চৈতন্য আন্দোলনঃ ধর্মীয় না বিপ্লবী?

0
135

© তমাল দাশগুপ্ত

আউল-বাউল কথাটা এসেছে আকুল-ব্যাকুল থেকে। আজকের আলোচনায় এই আউল-বাউল শব্দটি আমাদের দিকনির্দেশ করতে চলেছে, তাই প্রণিধান করুন। এবার প্রসঙ্গে আসি।
চৈতন্য আন্দোলন সম্পর্কে এরকম কথাও বলা হয়েছে যে আসলে উনি ছিলেন একজন বিপ্লবী, বৈষ্ণব ধর্ম ছিল ছদ্মবেশ। পুরোটাই রাজনৈতিক আন্দোলন, বাংলায় বাঙালির ঘুরে দাঁড়ানোর প্রয়াস। মানে বৈষ্ণবরাই মধ্যযুগের বলশেভিক আর কি।
এরকম একটা কথা অনেক চৈতন্য জীবনীতে লেখা হয়, ঠিক এভাবে লেখা না হলেও এই স্পিরিটে বক্তব্য রাখা হয়। 
এখন, শুনুন। ঠিক এই কথা, ঠিক এই কথাটাই যীশু সম্পর্কেও বলা হয়েছে। যে উনি আসলে ছিলেন বিপ্লবী, ধর্মের বেশে সমাজবিপ্লবী। বস্তুত চৈতন্য আন্দোলনকে বিপ্লবী প্রমাণ করতে চাওয়ার পেছনে এই পশ্চিমী তত্ত্বের প্রভাব আছে যে যীশুও বিপ্লবী ছিলেন।
যীশুর ধর্ম আন্দোলন কি নিছক বিপ্লবী? না, এ আসলে সরলীকরণ। টেরি ইগলটনের একটা সুন্দর লেখা (সেটা আসলে ওর সম্পাদনা করা ক্রিশ্চান গস্পেলের ভূমিকা) আছে এই নিয়ে, ভার্সো থেকে বেরয়। 
তাতে ইগলটন বলছেন, যীশু সত্যি ঈশ্বরবিশ্বাসী ছিলেন, তার সম্পূর্ণ আস্থা ছিল আব্রাহামিক পরমপিতার ওপরে। কাজেই এদিক থেকে তিনি বিপ্লবীরা যা হয় (যুক্তিবাদী, বাস্তববাদী, প্ল্যানমাফিক), তার তুলনায় বেশ খানিকটা কমই ছিলেন, একটা ডিসপ্লেসমেন্ট ছিল বলা যায়।
কিন্তু তিনি বিশ্বাস করতেন এক আমূল পরিবর্তনে, বিপ্লবীদের মত স্রেফ অর্থনৈতিক-সামাজিক-রাজনৈতিক পরিবর্তন নয়, উনি বিশ্বাস করতেন পৃথিবীতে অন্যরকম মানুষ আসবে, কারণ শেষবিচারের দিন আসন্ন। বিপ্লবীরা আধ্যাত্মিক পরিবর্তনের কথা বলেন না, যীশু যেহেতু বলতেন, এই হিসেবে তিনি বিপ্লবীরা যা হয় তার তুলনায় বেশ খানিকটা বেশিই ছিলেন, অর্থাৎ এক্ষেত্রেও বিপ্লবের লোগোসকে যীশু খানিকটা ডিসপ্লেস করেছেন।
ইগলটনের বিখ্যাত উক্তি, Jesus was both more and less than a revolutionary.
চৈতন্য সম্পর্কেও এরকম একটা কথা আমি বলতে চাই। চৈতন্য বিপ্লবী ছিলেন না। তিনি বিপ্লবীর থেকে খানিকটা বেশি ছিলেন। আবার বিপ্লবীর থেকে খানিকটা কমও ছিলেন। তিনি আউলবাউল ছিলেন।
চৈতন্য নিছক বিপ্লবী ছিলেন না, আবার নিছক ভাবোন্মাদ ছিলেন না। তিনি একজন বিপ্লবীর থেকে বেশি ছিলেন, বিপ্লবীর থেকে কমও ছিলেন। ধর্মীয় ভাবান্দোলন এবং বিপ্লবী পরিবর্তনের সবথেকে আশ্চর্য সংশ্লেষের উদাহরণ সম্ভবত চৈতন্য আন্দোলন কর্তৃক কাজি দলন। 
অর্থাৎ, এবং আমার এই পোস্টে এইটাই সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট, চৈতন্য আন্দোলনে কিন্তু বিপ্লব ও ধর্ম দুটোই বিনির্মিত হচ্ছে।
বিপ্লবী বড় বেশি বহিরঙ্গে মজে আছে। সে বড় বেশি ইতিহাসের, সমাজতত্ত্বের। সে বড় বেশি অর্থনীতির। দিনবদলের সময়ে সে স্লোগান। দর্শনে সে কার্ল মার্ক্স।
অন্যদিকে ধর্ম অনেক বেশি কবিতা। অন্তর্লীন। প্রেম। সংস্কৃতি। দুর্গাপুজোর শরতকালের মত বড় বেশি কাশফুল। মহালয়ায় সে বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্রের স্তোত্রপাঠ। দর্শনে সে নিরীশ্বর সাংখ্যের পুরুষ প্রকৃতি।
দুটোই অসামান্য, কিন্তু দুটোই নিজের নিজের জায়গায় সীমাবদ্ধ।
তাই এ দুটোই একে অন্যের থেকে শিখেছে বারবার। অগ্নিযুগের বিপ্লববাদ নিয়ে আমাদের অনেক পাঁড় আঁতেলই দুচ্ছাই করেন। কি সব গীতা হাতে করে, কি সব কালিমূর্তির সামনে শপথ, কি সব যাচ্ছেতাই বন্দেমাতরম। এটা তারা বোঝেন না, বিপ্লবও ধর্ম থেকে সমৃদ্ধ হতেই পারে, বারবার হয়েছে পৃথিবীর সর্বত্র।
ল্যাটিন অ্যামেরিকার কোনও চিন্তাবিদ অবিশ্যি লিবারেশন থিওলজি নিয়ে এমন দুচ্ছাই করেছেন বলে আমার জানা নেই।
কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্যাথলিক লেফট ছিল, অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা টেরি ইগলটন।
বিপ্লবের যে চিরাচরিত সীমারেখা আমরা দেখি, সেই বাউন্ডারি ভাঙার সময় হয়ে গেছে। সেই সঙ্গে ধর্মকেও ভাঙার সময় এসেছে।
নয়ত বাঙালির মধ্যে বিপ্লবের একচেটিয়া ঠিকেদার হবে একদল কাঠগোঁড়া বামপন্থী (অথবা কফি হাউসে তাদের সৌখিন কাউন্টারপার্ট), আর ধর্মের ঠিকেদার হবে একপাল গেরুয়া কাঠচাড্ডি (অথবা কর্পোরেট জগতে তাদের সৌখিন কাউন্টারপার্ট)।
চৈতন্য আন্দোলন থেকে তাই আজকের বাঙালিকে শিখতে হবে। গৌর-নিতাই আউলবাউল ছিলেন। ওঁরা দুজন ধর্ম এবং বিপ্লবের আমূল বিনির্মাণ ছিলেন। ওঁরা আমাদের আগামীর পথনির্দেশ করে গেছেন।

(এটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল মাৎসন্যায় অন্তর্জাল পত্রিকায়)

We are not big media organisation. Your support is what keeps us moving. Don't hesitate to contribute because, work, for society needs society's support. Jai Hind.