শ্রীরাম কি বিদেশী ছিলেন?

0
387


© সূর্যশেখর হালদার

পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদের দ্বারা প্রকাশিত ষষ্ঠ শ্রেনীর ইতিহাস বইতে ( অতীত ও ঐতিহ্য ) লেখা হয়েছে রামায়ণ রাম-রাবণের যুদ্ধের গল্প; রাম শব্দের একটি অর্থ হল ‘ঘোরা’ ( Move ) এবং সেটি ইংরেজী শব্দ ‘Roaming’ এর কাছাকাছি ( তাই অর্থও কাছাকাছি ); ইঙ্গিতে বোঝানো হয়েছে রাম যাযাবর জাতির মানুষ আর রাবণ খাঁটি ভারতীয়। অর্থাৎ ভাব ভঙ্গি পরিষ্কার যে দেশীয় রাজা রাবণকে হারিয়ে, বিদেশী, যাযাবর রাম তাঁর রাজ্য দখল করেন। আর বিজয়ীর দৃষ্টিভঙ্গি থেকে লেখা হয়েছে রামায়ণ, যাতে রাবণকে রাক্ষস বা অসুর বলে ছোট করা হয়েছে। এখন এই বক্তব্যের সত্যতা বিচার করা যাক।

প্রথমত: রামায়ণ কোন গল্প নয়, এটি আদিকাব্য। মহর্ষি বাল্মীকি তাঁর রামায়ণকে সাতটি কান্ডে ভাগ করেছেন ( অনেক পন্ডিতের মতে উত্তর কান্ড প্রক্ষিপ্ত ) l কান্ডগুলি কতকগুলি সর্গে এবং সর্গগুলি শ্লোকে বিভক্ত। প্রতিটি সর্গের সমাপ্তিতে কবি রামায়ণকে ‘আদিকাব্য’ বলে বর্ণনা করেছেন। যেমন বালকান্ডের নবম সর্গের শেষে বাল্মীকি লখেছেন –

“ ইত্যার্ষে শ্রীমদ্রামায়নে বাল্মীকিয় আদিকাব্যে বালকান্ডে নবমস্সর্গ”।

( এভাবেই সমাপ্তিলাভ করছে বাল্মীকি রচিত আদিকাব্য পবিত্র রামায়ণের বালকান্ডের নবমসর্গ। )

এই বর্ণনাতে পরিষ্কার রামায়ণকে মহাকাব্য নয়, বাল্মীকি আদিকাব্য বলেছেন। আমরা প্রায়শই শুনে থাকি রামায়ণ মহাকাব্য, আর ষষ্ঠ শ্রেনীর বইতে তো মহাকাব্য, আদিকাব্য, গল্প – সাহিত্যের তিনটি বিভাগের কোন পার্থক্যই নেই, তাহলে সুকুমারমতি ছাত্র – ছাত্রীরা শিখল আদিকাব্য, মহাকাব্য, গল্প সব এক।

দ্বিতীয়ত: রাম সংস্কৃত শব্দ। রামায়ণ অনুযায়ী রামাদির জন্মের এগারো দিন পরে শ্রীরাম ও তাঁর ভ্রাতাদের নামকরণ করেন মহর্ষি বশিষ্ঠ। বাল্মীকি রামায়ণের বালকান্ডের আঠারো সর্গের ২০তম শ্লোকে এর উল্লেখ রয়েছে। সংস্কৃত অভিধান অনুযায়ী ‘রাম’ শব্দের অর্থ Pleasing / Delightful ( আনন্দদায়ক )। ‘রাম’ আর ‘Roaming’ ( ঘোরা ) শব্দের মধ্যে উচ্চারণগত সাদৃশ্য থাকলেও তাদের অর্থের সাদৃশ্য আদৌ কোন অভিধানে আছে কি? ‘Roaming’ শব্দের উৎপত্তি খুঁজলে দেখা যায় এটি এসেছে Middle English ( মধ্যযুগ ) এর ‘Romen’ শব্দ থেকে। Wiktionary অনুযায়ী Old English এ ‘Ramian’ বা Proto – Germanic ‘Raimona’ বলেও দুটি শব্দ পাওয়া যায়। যেগুলি ‘Roaming’ এর উৎপত্তি হতে পারে। এই শেষ দুটি শব্দ আবার এসেছে ‘Raim’ থেকে যার অর্থ ‘to move / raise’ ( ঘোরা / তুলে ধরা )। অর্থাৎ ‘Roam’ শব্দ যে সংস্কৃত থেকে আগত, বা এর সঙ্গে ‘রাম’ শব্দের কোন অর্থগত মিল আছে, এমন প্রমাণ কোথায়?

তৃতীয়ত: রাবণ যে দেশজ রাজা একথা অনস্বীকার্য, কিন্তু তাঁকে অসুর বা রাক্ষস বানিয়ে ছোট করে দেখানো হয়েছে একথা স্বীকার করা কষ্টকর। এটা ঠিক রাবণের যে জন্মবৃত্তান্ত উত্তরকান্ডে বর্ণিত হয়েছে তাতে তিনি যে রাক্ষস বংশের রাজা ছিলেন তা প্রমাণ হয় না কারণ রাবণের পিতা বিশ্রবা মুনি ছিলেন একজন তপস্বী বা ব্রাহ্মণ। তাঁর ঠাকুরদা ছিলেন মহর্ষি পুলস্ত্য। অবশ্যই রাবণের মাতা কৈকেসী ছিলেন রাক্ষস। কিন্তু এর থেকে এটাই প্রমাণ হয় যে রাবণের শরীরে প্রবাহিত হচ্ছিল শুধু রাক্ষস নয়; ব্রাহ্মণেরও রক্ত, তিনি ছিলেন ব্রহ্মরাক্ষস।

আবার ‘রাক্ষস’ বা ‘অসুর’ শব্দগুলির উৎপত্তিও রামায়ণে বর্ণিত হয়েছে। রামায়ণের উত্তরকান্ডের চতুর্থ সর্গে রয়েছে – প্রজাপতি ব্রহ্মা জল সৃষ্টি করে প্রাণীদের তা রক্ষা করতে বলেন। একদল প্রানী বলে ‘রক্ষামঃ’ – এরাই হল রাক্ষস বা রক্ষাকারী। এর থেকে কি প্রমাণ হয় রাক্ষস জাতি মানেই খারাপ? আবার ‘অসুর’ শব্দের অর্থ হল যারা সুরা ( মদ নয় ) বারুণীকে গ্রহন করে না।
বাল্মীকি রামায়ণের বালকান্ডের ৪৫তম সর্গের ৩৬ থেকে ৩৮ তম শ্লোকে যা বর্ণনা আছে, তাতে প্রমাণ হয় সমুদ্র মন্থনের সময় যখন বরুণের কন্যা বারুণী উত্থিত হন, তখন দেবগণ সেই সুরাকে গ্রহন করেন, তাই তাঁদের বলা হয় ‘সুর’ আর দিতির পুত্রগণ যাঁরা সুরাকে গ্রহন করলেন না, তাঁরাই হলেন ‘অসুর’। এই অর্থ থেকেও কি এটা প্রমাণ হয় যে অসুর মানেই খারাপ? মনে রাখতে হবে রামায়ণের অন্যতম চরিত্র বিভীষণ কিন্তু রাবণের সহোদর ভ্রাতা।

এবারে আমরা যদি শ্রীরামের বংশ পরিচয়ের দিকে তাকাই তাহলে দেখব তাঁর পিতা ও মাতা উভয়েই ক্ষত্রিয়। পিতা দশরথ অযোধ্যার রাজা আর মাতা কৌশল্যা কোশল রাজ্যের ( বর্তমান ওড়িশা ) রাজকুমারী। রামের জন্মও অযোধ্যাতে, অর্থাৎ তিনিও রাবণের মত জন্মগতভাবে ভারতীয়। এছাড়াও বালকান্ডের ৭০তম সর্গের ২০ – ৪৩ তম শ্লোক পর্যন্ত শ্রীরামের পূর্বপুরুষদের নাম রয়েছে। শ্রীরামের বিবাহের সময় বশিষ্ঠের মুখে উচ্চারিত এই বংশ তালিকা এইরূপ –

অব্যক্ত -> ব্রহ্মা -> মারীচি -> কশ্যপ -> বিবস্বান -> মনু -> ইক্ষ্বাকু -> কুক্ষি -> বিকুক্ষি -> বাণ -> অনরণ্য -> পৃথু -> ত্রিশঙ্কু -> ধুন্ধুমার -> যুবনাশ্ব -> মান্ধাতা -> সুসন্ধি -> ধ্রুবসন্ধি -> ভরত -> অসিত -> সগর -> অসমঞ্জ -> অংশুমান -> দিলীপ -> ভগীরথ -> ককুতস্থ -> রঘু -> প্রবৃদ্ধ -> কল্মাষপাদ -> শংখন -> সুদর্শন -> অগ্নিবর্ণ -> শীঘ্রগ -> মরু -> প্রশুশ্রুক -> অম্বরীশ -> নহুষ -> যযাতি -> নাভাগ -> অজ -> দশরথ।
এনাদের মধ্যে বাল্মীকির মতে ইক্ষ্বাকু হলেন অযোধ্যা তথা সারা পৃথিবীর প্রথম অধীশ্বর, অনুমানের খাতিরে যদি ধরেও নেওয়া হয়, যে তিনি ভারতের বাইরে থেকে এসেছিলেন,( কোনো প্রমাণ অবশ্য নেই ) তাহলে তাঁর চৌত্রিশ প্রজন্ম পরে জন্মানো শ্রীরাম কিভাবে ভারতের বাইরে থেকে আগত হন? পঁয়ত্রিশ প্রজন্ম ধরেও শ্রীরাম ভারতীয় হলেন না, আর মহামতি(?) আকবর এক পুরুষেই ভারতীয় হয়ে গেলেন? আর পঁয়ত্রিশ পুরুষ ধরে অযোধ্যায় রাজত্ব করে শ্রীরাম কিভাবে যাযাবরের বংশ হলেন, তাঁর কোন্ পূর্বপুরুষ যাযাবর বৃত্তি পালন করতেন তাও বোঝা গেল না।

পরিশেষে পাঠকগণকে একটি প্রশ্ন, আচ্ছা কখনও এমনকি দেখেছেন যে পশ্চিমবঙ্গ মধ্য শিক্ষা / প্রাথমিক শিক্ষা সংসদের বইতে লেখা হয়েছে আকবর যাযাবর জাতির বহিরাগত, আর তিনি দেশজ রাজা রানা প্রতাপ সিংয়ের রাজত্ব ( মেবার ) আক্রমন করে উপনিবেশ স্থাপনের চেষ্টা করেন? আর আবুল ফজল রচিত আইন-ই-আকবরী আসলে বিজয়ীর দৃষ্টিভঙ্গী থেকে লেখা? যদি না পান আফসোস করবেন না কারণ পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করেন বিশিষ্ট গবেষক তথা অধ্যাপকরা যাঁরা বিদেশী আকবরকে দিল্লীর মহান বাদশা বলে পরিতৃপ্ত হন, আর পঁয়ত্রিশ পুরুষ ধরে অযোধ্যার রাজা থাকার পরেও শ্রীরাম এর বংশকে বহিরাগত, বিদেশী, যাযাবর ইত্যাদি বলে থাকেন। আপনাদের অনুকম্পাই এইসব গবেষক ও অধ্যাপকদের পাথেয়। ভাবুন, ভাবা অভ্যাস করুন।
🙏🙏🙏 নমস্কার🙏🙏🙏

We are not big media organisation. Your support is what keeps us moving. Don't hesitate to contribute because, work, for society needs society's support. Jai Hind.