প্রাচীন বঙ্গ: সিন্ধু থেকে পলাশী-(৩)

0
688

ডঃ অমিতেষ চৌধুরী

প্রাচীনকালে বাংলাদেশ বলতে আজকের বাংলাদেশকে বোঝাত না৷ অনেক ইতিহাসবিদের মতে বাংলার সঠিক সীমানা নির্ধারন করা এখনো কঠিন একটা কাজ৷ এর একমাত্র কারণ প্রাচীনকালে কতবার যে এই দেশের সীমা পরিবর্তন হয়েছে তার কোন সঠিক হিসাব কেউ রাখেনি ৷ ত্রিপুরা, আরাকান, প্রাগজ্যোতিষপুর, কলিঙ্গ, ব্রহ্ম, চিন প্রভৃতি দেশ এই ভূখন্ডের ভিন্ন ভিন্ন অংশ শাসন করেছিল৷ এক সময় যেমন গৌড় বলতে বিন্ধ্যোত্তরসীমায় কনৌজ, সারস্বত গৌড়, মিথিলা ও উৎকল অর্থাৎ সমস্ত আর্যবত্তকে বোঝাত তেমনি বঙ্গদেশ বলতে বার খন্ডে বিভক্ত বাংলাকে বোঝাত৷ বার খন্ডে বিভক্ত বাংলাকে একত্রে দ্বাদশ বঙ্গ বলা হত৷ যার সীমানা ছিল পূর্বে রেঙ্গুনের পশ্চিম সীমানা থেকে ছোট নাগপুরের সীমা, উত্তরে প্রাগজ্যেতিষপুর  ও দক্ষিনে তমলুক ও সুন্দরবন৷ আবার পাল বংশের রাজত্বের সময় পঞ্চগৌড় শব্দটার সৃষ্টি হয়৷ তখন গোটা আর্যবত্ত মাঝে মাঝে পঞ্চগৌড়ের অধিপতিদের  পদানত থাকিত৷ আবার এই দেশের রাজারা যখনি পঞ্চগৌড়েশ্বর উপাধি পেতেন সাথে সাথেই তারা রাজচক্রবর্তী দাবী করতে সময় নিতেন না যা আবার সবাই স্বীকৃতি দিয়েছে এমন প্রমান নাই৷ ভাষার কথায় যদি আসি বলতে হবে এই অঞ্চল এক সময় সংস্কৃত ভাষার প্রচলন ছিল যদিও পঞ্চগৌড়ের কিছুসময় আগে থেকেই এই অঞ্চলে বাংলা ভাষার গৌড়িয় রীতি প্রচলিত হয়েছিল৷
প্রাগৈতিহাসিক যুগে আর্য্যাবর্ত্তের রাজচক্রবর্তী ছিলেন জরাসন্ধ ।চেদির শিশুপাল, প্রাগজ্যোতিষ পুরের নরক ও পৌণ্ড্র বাসুদেব ছিলেন সামন্ত রাজা ৷ ইতিহাসে এমন একটা সময় এসেছিল যখন পৌণ্ড্র বাসুদেব অনেকাংশে জরাসন্ধের স্থান দখল করে ফেলেছিলেন৷ তবে ভগদত্ত, মুর ও ন রকের শাসন আমলে এই দেশটা প্রাগজ্যোতিষ পুরের অধীনে ছিল৷ বাঙ্গলাদেশটার বড় একটা অংশ তমলুকের অধীনেই ছিল৷ ধারনা করা হয় সম্রাট অশোক যেই সময় দুর্জেয় কলিঙ্গদের পরাজিত করেছিল সেই যুদ্ধে মেদিনীপুরের তমলুকবাসী বাঙ্গালীরাই  কলিঙ্গ সৈন্যদের অগ্রণী হয়েছিল৷ বাংলা সাহিত্যের অন্যতম অঙ্গ হচ্ছে ধর্ম মঙ্গল কাব্য৷ এই কাব্যে ‘দ্বাদশবঙ্গ’ উল্লেখিত আছে ৷ এই দ্বাদশবঙ্গের অন্য নাম হল বার ভূঞা৷  যখন রাজ চক্রবর্তীদের অভিষেক হত তখন দ্বাদশ মণ্ডলীদের উপস্থিতি বাধ্যতামূলক ছিল অর্থাৎ তাদের কিছু নির্দিষ্ট দায়িত্ব থাকত৷ রাজার অভিষেকের সময় তারা রাজার শিরে পবিত্র জল ঢেলে রাজাকে অভিষেক করাত৷ রাম পাল একাদশ শতাব্দিতে কৈবর্ত বিদ্রোহ দমনের সময় যেই সামন্তচক্র গঠন করেছিলেন তাদের মধ্যে এই দ্বাদশমণ্ডলীদের ভুমিকা ছিল প্রধান৷
পঞ্চদশ শতাব্দির শেষের দিকে  পাঠানদের শক্তি বিলোপের সময় এই দ্বাদশ মন্ডলিদের শক্তি ও সামর্থ বৃদ্ধি পেয়েছিল৷ ভুলুয়ার রাজা ছিলেন দুর্লভ নারায়ণ সুর৷ তিনি  সমগ্র পূর্ব দেশের অধিপতি ত্রিপুরেশ উদয় মাণিক্যকে রাজস্ব দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন৷ ফলে অমরমাণিক্য তার বিরুদ্ধে বিশাল সৈন্য বাহিনী প্রেরণ করেন এবং জয়লাভ করেন৷ এই যুদ্ধে জয় লাভের ফলে ভুলুয়ার রাজা দ্বাদশ মন্ডলির সদস্য বলরাম সুর উদর মাণিক্যকে  তার অমর দীঘি খননের সময় এক হাজার শ্রমিক পাঠিয়ে সাহায্য করতে বাধ্য হয়েছিলেন৷   ১৫৭৮-১৫৮১ এই তিন বছর যাবৎ এই দীঘিটি খননের কাজ চলেছিল৷ বাঙ্গলার প্রায় সকল রাজা ত্রিপুরেশ্বরের এই কাজে সাহায্য করেছিল৷ শুধুত্র শ্রীহট্টের ফতে সিং তার এই কাজে কোন রুপ সহায়তা করেনি ৷  কুমার রাজ্যধর ও ঈশা খাঁ শ্রীহট্টে অভিজান চালিয়ে নবাব ফতে সিং কে বন্ধী করে নিয়ে আসেন৷  রাজমালায় আমরা দেখতে পাই ষোড়শ শতাব্দীতে   ত্রিপুরেশ্বর বিজয়মাণিক্য  পূর্ব বঙ্গে রাজচক্রবর্তীত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিল৷
ভারতবর্ষে ইসলামিক  আগ্রাসনের অন্যতম আরেকটি কারন ছিল সমগ্র ভারতকে ইসলামিক বর্বরতার মাধ্যমে ইসলামিক শাসন কায়েম করা ৷ আর ভারতে বিদেশী ইসলামিক শাসকদের মধ্যে অন্যতম শক্তিধর ছিল মোগলরা ৷ তারা সামন্ত রাজাদের সবসময় অধীন করে রাখতেই পছন্দ করতেন কারন তারা বুঝতেন হিন্দু রাজারা একত্রিত হতে পারলে শক্তিশালী হয়ে উঠবেই৷ সামন্তদের সকল ক্ষমতা মোগলদের হাতে নিয়ে সামন্তদের তারা শুধু নামেমাত্র রাখতে চেয়েছিলেন৷ কিন্তু বঙ্গের বারভুঞারা মোগলদের এই অত্যাচারী ও স্বৈরাচারী মতাদর্শ মেনে নিতে পারেননি ৷ এই স্বৈরাচারী নীতি অমান্য করাই অনেককেই প্রাণ দিতে হয়েছিল৷ ভুলুয়ার মুকুন্দ রায় ও তার ছেলে শত্রাজিৎ, যশোরের প্রতাপাদিত্য, বিক্রমপুরের কেদারে রায় ইত্যাদি মোগলদের অত্যাচারে বিদ্রোহী হয়ে উঠেন৷ তারা বুঝতে পেরেছিলনে পাঠানের চেয়ে মোগলরা আরো বেশি ভয়ানক হয়ে উঠেছে ৷ মোগল শাসন নিয়ে সিয়ার মুতক্ষরিণে লিখেছেন “ফৌজদারদের প্রধান কর্তব্য ছিল জমিদারদের শক্তি খর্ব্ব করা, তাঁহারা যেন যুদ্ধাস্ত্রাদি সংগ্রহ না করেন, বন্দুক ও বারুদ যেন তাহারা  বেশি না রাখেন, তাঁহারা যেন তাঁহাদের পুরাতন দুর্গ গুলো সংস্কারা না করেন, কিংবা নতুন কোন দুর্গ নির্ম্মান না করেন৷ কিন্তু যদি কোন ফৌজদারের মনোযোগের ত্রুটির সুবাধা পাইয়া জমিদার ভাবের উপকরণাদি সংগ্রহ করিয়া ক্ষমতাসম্পন্ন হইতে চেষ্টা করেন, তবে তাঁহাকে তৎক্ষণাৎ  তাঁহার সমস্ত সৈন্য বিদায় করিয়া যুদ্ধোপকরণ সমূহ সম্রাট সরকারে সমর্পণ করিতে হইবে, ইহাতে কিছুমাত্র অবাধ্যতা করিলে তাঁহার বাসস্থান হইতে দূরে নির্বাসিত করিতে হইবে ৷ ইহাতে যদি তিনি ষড়যন্ত্রের কোন লক্ষণ প্রদর্শন করেন, তবে তাঁহার দুর্গাদি ভুমিসাৎ করিয়া , তাঁহাকে এমন কঠোর শাস্তি দিতে হইবে যে জমিদার যেন একটা নগণ্য প্রজার অবস্থা প্রাপ্ত হয়৷”  যদিও মোগরা ভারত ভূমিকে ইসলাম প্রচারের হাতিয়ার বানাতে সবসময় অত্যাচার চালিয়ে যেতেন এবং কঠোর নীতি প্রয়োগ করেই যেতেন তবুও তারা বাংলার খণ্ড রাজ্যগুলোর সেই আসীম সাহসী ক্ষমতাকে একেবারে বিলুপ্ত করে দিতে পারেননি৷  সম্রাট আকবরের সময়ে পাঠানদের    বিরুদ্ধে ভুরসুটের রাণী  পাঠানদের সাথে প্রচন্ড যুদ্ধ করে জয়লাভ করেছিলেন৷  তাকে “রায়বাঘিনী” নামেই তখন সবাই চিনত৷
ইংরেজশাসন আমলে জীবন রায় ছিলেন মেদিনীপুরের চকলিয়ার জমিদার ।জীবন রায় তার পাইক সৈন্য দ্বারা অসংখ্যবার বেশকিছু ইংরেজ সেনাপতিদের  পরাজিত করেছিলেন৷ প্রকৃতপক্ষে বাঙ্গালী রাজা ও জমিদারেরা যদি সবাই এক থাকত তবে এই পবিত্র ভূখন্ডে ইসলামিক বর্বরতা ও ইংরেজশাসনের মাধ্যমে মিশনারিদের প্রবেশ করিয়ে আজ ভারতকে খন্ডিত করার মত ভয়ে ভীত হতে হত না ৷ ডব্লিউ কে ফারমিঙ্গা স্বীকার করেছিলেন যে পাইক সেনারা বৃটিশ সেনাদের থেকেও অনেক শক্তিশালী৷ আমরা হয়ত অনেকেই জানি যে নলডাঙ্গার রাজাদের পূর্বপুরুষেরা তাদের এই রাজ্যটি দুর্দ্ধর্ষ পাঠানদের থেকে জয় করে নিয়েছিলেন৷ রাজশাহীর জমিদারদের রাজ্য ভাগলপুর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল৷ পাশাপাশি চাকলা রাজাও শক্তিশালী ছিল তারা  ইংরেজ সৈনিকের ভীত কাপিয়ে দিতেন৷ পাঠানেরা ছিল রাজ্য জয়ের নেশায় মত্ত আর অন্যদিকে মোগলেরা ছিল দেশের প্রকৃত স্বাধীনতা হরন করতেই পাশাপাশি হিন্দু নিধন ছিলই৷
এই বাংলা কখনোই মোগল সম্রাজ্য হতে পারত না যদি বার ভুইঞাদের মধ্যে ঈশা খাঁ এর মত বিশ্বাসঘাতক না থাকত৷ আকবরের সেনাপতিরা বারবার পরাজিত হয়েছিল এই বার ভুইঞাদের কাছে কিন্তু বঙ্গকে মুসলিম রাজ্য বানাতে ঈশা খাঁ গোপনে মোগলদের সাথে চুক্তি করার মাধ্যমে বিশ্বাস ঘাতকতা শুরু হয়৷ তবে সবচেয়ে দু:খের বিষয় হল এর পরেও বাংলার হিন্দু জমিদারেরা এক হতে পারেনি তাই তারা একের পর এক মোগলদের সাথে যুদ্ধে প্রাণ বিসর্জন দিয়েছিলেন৷ সেদিন ঈশা খাঁ যদি বিশ্বাস ঘাতকতা না করত তবে আজকের এই বঙ্গ এক রাজ্য থাকত আর এই বঙ্গে মুসলির সংখ্যাগরিষ্টতা হতে পারত না এবং  এই বাংলাদেশ আজ হিন্দুদের জন্যে চিতায় পরিণত হত না৷
গঙ্গাতীরের এই ভূমির দখল নিতে যুগের পর যুগ হিন্দুদেরকে বৌদ্ধরা, পাঠানেরা, মোগলেরা, ইত্যাদি আক্রমণ ও অত্যাচার চালিয়েছিল৷ এই কারনেই এই বঙ্গের রাষ্ট্রীয় সীমানা বারবার পরিবর্তন হয়েছিল৷ অল্প কিছুদিন আগেও উড়িষ্য ও বিহার এই বঙ্গভূমির অন্তর্ভূক্ত ছিল৷ তবে আমাদের উচিত হবে প্রকৃতি যেইভাবে এই বঙ্গের সীমা নির্ধারণ করেছে তাকেই অনুসরণ করা ৷ সেই অনুসারে বলা যায় উত্তরে আকাশ স্পর্শী হিমাদ্রী শৃঙ্গ, দক্ষিণে তমলুক প্রান্ত বিশাল জলাভূমি, পূর্বে আরকানের বনাঞ্চল, পশ্চিমে মগদের কান্তারভূমি ৷ তবে বঙ্গভুমির এক বিশাল অক্ষমতাও আছে যে কলিঙ্গ ও মিথিলার ইতিহাস এই বঙ্গের অন্তর্ভূক্ত হওয়া উচিৎ ছিল কিন্তু তা হল না ৷ তবে পূর্ব ভারতে শিক্ষা ও সংস্কৃতি প্রায় একই বলাই চলে৷ পাশাপাশি এই ভারত ভূমির ইতিহাস কে যতই ইসলামিক আগ্রাসনের কারনে পরিবর্তনের চেষ্টাই করা হোক না কেন তারা নিজেরাই বুঝে গিয়েছিল পুরা ইতিহাস বিকৃতি ছিল অনেক টাই অসম্ভব৷  
 পদ্মার ভাঙ্গনের মত এই বঙ্গের সীমানাও বারবার ভেঙ্গে গিয়েছিল৷ হিন্দু ও বৌদ্ধ যুগে  কর্ম্মান্ত, বিজয় নগর, সিংহপুর, সাভার, মহান্দ, পাটিকারা, ঢাকা, গৌড়, বিক্রমপুর, সোনারগাঁ, কর্ণসুবর্ণ, মহাস্থান, দন্তভুক্তি, তমলুক, ওদন্তপুর,মগধ ইত্যাদি এই বঙ্গের রাষ্ট্রীয় সীমানা হিসবে নির্ধারিত হয়েছিল৷ বৌদ্ধদের মানবিক নীতি সেইদিন ইসলামের বর্বর তরবারির আঘাতে মাটিতে লুটিয়ে পরেছিল৷  ইসলাম প্রচারের সুবিধার জন্যে ইসলামিক যুগেও এই বঙ্গের কেন্দ্র পরিবর্তন করা হয়৷ ইসলামিক যুগের রাজারা রজমহল, মুর্শিদাবাদ, ঢাকা, পাণ্ডুয়া, তান্ড্রা, রমতী, লক্ষণাবতী, গৌড় ইত্যাদি স্থানকে তাদের রাজধানী বানিয়েছিল৷ ইসলামিক ও বৌদ্ধ আগ্রাসনের পূর্বে এই বঙ্গে সংস্কৃত ভাষার প্রচলন ছিল কিন্তু বিশেষ করে ইসলামের আগ্রাসনের পর এই বঙ্গে সংস্কৃতকে তুলে দিতে সব রকমের ব্যবস্থাই করেছিল ইসলামিক শাসকেরা৷
বিদেশী আক্রমণকারীরা শুধুমাত্র ভারতীয় ভূমি দখল করেই ক্ষান্ত ছিল না তারা পাশাপাশি ভারতীয় সংস্কৃতি ও ভাষাকে ধংস করতে চেয়েছিল৷ বিশেষ করে খ্রিস্টান মিশনারিরা সামান্য পরিবর্তনের জন্যে বঙ্গ ভাষাকে আঘাত করার জন্যে বাংলা ভাষাকে বিভক্ত করেছিল৷ ত্রিপুরা, মণিপুর, প্রাগজ্যোতিষপুর প্রভৃতি প্রদেশে বাংলা ভাষা প্রচলন ছিল ৷ ত্রয়োদশ ও চতুর্দশ শতাব্দির উড়িষ্যা সাহিত্যের ভাষার সাথে বাংলা ভাষার যথেষ্ঠ সাদৃশ্য ছিল৷ গঙ্গা বংশের রাজত্বকালে উড়িষ্যার ভাষার সাথে বাংলা ভাষার সম্পর্ক আরো গভীর হয়েছিল৷ এইতো সেদিনেই খ্রিস্টান মিশনারিরা তাদের সুবিধার জন্যে আসামের ভাষাকে বাংলা থেকে পৃথক করেই দিল৷ তার আগে বাংলা আসামের রাজ দরবারের ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষাই ছিল৷ হিন্দু সংস্কৃতিকে ধংসের জন্যে কয়েকজন মিশনারী আসামের কথিত ভাষাকে আসামের ভাষা হিসেবে দাড় করানোর জন্যে কয়েকটি বই লিখেছিলেন৷ সাথে সাথে তারা কিছু অক্ষর তৈরি করেছিলেন৷ তারপর তারা দেখতে পেয়ছিলেন আসামের প্রকৃত ভাষা হিসেবে তাদের তৈরি করা ভাষায় যথেষ্ট ঘাটতি আছে তবুও তারা এই ভাষা চালিয়ে দিতে সব রকমের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছিল৷ অবশেষে মিশনারিদের সেই টাকার জোরে তারা আসামের কথিত ভাষায় বেশকিছু পরিবর্তন আনতে সফল হয়েছিল৷ এইভাবেই খ্রীস্টান মিশনারিরা তাদের সুবিধার্থে ভারতে এসেই সেই ভারতেই প্রাদেশিক অভিমান সৃষ্টি করে দিয়েছিল৷ অথচ তাদের ক্ষেত্রে সব ঠিক৷  অষ্ট্রেলিয়া, আমেরিকা, আয়ারল্যান্ড ও স্কটল্যান্ডের ভাষায় যথেষ্ট পার্থক্য থাকা সত্বেও বিশাল ইংরেজি সাহিত্য তারা সৃষ্টিতে কোন বিভেদ ছিল না কিন্তু সেই ইংরেজ মিশনারিরা আমাদের ভারতে এসেই কথিত ভাষার সামান্য পার্থক্যের জন্যে গোপন অভিসন্ধি নিয়ে আমাদের ভূখন্ডকে বিভক্ত করে দিল৷ আবার ওয়েলসের ভাষার সাথেও ইংরেজি ভাষার যথেষ্ট অমিল তবুও তারা সেখানে ইংরেজি ভাষাকে প্রচলিত রেখেছে ৷ 
ইসলামিক আগ্রাসনের পূর্বে এই ভারতবর্ষে  গান্ধার থেকে ব্রহ্মদেশ এবং হিমালয় থেকে রামেশ্বর এমনকি সিংহল, জাভা, বালি, সুমাত্রা পর্যন্ত এই বিশাল জনপদে সংস্কৃত ভাষার প্রচলন ছিল৷ এখনো এই সকল অঞ্চলের ভাষায় সংস্কৃত প্রভাব স্পষ্ট৷ এরপর উড়িষ্যা আসাম ইত্যাদি অঞ্চলে বাঙ্গালা ভাষা প্রচলিত ছিল কিন্তু ইসলামের আগ্রাসনে তারা সংস্কৃত বিলুপ্তি করে আরবি ভাষা আর ইংরেজ আক্রমণের পর তারা অন্য সব ভাষাকে বিলুপ্ত করে খ্রীস্টান ধর্ম প্রচারের জন্যে সব আয়োজন করে রাখল৷ এই লেখা পড়ার পর এখন অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে তাহলে এখন আবার সেই যুগে ফিরে যাচ্ছে না কেন? তারা উত্তর হবে তারা  আফগানিস্থান, পাকিস্থান ও বাংলাদেশ নামের যেই বিজ বপন করে গেছেন তাতে এখন আর সেই কাটা জিনিসটা আর জোড়া লাগানো সম্ভব নয়৷
বাংলার প্রাচীন ইতিহাস আলোচনা করতে গেলেই সমগ্র পূর্ব ভারতের ইতিহাসের আলোচনা চলে আসবে এটাই স্বাভাবিক৷ কবি দ্বিজেন্দ্র লাল রায় তার  বিখ্যাত “বঙ্গ আমার, জননী আমার, ধাত্রী আমার, দেশ আমার” গানে গৌতম বুদ্ধ, সম্রাট অশোক, বিজয় ইত্যাদি সবাইকে বঙ্গবাসী হিসেবে উল্লেখ করেছেন৷ অনেকেই তার এই গানের ঐতিহাসিক ভুল হিসেবে উল্লেখ করতে পারেন কিন্তু তিনি এখানে ভুল কিছুই  বলেন নাই৷ সেই প্রাচীন কালে বিহার জেলা বঙ্গের অংশ ছিল৷ কবি কালিদাস রায় লিখেছেন এই গানে ডি. এল রায় “বঙ্গ আমার” লিখেছেন৷ এই বঙ্গের শিক্ষা, সভ্যতার আদি উৎস ছিল গঙ্গ আর এই গঙ্গার উৎস হরিদ্বার- স্বরুপ- মগধ – কেন্দ্রস্থলে বিরাজিত ছিল৷ এই মগধের উচ্চশিক্ষা, শিল্পকলা সবকিছু আগে পুর্ব দিকে আশ্রয় করে গড়ে উঠেছিল৷ এই মগধকে বাদ দিলে বাংলার ইতিহাস রচনা করা যায় না ৷ বাংলার ইতিহাস গ্রন্থের মধ্যে অন্যতম রাখালদাস বন্দোপাধ্যয়ের গ্রন্থে তিনি বাংলার ইতিহাস লিখতে গিয়ে মগধকে বাদ দেননি৷ বঙ্গের ইতিহাস লিখতে গিয়ে যদি আমরা ভারতের মানচিত্রের পুর্ব সীমানার কিছু অংশের দিকে আমরা দৃষ্টিপাত করি, তবে উত্তর সীমান্তে কালিম্পং, দার্জ্জিলিং ইত্যাদির পাশে নেপালের উপত্যকায় গোরক্ষপুরের একেবারে নিকটে কপিলাবস্তু ও লুম্বিনী বনকে দেখতে পাই৷ তারপর বর্তমান মানভূম জেলা, আরো দক্ষিনে নবদ্বীপ এবং পূর্বে রঙ্গপুর, প্রাগজ্যেতিষ পুর ও বিক্রমপুর৷ তার পশ্চিমে ভাগলপুর ও মগধ৷  এই যে ছোট একটা সীমানা দেয়া হল বিশ্বম্যাপে তা অতি ক্ষুদ্র একটি অঞ্চল৷  যদিও এটি বঙ্গের সীমানা না , তবুও এই বঙ্গের যদি সভ্যতা ও সংস্কৃতির কথা আসে তবে এই অঞ্চলকে বাদ দেয়ার কোন সুযোগ নাই৷ এই অঞ্চল যদিও পৃথিবীর সীমানার তুলনায় অতি ক্ষুদ্র  কিন্তু অবদানের দিকে এই অঞ্চলের ইতিহাস ক্ষুদ্র নয়৷ ঠিক এই অঞ্চলেই আমরা গৌতম বুদ্ধকে পেয়েছি যিনি ছিলেন মানব জাতীর এক তৃতীয়াংশের আধ্যাত্মিক রাজ্যের সম্রাট৷ সম্রাট অশোক যিনি বুদ্ধ ধর্মকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিয়েছিল তিনিও এই অঞ্চলের মানুষ ছিলেন৷ বিশ্ববিখ্যাত শিক্ষা কেন্দ্র সুবর্ণবিহার, জগদ্দল, ওদন্তপুর, বিক্রমশীলা, নালন্দা ইত্যাদি এই অঞ্চলের অবদান৷ মহাযান বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের উপাস্য দেবতা যাকে গৌতম বুদ্ধের পরেই স্থান দেয়া হয়েছে সেই শ্রীজ্ঞান দিপংকরের জন্মস্থান এই অঞ্চলেই৷ বিক্রম পুরের শান্তরক্ষিত ও শীলভদ্র এক সময় পৃথিবী বিখ্যাত শিক্ষক ছিলেন৷ বিখ্যাত জৈন গুরু তীর্থঙ্ক র পার্শ্বনাথ দীর্ঘকাল রাঢ়, পুণ্ড্র ও তাম্রলিপ্ত দেশে তার চতুর্যাম ধর্ম প্রচার করে  ৭৭৭ খ্রী: পূ: মানভূমে দেহত্যাগ করেন৷ বঙ্গাধিপ রাজা গোবিন্দ চন্দ্র  ত্রিপুর ও রঙ্গপুর অঞ্চলে  রামচন্দের মত মাতৃআজ্ঞা গ্রহণ করে দ্বাদশ বছরের জন্যে সন্যাস গ্রহণ করেছিলেন৷ তার এই ত্যাগের কীর্ত্তিকথা আসাম থেকে পাঞ্জাব, কলিঙ্গ থেকে বোম্বে পর্যন্ত গীত হত৷
মগধের সেই বিখ্যাত সম্রাটদের কথা বাদই দিলাম৷ গুপ্ত, পাল ও সেন সম্রাটদের কথা আলোচনা করার অবকাশ এখানে নাই৷ কিন্তু যিনি হরিনামকে সমস্ত জগতে ছড়িয়ে দিতে জন্মগ্রহন করেছিলেন সেই মহাপ্রভু কিন্তু এই বঙ্গের৷ গঙ্গা যেমন এই বঙ্গ ভূমিকে উর্বরতা ও প্রাকৃতিক সুন্দর্য দান করেছেন ঠিক একইভাবে  চৈতন্য মহাপ্রভুও আধ্যাত্মিক জগতে সুভাষ ছড়িয়ে দিয়েছিল৷ চৈতন্য দেব ছাড়াও অসংখ্য গুরু মহারাজের জন্ম এই বঙ্গে হয়েছিল তারা অবশ্যই প্রত্যকে এক একজন দিকপাল ছিলেন৷ শ্যামানন্দ বৈষ্ণব, নিত্যানন্দ, অদ্বৈত, শ্রীনিবাস, নরোত্তম, সনাতন, রুপ ইত্যাদি আধ্যাত্মিক জগতের এক একজন মহামানব৷
ভারতের পুর্বাংশেরি এই ভূমিতে যত সংখ্যাক মহাত্মা জন্মগ্রহণ করেছেন পৃথিবীর আর কোন অঞ্চলে এতবেশি সংখ্যক মহামানবের জন্ম  হয়েছে বলে রেকর্ড নাই৷ এই ছোট ভুমিটাকে বলা যেতে পারে ধর্মবীর সাধকদের লীলাভুমি৷ বঙ্গভূমি মুলত শাক্ত, বৈষ্ণব, জৈন ও বৌদ্ধদের বিচরন ভুমি ৷ এই চারটি মত পাশাপাশি শান্তিতে বসবাস করেছিল হাজার হাজার বছর ধরে কিন্তু কোন প্রকার বিশৃঙখলা দেখা যেত না কারন তারা মানুষের মুক্তিতে বিশ্বাস করত৷ কিন্তু ইসলাম ও খ্রীস্টান যখনই এই বঙ্গে প্রবেশ করল তখন এই বঙ্গের মানুষে বিশ্বাসে আঘাত লাগল কারন এই বঙ্গের মানুষের ধর্ম নিয়ে যেই বিশ্বাস ছিল ধর্ম মানে শান্তি সেই বিশ্বাস আর থাকল না ৷  ইসলামের বর্বর নৃশংস তা তারা দেখল একই সাথে কিভাবে দারিদ্রতাকে পুঁজি করে ধর্মান্তরিত করা হয়  তা খ্রীস্টান মিশনারিদের থেকে দেখল৷ এই দুই জাতি শুধু এই দেশে লুন্ঠন আর নারি ধর্ষন করেই শান্ত ছিলেন না  তারা চেয়েছিলেন এই দেশটাকে সেই আরব্য নিষ্ঠুরতার দেশ বানিয়ে নিবেন৷ ধীরে ধীর বিদেশী অত্যাচারী জাতিরা শান্তিপ্রিয় বাঙ্গালী জাতির ক্ষমতা দখল করে নিল৷ হাজার হাজার বছর ধরে শান্তিতে বেরে উঠা বাঙ্গালী এরপর দেখতে পেল নিষ্টুর শাসকদের৷  এই বিদেশীদের অত্যাচারে বেশিরভাগ হিন্দু ভদ্রলোক তখন দেশ ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়েছিল৷ আর যারা নিজেরদেরকে সরিয়ে নিতে পারেনি তাদেরকে হয়ত নিজ ধর্ম ত্যাগ করতে হয়েছিল অথবা বিদেশী শাসকদের তরবারিরি নিচে নিজের কল্লা দিতে হয়েছিল৷
প্রাচীনকালে আর্যবর্তের পূর্ব অংশ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অঞ্চলে বিভক্ত ছিল৷  তবে এই রাজ্যগুলোর নাম ও সীমার তেমন কোন নির্দিষ্টতা ছিল না৷ অন্যদিকে এই রাজ্যগুলো নির্দিষ্ট কোন রাজার নিয়ন্ত্রনেও ছিল না৷৷ যেই রাজা যখন দখল করতে পারত তার নিয়ন্ত্রনেই চলে যেত৷ এক সময় গৌড় রাজ্যের নামে  সারস্বত, কন্যকূজ্ব, গৌড়, মিথিলা এক কথায় সমস্ত বিন্ধোত্তর প্রদেশ পরিচিত ছিল৷ গৌড় বলতে প্রায় সমস্ত আর্যবত্ত পরিচিত ছিল৷  গৌড়ের রাজারা পঞ্চগৌড়েশ্বর উপাধী ধারন করে সার্বভৌম সম্রাটের মর্যদা দাবী করতেন৷ যদি তাদের রাজ্য সংকোচিত হত তবুও তারা এই গৌড়েশ্ব উপাধী ব্যবহার করতেন৷ আমরা দেখতে পাই রাজা গণেশকে কৃত্তিবাস পঞ্চগৌড়েশ্বর নামেই উল্লেখ করেছিলেন৷ গান্ধার থেকে জলধির শেষ পর্যন্ত আমাদের এই গৌড়দেশ৷ এই উপাধী এই দেশের প্রাচীন গৌরব বহন করে ৷ সুতারং একথা বলাই চলে এই দেশের সীমান বারবার পরিবর্তিত হয়েছিল তবে বঙ্গের গৌরব কিন্ত চিরকালীন (ক্রমশ)

We are not big media organisation. Your support is what keeps us moving. Don't hesitate to contribute because, work, for society needs society's support. Jai Hind.