল করা বাগান বাড়ির এক চিলতে দরমার বেড়া দেওয়া ঘরে।ওপারে যে ছিল শিক্ষক এপারে তার জীবিকা হয় ভিক্ষাবৃত্তি।এঁরা সবাই ধর্মের কোপে পরে নিজেদের আশ্রয় হারিয়ে এসে আশ্রয় নিয়েছিল যে ভূখণ্ডে সেই আশ্রয়ের নাম পশ্চিমবঙ্গ।তাই পশ্চিমবঙ্গ বাঙালি হিন্দুদের কাছে শুধুমাত্র এক খন্ডিত ভূখণ্ড নয়।পশ্চিমবঙ্গ বাঙালি হিন্দুর আবেগের আরেক নাম।
=====
আজ সেই পশ্চিমবঙ্গে আমরা আবার দেখছি ধর্মীয় আগ্রাসন।আমরা দেখছি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির নামে তোষণ।আমরা দেখছি দেগঙ্গা,কালিয়াচক,ধূলাগড়, বসিরহাট।সময় এগিয়ে চলেছে তার সাথে জুড়ে চলেছে নতুন নতুন নাম।ডায়মন্ড হারবার, ক্যানিং, সন্দেশখালি একের পর এক নাম জুড়ে চলেছে।আজ এই পশ্চিমবাংলার মাটিতেই আমাদের দুর্গা পূজার নির্ঘন্ট বদলাতে হয় “সম্প্রীতির” দায়ে।সেই ১৯৪৬ সাল থেকে সম্প্রীতি রক্ষার দায় শুধুমাত্র বাংলার হিন্দুদের।নিজেদের ভিটেমাটি হারিয়ে, নিজেদের পরিবার পরিজনের রক্তাক্ত, ক্ষতবিক্ষত শরীরের উপর দিয়ে হেঁটে তাদের এই সম্প্রীতি রক্ষা করতে হচ্ছে।আর আজ সেই পশ্চিমবঙ্গের প্রশাসনিক প্রধানের কণ্ঠে ইদের নামাজে হুঙ্কার শুনতে পাই “আপকো ইনসাফ মিলেগা”। কে জানে তিনি কাকে ইনসাফ দেওয়ার কথা বলছেন।আর কে জানে তিনি আমাদের “ইনসাফ” দেওয়ার কথা কবে ভাববেন।
=====
২৮ দিন ব্যাপী চলা এসএসসি চাকরি প্রার্থীদের অনশন,সীমান্তের বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে অবৈধ অনুপ্রবেশের জেরে প্রতিনিয়ত জমি হারিয়ে চলা হিন্দুরা,সারা পশ্চিম বঙ্গ জুড়ে ধুঁকতে থাকা চাষিরা, বন্ধ কল কারখানার শ্রমিকরা কবে “ইনসাফ” পাবে তা কেউ জানেনা।অবশ্য “তিনি” ঘোষণা করেই দিয়েছেন অনেক বেশী কাজ করে ফেলেছেন, আর এতো কাজ করবেননা।তাই গৃহহীন মানুষটি কিংবা চাকরিপ্রার্থী হিন্দু যুবকটির তার কাছে “ইনসাফ” পাওয়ার আশা কমই।বরং তাদের মেনে নিতে হবে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির নামে দ্বিতীয় সংখ্যাগুরু গোষ্ঠীকে ওবিসি এ ক্যাটাগরিভুক্ত করে আরও আরও সুবিধা পাইয়ে দেওয়া চাকরিক্ষেত্রে।আর তাকে বসতে হবে অনশনে।অবশ্য সেখানেও ২৮ দিন পেরিয়ে গেলেও তাদের কথাটুকু শোনারও সময় হবেনা কারুর।কেউ জানেনা কবে “ইনসাফ” মিলবে ধূলাগড়ের নির্যাতিতার বা কবে “ইনসাফ” পাবে মহেশ রাউতের ছেলে।কেউ জানেনা।কোন উত্তর নেই এর।
=====
এখন আবার শুরু হয়েছে ঈদকে বাঙালির সর্ববৃহৎ উৎসবের আখ্যা দেওয়া।বাঙালি কে? বাংলা ভাষায় কথা বললেই কি কেউ বাঙালি হয়ে যাবে?নাকি বাংলার ঐতিহ্য,ইতিহাস, সংস্কৃতি এসব নিয়ে যার মনে আবেগ আছে সেই বাঙালি।সে যদিও অন্য ভাষায় কথা বলে তাহলেও যদি সে নিজেকে বাঙালির আবেগে নিজেকে মিশিয়ে দিতে পারে তবেই সে বাঙালি।শুধুমাত্র বাংলা ভাষা বললেই কেউ বাঙালি হয়ে যায়না।বাঙালির একটা তুলসীতলা থাকবে, বাঙালির সন্ধ্যেবেলার শঙ্খধ্বনি থাকবে।বাঙালির দুর্গাপুজো থাকবে।বাঙালির ভাইফোটা থাকবে।বাঙালির সরস্বতী পূজো থাকবে।বাঙালি তারা নয় যারা আমাদের সরস্বতী পুজো বন্ধ করতে চায়।যাদের জন্য আমাদের দুর্গাপুজোর নির্ঘন্ট পাল্টে যায় তারা বাঙালি নয়।বাঙালি তারা নয় যারা আমাদের সদর দরজার সামনের আলপনা মুছে দিতে চায়।সে তারা যতইনা উর্দু মিশ্রিত বাংলার কাছাকাছি একটি ভাষা বলুক।বাঙালির রবীন্দ্রনাথ থাকবে।বাঙালি তারা নয় যারা রবীন্দ্রনাথকে অশ্লীল মনে করে।বাঙালি তারা নয় যারা স্বামী বিবেকানন্দের আদর্শকে এই মাটির আদর্শ বলে মনে করেনা।বাঙালি তারা নয় বাউল ফকিরদের ফতোয়া দেয়।বাঙালি তারা নয় যারা কীর্তনের সুরে আমাদের ভেসে যাওয়া সহ্য করতে পারেনা।
=====
এই বাংলার ভারতবর্ষকে ও সারা বিশ্বকে দেওয়ার জন্য একটা দর্শন আছে,একটা বার্তা আছে।তা হোল সম্প্রীতি, বিকাশ ও বিত্তসাধনার বার্তা।এই বাংলার মাটিতেই জন্মেছেন শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু, যিনি আমাদের সাম্যের পাঠ দিয়েছেন।এই বাংলার মাটিতেই জন্মেছেন দ্বারকানাথের মতো শিল্পদ্যোগী,যিনি আমাদের দিয়েছেন বিত্ত সাধনার পাঠ।এই বাংলারই মানুষ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর,যার লেখনীতে আর সুরে বাঁধা হয়েছে তিন তিনটি দেশের জাতীয় সঙ্গীত।এই বাংলার মাটিতেই জন্মেছেন বাঘা যতীন, নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বোস, যারা আমাদের দিয়েছেন আত্মসম্মান।এই বাংলা শ্যামাপ্রসাদ মূখার্জীর বাংলা।যর প্রতিটি ধূলিকনাতে আছে আমাদের অধিকার এবং সর্বাগ্রে আমাদেরই অধিকার।
=====
বাঙালি অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির স্বার্থে।এবার সময় এসেছে তার নিজের অধিকার বুঝে নেওয়ার।বাঙালি তার এই ভূখন্ডে কোন অবৈধ অনুপ্রবেশকারীকে বরদাস্ত করবেনা আর।বাঙালি সম্প্রীতির নামে নিজের জমি আর কাউকে দখল করতে দেবেনা।বাঙালি এবার লড়াই শুরু করবে নিজের স্বাভিমানের জন্য,জাত্যাভিমানের জন্য।সম্প্রীতির নামে, ভুয়ো বিপ্লবের নামে বাঙালিকে ক্রমাগত পিছিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।কিন্তু বাঙালি আর ঠকতে রাজী নয়।তারা এবার চায় নিজের অধিকারটুকু বুঝে নিতে।
===== বাঙালি তাই আজ দাবী তুলছে প্রতিটি অবৈধ অনুপ্রবেশকারীকে চিহ্নিত করে তাদের এই ভূখন্ড থেকে বিতাড়িত করতে হবে।তার বদলে আশ্রয় পাবে বাংলাদেশ থেকে আগত সব শরনার্থী।যারা শুধুমাত্র ধর্মীয় সংখ্যালঘু হওয়ার কারনে আজ নিজের দেশ থেকে বিতাড়িত।পশ্চিম বাংলা আজ জনঘনত্বের চাপে হাঁসফাঁস করছে তাই আজ বাঙালির দাবী জন্মনিয়ন্ত্রন আইন।চাকরিক্ষেত্রে ওবিসি কোটার সঠিক মূল্যায়ন এবং সংশোধনের মাধ্যমে তোষণে ইতি টানা আজ বাঙালির দাবী।
=====
বাঙালির দাবী আজ সে নিজের ধর্মীয় পরিচয় সগর্বে ঘোষনা করবে।কারুর পরোয়া না করে আজ সে গলা তুলে বলবে জয় শ্রীরাম, জয় মাকালী কিংবা দুর্গা মাইকি কি জয় বা ভারত মাতা কি জয়।যেমনটা তার ইচ্ছা।সেখানে কারুর কোন খবরদাড়ি চলবেনা।চলবেনা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির নামে চাপিয়ে দেওয়া তোষনের বোঝা।বাঙালি তার সরস্বতী পুজো করবে, দুর্গা পুজো করবে।সেখান কোন ধর্মীয় আগ্রাসন সে সহ্য করবেনা।কোন দখলদারী সেখানে চলবেনা।বাচ্ছা মেয়েটার আর মাথা ফাটবেনা স্বরস্বতী পুজো করতে চেয়ে।
===== পশ্চিম বাংলার মাটিতে আবার উড়বে প্রগতির পতাকা।শ্রীরামকৃষ্ণ, বিবেকানন্দ, ঋষি অরবিন্দ, নেতাজী সুভাষ চন্দ্রের এই বাংলা আবার এগিয়ে যাবে সবার আগে।আবারও বলা হবে “what Bengal thinks today, India thinks that tomorrow”। শস্যক্ষেত্রে থাকবে সোনালী রং।থাকবে গোলাভরা ধান, কারখানার সাইরেন শুনে ঘড়ি মিলিয়ে বাঙালি সময়ের সাথে সাথে এগিয়ে যাবে। বাঙালি আবার তার নিজের ক্ষমতার জোরে ভারতের শ্রেষ্ঠ জাতিতে পরিণত হবে।নিজের মেধাসম্পদ তার নিজের লক্ষ্মীর সাধনায় কাজে লাগবে।অন্য কারুর গোলামীর জন্য নয়।
=====
আজ ভারতের মধ্যে সব থেকে বেশী ভিক্ষাজীবি পশ্চিমবাংলায়।নারী পাচারে আমরা সবার উপরে।আমাদের বর্তমান অন্ধকারাচ্ছন্ন,কিন্তু আমরা আমাদের নিজের ক্ষমতায় আমাদের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল করে তুলব।আবার আমরা জগৎ সভায় শ্রেষ্ঠ আসন নেব।

ছবি সৌজন্য: poschimbongo dibas

We are not big media organisation. Your support is what keeps us moving. Don't hesitate to contribute because, work, for society needs society's support. Jai Hind.

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here