নোয়াখালী গণহত্যা- (১০)

0
160
চিত্র: চপলাকান্ত ভট্টাচার্য

শ্রী চপলাকান্ত ভট্টাচার্য

সপ্তম অধ্যায়ঃ
উৎখাত জনমণ্ডলীর পুনঃপ্রতিষ্ঠাঃ

নোয়াখালি-ত্রিপুরার উৎখাত পরিবারসমূহকে আশ্রয়ের অভাবে আশ্রয়প্রার্থিনিবাসে ও রিলিফের অব্যবস্থায় যে ক্লেশ ভোগ করিতে দেখিয়া আসিয়াছি তাহার প্রতিকারের প্রয়োজনীয়তার কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করিয়াছি বটে; কিন্তু সে প্রতিকারও সাময়িক। সৰ্ব্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ এবং একমাত্র প্রশ্ন হইল ইহাদের ভবিষ্যৎ। আকস্মিক ও অপ্রত্যাশিত দুর্দিনের মধ্যে মহাপ্রস্থানের যাত্রা মনে করিয়াই ইহারা গৃহ ছাড়িয়া বাহির হইয়াছে। এখন ইহারা কোথায় থাকিবে, কোথায় যাইবে? রিলিফে, আশ্রয়প্রার্থিনিবাসে ও নিরাশ্রয়ে যাহাদিগকে দেখিয়াছি তাহারা উৎখাত জনমণ্ডলীর এক ভগ্নাংশমাত্র। নিকটে থাকিবার স্থান না পাইয়া বহু পরিবার বাঙলাদেশের বিভিন্ন অংশে এবং বাঙলার বাহিরেও ছড়াইয়া পড়িয়াছে। ইহারা কি বাসস্থানের জন্য জেলায় জেলায় এবং প্রদেশে প্রদেশে ঘুরিয়া বেড়াইবে অথবা পুনরায় সুদিনের আশায় পুরাতন বাসভূমির দিকেই ফিরিয়া যাইবে? ফিরিয়া গেলেও পুনরায় সেই পুরাতন আবেষ্টনের মধ্যে বাস সম্ভব হইবে কি? যে বিপুল ধ্বংসস্তুপ দেখিয়া আসিয়াছি তাহার মধ্যে বাস করিবে কেমন করিয়া ? ধ্বংসস্তুপ অপসারণ করিবে কে? এই নিঃস্ব জনমণ্ডলীর জন্য নূতন বাসা বাঁধিয়া দিবে কে? যদি পুরাতন আবেষ্টনের মধ্যে বাস সম্ভব না হয়, তাহা হইলে নূতন করিয়া গ্রামের পত্তন ও বাস নির্মাণের পরিকল্পনা করিতে হইবে। সে ক্ষেত্রেও সকল দিকে লক্ষ্য রাখিয়া এই নূতন পত্তন ও পরিকল্পনার দায়িত্ব লইবে কে? কে ইহা কাৰ্য্যে পরিণত করিবে?

পুনর্যাত্রা ও পুনঃপ্রতিষ্ঠার কথাটা বলিতে ও শুনিতে যত সহজ কাৰ্যতঃ ইহা তত সহজ নহে। ইহা কি সমস্যাসঙ্কুল ও কিরূপ দুঃসাধ্য, স্থানীয় অবস্থা যাহারা দেখিয়াছে, তাহারা সকলেই তাহা বুঝিবে। বাঙলা গবর্ণমেণ্ট এখন বিহার হইতে মুসলমান আনাইয়া পশ্চিম বাংলায় বসতি করাইবার ব্যবস্থাতেই নিযুক্ত; পূর্ব বাঙলার এই দুর্গত হিন্দু-সমাজের কথা কে ভাবিবে? যাহাদের বাড়ীঘর গিয়াছে, বাঙলা গবর্ণমেন্ট তাহাদের জন্য ২৫০ টাকা করিয়া বরাদ্দ করিয়াছেন। এই টাকাতে ঘর হওয়া দূরে থাকুক ঘরের একখানা চালও হইবে না। এদিকে লীগমন্ত্রিমণ্ডলের প্রচারকারীরা বলিতে লাগিয়া গিয়াছেন যে, নোয়াখালি-ত্রিপুরার জন্য ভাবিবার আর কিছুই নাই, যাহারা চলিয়া আসিয়াছিল তাহারা ফিরিয়া গিয়া অক্লেশে যে যাহার স্থানে বসিয়া যাইতে পারে।

এখনও বহির্মুখী গতিঃ

‘ভাবিবার আর কিছুই নাই’- ইহা নিঃসংশয়ে বিশ্বাস করিয়া লইতে পারিলে বাঙলার গবর্নরকে, তাহার যোগ্য মন্ত্রিমণ্ডলকে ও তাঁহাদের আজ্ঞাবাহকদিগকে সর্বান্তঃকরণে ধন্যবাদ দিতাম। কিন্তু দুই সপ্তাহ ঘুরিবার পর কলিকাতায় চলিয়া আসার দিনও দেখিলাম নোয়াখালি জেলার উপদ্রুত হিন্দু-সমাজের বহির্মুখী গতি বন্ধ হয় নাই। ২২শে নভেম্বর চৌমুহনী হইতে নৌকাযোগে আমরা যখন আমিষাপাড়া যাইতেছিলাম, তৎকালে বিপরীত দিক হইতে আগত পর পর দুইখানি নৌকা দেখিয়া বুঝিলাম দুইটি পরিবার গ্রাম ছাড়িয়া যাইতেছে। একথানি নৌকার আচ্ছাদনের বাহিরে উপবিষ্ট ভদ্রলোকটিকে জিজ্ঞাসা করিলাম “ছাড়িয়া যাইতেছেন বুঝি?” ভদ্রলোকটি একটু সঙ্কুচিত হইয়াই জবাব দিলেন—“হ্যাঁ, দেখি অদৃষ্ট কোথায় লইয়া যায়।”

২৫শে নভেম্বর আমরা চরমণ্ডল দেখিয়া চৌমুহনীতে ফিরি। রাত্রিতে চৌমুহনী হইতে লাকসাম যাত্রার সময়ে দেখি- বহির্মুখী জনতায় ষ্টেশন ভরিয়া গিয়াছে, অনেকে ষ্টেশনেই আশ্রয় লইয়াছে। ২৬শে নভেম্বর তারিখে আমরা চাঁদপুরে। ২৭শে নভেম্বর সকালে উঠিয়া দেখি রাত্রির মধ্যে বড় বড় নৌকা আসিয়া খালের মধ্যে সারি বাঁধিয়াছে। স্থানীয় জনৈক আইনজীবী জানাইলেন, ২৯খানি নৌকা করিয়া নোয়াখালির রায়পুর থানা হইতে আশ্রয়প্রার্থীর দল চলিয়া আসিয়াছে এবং উহার মধ্যে একখানিতে গৃহকর্তার স্ত্রীর মুখমণ্ডলে কুৎসিত আক্রমণের চিহ্ন বর্তমান। বস্তুতঃ আমরা যখন ছিলাম তখনও রায়পুর থানা অঞ্চলের আভ্যন্তরীণ অবস্থা বিশেষ কিছু জানা যায় নাই। রায়পুর থানার এলাকার মধ্যে বাহিরের লোকের গতিবিধি তখনও ভাল করিয়া আরম্ভ হয় নাই। ২রা ডিসেম্বর আমাদের কলিকাতা প্রত্যাবর্তনের তারিখেও আগরতলা হইতে কুমিল্লা যাইবার পথে আখাউড়া ষ্টেশনে দেখিলাম রামগঞ্জ থানার অধীন গ্রামাঞ্চল হইতে বহুলোক গৃহ ছাড়িয়া চলিয়া আসিয়াছে; জিজ্ঞাসা করিয়া জানিলাম গুপ্তহত্যার আতঙ্কে তাহারা চলিয়া আসিতে বাধ্য হইয়াছে।

এই যে ক্রমবর্ধমান বহির্মুখী যাত্রা—ইহা যতদিন পর্যন্ত চলিবে, ততদিন পর্যন্ত উৎখাতগণের পুনর্যাত্রা ও পুনঃপ্রতিষ্ঠা অবাস্তব কামনাই থাকিয়া যাইবে। অথচ উপদ্রুত অঞ্চলের যে অবস্থার মধ্য হইতে ইহারা চলিয়া আসিতে বাধ্য হইয়াছে সেই অবস্থা প্রত্যক্ষ দেখিয়া তাহারই মধ্যে ইহাদিগকে ফিরিয়া যাইতে বলা দুঃসাধ্য। বিপুল ধ্বংসস্তুপ ও চতুর্দিককার বিরুদ্ধ পরিবেশের মধ্যেও যাহারা রহিয়া গিয়াছে, তাহাদের সাহস, দৃঢ়তা ও ধৈর্যের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করি। কিন্তু যাহারা তখনও চলিয়া আসিতেছে তাহাদিগকেও মুখ ফুটিয়া বলিতে পারি নাই “ফিরিয়া যাও”। মনে হইয়াছে, উহা না বলাই ভালো। যাহারা এমনভাবে আবদ্ধ হইয়া পড়িয়াছিল যে, গ্রামের মধ্যেই আত্মীয়স্বজনের সহিত সাক্ষাৎ করিতে হইলে, গুণ্ডা-মাতব্বরদের ছাড়পত্রের [এইরূপ ছাড়পত্রের একটী নিদর্শন এখানে দিতেছি। ইহা অবিকল উদ্ধৃত করিলামঃ
“এই ব্যক্তি হিন্দু ছিলে এখন মুসলমান হইয়াছে—হইকে (ইহাকে) সকলে সাহাৰ্য্য (সাহায্য) ও সহাভুতি (সহানুভূতি) করিবে কেহ কটুবাক্য ও অন্যান্য প্রতি লক্ষ (লক্ষ্য) রাখিয়া ইসলামের সৌন্দয্য (সৌন্দৰ্য) রক্ষা করিয়া ইহকাল পরকাল হাছিল (হাসিল) করিবে।
ইতি
মৌলবী আবদুল হামিদ; নারায়ণপুর, রায়শ্রীরামপুর, নোয়াখালী।”

দীন মানিলে অর্থাৎ ইসলাম ধৰ্ম্ম কবুল করিলে, তবে এইরূপ ছাড়পত্র পাওয়া যাইত। ছাড়পত্র পাইলেও কেহ যখন গ্রাম হইতে বাহিরে যাইত তখন তাহার পুত্রকন্যা গ্রামের মধ্যেই সশরীরে জামিন থাকিত।] প্রয়োজন হইত, তাহাদেৰ চতুষ্পার্শ্বে সে অবরোধ যে আজ নাই; ইহা তাহাদিগকে অনুভব করিতে দিতেই হইবে। অবস্থা এমনি দাঁড়াইয়াছিল যে, অভ্যন্তরে অবরুদ্ধ হিন্দুরা কোনো আত্মীয়-স্বজনের সহিত যোগ রাখিতে পারিত না, অথবা কোনো আত্মীয়স্বজনের পক্ষে তাহাদের সহিত যোগ রাখিবারও উপায় ছিল না। অবরুদ্ধ হিন্দুদিগের গৃহে আত্মীয়স্বজন কেহ যাইতেছে দেখিলে অবরোধকারীরা তাহাদের নাম দিয়াছে “হিন্দু-গুণ্ডা”; গৃহকর্তার উপর আদেশ জারী হইয়াছে বাহির হইতে আত্মীয়স্বজন আসিলে তৎক্ষণাৎ লীগ অফিসে তাহাকে হাজির করাইতে হইবে; গৃহকর্তা তাহা না করিলে আগন্তুকের উপর মারপিট হইয়াছে এবং চৌকিদার আসিয়া তাহাকে ধরিয়া ইউনিয়ন প্রেসিডেন্টের কাছে লইয়া গিয়াছে; যে সকল গৃহে আত্মীয়স্বজন আসিয়াছে রাত্রিতে সে গৃহের উপর পাহারা বসিয়াছে। এই আবদ্ধ অবস্থায় যে আতঙ্কিত মনোভাবের উদ্ভব হইয়াছিল, সেই মনোভাব হইতে মুক্ত হইবার সুযোগ লোককে দিতে হইবে। বুঝিতে দিতে হইবে—ইচ্ছা করিলে তাহাদের বাহিরে যাইবার এবং বাহিরের লোকের তাহাদের নিকট আসিবার অবাধ অধিকার রহিয়াছে। যাতায়াতে, কোনোরূপ বাধা নাই—এই ধারণা লোকের মনে যতক্ষণ না পুনরায় বদ্ধমূল হইতেছে, ততক্ষণ আতঙ্ক কাটিবে না, উৎখাত এবং অপসারিতগণও গৃহে ফিরিতে চাহিবে না। গৃহের মায়া এখনও তাহাদের টানিয়া থাকে; কিন্তু তবুও তাহারা ফিরিতে পারে না।

গৃহের মায়াঃ

১৯শে নভেম্বর তারিখে কুমিল্লায় পৌঁছিয়া পরদিন আমরা যখন তথা হইতে রওনা হইব, তৎকালে আমাদের উপর ভরসা করিয়া পরিত্যক্ত গ্রাম ও গৃহসম্পত্তি দেখিয়া আসিবার জন্য স্থানীয় রিলিফ-কেন্দ্র হইতে দুই ব্যক্তি আমাদের সঙ্গ লয়, নোয়াখালি সহর হইতে আরও একজন জোটে। তাহাদের গন্তব্যস্থল ছিল আমিষাপাড়ার সন্নিকটবর্তী অঞ্চলে। তাহা তখনও সহজগম্য নহে, উপদ্রব চলিতেছে। ভরসা ছিল আমিষাপাড়া পরিদর্শনের সঙ্গে বা উহা হইতে ফিরিবার পথে আমরা তাহাদের গ্রামাঞ্চল হইয়া ফিরিব এবং তাহারাও গৃহাদি দর্শনের সুযোগ পাইবে। ২২শে নভেম্বর সন্ধ্যায় আমরা আমিষপাড়ায় পৌছিলাম; তখনও তাহারা আমাদের সঙ্গে। কিন্তু সময়াভাবে তাহাদের অঞ্চলে আমাদের যাওয়া হইল না অথচ তৎকালে সেই সকল অঞ্চলে সদ্য-সঙ্ঘটিত যে সকল উপদ্রবের সংবাদ পাওয়া যাইতেছিল, তাহাতে আমরাও ভরসা করিয়া তাহাদিগকে একক যাইতে বলিতে পারিলাম না। এতদূর আসিয়া ব্যর্থকাম হইয়া ফিরিয়া যাইবার সময়ে তাহাদের মুখে যে হতাশা ও বেদনাকাতর চিত্র দেখিয়াছিলাম তাহা ভুলিবার নহে। ২৪শে নভেম্বর শেষ রাত্রিতে উঠিয়া যখন আমরা মধুপুর রিলিফ ক্যাম্প হইতে মহাত্মাজীর সহিত সাক্ষাতের জন্য শ্রীরামপুর যাত্রা করি তখনও এইরূপ একটি করুণ ঘটনা ঘটে। অনুমান ৮ বৎসরের একটি বালক আমাদের শ্রীরামপুর যাইবার সংবাদ পূৰ্ব্বরাত্রিতেই সংগ্রহ করিয়াছিল এবং আমাদের যাত্রার অপেক্ষায় সমস্ত রাত্রি জাগিয়াছিল। বালকটি তখন রিলিফ ক্যাম্পের বাসিন্দা—পিতামাতা নাই—শ্রীরামপুরের সন্নিকটস্থ গ্রামে তাহাদের বাস; একেবারে নিঃসহায় তথাপি গৃহের মায়া ছাড়িতে পারে না। ভোররাত্রিতে রওয়ানা হইবার সময় দেখি বালকটি সঙ্গ লইয়াছে; কিন্তু শ্রীরামপুরে পৌঁছিয়া জানিতে পারিলাম, তাহার গ্রাম তথা হইতেও খানিকটা দূর। আমরা আর যাইব না, বালকটিও একা যাইবে না। অগত্যা স্থানীয় জনৈক ভদ্রলোককে অনুরোধ করিলাম। তিনি সঙ্গী দিলেন। বেলা ১টা পর্যন্ত গান্ধীজীর সহিত আমাদের আলাপ চলিল, তাহারই মধ্যে বালকটি গ্রাম ও গৃহ দেখিয়া আসিল এবং আমাদের সঙ্গে সঙ্গেই পুনরায় রিলিফ ক্যাম্পের দিকে ফিরিল।

যাহা বলিলাম তাহা হইতে নিশ্চয়ই উপলব্ধি হইবে যে, লোকে গ্রামের মায়া, বাসগৃহের মায়া, ভূ-সম্পত্তির মায়া ছাড়িতে পারে নাই। মায়া যথেষ্টই আছে, তথাপি যে লোকে ছাড়িয়া গিয়াছে এবং যাইতেছে, তাহার কারণ প্রাণের হানির, সম্মানের হানির এবং পুনরায় আবদ্ধ হইয়া পড়ার আশঙ্কা। ২১শে নভেম্বর আমরা যখন নোয়াখালিতে তৎকালে একজন বিশিষ্ট ব্যক্তি আমাদের সহিত সাক্ষাৎ করিয়া বলেন, তাঁহার পরিবারের স্ত্রীলোকেরা মাত্র মাইল দশেক দূরে রহিয়াছেন; কিন্তু পুনঃ পুনঃ চেষ্টা করিয়াও তাহাদের তিনি সহরে আনাইতে পারেন নাই, দুবৃত্তগণ পথ হইতে নৌকা ফিরাইয়া দিয়াছে। সম্প্রতি কোম্পানীগঞ্জ থানা হইতে জনৈক সরকারী কর্মচারী সম্বন্ধে এইরূপ একটি সংবাদ প্রকাশও হইয়াছে। এইরূপ ঘটনা আতঙ্কের সৃষ্টি না করিয়া পারে না। এইজন্যই বলিতেছিলাম-কেহ চলিয়া আসিতেছে দেখিলে তাহাকে বাধা না দেওয়াই হয়ত আতঙ্ক প্রশমনে অধিকতর সহায়ক হইবে। অবাধ যাতায়াতের অধিকার ও সুযোগ অক্ষুন্ন আছে,- এই ধারণা লোকের মনে দৃঢ় না হইলে পুনরায় তাহাদিগকে গ্রামে ফিরানো বা বসানো যাইবে না। অবশ্য গ্রামের মধ্যে যাহারা আছে এবং যাহারা পরামর্শ চাহিয়াছে, তাহাদিগকে আমরা থাকিতেই বলিয়াছি—ভয় ত্যাগ করিতে এবং সতর্ক থাকিতেও বলিয়াছি। তথাপি অবাধ যাতায়াত সম্বন্ধে লোকের মনে নিশ্চয়তা জাগাইবার প্রয়োজনও অনুভব করিয়াছি বিশেষভাবেই।

আতঙ্ক সৃষ্টিতে সরকারী দায়িত্বঃ

উপদ্রুত ও আবদ্ধ জনমণ্ডলীর মনে আতঙ্ক সৃষ্টির দায়িত্ব হইতে স্থানীয় শাসনকর্মচারীরাও অব্যাহতি পাইবেন না। ২০শে নভেম্বর তারিখে চাঁদপুরে পৌছিয়া জেলার শাসনকর্মচারীবিশেষের আচরণের যে বিবরণ পাইয়াছিলাম তাহাই এ অভিযোগ প্রমাণের পক্ষে যথেষ্ট। কলিকাতা হইতে আগত একটি বিশিষ্ট সেবা-প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা শ্ৰীযুত শরৎচন্দ্রের নিকট এই বিবরণ দাখিল করেন। অক্টোবরের শেষভাগের ঘটনার সময়ে চাঁদপুর মহকুমার এক অঞ্চলে উপদ্রুত সমাজের ৩০০০ লোক অবরুদ্ধ হয়। ধৰ্মান্তর না হয় মৃত্যু—এই দুই বিকল্প তাহাদের সম্মুখে। এই অবস্থায় তাহাদের মধ্যে কলেরা দেখা দেয়। মহামারী-বিপন্নদের সেবা করিতে যাইবার জন্য উক্ত সেবাপ্রতিষ্ঠানের কর্মীরা ত্রিপুরা জেলার উক্ত প্রধান শাসন-কর্মচারীর নিকট সাহায্যের জন্য আবেদন করেন। তাহাতে উক্ত শাসন-কৰ্ম্মচারী জবাব দেন, “What is the harm if these three thousand people are converted to Islam?”—“এই তিন হাজার লোক যদি মুসলমান ধর্ম গ্রহণ করেই, তাহাতে এমন ক্ষতিই বা কি?” সেবা প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা জানান যে, ধর্মান্তরের কথাটাই অফিসার মহাশয়ের প্রধান আগ্রহের বিষয় হইলেও তাহারা উহা লইয়া মাথা ঘামাইতেছেন না, তাহারা বিপন্নের সেবা করিতে আসিয়াছেন এবং তাহারই জন্য উক্ত স্থানে যাইতে চাহেন। তথাপিও শেষ পর্যন্ত অফিসারটি কৰ্ম্মীদিগকে উক্ত স্থানে নিরাপদে পৌঁছাইবার জন্য কোনো সাহায্য করিতে সম্মত হন নাই। তাহার এই আচরণে এবং কর্মীদের আবেদনের উত্তরে তিনি যাহা বলিয়াছিলেন, তাহাতে বুঝা যায়—সরকারীমহল কি মনোবৃত্তির দ্বারা প্রভাবিত এবং স্থানীয় শাসনকর্মচারীরা কি মনোবৃত্তি লইয়া কাজ করিয়াছেন। স্থানীয় কর্মচারীদের এই মনোবৃত্তির প্রতিক্রিয়া উপদ্রুত জনসাধারণের আতঙ্ক বৃদ্ধিতে কিরূপ সহায়তা করিয়াছে তাহা সহজেই উপলব্ধি করা যায়।

কর্তব্যে অবহেলা ও শৈথিল্যঃ

আতঙ্কবৃদ্ধিতে এই সক্রিয় সহায়তা ছাড়া স্থানীয় সরকারী কর্মচারীদের কর্তব্যে অবহেলা এবং শৈথিল্যও উৎখাত জনগণের পুনর্যাত্রা ও পুনর্বসতির বিঘ্ন ঘটাইতেছে। নভেম্বর মাসের তৃতীয় সপ্তাহে আমরা যখন পরিদর্শনে গিয়াছিলাম তখন ঘটনার পর দেড় মাস হইতে চলিয়াছে। কিন্তু দেখিয়া বিস্মিত হইলাম, ঘটনার সময়ে খণ্ডিত ও ভগ্ন রাজপথসমূহ তখনও মেরামত হয় নাই। চৌমুহনী হইতে রামগঞ্জ যাইবার পথ অন্তত ছয় জায়গায় খণ্ডিত ও বিধ্বস্ত—এমনভাবে বিধ্বস্ত যে, গাড়ী লইয়া চলা অসম্ভব। শুনিয়াছি এই অঞ্চলে মিলিটারী আসিবার পূর্বে এই পথটি একেবারে অগম্য হইয়াছিল। অথচ ইহাই উপদ্রুত অঞ্চলে যাইবার প্রধান রাজপথ। মিলিটারীর উদ্যোগে ভাঙ্গনগুলিতে গাছ ও মোটা লোহার জাল ফেলিয়া যে আচ্ছাদন দেওয়া হইয়াছে, তাহার উপর দিয়া গাড়ী অতি কষ্টে যাওয়া আসা করে। প্রত্যেকটা ভাঙ্গনের মুখে আসিয়া যাত্রীদিগকে গাড়ী হইতে নামিতে হয় এবং গাড়ী ভাঙ্গন পার হইয়া গেলে পুনরায় উঠিতে হয়। এইভাবে যাইতে আমাদিগকে বিশেষ বেগ পাইতে হইয়াছিল। এ পথটিতে তবু জল ছিল না। যে সকল পথের ভাঙ্গন জল-প্লাবিত হইয়াছে তাহাতে গাড়ী একেবারে অচল। ২২শে নভেম্বর তারিখে আমিষাপাড়া যাওয়ার
[আমিষাপাড়ায় বারাহী মন্দিরের ধ্বংস আমরা পরিদর্শন করি। ইহা একটী প্রসিদ্ধ পীঠস্থানরূপে গণ্য। প্রতিষ্ঠিত মন্দিরে বারাহীমূর্ত্তি কদাচিৎ দেখিতে পাওয়া এই প্রাচীন মুর্ত্তির প্রতিষ্ঠার সময় দিগভ্রম হওয়াতে মূর্তির স্থাপনে ভুল হয়। শক্তিমূর্তি প্রধানতঃ দক্ষিণমুখী না হয় পশ্চিমমুখী ভাবে স্থাপিত হইয়া থাকে। এক্ষেত্রে পূর্বমুখী ভাবে স্থাপিত। এই ভূল হইতেই ভুলুয়া (ভুল হুয়া) পরগণার নামকরণ বলিয়া শোনা যায়। কৃষ্ণপ্রস্তরের মূৰ্ত্তি কুঠারের দ্বারা খণ্ডিত হইয়াছিল। মূৰ্ত্তির খণ্ডিত অংশগুলির কিছু ছিল বেগমগঞ্জ থানায়, কিছু ডাঃ শ্যামাপ্রসাদের নিকট, কিছু শরৎচন্দ্র (নেতাজী সুভাষ বসুর অগ্রজ) সংগ্রহ করেন। কিছু ছিল হাওড়ায় উদ্বাস্তু শিবিরে সেবায়েতদিগের এক বংশধরের নিকট। বেগমগঞ্জ থানায় গিয়া তথাকার সংগৃহীত অংশগুলি দেখিবার চেষ্টা করিয়াছিলাম। সমর্থ হই নাই। মূর্তির অংশগুলি একত্র করিয়া এবং পূর্বেকার চিত্র দেখিয়া অনুরূপ মুর্ত্তি গঠন করিয়া প্রতিষ্ঠার কথা শরৎচন্দ্রের সহিত হইয়াছিল। বল্লভাচারী সম্প্রদায়ের গুরু বোম্বাইয়ের শ্রীকৃষ্ণজীবনজী মহারাজ এই ভ্রমণে আমাদের সঙ্গী ছিলেন। তিনিও এ বিষয়ে বিশেষ আগ্রহ প্রকাশ করেন। কিন্তু কাৰ্যতঃ শেষ পর্যন্ত তাহা হইয়া উঠিল না দেখিতেছি। এখানে সেবায়ৎ পরিবারের একটী বালকের সহিত সাক্ষাৎ হয়। আক্রমণের সময়ে বেতস জঙ্গলের মধ্যে লুকাইয়া সে আত্মরক্ষা করে এবং একাদিক্রমে তিন দিন সেই ভাবে থাকে। আমাদের সহিত যখন সাক্ষাৎ তখনও গায়ে বেতকাঁটার ক্ষত রহিয়াছে।]
ব্যবস্থা করিতে আমাদিগের এই অভিজ্ঞতা হয়। চৌমুহনী হইতে আমিষাপাড়া যাইবার বাঁধান পথ আছে, মোটরে ঘণ্টাদুই লাগে। কিন্তু উপদ্রবের উদ্যোগেই আমিষাপাড়া হইতে মাইল দুয়েক আগে এই পথটি কাটিয়া দেওয়া হয় এবং ভাঙ্গনের ভিতর দিয়া জল বহিতে থাকে। মোটরে ভাঙ্গন পর্যন্ত গিয়া তথা হইতে নৌকায় যাইতে পারিলেও সময় সংক্ষেপ হইত, কিন্তু সেইখানে গিয়া নৌকা পাইবার কোন সম্ভাবনা ছিল না। সুতরাং গাড়ীর চেষ্টা ছাড়িয়া চৌমুহনী হইতেই আমাদের নৌকায় যাইতে হইল, এবং যে কাজ গাড়ীতে দুই ঘণ্টার মধ্যে পৌঁছিয়া সারিয়া আসা চলিত, সেখানে যাইবার পথেই আমাদের ৫৬ ঘণ্টা লাগিয়া গেল। ফিরিবার সময়েও ঐ একই অবস্থা। অথচ স্থানীয় জেলাবোর্ড এবং গবর্ণমেন্ট মিলিয়া চেষ্টা করিলে রাস্তার ভাঙ্গনগুলি বহুদিন পূৰ্বেই মেরামত করিয়া ফেলিতে পারিতেন।

শাসনশক্তিতে লোকের অনাস্থাঃ

এই সমস্ত ব্যাপারের সম্মিলিত ফল যাহা হইয়াছে তাহা পূর্বেই বলিয়াছি। লোকে গবর্ণমেন্টের উপর আস্থা হারাইয়া ফেলিয়াছে। উৎপীড়ক প্রতিবেশীসম্প্রদায়ের সম্বন্ধে উৎপীড়িত সম্প্রদায়ের অবিশ্বাস, সন্দেহ ও আশঙ্কা যে গভীরতম হইয়াছে তাহা বিশেষ করিয়া না বলিলেও চলে। কিন্তু ইহা সত্ত্বেও উৎপীড়িত সম্প্রদায়ের এইভাবে দলবদ্ধ অভিনিষ্ক্রমণ ঘটিত না যদি তাহারা গবর্নমেন্টের সদভিপ্রায় ও কাৰ্যকারিতার উপর আস্থা রাখিতে পারিত। ঘটনাপরম্পরা হইতে, সরকারী কৰ্ম্মনীতি হইতে এবং সরকারী কর্মচারীদের আচরণ হইতে লোকের মনে ধারণা বদ্ধমূল হইয়াছে যে, অনিচ্ছায় হউক, অবহেলায় হউক, শাসনশক্তির প্রভাব বাঙলার প্রান্তবর্তী এই জেলাটি পর্যন্ত পৌঁছিতেছে না।—ইহা অপরাধীকে দমন করিতে বা নিরপরাধকে অপরাধীর আক্রমণ হইতে রক্ষা করিতে হয় অনিচ্ছুক, নয় অপারগ। রাজশাসনের অক্ষমতা এবং অপরাধীর প্রশ্রয়লাভ-উৎখাতগণের পুনর্যাত্রা ও পুনৰ্ব্বসতির ইহাই সর্বপ্রধান অন্তরায়। শূন্যগর্ভ আবেদনের আড়ম্বর ত্যাগ করিয়া বাঙলা গবর্ণমেণ্ট এই বাস্তব সমস্যার সম্মুখীন হইতে প্রস্তুত আছেন কি?(ক্রমশ)

We are not big media organisation. Your support is what keeps us moving. Don't hesitate to contribute because, work, for society needs society's support. Jai Hind.