বাংলাদেশের কমরেড

0
215

© শ্রী তপন কুমার ঘোষ


বাংলাদেশে আগে অনেক কমিউনিস্ট কর্মী ছিল। হিন্দু ও মুসলমান দু ধর্মেরই কমরেড ছিল। এই হিন্দু কমরেডরা অবশ্যই পশ্চিমবঙ্গের কমরেডদের থেকে নৈতিকতার দিক থেকে অনেকটাই উন্নত মানের ছিল। কারণ মুখে মার্কসবাদের কথা ব’লে, ধর্ম ও সম্প্রদায় মিথ্যা আর শোষক ও শোষিত শ্রেণীই একমাত্র সত্য এবং হিন্দু জমিদারদের দ্বারা গরীব মুসলিম ও হিন্দু প্রজাদের শোষণের বিরুদ্ধে অনেক লেকচার দিয়ে, দেশভাগের পরই গরীব হিন্দু মুসলমানের মিলিত শ্রেণী সংগ্রামের কথা ভুলে গিয়ে যেসব মহান কমরেড লেজ গুটিয়ে ভারতে পালিয়ে এসেছিল, তাদের মত ভণ্ড বাংলাদেশের হিন্দু কমরেডরা ছিল না। তারা পার্টির তাত্বিক কথাগুলো বিশ্বাস করে পূর্ব পাকিস্তানেই থেকে গিয়েছিল। অনেক প্রতিকূল অবস্থা সত্বেও থেকে গিয়েছিল।
সেই হিন্দু কমরেডরা খুব গরুর মাংস খেয়ে তাদের মার্ক্স ভক্তি দেখাতো। মোল্লা কমরেডরা কিন্তু কখনো পর্ক খেত না। তাতেও হিন্দু কমরেডরা কিছু মনে করত না। ভাবত ওটা ওদের ছোটবেলা থেকে অভ্যাস। তাই খেতে পারে না। সেই হিন্দু কমরেডরা একদিন চমকে উঠলো। তাদের সারা জীবনের বিশ্বাস ও ধারণা ভেঙে চুরমার হয়ে গেল ১৯৯২ সালের ৬ ই ডিসেম্বর এর পর। তারা চমকে উঠে দেখল, তাদের বহুদিনের বহু সংগ্রামের সাথী মুসলিম কমরেডদের যেন দাঁত নখ বেরিয়ে পড়েছে। তাদের চেহারাগুলো কেমন যেন হিংস্র হয়ে উঠেছে। তাদেরকে যেন চেনা যাচ্ছে না। ঢাকা থেকে কতদূরে ভিন দেশে অবস্থিত অযোধ্যা। সেখানে কিছু হিন্দু নামধারী জানোয়ার ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদ ভেঙে দিয়েছে। খুবই অন্যায় কাজ করেছে। কিন্তু সেজন্য বাংলাদেশে হিন্দুরা তো একটুও দায়ী নয়! তাহলে তাদের প্রতি শুধু কাঠমোল্লাদের নয়, কমরেডদেরও এতো আক্রোশ কেন? সারা পৃথিবীতে ধর্মান্ধ মুসলিমরা কত অন্যায় কাজ করে। এই তো মাত্র দুবছর আগে ১৯৯০ সালে কাশ্মীরের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানরা সেখানকার সংখ্যালঘু হিন্দু পণ্ডিতদের উপর চরম অত্যাচার করে কাশ্মীর থেকে তাড়িয়ে দিল। কই তখন তো আমরা সেজন্য বাংলাদেশের মুসলমানদেরকে দোষী বলে মনে করিনি। আজ সুদূর অযোধ্যায় একটা ঘটনা বা দুর্ঘটনার জন্য  বাংলাদেশের মুসলমানরা এখানকার হিন্দুদেরকে দায়ী করছে! তার থেকেও আশ্চর্য্য, নাস্তিক কমরেডরাও যেন কিরকম হিংস্র হয়ে উঠেছে। তাদের চেহারাগুলো কেমন যেন পাল্টে গেছে। বহুদূরে বিদেশে অবস্থিত একটা ভাঙাচোরা বহুদিনের পরিত্যক্ত মসজিদের জন্য মার্কসবাদী নাস্তিক কমরেডদেরও এত প্রেম থাকতে পারে, এ হিন্দু কমরেডদের কল্পনার বাইরে ছিল।

সেই পাকিস্তান আমল থেকে কত হিন্দু মন্দির ভাঙা হয়েছে। এখনো বাংলাদেশ আমলেও নিয়মিত মন্দির ভাঙা হচ্ছে। কই তার জন্য হিন্দু কমরেডরা তো কখনো ব্যথা অনুভব করেনি। বরং ভেবেছে, ধর্ম তো আফিম, আর মন্দিরে যাওয়া তো কুসংস্কার। তাই মন্দির ভেঙেছে একদিক থেকে ভালই হয়েছে। হিন্দুর কুসংস্কার কমবে, হিন্দু যুক্তিবাদী হবে। তাই তারা এজন্য দুঃখিত হয়নি। একদল ধর্মান্ধ মুসলমানের এই অসহিষ্ণুতার জন্য সব মুসলমানকে কখনো দোষী বলে মনে করেনি। আর আজ এ কী দেখছে হিন্দু কমরেডরা? তারা যেন ভিতর থেকে একটা প্রচন্ড ঝাঁকুনি খেল। তাদের কাছে জগৎটা যেন তোলপাড় হয়ে গেল। তার হিন্দু পাড়াতেই ওই মন্দিরটা আছে। কতদিন যায়নি! আজ যেন মনে হচ্ছে একবার যাওয়া দরকার। প্রত্যেকবছর ১লা বৈশাখে রমনা বটমূলে যায় বাঙালি সংস্কৃতির হাওয়া গায়ে লাগাতে। ছোট ছেলেটাকে রঙিন প্যাঁচা কিনে দেই তাকেও বাংলার সেক্যুলার সংস্কৃতি বোঝাতে। এবার যেন মনে হচ্ছে সামনের ১৪ ই এপ্রিল একবার ঢাকেশ্বরী মন্দির যেতে হবে। কতদিন যায়নি। হিন্দু কমরেড নিজেকেই প্রশ্ন করতে লাগল, আচ্ছা আমার মধ্যে এই পরিবর্তন হচ্ছে কেন? আমিও কি তবে সাম্প্রদায়িক হয়ে গেলাম? নাকি মনের অবচেতনে একটা নিরাপত্তাহীনতা ভোগ করছি! তাই কি মনে হচ্ছে যদি বিরাট কোন বিপর্যয় আমার বা আমার পরিবারের জীবনে নেমে আসে তখন হিন্দু জাতভাইদের কাছেই আশ্রয় সহানুভূতি পাব? কারণ মুসলিম কমরেডদের যে এখন কিরকম অচেনা মনে হচ্ছে। হিন্দু কমরেড দ্বিধায় পড়ে যায়। কোন্ টা ঠিক? তার নিরাপত্তাবোধের অভাব? নাকি তার ভিতর থেকেই একটা পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে? সে যেন নিজেকেই চিনতে পারে না। পুজোপাঠ করা ধার্মিক হিন্দুদের সঙ্গে বহুদিন মেশেনি। এখন তাদের সঙ্গে একটু মিশতে ইচ্ছা করছে। তাদের সঙ্গে কথা বলে গল্প করে তাদের চিন্তাভাবনার সঙ্গে কোন common ground আছে কিনা খুঁজে দেখতে মন থেকে তাগিদ আসছে। তাদেরকে কেমন যেন আপন মনে হচ্ছে, যা আগে কখনো হয়নি। আর একটা ভাবনা আস্তে আস্তে মনে দানা বাঁধছে। হিন্দু কমরেড, মুসলিম কমরেড, আগে ভাবতাম কমরেডটাই আগে, ধর্মীয় পরিচয়টা পরে। আজ যেন মনে হচ্ছে, ‘আমি বোধহয় আগে হিন্দু পরে কমরেড’। 
মনে পড়ছে, আমার কত আত্মীয় ইন্ডিয়ায় চলে গেছে। তাদেরকে মনে মনে কত ধিক্কার দিয়েছি নিজের জন্মভূমি মাতৃভূমিকে ছেড়ে যাওয়ার জন্য। রবীন্দ্রনাথের কবিতার সেই লাইনগুলো তখন খুব আওড়াতাম। “সপ্তপুরুষ যেথায় মানুষ সে মাটি সোনার বাড়া”, ইত্যাদি। আজ মনে হচ্ছে ওই আত্মীয়রা ইন্ডিয়ায় যায়নি।ইন্ডিয়ার ভরসায় যায়নি। হিন্দুস্থানে গেছে। হিন্দুর ভরসায় গেছে। কোন রাজনৈতিক দল বা নেতার ভরসায় যায়নি। জাতভাইদের ভরসায় গেছে, একই রক্তের ভরসায় গেছে। আগে এই বাংলাদেশের মাটির উপর নিজের যে অধিকার অনুভব করতাম, ৬ ই ডিসেম্বরের (১৯৯২) পর সেই ভরসাটাই যেন টলে গেছে। আর এখন তো ২৯% থেকে ৯% এ এসে দাঁড়িয়েছি। তাই মনে হয়, আমারও শেষ ভরসা কি ওই হিন্দু ইন্ডিয়াতেই?৬ ই ডিসেম্বর ১৯৯২ দিনটা যেন বাংলাদেশের হিন্দু কমরেডদের জীবনে একটা watershed (এর বাংলা কী হবে এখনই মাথায় আসছে না)। একটা প্রচন্ড জোর আঘাতে যেন তার নবজন্ম হল। তাদের মনে হয়, এ যেন এক নতুন আমি। আগে বাজপেয়ী আদবানিকে সাম্প্রদায়িক মনে করতাম। আর এখন মোদীর উত্থানে মনের ভিতর থেকে কোথায় যেন একটা ভরসা পাই, আশ্বস্ত হই। অমিত শাহ কে দেখে মনের খুব ভিতরে যেন একটা পুলক জাগে। নিজেই নিজেকে দেখে অবাক হয়ে যাই। প্রশ্ন করি – আমিই কি বাংলাদেশের সেই কমরেড?

( তপন কুমার ঘোষ- বাংলার হিন্দুত্ব আন্দোলনে এক উজ্জ্বল নাম। হিন্দু সংহতির প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রাক্তন সভাপতি)

We are not big media organisation. Your support is what keeps us moving. Don't hesitate to contribute because, work, for society needs society's support. Jai Hind.