নোয়াখালী গণহত্যা- (১১)

শ্রী চপলাকান্ত ভট্টাচার্য

অষ্টম অধ্যায়ঃ

পুনৰ্বসতি ও জেনারেল বুসারঃ

অক্টোবর মাসে নোয়াখালি-ত্রিপুরায় আমাদের প্রথম পরিদর্শনের অব্যবহিত পরেই ঘুরিয়া আসিয়া ইষ্টার্ণ কমাণ্ডের জিওসি-ইন-সি লেঃ জেনারেল বুসার লালদীঘির দপ্তরখানায় ২৬শে অক্টোবর তারিখে এক প্রেস কনফারেন্স আহ্বান করিয়া আপনার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেন। ইহাতে উপস্থিত ছিলাম, দেখিলাম জেনারেল বুসার অবস্থার গুরুত্ব একেবারেই যেন উড়াইয়া দিয়া বলিলেন, ১০/১৫ দিনের মধ্যেই লোকের নষ্ট আস্থা ফিরাইয়া আনিব এবং তিন সপ্তাহের মধ্যেই পুনৰ্ব্বসতি করাইয়া দিব। অব্যবহিত পূৰ্বেই অবস্থাটা স্বচক্ষে দেখিয়া আসিয়াছিলাম। সুতরাং বিস্ময়ে অবাক হইয়া সাহেবকে কলিকাতার অবস্থাটা স্মরণ করাইয়া দিলাম। বৃটিশ সাম্রাজ্যের অন্যতম প্রধান নগরী কলিকাতা-বাঙলার রাজধানী। এইখানে একেবারে গভর্ণমেন্টের নাকের উপর সহরের পূৰ্বাঞ্চল হইতে শান্তিপূর্ণ অধিবাসীরা ১৬ই আগষ্টের সাম্প্রদায়িক আক্রমণের ফলে সেই যে হঠিয়া আসিয়াছে দুই মাসের মধ্যেও গবর্নমেন্ট তাহাদিগকে স্ব স্ব স্থানে ও আবাসে পুনরায় বসাইতে পারেন নাই। এই অবস্থায় বিশ্বাস করিতে হইবে যে বাঙলার প্রান্তবর্তী এই জেলার অভ্যন্তরভাগ হইতে উৎসাদিত এবং কল্পনাতীত প্রকারে উৎপীড়িত একটা গোটা সমাজকে তিন সপ্তাহের মধ্যেই পুনরায় বসাইয়া দেওয়া যাইবে? কথাটা সাহেবের ভাল লাগে নাই। তিনি আরও জোর করিয়া বলিলেন, “হ্যাঁ করিবই, যদি না পারি; তখন আমাকে অভিসম্পাত করিবেন।”
তাঁহার এই উক্তি শুনিয়া তখনই সকলে বুঝিতে পারিয়াছিল যে, তিনি প্রকৃত অবস্থা কিছুই প্রত্যক্ষ করেন নাই, স্থানীয় শাসনকর্ম্মচারীরা যাহা সাজাইয়া গুছাইয়া বুঝাইয়া দিয়াছে, তিনি তদনুযায়ী কথা কহিতেছেন। জেনারেল বুসারের এই উক্তির তিনসপ্তাহাধিককাল পরে পুনরায় দেখিতে গিয়া জেলার বিধ্বস্ত ও জনশূন্য অঞ্চলসমূহের মধ্য দিয়া নিঃশব্দে পরিভ্রমণ করিতে করিতে জেনারেল বুসারের এই কথা সৰ্ব্বক্ষণ স্মরণ হইত এবং বিস্মিত হইয়া ভাবিতাম—এত বড় দায়িত্বপূর্ণ সরকারী পদে অধিষ্ঠিত কৰ্ম্মচারী এত বড় অবিশ্বাস্য কথা কহিলেন কেমন করিয়া? যে সকল স্থানীয় কর্মচারী তাহাকে এই অভিমত গঠনের তথ্য যোগাইয়াছে তাহারাই বা কিরূপে এমন দায়িত্বজ্ঞানহীনের মত কাজ করিল?

বুসারের ভ্রমণ ও সিদ্ধান্তঃ

জেনারেল বুসারের কথাটা বিশেষ করিয়া উঠাইলাম, কারণ ঘটনার ও অবস্থার সহিত তুলনায় তাহার অভিমত যতই অসার হউক ইহার অন্য একটা গুরুত্ব আছে। তিনি আপনার মতানুযায়ী ভারত গবর্ণমেন্টের নিকট একটা রিপোর্ট পেশ করেন। সম্ভবত সেই রিপোর্টের ভিত্তিতে ভারত গবর্ণমেন্টের অভিমত গঠিত হইয়া বিলাতে প্রেরিত হইয়াছে। জেনারেল বুসার ২০শে অক্টোবর কলিকাতায় আসেন; ২১শে অক্টোবর রাত্রিতে কলিকাতা হইতে রওয়ানা হইয়া ২২শে চাঁদপুর পৌঁছেন; তথায় ব্রিগেডিয়ার থাপারের সহিত আলোচনা করিয়া চাঁদপুর হইতে লাকসাম, লাকসাম হইতে সোনাইমুড়ী, তথা হইতে চৌমুহনী এবং নোয়াখালি হইয়া (অর্থাৎ উপদ্রুত অঞ্চলের বাহির হইতে উহার উত্তর ও পূর্ব সীমান্ত দিয়া) দুই দিনে ভ্রমণ সারিয়া কলিকাতায় ফিরিয়া আসেন। এই নিতান্ত সংক্ষিপ্ত বহিরঙ্গ দর্শন ও অভিজ্ঞতার উপরে নির্ভর করিয়া তিনি ভারত গবর্ণমেন্টের নিকট যে রিপোর্ট – দিয়াছেন, সে রিপোর্টটি কিন্তু সংক্ষিপ্ত নহে। রিপোর্টটি তিনি প্রেস কনফারেন্সে দেখাইয়াছিলেন এবং তাহা হইতে কিছু কিছু পড়িয়াও শুনাইয়া ছিলেন।

ভারত গবর্ণমেন্টের নিকট পেশ করিবার জন্য রচিত সুদীর্ঘ রিপোর্ট হইতে জেনারেল বুসার অনুগ্রহ করিয়া যেটুকু প্রেস কনফারেন্সে পড়িয়া শুনাইয়াছিলেন, তাহাতে তাহার অভিমত খানিকটা জানা গিয়াছিল এবং প্রাসঙ্গিক আলোচনায় জানা গিয়াছিল আরও কিছু। লিখিত রিপোর্ট হইতে পাওয়া গেল তাঁহার তিনটি সিদ্ধান্তঃ-
(১) উপদ্রুত অঞ্চলে সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে সম্প্রদায়ের সাধারণ অভ্যুত্থান ঘটে নাই।
(২) উপদ্রব করিয়াছে বহিরাগত গুণ্ডারাই—স্থানীয় লোক কিছু কিছু তাহাদের সঙ্গে যোগ দিয়াছিল।
(৩) উপদ্রবের চূড়ান্ত বিবরণে প্রমাণিত হইবে যে, উহার প্রাথমিক সংবাদে অত্যন্ত অত্যুক্তি করা হইয়াছিল (grossly exaggerated )।
ইহার পর আলোচনাপ্রসঙ্গে প্রশ্নোত্তরে জেনারেল বুসার তাঁহার এই সকল সিদ্ধান্তের হেতু কিছু কিছু প্রকাশ করেন। সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে সম্প্রদায়ের ব্যাপক সাধারণ অভ্যুত্থান ঘটে নাই এই সিদ্ধান্তের হেতুস্বরূপে তিনি বলিলেন তাহা হইলে সহরগুলি রক্ষা পাইত না; কিন্তু বস্তুতঃ সহরগুলি আক্রান্ত হয় নাই। এই সিদ্ধান্ত একবার মানিয়া লইলে পরবর্তী সিদ্ধান্তটিও সঙ্গে সঙ্গেই আসিয়া পড়ে যে, উপদ্রব সংঘটিত হইয়াছে প্রধানতঃ বহিরাগত ও কিছু কিছু স্থানীয় গুণ্ডাদের দ্বারাই। যে বিস্তৃত এলাকা জুড়িয়া দিনের পর দিন ব্যাপক উপদ্রব চলিয়াছে তাহা স্মরণ করাইয়া দিয়া তাহাকে জিজ্ঞাসা করিয়াছিলাম— ‘মাত্র গুণ্ডার দ্বারা ইহা সম্ভব কিনা’। উত্তরে তিনি বলিয়াছিলেন “কেন হইবে না? হাজারখানেক গুণ্ডার দ্বারা ইহা বেশ ঘটিতে পারে, প্রতি ২০ বর্গ মাইলের জন্য ৫ জন গুণ্ডাই যথেষ্ট।” ১০ হাজার, ১৫ হাজার লোক মিলিয়া এক একটি অঞ্চল আক্রমণ করিয়াছে এ কথাটাকে তিনি একেবারে উড়াইয়াই দিলেন, বলিলেন—“১৫ হাজার লোকের দাঁড়াইতে কত জায়গা লাগে, একবার হিসাব করিয়া দেখিয়াছেন কি—৫ মাইলের কম নহে।” এইরূপ যাহার ধারণা তিনি যে বলিবেন প্রাথমিক রিপোর্টে অত্যন্ত অত্যুক্তি করা হইয়াছে এবং চূড়ান্ত রিপোর্টে তাহাই প্রমাণিত হইবে—ইহা কিছুমাত্র বিচিত্র নহে।

তৈয়ারী-করা পাঠের পুনরাবৃত্তিঃ

দুই দিনের মধ্যে উপদ্রুত অঞ্চলের বাহির দিয়া কয়েকটি সহর পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা লইয়া জেনারেল বুসারের এই বিবৃতি প্রেস কনফারেন্সে শুনিবার সময়েই অনুভব করিয়াছিলাম যে, নোয়াখালি ও ত্রিপুরার শাসনকর্মচারীদের তৈয়ারী-করা পাঠই তিনি আমাদের সম্মুখে পড়িয়া যাইতেছেন এবং তাহাই রিপোর্টের আকারে ভারত গবর্ণমেন্টের নিকট যাইতেছে। নোয়াখালি-ত্রিপুরার অভ্যন্তরের অবস্থা স্বচক্ষে দেখিয়া অবধি এই রিপোর্টের ভিত্তিহীনতা বিশেষভাবেই উপলব্ধি করিয়াছি। সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে সম্প্রদায়ের ব্যাপক সৰ্ব্বসংহারী আক্রমণ ঘটিয়াছিল কি না সে বিষয়ে জেনারেল বুসারের কিছু মাত্র সংশয় থাকিত না যদি তিনি অভ্যন্তরের অবস্থা স্বচক্ষে দেখিতেন এবং যে শাসনকর্মচারীদের অক্ষমতায় বা ঔদাসীন্যে উপদ্ৰবকারীরা সুযোগ পাইয়াছিল, তাহাদেরই কথা বেদবাক্য বলিয়া মানিয়া না লইতেন। সহর কয়টিতে উপদ্রব না ঘটিবার হেতু প্রেস কনফারেন্সে যাহা বলিয়াছিলাম, তাহাই এখন অধিকতর দৃঢ়তার সহিত পুনরায় বলিতে পারি—প্রথম কারণ, উপদ্রুত সম্প্রদায়ের সহরে সংখ্যাধিক্য ও প্রভাবাধিক্য; দ্বিতীয় কারণ, সহরে শাসনকর্মচারীদের অবস্থিত্তি, তৃতীয় কারণ, বাহিরের দৃষ্টি হইতে যতটা সম্ভব এবং যতদিন সম্ভব অন্তরাল রাখিয়া নির্ধারিত অঞ্চলে উপদ্ৰবকারীদের নির্বিবাদে অভিপ্রায় সিদ্ধির আকাঙ্ক্ষা; সহর শুদ্ধ ঘটাইয়া লইলে ইহা কোনমতেই সম্ভব হইত না। কেবল সহর কেন? উপদ্রুত অঞ্চলের প্রধান রাজপথের দুই পার্শ্ব দেখিয়া আসিয়াও জেনারেল বুসার এই কথাই বলিতে পারিতেন। পথের দুই পার্শ্ব ছাড়িয়া দিবার কারণ যাহা, সহর কয়টি ছাড়িয়া দিবারও অন্যতম কারণ তাহাই। ব্যাপক অভ্যুত্থানের কথা অস্বীকার করিবার জেনারেল বুসরের আর একটা কারণ এই যে, ১৫ হাজার লোকের দাঁড়াইতেই ৫ মাইল জায়গা লাগিয়া যায়। হয়তো মিলিটারী মস্তিষ্কের হিসাবে তাহাই লাগে। আমরা কিন্তু নিত্যই দেখিয়া থাকি ১৪/১৫ হাজার লোকের সভা কলিকাতার একটা পার্কের এক কোণে পড়িয়া থাকে। চূড়ান্ত বিবরণের দ্বারা ঘটনার প্রাথমিক বিবরণ খণ্ডিত হইবে ইহাই জেনারেল বুসারের অভিমত। কিন্তু সত্যকার চূড়ান্ত বিবরণ যদি কোনদিন প্রকাশিত হয়, তাহা নিঃসংশয়ে প্রমাণ করিবে যে ঘটনার সামান্য অংশই প্রাথমিক বিবরণে প্রকাশ পাইয়াছিল। তবে প্রশ্নোত্তরে এই একটা গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি জেনারেল বুসারের নিকট হইতে পাওয়া গিয়াছিল যে, নোয়াখালির স্থানীয় যাহারা এখনও মিলিটারীতে নিযুক্ত আছে তাহাদের মধ্যে কেহ কেহ এই উপদ্রবে অংশ গ্রহণ করিয়াছে বলিয়া ধরা পড়িয়াছে। জেনারেল বুসার বলিয়াছিলেন যে তাহাদের বিচারার্থ আদালতের নিকট সমর্পণ করা হইবে। আদালতের বিচার হইলে প্রকৃত তথ্য উদ্ঘাটনের বিশেষ সহায়তা হইত; কিন্তু শেষ পর্যন্ত সে সৎসাহস বোধ করি কর্তৃপক্ষের হইয়া উঠিল না। নোয়াখালির উপদ্রবকে লঘু করিয়া উড়াইয়া দিবার জন্য উর্দ্ধতনমহলে যে ষড়যন্ত্র চলিয়াছে বলিয়া অনুমিত হয় এইরূপ অপরাধীর প্রকাশ্য বিচারে তাহা সম্পূর্ণভাবেই ফাঁস হইয়া যাইত।

বুসারের অভিমত খণ্ডনঃ

নোয়াখালি-ত্রিপুরার স্থানীয় শাসনকর্ম্মচারীরা জেনারেল বুসারকে কি পাঠ প্রস্তুত করিয়া দিয়াছিলেন জানি না; জেনারেল বুসার ভারত গবর্নমেন্টকে যে রিপোর্ট দিয়াছেন, তাহাও প্রকাশিত হয় নাই। কিন্তু উপদ্রুত সম্প্রদায়ের অত্যন্ত নিরপেক্ষ ব্যক্তিরাও আক্রমণোদ্যোগের যে বিবরণ প্রদান করেন, তাহা জেনারেল বুসারের মতবাদকে সম্পূর্ণভাবেই খণ্ডিত করে। তাহাদের প্রদত্ত বিবরণমতে আক্রমণের উদ্যোগকার্যে ছিলঃ—
(১) প্রাইমারী স্কুলের শিক্ষক
(২) স্থানীয় হাইস্কুলের ও কলেজের ছাত্র
(৩) জেলায় প্রত্যাগত কলেজের ছাত্র
(৪) বেকারগণ। এই চতুর্থ শ্রেণীর মধ্যে পূর্বতন মিলিটারীদের ধরা যাইতে পারে। একটি সুবিদিত কিশোরীহরণের [করপাড়ায় নিহত রায় সাহেব রাজেন্দ্রনাথ রায় চৌধুরীর গৃহ হইতে অপহৃত নমিতা রায় চৌধুরী।] ব্যাপারে অগ্রবর্তী বলিয়া যিনি অভিযুক্ত তিনি স্থানীয় এক হাইস্কুলের সহকারী প্রধান শিক্ষক। একাধিক পাশব ও ব্যাপক হত্যাকাণ্ডের নায়ক [পূর্ব অধ্যায়ে উল্লিখিত গোপাইরবাগ গ্রামের দাস পরিবারের হত্যাকাণ্ডের নায়ক, আবুল কাসেম। এই ব্যক্তি তৎকালীন পাবনার জেলা ম্যাজিষ্ট্রেটের ভাগিনেয়।] কোনো ম্যাজিষ্ট্রেটের ভাগিনেয়। দ্বিতীয়টিকে এখনও গ্রেপ্তার করা হয় নাই। কিন্তু ইহা হইতেই সুস্পষ্ট হয় আক্রমণ কোন শ্রেণীর লোকের দ্বারা হইয়াছে এবং কিভাবে হইয়াছে। বাটাদল ও ডানলপদলের [বাটা কোম্পানী ও ডানলপ কোম্পানীর পূর্ববঙ্গবাসী এক শ্রেণীর মুসলমান কর্মচারী। কলিকাতায় ১৯৪৬ সালের ১৬ই আগষ্টের হাঙ্গামার পর ইহারা ছুটী লইয়া দল বাঁধিয়া পূর্ব্ববঙ্গে বিশেষতঃ নোয়াখালি ত্রিপুরা অঞ্চলে গিয়াছিল।] নাম ইতিপূর্বে প্রকাশিত হইয়াছিল। এই প্রসঙ্গে তাহারও পুনরুল্লেখ করা যাইতে পারে। মোটের উপর সম্প্রদায়বিশেষের আবালবৃদ্ধবনিতার অধিকাংশকে বা একটা বৃহৎ অংশকে যদি “গুণ্ডা” আখ্যা দেওয়া যায়, তাহা হইলেই নোয়াখালি-ত্রিপুরার আক্রমণকে গুণ্ডার আক্রমণ বলা যাইতে পারে, নতুবা নহে।

নোয়াখালি-ত্রিপুরার উপদ্রব বহিরাগতদের দ্বারা এবং প্রধানত গুণ্ডাদের দ্বারাই সংঘটিত হইয়াছে—এই মতবাদ যাঁহারা প্রচার করিয়াছেন, উপদ্রুত ও উৎখাতগণের পুনরাগমন ও পুনৰ্ব্বসতির তাঁহারাই প্রধান অন্তরায় এবং সর্বাপেক্ষা প্রবল প্রতিবন্ধক। স্থানীয় ক্ষুদ্রতর শাসকগণ ইহা উদ্ভাবন করিয়াছেন এবং বাহিরের বৃহত্তর শাসকগণ ইহা নির্বিবাদে গ্রহণ করিয়া এই কৈফিয়তে তাঁহাদের ও আপনাদের দায়িত্ব এড়াইতে চাহিয়াছেন। উপদ্রুত অঞ্চলের বাহির হইতে লব্ধ কয়েক ঘণ্টার মূল্যবান অভিজ্ঞতায় ভারত গবর্ণমেন্টের নিকট জেঃ বুসার কি রিপোর্ট দিয়াছিলেন তাহা যদি কোনোদিন প্রকাশিত হয়, তাহা হইলে বোঝা যাইবে উর্দ্ধতন ও অধস্তন কর্তৃপক্ষ মিলিয়া ভিতরে ভিতরে কি সাজাইতেছিলেন। বাহির হইতে দেখিয়া মনে হয় গুণ্ডাতত্ত্ব প্রবর্তনের দ্বারা উপদ্রবের একটা সহজগ্রাহ্য কৈফিয়ৎ উদ্ভাবন করা হইয়াছে এবং প্রকৃত উপদ্রবকারীদের দায়িত্ব এড়াইবার সুযোগ ঘটাইয়া দেওয়া হইয়াছে। নোয়াখালি হইতে এবং ত্রিপুরার অংশবিশেষ হইতে জনসমাজ যে উৎখাত হইল, তাহার প্রকৃত কারণ ইহার দ্বারা চাপা দেওয়া হইয়াছে। সুতরাং পুনৰ্ব্বসতির যাহা প্রকৃত বাধা তাহার প্রতিকারে বাধা দেওয়া হইয়াছে। প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষে এই দায়িত্ব হইতে জেনারেল বুসারও অব্যাহতি পাইবেন না।

বুসারের ব্যর্থতাঃ

জেঃ বুসারের নিশ্চয়তা দানের পর দুইমাস হইয়া গেল। এখনও, এবং মহাত্মাজীর উপস্থিতি সত্ত্বেও, উৎখাত জনমণ্ডলী স্বস্থানে ফিরিতে পারে নাই। নিশ্চয়তা ব্যর্থ হইলে জেনারেল বুসার তাঁহাকে অভিসম্পাত করিতে বলিয়াছিলেন। কাহাকেও অভিসম্পাত করিবার প্রবৃত্তি আমাদের নাই। কিন্তু আপনার উক্তির এই প্রকাণ্ড ব্যর্থতা হইতে এই অতি বিশ্বাসী অফিসারটি অনুতাপের সহিত উপলব্ধি করিয়া লউন বাস্তব অবস্থার সহিত তুলনায় তাহার প্রাথমিক অনুমান ও নির্ধারণ কত বড় হঠকারী এবং কত বড় মিথ্যা বলিয়া প্রমাণিত হইয়াছে; স্থানীয় কর্মচারীরা তাহাকে কি ভাবে বিভ্রান্ত করিয়াছে; তাহাদের দ্বারা বিভ্রান্ত হইয়া ভারত গবর্ণমেন্টের নিকট, তিনি যে রিপোর্ট দিয়াছেন তাহাতে কত বড় মিথ্যার প্রশ্রয় দেওয়া হইয়াছে এবং এই মিথ্যার প্রশ্রয়ের দ্বারা একটা দুর্গত জনসমাজের চরম দুঃসময়ের ক্ষণে কি ক্ষতি তিনি ঘটাইয়াছেন।
(২৭.১২.৪৬) (ক্রমশ)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!