মহারাজা প্রতাপাদিত্য- এক বিস্মৃত বাঙালি বীর

1
919

© অঞ্জন বসু

বঙ্গের বীর যোদ্ধা মহারাজা প্রতাপাদিত্য,বাঙালির এক গর্বিত ও বিস্মিত ইতিহাস।।

 গুহ বংশীয় কায়স্থ, মহারাজা বিক্রমাদিত্য ও রাজা বসন্ত রায় যশোর রাজ্যের কর্ণধার ও স্রষ্টা। এই বংশের স্বনামধন্য রাজা। মহারাজা প্রতাপাদিত্যই এখন আমাদের আলোচ্য বিষয়।১৫৬০ খৃষ্টাব্দে বা তার অব্যবহিতর পরে, শ্রীহরি বিক্রমাদিত্যর ঔরসে বসু কন্যার গর্ভে একটি সন্তানের জন্ম হয়। তার নাম রাখা হয় প্রতাপ গোপীনাথ। এই প্রতাপই বিশ্ববিশ্রুত বঙ্গেশ্বর মহারাজা প্রতাপাদিত্য। যুবরাজ অবস্থায় তিনি প্রতাপাদিত্য নামে পরিচিত হয়েছিলেন। রাম রাম বসু প্রতাপ সম্পর্কে লিখেছেন, “জ্যোতিষিরা বললেন সব বিষয়েই উত্তম কিন্তু পিতৃদ্রোহী। হরিষেবিষাদ মনে রাজা অন্নপ্রাশনে পুত্রের নাম রাখলেন প্রতাপাদিত্য।” কার্যক্ষেত্রে প্রতাপ মাতার মৃত্যুর কারণ হয়েছিলেন এবং পিতৃদ্রোহী হয়েছিলেন। তাঁর বয়স যখন মাত্র ৫দিন তখন সুতিকাগৃহে তাঁর মায়ের মৃত্যু হয়। শ্রীহরি পত্নী বিয়োগে যেমন মর্মাহত হলেন তেমনি পুত্রের পিতৃঘাতী হওয়া নিশ্চিত মেনে নিয়ে অশান্তি ভোগ করতে লাগলেন। সুতরাং প্রথম হতেই তিনি প্রতাপের উপর বিরক্ত হলেন।প্রতাপ পিতৃস্নেহ তিনি বিশেষ পাননি। অল্প বয়সে মা মারা যাওয়ায় কাকীমা বসন্ত রায়ের প্রথমা স্ত্রীর স্নেহে লালিত পালিত হতে থাকেন। পিতা তাঁর উপর বিরক্ত থাকলেও স্নেহমমতার মুর্তিমান অবতার রাজা বসন্ত রায়ের স্নেহগুণে তাঁর বিশেষ কোন ক্ষতি হয়নি। খুল্লতাত পত্নীর অতুল স্নেহে প্রতাপের যে নিজের জননী নাই তা তিনি জানতেন না। প্রতাপ কাকীমাকে মা জ্ঞান করে বড় ভক্তি করতেন। তাঁর ঔদ্ধত্য মায়ের স্নেহের কটাক্ষে বিলুপ্ত হতো। প্রতাপের রাজত্বকালে এই মাতাই “যশোহরের মহারাণী” বলে পরিচিত ছিলেন।

অতি শিশুকালে প্রতাপ শান্ত ও নিরীহ ছিলেন। আপত্য স্নেহের প্রভাবে বাল্যকালেই প্রতাপ চঞ্চল ও অস্থিরমতি হয়ে উঠলেন। এই সময় প্রতাপ বীরত্ব ও সাহসিকতার জন্য বিখ্যাত হয়ে উঠেছিলেন। তিনি অত্যন্ত তীক্ষ্ণ বুদ্ধি ও মেধাবী ছিলেন। তিনি জীবনে সংস্কৃত, ফারসী ও বাংলা ভাষা শিক্ষা গ্রহণ করেন। তিনি সংস্কৃতি তান্ত্রিক স্তবাদি অতি সুন্দর আবৃত্তি করতেন। ফারসীতে পত্র লিখতে ও অতি সুন্দরভাবে কথা বলতে পারতেন। প্রাদেশিক বাংলায় তিনি সৈন্যগণের সহিত কথা বলতেন। এই সব শিক্ষাই তাঁর তত মত ছিল না। তিনি শাস্ত্র অপেক্ষা শস্ত্র শিক্ষায় অধিক পক্ষপাতী ছিলেন। তাঁর সর্বাপেক্ষা উৎকৃষ্ট শিক্ষক ছিলেন রাজা বসন্ত রায় স্বয়ং। তিনি পিতৃব্য বসন্ত রায়ের সুযোগ্য অভিভাবকত্বের উত্তর কালে যশোর রাজ্যের সুযোগ্য ব্যাক্তিত্ব হিসেবে গড়ে ওঠেন।

পূর্ব থেকেই রাজা বসন্ত রায় উদীয়মান যুবকের অদম্য উদ্যম ও লোক পরিচালনায় ক্ষমতা দেখে প্রতাপের সম্পর্কে অনেক কিছু আশা করতেন।বাল্যকালে প্রতাপ যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শিতা অর্জন করেছিলেন। তিনি তরবারী, তীর চালনা ও মল্লযুদ্ধে শিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন। জন্মাবধি সুন্দরবনের সাথে প্রতাপের নিবিড় সম্পর্ক ছিল। তিনি সুন্দরবনের জঙ্গলে বাঘ, হরিণ, গন্ডার (পূর্বে ছিল) প্রভৃতি শিকার করতেন। প্রতাপ বন্ধুবান্ধবসহ অরণ্যে প্রবেশ করে বিশেষ কৃতিত্ব অর্জন করেন। এই সময় বালক প্রতাপের উচ্ছৃঙ্খলতায় বিক্রমাদিত্য ও বসন্ত রায় বড়ই বিপদে পড়লেন। অবশেষে উভয়ে পরামর্শ করে স্থির করলেন যে, বিবাহ দিলে প্রতাপের মতির পরিবর্তন হতে পারে। এই জন্য তারা উভয়ে উদ্যোগী হয়ে প্রতাপের বিবাহ দিলেন। ঘটকারিকায় প্রতাপের তিন বিবাহের কথা উল্লেখ আছে। সর্বপ্রথম প্রতাপের বিবাহ হয় পরমকুলীন, জগদানন্দ রায়ের (বসু) কন্যার সাথে। ১৫৭৮ খৃষ্টাব্দে প্রতাপ সম্মানিত জিতামিত্র নাগের কন্যা শরৎকুমারীর সাথে মহাসমারোহে বিবাহ করেছিলেন। এই শরৎকুমারীই তাহার পাটরাণী বা প্রধান মহিষী ছিলেন। প্রতাপের তৃতীয় বিবাহ হয়েছিল প্রতাপের রাজা হবার অনেক পরে। বিবাহ হইল পরমাসুন্দরী, গুণবতী, প্রণয়িনী রূপে স্ত্রী পেলেন, কিন্তু তার ঔদ্ধত্য ও মৃগয়াভিযান কমিল না। ১৫৭৮ খৃষ্টাব্দের শেষভাগে প্রতাপ সূর্যকান্ত ও শংকরের সহিত রাজা বসন্ত রায়ের পত্র নিয়ে আগ্রার দরবারে উপস্থিত হন।এবং দিল্লির দরবারের সনদ নিয়ে নাম মাত্র বাৎসরিক করের বিনিময়ে যশোর রাজ্য শাসনের অনুমতি লাভ করেন, এভাবে প্রতাপ কৌশলে পিতাকে অপসারণ করে যশোর রাজ্যের অধীশ্বর হলেন।এবং বাংলায় ফিরে নিজের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন।

প্রতাপ রাজ্যের অধীশ্বর হবার পর রাজধানী স্থানান্তরের পরিকল্পনা করেন। ১৫৮৩ সালে রাজা বিক্রমাদিত্যের মৃত্যুর পর যশোর নগরের ৮/১০ মাইল দক্ষিণে যমুনা নদী ও ইছামতী নদীর সংগম স্থলে সুন্দরবন ঘেষে ধুমঘাট নামক স্থানে এক নতুন নগরী প্রতিষ্ঠা করেন। তথায় প্রতাপাদিত্যের রাজাভিষেক সম্পন্ন হয়। ধুমঘাটের ধ্বংসাবশেষ বর্তমানে বাংলাদেশের তীরকাটি জঙ্গলের মধ্যে অবস্থিত। ধুমঘাটের দূর্গ নির্মাণের প্রধান ভার ছিল পাঠান সেনাপতি কামাল খোজার উপর। প্রবাদ আছে যে, প্রতাপের রাজ্যভিষেক উৎসবে এক কোটি টাকা খরচ হয়েছিল।

মহারাজা বিক্রমাদিত্যের মৃত্যুর পর যশোর রাজ্য দুই ভাগে ভাগ করে দিয়েছিলেন। প্রতাপ ও বসন্ত রায়ের মধ্যে জমিদারির সম্পত্তি বিভক্ত হইল। প্রতাপ জমিদারির দশ আনা অংশ এবং বসন্ত রায় জমিদারির ছয় আনা অংশ পেলেন। বসন্ত রায় এ অসম বন্টন আপোষেই মেনে নেন এবং স্বীয় পুত্রদের ভবিষ্যতে এ নিয়ে প্রশ্ন না তোলার জন্য নির্দেশ দেন। রাজ্য বিভাজনের পরও বসন্ত রায় অনেক দিন রাজ্যের ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে ছিলেন। বাংলার বার ভূঁইয়াদের অন্যতম প্রতাপাদিত্য সিংহাসনে আহরণ করেই সৈন্যবল বৃদ্ধিতে মনোনিবেশ করেন। সুচতুর প্রতাপ প্রথম থেকেই মোঘলদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হন। যুদ্ধযাত্রা করেছিলেন। যেসব যুদ্ধযাত্রা করেন উড়িষ্যা অভিযান উল্লেখযোগ্য। উড়িষ্যা থেকে তিনি গোবিন্দ দেব বিগ্রহ এবং উৎকলেস্বর থেকে শিব লিংগ এনে গোপালপুর ও বেদকাশী নামক স্থানে স্থাপন করেন। 

মহারাজা প্রতাপাদিত্য রাজদন্ড গ্রহণ করে বঙ্গোপসাগরের উপকূল ভাগে মগ ও পর্তূগীজ জলদস্যুদের অত্যাচার দমনে মনোনিবেশ করেন। মগ ও ফিরিংদের অত্যাচারে ভারতের ভূস্বর্গ বঙ্গ দেশে অরাজকতার সৃষ্টি হল। মগেরা কোন শাসন মানত না। মগেরা যে মুল্লুকের যেত সে এলাকাকে একেবারে ধ্বংস করে ছাড়িত। তৎকালে দক্ষিণ বঙ্গ জলদস্যুদের অত্যাচারে অতিষ্ট হয়ে উঠেছিল। তারা এদেশের নারী পুরুষ ধরে নিয়ে ক্রীতদাস হিসেবে বিক্রি করতো। বন্দীদেরকে হাতের তালুতে ছিদ্র করে সরু বেত ঢুকিয়ে হালি করে জাহাজের পাটাতনের নীচে বোঝাই করে নিয়ে যাওয়া হতো। ভাগীরথী থেকে সুদুর চট্টগ্রাম পর্যন্ত তারা এরুপ উপদ্রব চালাত। এসব জলদস্যুদের হার্মাদ বলা হত। প্রতাপাদিত এদের বশীভূত করেন। অনেকেই তাঁর সেনাবাহিনীতে যোগদান করেছিল। প্রতাপ আরাকান রাজ কে পরাজিত করে তার কাছথেকে সন্দীপ নামক দ্বীপ জয় করেন।। মহারাজা প্রতাপাদিত্য ও মহারাজা কেদার রায় এর সাথে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন। মহারাজ কেদার রায়ের মৃত্যুর পরে তার সেনাপতি কে কোবালো কে হত্যা করেন।প্রতাপ রাজনীতি বিশারদ ছিলেন। প্রতাপের রাজত্বকালে তিনি প্রয়োজন বুঝে নানা স্থানে দূর্গ নির্মাণ করেন। প্রতাপের দূর্গসমূহ পশ্চিমে হুগলী নদী থেকে পূর্বে বালেশ্বর নদী পর্যন্ত এলাকা জুড়ে ছিল। তিনি বেশ কয়েকটি দূর্গ নির্মাণ করেন। সেগুলোর নাম হল – যশোর দূর্গ, ধূমঘাট দূর্গ, কমলপুর দূর্গ, বেদকাশী দূর্গ, শিবসা দূর্গ, জগদ্দল দূর্গ, সালিখা দূর্গ, সাতলা দূর্গ, আড়াই বাকী দূর্গ, মনি দূর্গ, রায়মঙ্গল দূর্গ, তকশ্রী দূর্গ ইত্যাদি। এই সমস্ত দূর্গের অনেকগুলি গভীর অরণ্যে অবস্থিত ছিল। এখনও কিছু কিছু দূর্গের ভগ্নাবশেষ দেখতে পাওয়া যায়।

প্রতাপাদিত্য নিম্নবঙ্গ ও সুন্দরবন অঞ্চলে নদীনালা ও খাল বিলের কথা বিবেচনা করে নৌশক্তি ও নৌবাহিনীর দিকে মনোনিবেশ করেন। দেশে প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের সংস্থান, নদীর অবস্থা ও উপকূলের প্রকৃতি বিচার করে কাতরী নির্মাণ করেন। প্রতাপ বাহিনীর ব্যবহৃত দ্রুতগামী নৌকা সমূহের মধ্যে ছিল – ঘুরাব, বেপারী, কোশা, বলিয়া, পাল, মাচোয়া, পশতা, জালিয়া, পিয়ারা, মহলগিরি প্রভৃতি। এই সকল নৌকাসমূহের মধ্যে ঘুরাব সবচেয়ে শক্ত ওশক্তিশালী। তার সময়ে যশোরের কারিগরগণ জাহাজ নির্মাণে বিশেষত্ব লাভ করেছিল। তৎকালে শায়েস্তা খাঁ যশোর হতে অনেক জাহাজ প্রস্তুত করে নিয়েছিলেন। প্রতাপাদিত্যের উৎকৃষ্ট কাতরীর সংখ্যা সহস্রাধিক ছিল। ইসলাম খাঁর নবাবী আমলে আব্দুল লতীফ নামে একজন ভ্রমণকারীর বিবরন হতে জানা যায়, “প্রতাপাদিত্য বঙ্গদেশের শক্তিশালী রাজা। তাঁর যুদ্ধসামগ্রীতে পূর্ণ সাতশত নৌকা এবং বিশ হাজার পদাতিক সৈন্য ছিল এবং তার রাজ্যের আয় পনের লক্ষ টাকা।” কালীগঞ্জ – শ্যামনগর সড়কের পূর্ব পার্শ্বে মৌতলার নিকট তার জাহাজ ঘাটা কুআর বন নামক স্থানে জাহাজের পোতাশ্রয় ছিল। নিকটবর্তী দুদলিয়া গ্রামে ছিল তার কাতরী নির্মাণের বন্দর। জাহাজঘাটার নৌবিভাগের সর্বাধ্যক্ষ ফ্রেডারিক ডুডলির নামে একটি গ্রাম আছে। বন্দরের তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন নৌসেনার অধ্যক্ষ ছিলেন অগাষ্টস পেড্রো।প্রতাপাদিত্যের সেনাপতিদের মধ্যে সূর্যকান্ত ও শংকর প্রতিপত্তিশালী ছিলেন। সুপন্ডিত, ধীরস্থির কর্তব্যকাসার এবং ব্রাহ্মনোচিত প্রতিভা সম্পন্ন শংকর চক্রবর্তী রাজস্ব ও রাজ্য শাসনের ব্যাপারে পরিদর্শন করতেন। মহাযোদ্ধা, অসমসাহসী, সবশাস্ত্র বিশারদ এবং লোক পরিচালনে অদ্বিতীয়, ক্ষমতাশালী সূর্যকান্ত  রাজত্বের প্রথম ভাগে রাজ্যের প্রধান সেনাপতি ছিলেন। তিনি সৈন্য রক্ষণ, যুদ্ধব্যবস্থা ও বলসঞ্চয়ের দায়িত্ব পালন করতেন। শঙ্কর দেওয়ান ও মন্ত্রণা বিভাগের কর্তা এবং সূর্যকান্ত সৈন্যবিভাগের অধ্যক্ষ। প্রতাপ হিন্দুরাজা হয়েও পাঠান ও পর্তুগীজ সৈন্যরা যুদ্ধে অধিকতর দক্ষ ছিলেন বলে তাদের নিযুক্ত করতেন। প্রতাপের সেনাবাহিনীতে নয়টি ভাগ ছিল। প্রধান সেনাপতির অধীন এর প্রত্যেক বিভাগে পৃথক পৃথক সেনানী ছিল। সেনাবাহিনীতে ঢালি বা পদাতিক সৈন্য, অশ্বারোহী সৈন্য, তীরন্দাজ সৈন্য, গোলন্দাজ সৈন্য, নৌ সৈন্য, গুপ্ত সৈন্য, রক্ষী সৈন্য, হস্তী সৈন্য, পার্বত, কুকী সৈন্য, এই নয় বিভাগে বিভক্ত ছিল। যুদ্ধে ঢাল, তলোয়ার, শড়কী, বল্লম, লেজা, কামান, বন্দুক, বর্শা, তীর প্রভৃতি অস্ত্র শস্ত্র ব্যবহৃত হতো। প্রতাপের ঢালী বাহিনীর অধিনায়ক ছিলেন মদন মল্ল। অশ্বারোহী বাহিনীর প্রধান অধ্যক্ষ প্রতাপ সিংহ দত্ত এবং সহকারী ছিলেন মাহিউদ্দীন, বৃদ্ধ নূরউল্লা প্রভৃতি। তীরন্দাজ বাহিনীর প্রধান ছিলেন সুন্দর ও ধুলিয়ান বেগ। গোলন্দাজ বাহিনীর অধ্যক্ষ ছিলেন ফ্রান্সিসকো রড়া। নৌবাহিনীর প্রধান ছিলেন অগষ্টাস পেড্রো। সুখা নামক এক দুঃসাহসী বীর গুপ্ত বাহিনীর প্রধান ছিলেন। রক্ষী বাহিনীর প্রধান ছিলেন রত্নেশ্বর বা যজ্ঞেশ্বর নয়, বিজয় রাম ভক্ত চৌধুরী প্রমুখ। হস্তী সৈন্য বাহিনীর কোন অধ্যক্ষের নাম পাওয়া যায় না। পাত্রি কুকী বাহিনীর প্রধান ছিলেন রঘু। মহারাজ প্রতাপাদিত্যের আরাধ্য দেবী ছিলেন মাদুর্গা যিনি যশোরেরস্বরি নামে পরিচিত ছিলেন।

প্রাপ্ত তথ্য থেকে জানা যায় যে, ১৫৮৭ খৃষ্টাব্দে প্রতাপাদিত্য নিজ হাতে রাজ্য শাসন শুরু করেন। ঐ বছরই ধুমঘটি দুর্গ নির্মাণ শুরু হয় এবং অচিরেই কাজ সমাপ্ত হয়। উড়িষ্যা যুদ্ধ থেকে ফিরবার পরে তিনি স্বাধীনতা ঘোষণার মনস্থ করেন এবং মোঘলদের বিরুদ্ধাচারণ করতে শুরু করেন। পিতৃব্য বসন্ত রায় তাঁকে নিরস্ত্র করার চেষ্টা করেন এবং ভয়াবহ পরিণামের কথা বুঝায়ে দেন। প্রতাপ নিষেধ বাণীর উল্টো মর্ম বুঝে বসেন। পিতৃব্য ও ভ্রাতুষ্পুত্র একে অপরের প্রতি বিশ্বাস থাকল না। প্রতাপ সর্বদা বসন্ত রায়কে সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখতে লাগলেন।

প্রতাপ কিছুদিন তার খুড়ার সাথে সদ্ভাব রক্ষা করে চলেছিলেন। বসন্ত রায় নানাবিধ সৎকার্য সাধন করে প্রজাদের প্রিয়ভাজন হয়ে ওঠেন। পিতৃব্যের এই সুনাম প্রতাপের মনে বিদ্বেষভাবের জন্ম দেয়। এক শ্রাদ্ধ উৎসবে নিমন্তণ পেয়ে প্রতাপ পিতৃব্যের বাড়িতে গমন করেন এবং সামান্য একটা কথায় সন্দেহের বশবর্তী হয়ে তিন পুত্র সহ তাহাকে হত্যা করেন। এই হত্যাকান্ডের সময় বসন্ত রায়ের কনিষ্ঠ পুত্র রাঘব রায় এক কচুবনে আত্মরক্ষা করেন বলে পরবর্তীকালে তিনি কচু রায় নামে প্রসিদ্ধি লাভ করেছিলেন।

কেউ কেউ বলেন যে, প্রতাপ ও তাহার জামাতা রামচন্দ্র রায়ের মধ্যে যে মনোমালিন্যের সৃষ্টি হয়েছিল, তার মূলে বসন্ত রায়ের কারসাজি ছিল। প্রতাপ শুধুমাত্র পিতৃব্যকে হত্যা করে তার প্রতিশোধ গ্রহণ করেন। পিতৃব্যের মৃত্যুর পর প্রতাপাদিত্য সমগ্র যশোর রাজ্যের অধিকার লাভ করেন এবং মহারাজ উপাধি ধারণ করে রাজ্য শাসন করতে থাকেন।

এই সময় বাংলা ও উড়িষ্যার মোঘল-পাঠান শক্তির মধ্যে সংঘর্ষ চলতে থাকে। প্রতাপ স্বভাবতই পাঠান শক্তির অনুকূলে ছিল। সেসময় তার মনে ভাটি বাংলায় একটি স্বাধীন রাজ্য সংস্থাপনের আশাও মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিল। ১৫৯৯ খৃষ্টাব্দের কাছাকাছি প্রতাপ বাংলার মোঘল সুবেদারকে অমান্য করে রাজ্য শাসন করে যেতে লাগলেন এবং স্বাধীনতা ঘোষণা করলেন।

প্রতাপাদিত্যের সমর সজ্জার উদ্দেশ্য বাংলার সুবাদারের কর্ণগোচর হলে তিনি পর্যায়ক্রমে শের খাঁ এবং ইব্রাহীম খাঁ নামক দুইজন মোঘল সেনাপতিকে প্রতাপের বিরুদ্ধে প্রেরণ করলেন। কিন্তু তাঁরা প্রতাপকে সামান্য ভূস্বামী মনে করে যশোহরে আসলেন । প্রতাপও তার সেনা বাহিনীর নিকট পরাজয় স্বীকার করে পশ্চাদপসরণ করল। প্রতাপাদিত্যের এই সকল বিজয় বার্তা চারদিকে ছড়িয়ে পড়লো। বিভিন্ন এলাকার ভূইয়াগণ তাঁর সহিত মৈত্রী স্থাপন করে মোঘল বাদশাহের বিরুদ্ধে সমবেতভাবে যুদ্ধ করতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলেন। প্রতাপাদিত্যের এই সকল কীর্তি কথা স্মরণে কবি ভরতচন্দ্র রায় গুণাকর তার ‘অন্নদামঙ্গল কাব্যে’ লিখিয়াছেন-

যশোর নগর ধাম  প্রতাপাদিত্য নাম

মহারাজ বঙ্গজ কায়স্থ

নাহি মানে পাতশায়  কেহ নাহি আঁটে তায়

ভয়ে যত নৃপতি দ্বারস্থ।।

বরপুত্র ভবানীর  প্রিয়তম পৃথিবীর

বায়ান্ন হাজার যার ঢালী

ষোড়শ হলকা হাতী  অযুত তুরঙ্গ

যুদ্ধকালে সেনাপতি কালী।।

প্রতাপাদিত্য পর পর দুবার মোঘল বাহিনীকে পরাজিত করে । তিনি মোঘল শাসনাধীন সপ্তগ্রাম বন্দর লুট করে ধন সঞ্চয় করতে অগ্রসর হলেন। সপ্তগ্রামের ফৌজদার প্রতাপাদিত্যের অতর্কিত আক্রমণ রোধ করতে পারলেন না। ফলে সপ্তগ্রামের সমুদয় ধন সম্পদ প্রতাপাদিত্যের কুক্ষিগত হল।

এই সময় আগ্রার দরবারে নানারকম অশান্তি বিরাজ করছিল। বাদশাহ আকবরের মৃত্যুর পর শাহজাদা সেলিম নুরুদ্দীন মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর নাম ধারণ করে সিংহাসনে আরোহণ করেন। এইবার জাহাঙ্গীর দরবারে প্রতাপাদিত্য সম্পর্কে নানা অভিযোগ উত্থাপিত হলো। এই সময়ে বসন্ত রায়ের পুত্র কচু রায়ও সমগ্র কাহিনী বাদশাহের গোচরীভূত করল। সমুদয় অভিযোগ শুনে জাহাঙ্গীর তাঁর সেনাপতি মানসিংহকে পাঠালেন প্রতাপাদিত্যকে দমনের জন্য। মানসিংহ বাংলায় এসে সসৈন্য যশোর রাজ্যের বিরুদ্ধে অগ্রসর হলেন এবং কপোতাক্ষ নদের তীরে শিবির স্থাপন করে থাকলেন। কিন্তু নদীমাতৃক বাংলার বর্ষার সম্পর্কে মোঘল সেনাপতির কোনো ধারণা ছিলোনা। একদিকে বর্ষা ও মহারাজা প্রতাপের নৌসেনায় আক্রমণে মোঘল সেনা বিপর্যস্ত ও ছত্র ভঙ্গ হয়েযায়,বাধ্যহয়ে মানসিংহ পিছুহটতে বাধ্য হয়।এবং বর্ষার শেষে কিছুকাল পরে  আন্দুলিয়া নিবাসী ভবানন্দ মজুমদার নামক এক জমিদার কে উৎকোচ প্রদান করে,রাজা মানসিংহ তাকে নিজের পক্ষে আনে। তারই সাহায্যে মানসিংহ ধুমঘাট আক্রমণ করতে সমর্থ হন।

প্রতাপ এবং তার পুত্র উদয়াদিত্য ও অন্যান্য সেনানায়কগণ দীর্ঘদিন ধরে মোঘল বাহিনীর সাথে কতিপয় খন্ড যুদ্ধ করলেন। অসীম সাহস ও অসামান্য রণচাতুর্য প্রদর্শন করে প্রতাপ শেষ যুদ্ধে বন্দী হলেন। রাজা মানসিংহ বন্দী প্রতাপাদিত্যকে পিঞ্জরাবদ্ধ অবস্থায় আগ্রায় প্রেরণ করলেন। পথিমধ্যে বানারসী ধামে উপস্থিত হওয়ার সাথে সাথে প্রতাপাদিত্য শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন। তার সেনাপতি শংকর কে বন্দী অবস্থায় দিল্লি নিয়ে যাওয়া হয়।তার সাথে বাংলার স্বাধীন হিন্দু রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন ভূলুণ্ঠিত হয়।যুদ্ধের পর মানসিংহ কচু রায়কে ‘যশোরে জিৎ’ উপাধি দিয়ে যশোহর রাজ্যে প্রতিষ্ঠিত করেন। তিনি ভবানন্দ মজুমদারকে বিশেষভাবে পুরস্কৃত করেন।

তথ্যসূত্র :- ১) বঙ্গের জাতীয় ইতিহাস।               

  ২) বাংলার বারো ভূঁইয়া এবং মহারাজা

We are not big media organisation. Your support is what keeps us moving. Don't hesitate to contribute because, work, for society needs society's support. Jai Hind.

1 COMMENT

  1. অনেক অনেক ধন্যবাদ এমন তথ্যবহুল, ইতিহাস সমৃদ্ধ লেখার জন্য।
    আপনি আরও লিখুন। যদি বই আকারে প্রকাশ করতে চান তাহলে আমি সাহায্য করবো।

Comments are closed.