১৯৭১: সিলেটের বুরুঙ্গা হিন্দু গণহত্যা

© প্রীতম চট্টোপাধ্যায়

২৬ মে ১৯৭১, বালাগঞ্জের বুরুঙ্গা গণহত্যা দিবস।

উত্তাল একাত্তরের এই দিনে ওসমানীনগর থানার বুরুঙ্গা হাইস্কুল মাঠে শান্তি কমিটি গঠনের নামে আশপাশের বিভিন্ন গ্রামের সহজ সরল নারী-পুরুষদের জড়ো করে স্থানীয় রাজাকারদের সহযোগীতায় নির্মমভাবে হত্যা করে পাকবাহিনী।

ক্যাপ্টেন নুরউদ্দিন খানের নেতৃত্বে সেদিন নারকীয় এই গণহত্যায় নিহত হন শতাধিক নিরীহ হিন্দু।

পাক হায়েনারা বুরুঙ্গার নিরীহ বাঙ্গালি হিন্দুদের গুলি করে মেরে ক্ষান্ত হয়নি। মৃতদেহের ওপর কেরোসিন ঢেলে আগুন লাগিয়ে দেয় তারা।

২৫মে পাক হানাদার বাহিনী ও স্থানীয় কিছু রাজাকার বুরুঙ্গায় প্রবেশ করলে চারদিকে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ঐদিন পাকবাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসররা মিলে এলাকায় বৈঠক করে। পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেয় ২৬ মে শান্তি কমিটি গঠনের লক্ষ্যে সভা করা হবে এবং সকলকে শান্তি কার্ড দেওয়া হবে।

জানানো হয় সভায় সকলের উপস্থিতি বাধ্যতামূলক।

সিদ্ধান্ত মোতাবেক সভায় উপস্থিতি নিশ্চিত করতে গ্রামে জোর প্রচার চালানো হয়। ২৬ মে সকালে মৃত্যুভয় নিয়ে অনেকে বিদ্যালয় মাঠে এসে উপস্থিত হন। সকাল ৯টার দিকে রাজাকার আব্দুল আহাদ চৌধুরী (ছাদ মিয়া), ডাঃ আব্দুল খালিকসহ পাক বাহিনীর ক্যাপ্টেন নূরউদ্দিনের নেতৃত্বে একদল পাক সেনা জীপে চড়ে বুরুঙ্গা উচ্চ বিদ্যালয়ে অবস্থান নেয়।

প্রথমে তারা তাদের পূর্ব তালিকা অনুযায়ী সবার উপস্থিতি সম্পর্কে নিশ্চিত হয়। রাজাকার ও পাক হানাদারদের একটি দল গ্রামে ঢুকে পুরুষদের মিটিং-এ আসার তাগাদা দিতে থাকে। সকাল ১০ টায় সমবেত লোকদের মধ্যে হিন্দু-মুসলমানদের আলাদা করে কয়েক’শ মুসলমানকে কলেমা পড়িয়ে ছেড়ে দিয়ে হিন্দুদের আটকে রাখা হয়।

দুপুর ১২ টার দিকে বিদ্যালয় মাঠে মোতায়েন ৩টি এলএমজির সামনে নিরপরাধ মানুষগুলোকে গরু ছাগলের মতো বেঁধে, লাইনে দাঁড় করানো হয়। একসময় ক্যাপ্টেন নূরউদ্দিনের ইশারায় এলএমজি গুলো এক সাথে গর্জে ওঠে।

মুহূর্তেই মানুষের তাজা রক্তে রঞ্জিত হয়ে উঠে সবুজ মাঠ। মাটিতে লুঠিয়ে পড়ে অনেকগুলো দেহ।

মৃত্যু নিশ্চিত করতে ২টিন কেরোসিন ঢেলে দেহগুলোয় আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।

পাক বাহিনীর এই ধ্বংসযজ্ঞ থেকে শিক্ষক প্রীতি রঞ্জন চৌধুরী, নিবাস চক্রবর্ত্তী, রানু মালাকার, দিনেশ বৈদ্যসহ কয়েক জন ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান।

সমস্তদিন-রাত পোড়া, অর্ধপোড়া ৭৮টি লাশ একই জায়গায় লুটিয়ে থাকে। পরদিন সকালে কয়েকজন পাক সৈন্য মৃতদেহগুলি বুুরুঙ্গা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশে বর্তমান গণকবরে একটি গর্ত খুঁড়ে মাটি চাপা দেয়।

দীর্ঘদিন অযত্ন আর অবহেলায় পড়ে থাকা বুরুঙ্গা গণকবরটিকে সিলেট-২ আসনের সংসদ সদস্য শফিকুর রহমান সংসদ সদস্য থাকা কালে গণকবরের উপর একটি স্মৃতি সৌধ নির্মাণ করে কৃতার্থ করেন হিন্দুদের।

পাকবাহিনীর নির্মম বর্বরতার কালের সাক্ষী হয়ে ৪৯ বছর ধরে দাড়িয়ে আছে বুরুঙ্গা গণকবর।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!