ধর্মনিরপেক্ষতা, সাম্য, অসাম্প্রদায়িকতা, সহিষ্ণুতা, সমানাধিকার নিয়ে কিছু কথা

0
21

স্মৃতিলেখা চক্রবর্তী

ধর্ম নিরপেক্ষতা, সাম্য, অসাম্প্রদায়িকতা, সহিষ্ণুতা আর সমানাধিকার। ভারতের বুদ্ধিজীবী মহলে মহা পবিত্র পাঁচটা শব্দ। এই শব্দগুলোর ক্ষমতা এতটাই বেশী যে ভারতবর্ষের বেশিরভাগ মানুষকেই দম বন্ধ করে ভয়ে ভয়ে থাকতে হয়। এই বুঝি মুখ ফস্কে সত্যি কথাটা বেরিয়ে গেল, “পাঁচ শব্দ”-এর বিরুদ্ধে যেতে গিয়ে শাস্তির খাঁড়া নেমে এল। বুদ্ধিজীবীরা চান, “এক দেশ এক ভাবনা”! অর্থাৎ যে কোন বিষয়ে দেশের প্রত্যেকটা মানুষ একই ভাবে ভাবুক। তবে কোন বিষয়ে কিরকম ভাবনাকে সঠিক বলা যাবে, সেটা স্থির করবেন হাতে গোনা কিছু  বুদ্ধিজীবী এবং তাদের সাঙ্গোপাঙ্গরা। এবং ওদের ঠিক করা এই “সমষ্টি ভাবনা” নিয়েই সমস্ত ভারতবাসীকে চলতে হবে। এর বাইরে গিয়ে কেউ অন্যরকম কিছু ভাবতে গেলেই, বুদ্ধিজীবীদের চোখে সে অপরাধীর তকমা পাবে। কারণ সাম্প্রদায়িকতা, ধর্মান্ধতা, অসহিষ্ণুতার মত গুরুতর অপরাধ নাকি সে করে ফেলেছে। 
“সাম্প্রদায়িক”, “ধর্মান্ধ”, “অসহিষ্ণু” ইত্যাদি শব্দগুলোকে বার বার খারাপ অর্থে ব্যবহার করে করে এগুলোকে প্রায় গালাগালির পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এবং “ধর্ম নিরপেক্ষ”, “সহিষ্ণু”, “অসাম্প্রদায়িক” প্রভৃতি কথাগুলোকে ভালো অর্থে ব্যবহার করে করে প্রশংসার সূচকে পরিণত করা হয়েছে। এখন এই শব্দগুলোই বুদ্ধিজীবীদের অস্ত্র। ওদের নির্দিষ্ট করা চিন্তা ভাবনা কেউ মেনে না চললেই গালি সূচক শব্দগুলো দিয়ে তাকে অমানুষ প্রতিপন্ন করা হয়। আর মেনে চললে জোটে মহান হবার পুরস্কার হিসেবে প্রশংসা মূলক শব্দের পিঠ চাপড়ানি। 
খেলাটা ভালোই চলছিল, বাদ সাধল দেশের মানুষ। তারা লক্ষ্য করল, কিভাবে কয়েকটা শব্দকে ব্যবহার করে একদল অসাধু লোক দিনের পর দিন আসল সমস্যা থেকে তাদের নজর ঘুরিয়ে রেখেছে। কিভাবে কোন শব্দকে ঠিক তার অর্থের বিপরীত কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। মানবাধিকার রক্ষা যাদের কাজ, তারা আসলে করছে খুনীদের অধিকার রক্ষা। প্রমাণিত সন্ত্রাসবাদীদের যাতে ফাঁসি না হয়, যাতে সেনাদের হাতে জঙ্গি নিকেশ না হয়; এগুলোই হল এদের একমাত্র দায়িত্ব।  “মানবাধিকার কর্মী” হিসেবে পরিচয় দিলেও এরা আসলে “দানবাধিকার কর্মী”! মানুষের মুখোশ পরা যেসব দুর্বৃত্তের দল সাধারণ মানুষের উপর তুমুল অত্যাচার করে; এরা চায় সেই সব দানবেরাও মানবের অধিকার পাক। সেজন্যই পুলিশ, সেনা, আধা-সেনারা এদের চোখে “রাষ্ট্রীয় গুন্ডা”। জঙ্গি ইয়াকুব মেমনের ফাঁসি এদের কাছে “রাষ্ট্রীয় খুন”, গণশত্রু নকশালদের হত্যা এদের কাছে “রাষ্ট্রীয় বর্বরতা”! 
ভারতের মানুষ তাই মনে মনে নিজেদেরকে দুটো ভাগে আলাদা করে নিয়েছে। আমরা এবং ওরা। ওরা আমাদের সহিষ্ণুতার পাঠ শেখাতে চায়। ওদের কাছে সহিষ্ণুতা মানে অবশ্যই শব্দের ঠিক উল্টো কাজ করা। অর্থাৎ অসহিষ্ণুতাকে প্রশ্রয় দেওয়াটাই ওদের কাছে সহিষ্ণুতা। হিন্দুবিদ্বেষীর দল মন্দিরের মূর্তি ভাঙবে, মন্দির ধ্বংস করবে, হিন্দুদের দেখিয়ে দেখিয়ে গরুর মাংস খাবে; তারপরেও হিন্দুদেরকে ওদের মাথায় তুলে নাচতে হবে। ধুলাগড়, কালিয়াচক, দেগঙ্গা, ক্যানিং, আসানসোল ঘটে গেলেও “এমন তো কতই হয়” ভেবে মুখ বন্ধ রাখতে হবে। দুর্বলতার আরেক নাম তো সহিষ্ণুতা। মার খেয়ে ফিরিয়ে দেবার ক্ষমতা তো দুর্বলের নেই। তাই চুপচাপ সব সহ্য করে সহিষ্ণুতা দেখানোই দুর্বল-কাপুরুষদের একমাত্র উপায়। এরকম অথর্ব, কাপুরুষ হতে না চাইলেই দেখবেন আপনি “অসহিষ্ণু” হয়ে গেছেন। 
যতদিন বাংলাদেশ, পাকিস্তানে হিন্দুদের উপর অমানুষিক অত্যাচার হচ্ছিল, কোথাও কোন সাম্য-সমানাধিকার-ধর্মনিরপেক্ষতা বিপন্ন হয়নি। এদেশে দাঁড়িয়ে যারা কিউবা, চীন, রাশিয়া, ভিয়েতনাম নিয়ে আন্দোলন করে আর যারা লাদেনের মৃত্যুতে জানাজা বের করে কিংবা বর্মার রোহিঙ্গা মুসলমানদের জন্য আন্দোলন করে; তারা কিন্তু কখনোই পাশের দেশগুলোয় হিন্দু-বিদ্বেষ নিয়ে টুঁ শব্দ করেনি। কিন্তু যেই না ২০১৯ শে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন করে এই অত্যাচারিত মানুষগুলোকে একটু আশ্রয় দেবার ব্যবস্থা করা হল; অমনি নাকি মহাপবিত্র পাঁচটা শব্দই একসাথে অস্ত চলে গেল। বাংলাদেশের বাঙালি হিন্দু মরে যাক, পুড়ে যাক, ধর্ষিত-লুন্ঠিত সব হয়ে যাক; কারণ তাকে ভারতের নাগরিক করলে “ধর্মনিরপেক্ষতা” নামক গালভারী শব্দটার তীব্র অপমান হবে। আজ্ঞে হ্যাঁ, একটা শব্দের জন্য বাংলাদেশের দেড় কোটি হিন্দুকে মরতে হবে। শুধুমাত্র ওই শব্দটার জন্য ভারতের চার কোটি পূর্ব বঙ্গীয় হিন্দুকে নাগরিকত্ব দেওয়া যাবে না। এই সাড়ে পাঁচ কোটি লোককে ঠেলে দিতে হবে দেশহীনতার এক অনন্ত নরকে, যাতে তারা ওপারে “মালাউন” আর এপারে “অবৈধ বিদেশী” ডাক শোনার মধ্যে একটা রাস্তা বেছে নিতে পারেন।

বুদ্ধিজীবীরা খুব ঘেন্না ভরে বলেন, হিন্দুদের মধ্যে নাকি দেবতাকে তুষ্ট করতে পশুবলির মত কুসংস্কারের প্রচলন আছে। উৎসবের দিন মাংস খাবার আগে মা কালীকে নিবেদন করাটা হল কুসংস্কার আর “ধর্মনিরপেক্ষতা” নামক একটা শব্দের জন্য সাড়ে পাঁচ কোটি মানুষকে দেশছাড়া করাটা হল সুসংস্কার। ভারত থেকে খণ্ডিত অংশগুলোয় অত্যাচার যদি ধর্মীয় ভিত্তিতে হয়; তাহলে ভারত রাষ্ট্র সেই অত্যাচারের ভিত্তিতে অত্যাচারিত মানুষগুলোকে নাগরিকত্ব দিতে বাধ্য। এই নাগরিকত্ব ধর্মীয় ভিত্তিতে নয়, অত্যাচারের ভিত্তিতে দেওয়া হচ্ছে। এবারে এই অত্যাচারের যে একটা ধর্মীয় ভিত্তি রয়েছে, তার জন্য বাংলাদেশ-পাকিস্তান এবং সেখানকার সংখ্যাগুরুরা দায়ী। ওরা যদি ধর্ম দেখে অত্যাচার না করত, ভারতেরও অত্যাচার দেখে নাগরিকত্ব দেবার দরকার পড়ত না। 
প্রকৃত ভারতবাসীদের চোখ ধীরে ধীরে খুলছে। আমরা বুঝতে পারছি কিভাবে শব্দের মোহে ডুবিয়ে অন্ধ করে রাখা হয়েছিল আমাদের। শব্দের মায়া যত বেশি করে কাটিয়ে উঠছি, তত কমে যাচ্ছে ওদের বানানো শব্দগুলোর ক্ষতিকর প্রভাব। ওদের শব্দগুলোকে ওদেরই বিরুদ্ধে ব্যবহার করা শুরু হয়েছে। ওরা যত জোরে জোরে চিৎকার করুক- “আমরা ধর্মনিরপেক্ষ”; আমরা জানি ওরা আসলে “ধর্মনেড়েপক্ষ”। ওরা যদি রেগে উঠে বলে “তুই সাম্প্রদায়িক”; সেটা নিয়ে লজ্জায় কুঁকড়ে যাবার বদলে আমরা গর্ব করতে শিখছি। যে নিজের সম্প্রদায়কে ভালোবাসে, সেই তো সাম্প্রদায়িক। নিজের সম্প্রদায়কে ভালোবাসাটা অপমান কেন হবে? আমাদেরকে “অসহিষ্ণু” বললে আজকাল প্রচন্ড গৌরব বোধ হয়। কারণ সাহসী, শক্তিশালী মানুষ সবসময়ই অন্যায়ের প্রতি “অসহিষ্ণু” হয়।
 ওরা যত চোখা চোখা শব্দ বানিয়েছিল, আমাদের ঘায়েল করতে; একটা একটা করে তার সবগুলোকে আমরা ভোঁতা করে দিয়েছি। আর চলবে না ওদের শব্দ সন্ত্রাস। শব্দের দোহাই দিয়ে আর মেনে নেওয়া হবে না হিন্দু বিদ্বেষ। কতক গুলো শব্দের মর্যাদা রাখতে হাজার হাজার অত্যাচারিত হিন্দুকে বলি দেওয়া যাবে না। শব্দের ভয়ে কোথাও যেন হিন্দুর অপমানে কেউ নীরব না হয়ে যায়। আমরা শুধু শুনব না, এবার আমরা শোনাব। প্রাণ ভরে শব্দ বানাব। “অসহিষ্ণু”, “সাম্প্রদায়িক” ইত্যাদি বলে গালি দেবার দিন শেষ। এগুলোর অর্থ এখন পাল্টাচ্ছে। তার সাথে তৈরি হচ্ছে আমাদের নিজস্ব শব্দ। বামাতি, মাকু, ভাম, বুদ্ধুজীবীর মত অজস্র কথা বাংলা ভাষায় জায়গা করে নিচ্ছে প্রতিদিন। এসব শব্দের ব্যবহার যত বেশি হচ্ছে, তত বাড়ছে তার জোর। শব্দযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। শব্দের নামে হিন্দু-বিরোধী আতংক সৃষ্টির দিন শেষ। 

We are not big media organisation. Your support is what keeps us moving. Don't hesitate to contribute because, work, for society needs society's support. Jai Hind.

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here