বাঙালীর কাছ থেকে তার নববর্ষ চুরির বাংলাদেশী ষড়যন্ত্র ফাঁস

0
13


© স্মৃতিলেখা চক্রবর্তী

গত বছরের কথা। বঙ্গাব্দ নিয়ে আকবর তত্ত্বে ছেয়ে গেছিল পশ্চিমবঙ্গের বাংলা কাগজ গুলো। তারই মধ্যে একটা বিখ্যাত পোর্টাল একটু অন্যরকম ভাবে এই বিষয়ে একটি লেখা বের করে। শিরোনামটা বেশ বিস্ফোরক। “বাঙালিদের কোনও কৃতিত্ব নেই। পয়লা বৈশাখের সূচনা করেছিলেন মহামতি আকবর”! শুধুমাত্র এই শিরোনামের জন্যই, লেখাটা আমার সব থেকে বেশি ভাল লেগেছিল। কোন লুকোলুকির ব্যাপার নেই। একদম সোজা-সাপ্টা স্বীকার করে নেওয়া  হয়েছে যে এরা ঠিক কি চায়। বঙ্গাব্দে “বাঙালিদের কোন কৃতিত্ব নেই”, এটা যে কোন ভাবে প্রমাণ করাটাই এদের ঘোষিত লক্ষ্য। 
 আকবরের বঙ্গাব্দ চালু করার কোন ইতিহাস না থাকলেও, বঙ্গাব্দের আকবর তত্ত্বের কয়েক দশকের ইতিহাস আছে। ঘটনার সূত্রপাত পাকিস্তানি আমলে।  পাকিস্তান পন্থী বুদ্ধিজীবীরা চেয়েছিলেন বাঙালির থেকে তার ইতিহাস, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য কেড়ে নিয়ে  বাঙালিকে অন্যদের মানসিক দাসে পরিণত করতে। সেজন্যই দরকার ছিল বাংলার বাইরের কোন ব্যক্তিকে বঙ্গাব্দের কৃতিত্ব দেবার। তাই ১৯৬৬ সালে পূর্ব পাকিস্তানে এমন একটি কমিটি গঠিত হয়, যার লক্ষ্য ছিল আকবরকে বঙ্গাব্দের প্রবর্তক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। সরকারি ভাবে এই কমিটির নাম ছিল “পঞ্জিকা সংস্কার কমিটি”।
দায়িত্ব পেয়েই এই বিষয়ে একটি সুদীর্ঘ রচনা লিখে ফেলেন কাজী দীন মোহাম্মদ। এই রচনার মূল বক্তব্য ছিল আকবর প্রবর্তিত বর্ষপঞ্জি তারিখ-ই-ইলাহীই হল বাঙালির বঙ্গাব্দ। এবং বঙ্গাব্দের গণনা পদ্ধতি নাকি আরবি বছর হিজরীর সাথে সঙ্গতি পূর্ণ। এরকম উদ্ভট এবং হাস্যকর দাবি কাজী দীন মোহাম্মদই প্রথম তোলেন। এরপরে ওই অসঙ্গতি পূর্ণ লেখাটিকে প্রামাণ্য তত্ত্বের রূপ দিতে ডাক পড়ল জনাব গোলাম সামদানীর। লেখাটি ছেপে বেরোল জনাব গোলাম সামদানীর বাংলা একাডেমি পত্রিকায়। ধীরে ধীরে পূর্ণতা পেতে লাগল বঙ্গাব্দকে বাঙালির থেকে কেড়ে নেবার চক্রান্ত।
 এরপরেই আসরে নামেন মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ। এই শহীদুল্লাহ ছিলেন মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তানের অন্যতম সমর্থক। বাংলায় কথা বলা মুসলমান যে কোনোভাবেই বাঙালি নয়, এটা শহীদুল্লাহ মনে মনে ঠিকই জানতেন। তাই ইনি মনে করতেন মুসলিম দেশের রাষ্ট্রভাষা বাংলা বা উর্দু না হয়ে আরবী হওয়াই উচিত। কারণ “মুসলমানের জাতীয় ভাষা আরবী”-ই। ফলে কাজী দীন মোহাম্মদের লেখাটা মোহাম্মদ শহীদুল্লাহর বিশেষ ভাবে পছন্দ হয়। কারণ ওই লেখাতে আরবি বর্ষপঞ্জি হিজরীর সাথে বঙ্গাব্দ গণনা পদ্ধতির মিল দেখানোর চেষ্টা করা হয়। তাই পঞ্জিকা সংস্কার কমিটির প্রধান হিসেবে মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ সুপারিশ নং ৪-এর মাধ্যমে মোগল সম্রাট আকবরকেই বঙ্গাব্দের জনক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে দেন।
 মজার ব্যাপার হল, আকবরের রাজসভায় লিখিত আকবরনামা বা আইন-ই-আকবরীর কোন অংশেই বাংলার জন্য আলাদা বছর চালুর কথা লেখা নেই। এমন কি, খুব পরিষ্কার ভাষায় আইন-ই-আকবরীতে লেখা রয়েছে যে আকবর একটিই বর্ষ চালু করেন, যার নাম “তারিখ ই ইলাহী”! এবং এই তারিখ-ই-ইলাহীও কিন্তু আরবের হিজরী সালের গণনা অনুযায়ী তৈরি হয়নি। কারণ, আকবর হিজরী সন পছন্দ করতেন না। সেজন্যই আকবর প্রবর্তিত তারিখ-ই-ইলাহী তৈরি হয় “মালিকী সাল”-এর গণনা পদ্ধতির সাথে মিলিয়ে। 
 অথচ বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীরা আকবর, হিজরী এবং বঙ্গাব্দকে মিলিয়ে মিশিয়ে একটা কাল্পনিক খিচুড়ি বানিয়ে ফেলেছেন। তাঁদের বানানো গল্পটা হল এরকম। আকবর সিংহাসনে বসেন ইংরেজি ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দে। ওই বছর ছিল ৯৬৩ হিজরী সাল। সিংহাসনে বসার সনটিকে স্মরণীয় করে রাখতে বাংলায় বঙ্গাব্দ চালু করেন আকবর। এবং যেহেতু সেই বছরটি ছিল ৯৬৩ হিজরী, তাই প্রথম বঙ্গাব্দটিও হয় ৯৬৩ বঙ্গাব্দ! এই আকবর তত্ত্বের সবথেকে বড় মুশকিল হচ্ছেন আকবর নিজে। আইন-ই-আকবরীতে বেশ গোদা গোদা অক্ষরে লেখা রয়েছে যে আকবর হিজরী সন পছন্দ করতেন না বলেই তারিখ-ই-ইলাহী চালু করেন। তো যিনি হিজরী সন পছন্দই করতেন না, তিনি সেই হিজরী গণনা অনুযায়ী বঙ্গাব্দ বানাবেন কেন?
তাছাড়া আইন-ই-আকবরীতে আরো লেখা রয়েছে, তারিখ-ই-ইলাহির প্রথম বছর সেটাই, যেই বছর আকবর সিংহাসনে বসেন। অর্থাৎ ইংরেজি ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দই হল তারিখ-ই-ইলাহী ১ম বছর। অর্থাৎ ইংরেজির ২০২০ খ্রিস্টাব্দে হবে তারিখ ই ইলাহী (২০২০-১৫৫৬) ৪৬৪ অব্দ। অথচ এই বছর পূর্ণ হবে ১৪২৭ বঙ্গাব্দ। আকবর যদি তারিখ-ই-ইলাহী এবং বঙ্গাব্দ এই দুটোই চালু করে থাকেন, তাহলে বর্ষের সংখ্যাতে মিল থাকা অবশ্যই উচিত ছিল। 
আরো আশ্চর্যের বিষয়, তারিখ-ই-ইলাহীর মাসের নামের সাথেও বাংলা বছরের মাসের নামের কোন মিল নেই। তারিখ-ই-ইলাহির প্রথম মাসটি হল “ফরোয়ার মাহ ই ইলাহী”! অথচ বাংলার প্রথম মাস বৈশাখ। ভারতের অন্যান্য সমস্ত রাজ্যের হিন্দু পঞ্জিকাতেই তাই। দ্বিতীয় মাসটি যেমন অর্ধিবিশত মাহ-ই-ইলাহী। বাংলার দ্বিতীয় মাস হল জৈষ্ঠ্য। এইভাবে তারিখ-ই-ইলাহির বাকি মাসের নামগুলো সবই ওই “মালিকি সাল” থেকে নকল করা। একজন বাদশা তার সাম্রাজ্যের সমস্ত অংশে তারিখ-ই-ইলাহী চালু করবেন, আর শুধুমাত্র বাংলার জন্য বঙ্গাব্দ চালু করবেন, এ কি হয়? 
আকবর তত্ত্বে সমস্যা আরো আছে। আকবর নিজের সাম্রাজ্যকে ১২ টি সুবা (রাজ্য) তে ভাগ করেন। বাংলা, বিহার, উড়িষ্যাকে নিয়ে তৈরি হয় সুবা-ই-বাঙ্গাল। যদি ধরেও নিই, আকবর শুধুমাত্র বাংলার জন্যই বঙ্গাব্দ বানান, তাহলেও সেটা হবে সুবা-ই-বাঙ্গালের জন্য। অর্থাৎ বাংলা, বিহার এবং উড়িষ্যার জন্য। বিহার বা উড়িষ্যাতে বঙ্গাব্দের প্রচলন আছে বা ছিল, এরকম অদ্ভুত কথা কেউ কখনো শুনেছেন? অতএব তারিখ-ই-ইলাহী এবং বঙ্গাব্দের মাসের নাম, গণনা পদ্ধতি, কত তম সাল এসবে কোন মিলই খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। বরং বিপক্ষে প্রমাণই মিলছে ভুরি ভুরি।
তবে সংস্কৃতির দখলদাররা এসবে দমে যাবার পাত্রই নয়। পূর্ব পাকিস্তান নাম বদলে বাংলাদেশ হবার এক দশক পর ক্ষমতায় বসেন কর্নেল হুসেন মোহাম্মদ এরশাদ। ক্ষমতায় বসেই তার ধ্যানজ্ঞান হয়ে ওঠে বাংলা বর্ষপঞ্জির গণনা পদ্ধতি বদলে দেওয়া। একে সরকারিভাবে “পঞ্জিকা সংস্কার” নাম দেওয়া হলেও, আসল লক্ষ্য ছিল বঙ্গাব্দের থেকে আদি এবং প্রকৃত বাঙালির শেষ চিহ্ন টুকু মুছে দেওয়া। তারই অংশ হিসেবে মোহাম্মদ শহীদুল্লাহর কমিটির সুপারিশ নং ৪-কে মান্যতা দেন রাষ্ট্রপতি কর্নেল এরশাদ। সুপারিশ নং ৪ অর্থাৎ “বঙ্গাব্দের প্রতিষ্ঠাতা আকবর”! এক কলমের খোঁচায় প্রতিষ্ঠা হয়ে গেল এত বড় ভিত্তিহীন মিথ্যা। 
 এই নতুন তত্ত্বকে জনপ্রিয় করার বিপুল চেষ্টা হয় বাংলাদেশে। ওই দেশের সংখ্যাগুরু জনগণ এবং আকবর সমধর্মী হওয়ায় বিপুল ভাবে সমাদৃত হয় এই তত্ত্ব। এরপর ধীরে ধীরে চেষ্টা করা হয়, বাঙালির শেষ আশ্রয় পশ্চিমবঙ্গে এই তত্ত্ব আমদানি করার। 
পশ্চিমবঙ্গে এই তত্ত্ব আমদানি করার প্রধান নায়ক হলেন অমর্ত্য সেন। যিনি সংখ্যাগুরু মুসলমানের হাতে পূর্ব পাকিস্তানে বেঁচে থাকা ২২% আদি বাঙালির গণহত্যাকে বলেছিলেন “স্বতঃস্ফূর্ত ভুমিসংস্কার”। অমর্ত্য সেনের আকবর ভক্তির সমর্থনে যোগ দেয় আনন্দবাজার, Scroll, News18 বাংলা ইত্যাদি বাম মানসিকতার মিডিয়া গ্রূপ। লক্ষ্য একটাই। বাঙালিকে বোঝানো যে “বাঙালির আসলে কোন কৃতিত্ব নেই”! বাঙালির নববর্ষ, তার সংস্কৃতি-গণনা পদ্ধতি কোন কিছুই তার নিজের নয়। 
কোন মানুষের থেকে তার সম্পদ চুরি করা একটা অপরাধ। কিন্তু কোন জাতির থেকে তাদের সম্পদ কেড়ে নেওয়া আরো বড় অপরাধ। কিন্তু ক্ষমাহীন অপরাধ হল নিজেদের জাতীয় সম্পদ বিনা বাধায় অন্যকে কেড়ে নিতে দেওয়া। সেই ক্ষমাহীন অপরাধ আমরা এতদিন ধরে করে এসেছি। বঙ্গাব্দের চক্রান্ত একদিনে হয়নি, বহু বছর ধরে হয়েছে। একটু একটু করে ওরা এগিয়েছে আর আমরা চোখ দুটোকে বন্ধ করে রেখেছি। এখনই সময় প্রতিবাদ করার, মহারাজ শশাঙ্ক প্রবর্তিত বঙ্গাব্দে আমাদের একমাত্র অধিকার প্রতিষ্ঠা করার। 
জয় বঙ্গ, জয় শশাঙ্ক। 
তথ্যসূত্র: 
১) “বাঙালির কোন কৃতিত্বই নেই”- https://www.google.com/amp/s/bengali.news18.com/amp/news/features/not-bengalees-but-akbar-the-great-initiated-poila-boisakh-299715.html
২) আইন-ই-আকবরী:- https://persian.packhum.org/main?url=pf%3Fauth%3D7%26work%3D002

We are not big media organisation. Your support is what keeps us moving. Don't hesitate to contribute because, work, for society needs society's support. Jai Hind.

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here