১৯৬৪-এর খুলনার হিন্দু গণহত্যা

0
486
সিঁদুর মুছে ভারতে পালিয়ে আসা দাঙ্গার শিকার এক হিন্দু মহিলা

খুলনা জেলার প্রায় সমগ্র পল্লী অঞ্চলে হিন্দু বিরোধী হাঙ্গামা প্রচন্ড হাঙ্গামা ধারণ করিয়াছে। শনিবার রাত্রে খুলনা শহর হইতে প্রায় ৪০ মাইল দক্ষিণে চালনার নিকটে মঙ্গলা গ্রামের ১৪ জন হিন্দু গ্রামবাসীকে পোড়াইয়া হত্যা করা হইয়াছে। নিহতদের মধ্যে ৬ জন নারী ও ৪ টি শিশু ও ৪ জন পুরুষ আছে। আজ কলিকাতায় প্রাপ্ত সংবাদে জানা গিয়াছে যে, শনিবার মধ্যরাত্রি হইতে বাগেরহাট মহকুমার ৬ টি গ্রামের হিন্দুদের ঘরবাড়ি জ্বালাইয়া দেওয়া হইয়াছে ।বহু ক্ষেত্রে হিন্দুদের ক্ষেতের পাকা ফসলে আগুন ধরাইয়া দেওয়া হয় এবং মাইলের পর মাইল ধরিয়া সেই আগুন দাউ দাউ করিয়েএ জ্বলিতেছে। বাগেরহাট মহকুমার ফকিরহাট থানা এলাকা, শেওলাবুনিয়া, কানাইনগর, মোক্কাদেরপুর, মঙ্গলা, কর্ণপুর প্রভৃতি অঞ্চলে নুতন করিয়া প্রচণ্ডতম হাঙ্গামা আরম্ভ হইয়াছে। ঢাকার ‛পাকিস্তানি অবজারভার’ মঙ্গলা গ্রামের যে মর্মান্তিক গণহত্যার বিবরণ দিয়াছে, তাহাতে বলা হইয়াছে যে, গভীর রাত্রে ঐ গ্রামের হিন্দুরা যখন ঘুমাইয়া ছিল, তখন উহাদের ঘরে আগুন দেওয়া হয়। ঘুমন্ত অবস্থায় ১৪ টি অসহায় হিন্দু দগ্ধ হইয়া মরিয়াছে। যাহারা অগ্নিকুণ্ডলী হইতে বাহির হইতে পারিয়াছে, তাহাদের উন্মত্ত জনতা আক্রমণ করিয়াছে। রবিবার সকালে পুলিস ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলসের লোকেরা যাইয়া ভস্মীভূত গৃহগুলি হইতে দগ্ধ মৃতদেহগুলি বাহির করিয়া আনে। 

এ যাবৎ ২১ জন নিহত

শুক্রবার সন্ধ্যা হইতে রবিবার সকাল পর্যন্ত খুলনা শহর ও পল্লী অঞ্চলে কমপক্ষে ২১ জন হিন্দু নিহত হইয়াছে । পূর্ব পাকিস্তান সরকারের হিসাবে ১৯ জন বলা হইয়াছে। আহতের সংখ্যা সহস্রাধিক হইবে বলিয়া আশঙ্কা করা হইতেছে। মৃত ও আহতদের মধ্যে অধিকাংশ হইলো অগ্নিদগ্ধ ।আজ কলিকাতায় একটি বিদেশি ব্যাংকের সূত্রে জানা গিয়াছে যে, শুক্রবার রাত্রে খুলনা শহরে বহু হিন্দুকে হত্যা করা হইয়াছে এবং শহরের গান্ধী পার্ক ও ধর্মসভা অঞ্চল, যে অঞ্চলে হিন্দু উকিল, সেখানে বহুক্ষণ ধরিয়া হিন্দুদের উৎপীড়ন করা হইয়াছে । ধর্মসভার বাড়িটি বিধ্বস্ত করা হইয়াছে। অথচ এই এলাকা এবং বিধ্বস্ত কালীবাড়ি খুলনা কোতোয়ালি থানা হইতে মাত্র তিন-চার মিনিটের পথ। কিন্তু এক ঘন্টারও বেশি সময় ধরিয়া সেখানে হিন্দুদের ওপর উন্মত্ত তান্ডব চলিয়াছে।  

ফকিরহাটে ২ জন ছুরিকাহত 

মঙ্গলা গ্রামটিতে গত বৎসরখানেক ধরিয়া বন্দরে রূপান্তরিত হইয়াছে। চালনা বন্দর তুলিয়া দেওয়ায় সব বড় জাহাজ মঙ্গলা বন্দরে আসিয়া থাকে। বঙ্গোপসাগরের নিকটবর্তী পসর, মঙ্গলা ও ভৈরব এই তিনটি নদ- নদীর মোহনায় গ্রামটি অবস্থিত। শনিবার রাত্রে ১৪ জন হিন্দু নরনারীকে হত্যার পর গতকাল সকালে সেখানে অতিরিক্ত পুলিস ও ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলসের একটি কোম্পানি পাঠানো হইয়াছে। মঙ্গলা হইতে স্টিমারে খুলনা আসিতে প্রায় ৫ ঘন্টা সময় লাগে। ফকিরহাট হইতে ২০ জনকে ছুরিকাহত অবস্থায় গতকাল খুলনা সদর হাসপাতালে লইয়া আসা হইয়াছে। এই গ্রামগুলি খুলনার ভৈরব নদের ওপর পারে এবং হাঙ্গামাকারীরা এখন শহর ও শিল্পাঞ্চল ছাড়িয়া গ্রামাঞ্চলে যাইয়া তান্ডব আরম্ভ করিয়া দিয়াছে। 
আরো কিছু ঘটনা

খুলনা শহরে এখনও বিক্ষিপ্ত ঘটনা ঘটিতেছে বলিয়া বিভিন্নসূত্রে জানা গিয়াছে।গত শুক্রবার উক্ত শহরের হিন্দুদের অধিকাংশ ঠাকুর মন্দির লুন্ঠন করিয়া বহু বিগ্রহ বিনষ্ট করা হইয়াছে। খুলনার মহেশ্বরপাশা গ্রামের হিন্দুরা সর্বাপেক্ষা বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হইয়াছে। ঐ গ্রামেরই বাসিন্দা দৌলতপুর কলেজের অধ্যাপক  শ্রী সুবোধ মজুমদারের বাড়ির নিচের তলায় অবস্থিত তাহাদের গ্রন্থাগারটি পেট্রোল ঢালিয়া একদম পোড়াইয়া দেওয়া হইয়াছে। ক্ষতির পরিমাণ কয়েক সহস্র টাকা। খুলনা গার্লস কলেজের অধ্যাপক শ্রী প্রমথনাথ বিশ্বাসের ফারাদিপাড়ার বাড়ি লুঠ করা হইয়াছে। মহেস্বরপালার শ্রী মন্মথনাথ দত্তের জামাই ও মেয়ে নিভা(২৫) আজও নিখোঁজ রইয়াছেন। শুক্রবার রাত্রে দুর্বৃত্তরা তাহাদের গায়েব করিয়া ফেলে। অতঃপর ওই বাড়িতে লুটতরাজ করা হয়। মহেস্বরপাশার শ্রী সতীশ নন্দীর বিড়ির কারখানার লোকেদের নির্দয়ভাবে প্রহার করিয়া কারখানাটি আগুন দিয়া পোড়াইয়া দেওয়া হয়। শুক্রবারদিন খুলনা শহরের পাওয়ার হাউসের নিকটে শ্রী অবিনাশ পাড়ুইর ছেলেকে ছুরিকাঘাতে আহত করা হইয়াছে। গত শনিবার খুলনা স্টেশনের হিন্দুদের একটি পরিত্যক্ত একটি হোটেলে কয়েকটি নরমুণ্ড এবং মুন্ডহীন একটি দেহ পাওয়া গিয়াছে বলিয়া প্রাপ্ত সংবাদে প্রকাশ ।খুলনার স্টেশন রোডের শ্রী শিশির কুমার সরকার নামে একজন শিক্ষককে ছুরিকাঘাতে আহত করা হইয়াছে। শুক্রবার রাতে দুইটি হিন্দু তরুণী অসহায় হইয়া স্থানীয় সুলতান হোটেলে আশ্রয় গ্রহণ করিয়াছিলেন। দুর্বৃত্তরা তাহাদেরও রেহাই দেয় নাই। অসহয়তার সুযোগ লইয়া তাহাদের অন্যত্র পাচার করিয়া দিয়াছে। আজ ‛পাকিস্তান অবজারভার’ ও ইত্তেফাক’সহ ঢাকায় কয়েকখানি পত্রিকা খুলনার হাঙ্গামার ব্যাপারে জেলা কতৃপক্ষের সমলোচনা করিয়াছে। উহারা বলিয়াছে যে, ২০ হাজার লোকের ঐ বিক্ষোভ মিছিলকে শহরে প্রবেশের পথে পুলিস কতৃক বাধা দেওয়া উচিত ছিল। তাহা হইলে হয়তো এই হাঙ্গামা পরিহার করা যাইতো। 

তথ্যসূত্র:- যুগান্তর, ৭ই জানুয়ারি, ১৯৬৪

We are not big media organisation. Your support is what keeps us moving. Don't hesitate to contribute because, work, for society needs society's support. Jai Hind.