শিবাজী মহারাজের জীবনী ও বীরত্বগাথা- (২)

0
32


© অরিন্দম পাল

পর্ব – ২

ছোট্ট শিবাজী

…কথিত আছে যে, শাহাজী’র পিতা মালোজী রাজে ছিলেন অত্যন্ত শিবভক্ত । একবার শিবঠাকুর নাকি মালোজী কে স্বপ্নে দেখা দিয়ে বলেছিলেন, “আমি তোমার বংশে জন্মগ্রহণ করব”। মালোজী’র এই স্বপ্নের কথা মালোজী’র কনিষ্ঠ ভ্রাতা বিঠোজী, মাতা জিজাবাঈ কে বলেছিলেন ।
অত্যন্ত বুদ্ধিমতি মাতা জিজাবাঈ সর্বদা চিন্তামগ্ন থাকতেন ভারতমায়ের কথা ভেবে । এই দেশ আমাদের, তবু কেন আমাদের (হিন্দুদের) ধর্মিক কাজকর্ম, রীতি-নীতি পালন ভয়ে-ভয়ে, লুকিয়ে-লুকিয়ে গোপনে করতে হয়…??
হিন্দুরা কেন নিজেদের জীবন, ধন-সম্পদ ও সংস্কৃতির উপর অকারণে অন্যায় অত্যাচার সহ্য করে, কেন তাদের চরম দুঃখ, দুর্দশা ও অপমানের জীবন অতিবাহিত করতে হয়….??
কেন রাম ও কৃষ্ণের এই পবিত্র ভূমিতে আজ বিদেশি বিধর্মীদের অন্যায় শাসন…? মারাঠারা অতীব সাহসী ও নির্ভীক,তবু কেন তারা বিধর্মী ও বিদেশী দের ক্রীতদাস হয়ে সারা জীবন যাপন করতে বাধ্য হয়…??
এইসব হাজারো প্রশ্ন জিজাবাঈ-এর মনে ভীড় করতে থাকে ।

শিবাজীর জন্মের আগে 1629 খ্রীষ্টাব্দের 25 শে জুলাই, দৌলতাবাদের নিজমশাহের প্রকাশ্য দরবারের মধ্যে নেশাগ্রস্ত বাদশাহের নির্দেশে জিজাবাঈ -এর পিতা লখুজী যাধবরাও ও তাঁর দুই পুত্র (জিজাবাঈ -এর দুই ভাই) এবং পৌত্র জশবন্ত রাও-কে হত্যা করা হয়, অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে । এই ঘটনা জিজাবাঈ এর মনের মধ্যে এক গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করে এবং তার মন থেকে অবিরত রক্তক্ষরণ হতে থাকে ।

দেশকে স্বাধীন করার তীব্র আকাঙ্ক্ষা অগ্নিশিখার মতো তার অন্তরে জ্বলতে থাকে । দিল্লির বাদশাহ আকবর তারপরে তার পুত্র জাহাঙ্গীর এই দেশ আক্রমণ করেছে কিন্তু তাদের হয়ে যুদ্ধ করেছে আমাদের দেশের স্বদেশীরা । আমাদের সমস্ত শক্তি আমরা শত্রুদের হাতে সঁপে দিয়ে নিজেরাই নিজেদের ধ্বংস করছি । কিন্তু এসব এবার শেষ হবে ভগবান শিবের কৃপায় । সেই সময়ই বিঠোজী জিজাবাঈ কে মালোজী’র স্বপ্নের কথা বলেছিলেন । জিজাবাঈ -এর পুত্র জন্মের সংবাদ শিবনেরি দূর্গে এক অপরিসীম আনন্দের পরিবেশ তৈরি করেছিল, সকলে দীপ জ্বালিয়ে, ঘরে ঘরে শঙ্খ বাজিয়ে আনন্দের বহিঃপ্রকাশ হয়েছিল । এই পুত্র যে পূজনীয় শশুর মহাশয় মালোজী-এর স্বপ্নের সাক্ষাৎ রূপায়ণ তাতে তার কোন সন্দেহের অবকাশ ছিল না । মাতা জিজাবাঈ ভগবানের কাছে প্রার্থনা করেন- “আমার প্রাণ সর্বস্ব পুত্র যেন ভারতমাতার আশার প্রদীপ হয়ে জ্বলতে থাকে । শুধু মাত্র মহারাষ্ট্র নয়, তাদের পুত্র যেন সারা ভারতবর্ষের মুখ উজ্জ্বল করে । তুমি আমাকে যে অমূল্য রত্ন দিয়েছো তা শুধু আমার একার নয় সমগ্র দেশের ও ধর্মের সম্পদ হোক। মা আমাকে করুণা করো । হে শক্তিদায়িনী মা, আমাকে শক্তি দাও যেন তোমার এই দানকে আমি আমার সর্বশক্তি ও সামর্থ্য দিয়ে মানুষের মত মানুষ করে তুলতে পারি ।

জন্মের দ্বাদশ দিনে বালকের নামকরণ সম্পন্ন হয়েছিল । শিবনেরি দূর্গে ‘দেবী শিবাই’ এর ছত্রছায়ায় শিবের আরাধনায় জন্ম হয়েছে বলে তার পুত্রের নাম রাখা হয়েছে শিবাজী । জ্যোতিষী রা ভাগ্য গণনা করে বলেন, “অত্যন্ত ব্যক্তিত্বসম্পন্ন, সাহসী ও বীরপুরুষ হবে, অতি ক্ষুরধার বুদ্ধি ও তীক্ষ্ণ ধী-শক্তির অধিকারী হবে এবং চতুর্দিকে ভারতীয় সভ্যতার গৌরব তার পতাকা উড্ডীন করবে” ।

এরপর থেকেই মাতা জীজাবাঈ অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে থাকে এবং মনে মনে এই কামনা করতে থাকেন, “তাড়াতাড়ি বড় হয়ে ওঠো আমাদের রাজা । অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ তোমার পথ চেয়ে অপেক্ষা করছে “।
ক্রমেই বালক শিবাজী হাঁটতে শিখলো, তারপর দুর্গের মধ্যে চারিদিকে ছুটাছুটি করে খেলে বেড়াতে থাকলো । তখন জিজাবাঈ-এর অবস্থা হয়েছিল মা যশোদার মত । শ্রীকৃষ্ণের মতোই চপল, চঞ্চল শিবাজী তার মাতা জিজাবাঈ কে সর্বক্ষণ ব্যতিব্যস্ত করে রাখত । অতীব স্নেহে, যত্নে জিজাবাঈ নিজের হাতে শিশুপুত্রকে স্নান করিয়ে মন্দিরে নিয়ে যান । ছোট্ট শিবাজীর হাত দিয়ে দেবতার চরণে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করান, নিজে পূজা করেন, নিজের পুত্র ও দেশের মঙ্গল কামনা করেন । মাতার এই ভক্তিভাব ধীরে ধীরে ছোট্ট শিবাজীর মধ্যে সঞ্চারিত হতে থাকে । এইভাবে মন্দিরে গিয়ে ছোট্ট শিশুর আশ্চর্য পরিবর্তন লক্ষ্য করে মা তো অবাক হয়ে যান । দেবতার সামনে উপস্থিত হলে তার সব দুষ্টুমি যেন কোথায় পালিয়ে যায় । সে একমনে মায়ের পুজো দেখে। মায়ের মতোই হাত জোড় করে শান্ত হয়ে বসে থাকে শিবাজী ।

রাত্রে মায়ের কাছে শুয়ে তার পিতা শাহাজীর বীরত্বের গল্প কাহিনী শোনে । উপযুক্ত ভাষায় রামায়ণ মহাভারতের কাহিনী শোনাতেন, মুখে গল্প শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়ত ছোট্ট শিবাজী । দিনের বেলায় খেলার সময় শিবাজী নিজেই পাথরের টুকরো সাজিয়ে কেল্লা তৈরি শুরু করে, গাছের সরু ডাল বা কঞ্চি হতো তলোয়ার । তারপর শুরু হয় কাল্পনিক শত্রুর সঙ্গে প্রবল যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা । শত্রু ধ্বংস করে যখন মার কাছে ফিরে আসত, তখন যুদ্ধের বর্ণনা শুনে বড় বড় চোখ করে বীর পুত্রের দিকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে চেয়ে থাকেন মাতা জিজাবাঈ ।

এভাবে ধীরে ধীরে প্রবল দেশপ্রেম ছোট্ট শিবাজীর মধ্যে সঞ্চারিত হতে থাকে ।

(ক্রমশঃ)

We are not big media organisation. Your support is what keeps us moving. Don't hesitate to contribute because, work, for society needs society's support. Jai Hind.

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here