দাঙ্গার শিক্ষা

0
214

© স্মৃতিলেখা চক্রবর্তী

অরিঞ্জয় বন্দ্যোপাধ্যায় করোনার প্রতিষেধক আবিষ্কার করতে চলেছেন। বাঙালি হিসেবে আমরা সকলেই খুব গর্বিত। বাঙালিদের মধ্যে মেধাবীর সংখ্যা প্রচুর। আমরা অজস্র বিজ্ঞানীর জন্ম দিয়েছি। কত শত রসায়নবিদ, পদার্থ বিজ্ঞানী, প্রযুক্তিবিদ; কি নেই বাঙালিদের মধ্যে? আমাদের ছেলেমেয়েরা স্বপ্ন দেখে বিদ্যা-বুদ্ধিতে অনেক বড় হবার, বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তিতে নতুন নতুন আবিষ্কার করার। আমি বুক ঠুকে বলতে চাই, “আমি বাঙালির গর্বে গর্বিত একজন বাঙালি।” কিন্তু….

কিন্তু আমি যখন দেখি, দিল্লি দাঙ্গার ছবি। ছাদের উপরে, রিক্সার পিছনে বসানো ওদের গুলতি গুলো; যেগুলোর লক্ষ্য দূরের হিন্দু বসতি এবং মন্দিরের উপর হামলা। যখন দেখি, তাসা-ব্যান্ড পার্টির ঘরের আড়ালে লুকিয়ে ওরা তৈরি করছিল ৫০০০ লিটার এসিড। আর সেই এসিড ভরা হচ্ছিল ফিনফিনে পাতলা প্লাস্টিকের থলিতে, কারণ ফিনফিনে প্লাস্টিকে এসিড ভরে রাখা যায়। কিংবা যখন দেখি, পুরোনো কোল্ড ড্রিঙ্কের বোতলে পেট্রোল ভরে, কাগজের লম্বা ছিপি দিয়ে তার মুখ আটকে ওরা বানাচ্ছিল পেট্রোল বোমা। যাতে আগুন ধরিয়ে গুলতিতে করে আমাদের উপর ছুঁড়ে পুড়িয়ে মারবে বলে। এমন কি, নিজেদের কোন কোন মহল্লাতে এলার্ম সিস্টেমও বসিয়েছিল ওরা। দরকার পড়লেই এলার্ম বেজে উঠবে আর সকলের কাছে জরুরি বার্তা পৌঁছে যাবে। তখন…

তখন মনে হয় কিসের পদার্থ বিজ্ঞান, কিসের রসায়ন বিদ্যা, কিসের প্রযুক্তি? এগুলো নিয়ে বাঙালিদের এত গর্ব করা সাজে না। সত্যি সত্যি যদি কোনোদিন গৃহযুদ্ধ লাগে, পারব আমরা আত্মরক্ষার জন্য ঐরকম গুলতি বানাতে? কিংবা আত্মরক্ষার জন্য চটজলদি ওরকম পেট্রোল বোমা তৈরি করতে? বা বাড়িতে এবং পাড়ায় যা আছে, তাই দিয়ে তক্ষুনি এমন কোন মারাত্মক অস্ত্র আবিষ্কার করতে, যা দিয়ে পরিবারকে রক্ষা করা যায়? দরকার পড়লে তড়িঘড়ি পাড়ায় পাড়ায় এলার্ম সিস্টেম লাগিয়ে ফেলতে, যাতে জরুরি নির্দেশ ঠিক সময়ে সময়ে পৌঁছে দেওয়া যায়? সুরক্ষার জন্য সম্পূর্ণ আটঘাট বেঁধে এরকম একটা পরিকল্পনার ছক আমরা ভাবতে পারব কোনদিনও? আর যদি এরকম ছক বানিয়েও ফেলি, সেটাকে বাস্তব রূপ দেবার মত যথেষ্ট দক্ষ লোক আমাদের মধ্যে আছে কি? অতএব…

অতএব সেসব যদি না পারি, তাহলে ধিক আমাদের। দিল্লি দাঙ্গা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল; সব থেকে বড় প্রযুক্তিবিদ, পদার্থবিদ এবং রসায়নবিদ ওরাই। ওরা যে কোন পদার্থকে, রাসায়নিককে নিজের হাতের তালুর মত চেনে। সেগুলোকে কিভাবে কাজে লাগাতে হয়, তার ব্যবহার জানে। এর থেকে বড় প্রযুক্তি আর কি হতে পারে? প্রযুক্তি মানুষের আরামের জন্য, সুবিধার জন্য, নিরাপত্তার জন্য। ওরা প্রযুক্তিকে নিজের জাতিগত সুবিধার্থে কাজে লাগাতে পারে, আমরা পারি না। তাই…

তাই আমি বাঙালির গর্বে গর্বিত নই; আমি বাঙালির চিন্তায় চিন্তিত। সেই বখতিয়ার খলজি থেকে শুরু করে নোয়াখালী, বরিশাল, ঢাকা, খুলনা, চট্টগ্রাম কিংবা ক্যানিং-উস্থি-দেগঙ্গা-কালিয়াচক-ধুলাগড় হয়ে আজকের হিন্দু বিরোধী দিল্লি দাঙ্গা। আমি চাই প্রতিটা পাড়ায়, চায়ের ঠেকে, রকের আড্ডায় বাঙালিরা এগুলো নিয়ে আলোচনা করুক। অসার, আদর্শবাজি, গুলতানি মারা আলোচনা নয়। নির্দিষ্ট, বস্তুনিষ্ঠ আলোচনা। ওরা কিভাবে যুদ্ধ সাজাল, কোন দিক থেকে আক্রমণ করল, কোন রাস্তা কাটল, কি কি জিনিসকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করল। সেসব জিনিসের সুবিধা কি, অসুবিধা কি। বই রিভিউ বা সিনেমা রিভিউ নয়; এখন বাঙালিদের উচিত গত হাজার বছরে ঘটা প্রতিটা হিন্দু-বিরোধী দাঙ্গার রিভিউ করা। কিসে আমরা মার খেলাম আর কি করলে বেঁচে যেতাম; সেগুলো বিচার বিশ্লেষণ করা খুব দরকারি হয়ে পড়েছে।

সব বাঙালিই দুলে দুলে মুখস্থ করে, “নেতাজি ইংরেজদের হারাতে আজাদ হিন্দ ফৌজ নামে একটি সৈন্যবাহিনী গঠন করেন”। কিন্তু এই বাহিনীর সৈন্যসজ্জা কেমন ছিল, কোন ধাঁচে নেতাজি তার সেনা সাজাতেন, কি ছিল তার রণ-কৌশল; এগুলো বাঙালিরা পড়ে না, জানে না। মা দুর্গা মহিষাসুর বধ করেছিলেন, আমরা সবাই জানি। কিন্তু সেই যুদ্ধও হয়েছিল সৈন্য-সামন্ত সমেত। কোন পক্ষে কত সেনা ছিল, যুদ্ধে জিততে মা দুর্গার রণনীতি কি ছিল; এসবের কোন জ্ঞান আমাদের নেই। আজ আমাদের সব ছেড়ে যুদ্ধ শিখতে হবে, শত্রু-মিত্র চিনতে হবে। আমাদের কাছে আর বেশি সময় নেই। মন্দির পুড়তে থাকলে গবেষণাগার রক্ষা পায় না। ওদের ভয়ে কুঁকড়ে থাকলে, পশ্চিমবঙ্গ বাঁচবে না।

We are not big media organisation. Your support is what keeps us moving. Don't hesitate to contribute because, work, for society needs society's support. Jai Hind.