সিলেট থেকে পশ্চিমবঙ্গ: ভিটে-মাটি ছেড়ে আসার স্মৃতি

0
614

শ্রীমতি সুনন্দা মুখার্জি
সিলেট থেকে পশ্চিমবঙ্গের উদ্দেশ্যে আমাদের শেষ যাত্রা
পূর্ব পাকিস্তান থেকে পশ্চিমবঙ্গের উদ্দেশ্যে আমাদের যাত্রাপথ ছিল যথেষ্ট দীর্ঘ। সেটা ছিল ১৯৪৮ সাল। ওই বছরই পূর্ব পাকিস্তান ছেড়ে পশ্চিমবঙ্গে চলে যাওয়া ছাড়া আমাদের সামনে আর কোনো রাস্তা খোলা ছিল না। ওই সময় পূর্ব পাকিস্তান থেকে পশ্চিমবঙ্গে আসতে আমাদের সময় লেগেছিল তিন দিন এবং দুই রাত। আমি অনেকের কাছে শুনেছি যে দেশ ছেড়ে আসার সময় তাদেরকে নানা বাধা-বিপত্তির মুখে পড়তে হয়েছিল। কিন্তু ভগবানের দয়ায় আমাদের সেরকম কোনো সমস্যার মুখে পড়তে হয়নি।
একদিন বিকালবেলায়, অল্প কিছু জিনিসপত্র আর জামাকাপড় নিয়ে বাড়ি থেকে আমরা বের হলাম। আমরা বেশিরভাগ জিনিসপত্র, আসবাবপত্র বাড়িতেই রেখে এসেছিলাম। আমাদের মনে এই আশা ছিল যে একদিন হয়তো আবার আমাদের বাড়িতে ফিরে আসতে পারবো। বাড়ি ছেড়ে চলে আসার কয়েকদিন আগেই বাবা আমাদের বাড়ির বড়ো মেহগনি কাঠের তৈরি খাট বিক্রি করে দিলেন। খাটটি কালো রঙের ছিল এবং আমরা ওই খাটেই ঘুমাতাম। আমার এখনও মনে আছে, যেদিন বাড়ি থেকে খাটটি নিয়ে চলে গেল, সেদিন আমরা ভাইবোনেরা খুব কেঁদেছিলাম। আমরা এই কথা ভেবে কাঁদছিলাম যে, আমাদের এবার থেকে মাটিতে শুতে হবে।
কিন্স সেতু দিয়ে সুরমা নদী পেরিয়ে আমরা সিলেট রেল স্টেশনে এসে পৌছালাম। আমাদের ট্রেন রাতে ছাড়ল। পরেরদিন আমরা জগন্নাথ ঘাটে এসে পৌছালাম। জগন্নাথ ঘাট ছিল স্টিমার চলাচলের ঘাট, যেটা ছিল মেঘনা নদীর খুব কাছেই। নদী পেরোনোর জন্য আমরা স্টিমারে চড়ে বসলাম। স্টিমারে চড়ে বসতেই পুরোনো স্মৃতি ভিড় করে এলো। সেটা ১৯৪৫ সালের কথা। আমরা সিলেট থেকে স্টিমারে করে কলকাতায় ঘুরতে গিয়েছিলাম। আমাদের সঙ্গে মেজো মামার পুরো পরিবারও ছিল। সে যাত্রা ছিল আরামদায়ক। সেসময় খুব আনন্দ হয়েছিল। মামা স্টিমারে ফার্স্ট ক্লাস কেবিন বুক করেছিলেন আমাদের জন্য। ট্রেনেও একটা পুরো কামরা করেছিলেন মামা। ট্রেনে সুস্বাদু খাবার খেয়েছিলাম এবং স্টিমারে মুরগির মাংস ও ভাত খেয়েছিলাম। কিন্তু এবারের যাত্রা ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত। এবারের যাত্রা ছিল দুঃখের। এক অজানা স্থানের উদ্দেশ্যে যাচ্ছিলাম আমরা। রাতে স্টিমারে মাছের ঝোল আর ভাত খেয়ে বাঙ্কে শুয়ে পড়লাম আমরা। তখনও জানতাম না যে আমরা চিরদিনের মতো পদ্মা নদী পেরিয়ে চলে যাচ্ছি। আমরা পদ্মা নদী পেরিয়েছিলাম গোয়ালনন্দ এবং চাঁদপুরের মাঝ দিয়ে। অনেক বছর পর মুম্বইতে থাকার সময় বিখ্যাত সাহিত্যিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে লেখা বাবার একটি চিঠি খুঁজে পাই। ওই চিঠিতে তিনি পদ্মা নদী পার হওয়ার বর্ণনা করেছেন। পরে সে চিঠি একটি পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল।
সন্ধ্যাবেলা নদীর অন্যপারে সিরাজগঞ্জ নামে একটা জায়গায় এসে পৌছেছিলাম। আমরা আর একটা ট্রেনে চেপে সীমান্তে পৌছালাম। পরের দিন সকালে আমরা সীমান্তের কাছে দর্শনা নামে একটা জায়গায় এসে পৌছালাম। ওখানে কিছু কাগজপত্রের কাজ শেষ করে আমরা রানাঘাটের আনুলিয়া নামে একটা গ্রামের উদ্দেশ্যে যেতে শুরু করলাম।
অনুলিয়াতে ছিল আমার কাকিমার বাপের বাড়ি। সন্ধ্যায় আমাদের ট্রেন রানাঘাট স্টেশনে পৌঁছেছিল। আমরা একটা ঘোড়ার গাড়ি ভাড়া করে গ্রামের দিকে চলতে লাগলাম। অন্ধকারে গ্রামের রাস্তায়  যেতে আমার খুব ভয় করছিল, কারণ গ্রামের পরিবেশের সঙ্গে আমরা পরিচিত ছিলাম না। আমরা গভীর রাতে কাকিমার বাপের বাড়িতে পৌছেছিলাম। আমরা খুবই ক্লান্ত ছিলাম, কিন্তু আমাদের ফেলে আসা সিলেটের কথা খুব মনে পড়ছিল।
পরের দিন সকালে গ্রামটি দেখলাম। গ্রামটি ছিল সুন্দর এবং বর্ধিষ্ণু।  আমরা এর আগে কখনো গ্রামে থাকিনি। তবে গ্রামের লোকেরা আমাদের প্রতি খুব ভালো ব্যবহার করতো। যদিও তাঁরা বাঙালদের(পূর্ব বঙ্গ থেকে আসা লোকজনকে স্থানীয়রা বলতো) সঙ্গে ততটা মেলামেশা করতো না, তবে আমার বাবাকে তাঁরা খুব শ্রদ্ধা করতো। তাঁরা আমাদেরকে ভালোবাসতো, কারণ আমরা ছিলাম কাকিমার আত্মীয়।
কিছুদিনের মধ্যেই আমরা গ্রামের পরিবেশের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিলাম এবং নতুন জীবন শুরু করলাম। আমরা ভাইবোনেরা স্কুলে যেতে শুরু করলাম। যদিও সিলেটের স্কুলের তুলনায় এই স্কুলটি ছোট ছিল। কিন্তু স্কুলটিকে ভালোবেসেছিলাম, কারণ আমি ক্লাসে ফার্স্ট হয়েছিলাম।  পর পর দু বছর আমি অঙ্কতে ১০০ নম্বরের মধ্যে ১০০ পেয়েছিলাম। এটা ছিল আমার বিরাট সফলতা । কারণ শিশু শ্রেণীতে অঙ্কতে শূন্য পেয়েছিলাম বলে কথা শুনতে হতো আমাকে।
আনুলিয়াতে দুই বছর থাকার পর আমি, মা, বাসু( ছোট ভাই) ও দাদার সঙ্গে কলকাতায় চলে আসি। রথী এবং রঞ্জি(আর দুই ভাই) এক বছর পরে কলকাতায় চলে আসে। স্কুল জীবন ততটা ভালো না কাটলেও কলেজ জীবন ভালো কেটেছিল। কলেজে প্রতি বছর নাটকে অংশ নিতাম। আমি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চিরকুমার সভা, শেষ রক্ষা, নটির পূজা ও আরও অনেক নাটক করেছিলাম। আমরা কলকাতায় জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু করেছিলাম।
সিলেট থেকে পশ্চিমবঙ্গে আসার শেষ যাত্রা আমার জীবনের আনন্দময় অধ্যায়ের শেষ দিয়ে শুরু হয়েছিল। এখনও আমার স্মৃতিতে বারবার ফিরে আসে আমার প্রিয় সিলেট। আমার জন্মভূমির  স্মৃতি এখনও অমলিন।

লেখিকা পরিচিতি: সুনন্দা মুখার্জির জন্ম তৎকালীন পূর্ব বঙ্গের সিলেটের জিন্দা বাজারে, ১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দের ২৩শে আগস্ট। বর্তমানে উনার বয়স ৮৫ বছর এবং মুম্বই নিবাসী।

(মূল লেখাটি ইংরেজিতে স্মৃতি ও চেতনাতে প্রকাশিত)

অনুবাদ: Team Hindu Voice

We are not big media organisation. Your support is what keeps us moving. Don't hesitate to contribute because, work, for society needs society's support. Jai Hind.