বরিশাল গণহত্যা- এক হিন্দুর উদ্বাস্তু হওয়ার কাহিনী

0
321

কবি গান শুনেছেন নাকি ? যারা এই কবি গান গাইত তাদেরকে কবিয়াল বলা হত। গায়ক এখানে নিজে একজন কবি। সে কবিতা লিখে গান বাঁধে, তাতে নিজেই সুর দেয় এবং গানটিও সে নিজেই গায়। বাংলা লোকসংগীতের একটি বিশেষ ধারা। এই ধারার গায়করাই কবিয়াল। পূর্ব পাকিস্তান তথা পূর্ববঙ্গের বরিশাল এক বড় অঞ্চল। এই অঞ্চলের একটি জায়গার নাম ঝালকাঠি। ঝালকাঠির খ্যাতনামা কবিয়াল ছিলেন নকুলেশ্বর সরকার। পূর্ব পাকিস্তানের ১৯৫০ এর দাঙ্গার সময় কবিয়াল নকুলেশ্বর আটকা পরে গিয়েছিলেন কুমিল্লা জেলার গৌরীপুরে। উনি সেখানে কবিগান পেশ করতে গেছিলেন। ওনার কানে যখন খবর পৌঁছলো, বরিশালে ভয়াবহ দাঙ্গা শুরু হয়েছে, উনি কুমিল্লার গৌরীপুরে বসে চরম উদ্বিগ্ন হয়ে পরলেন। তার পরিবার বাড়ী ঘরদোর সমস্তই বরিশালের ঝালকাঠিতে।  যে করেই হোক তাকে সেখানে পৌঁছতেই হবে। পরিবারই যদি না বাঁচে, তার বেঁচে লাভ কি ? কুমিল্লা থেকে বরিশাল যাওয়ার জন্য নকুলেশ্বর কবিয়াল তড়িঘড়ি তৈরি হতে লাগলো, সকলেই দাঙ্গার ভয়াবহতার বাস্তবতা জানত, তাই সকলেই নকুলেশ্বরকে যেতে মানা করলো।  চলুন কবিয়াল নকুলেশ্বরের নিজের কথাতে তার সেই ১৯৫০ এর ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা জেনে নি :
চারিদিকে খবর ছড়িয়ে পরলো যে বরিশালে নোয়াখালীর মতোই নারকীয় দাঙ্গা হচ্ছে।  স্থানীয় বাঙালি মুসলমানদেরা হিন্দু নিধনযজ্ঞে মেতে উঠেছে। নদীপথে বেপারী, মহাজন যারই নৌকা পাচ্ছে খুন-জখম করে সব লুটপাট করে নিচ্ছে। কুমিল্লার গৌরীপুর বাজারে কবিয়াল নকুলেশ্বর এর সাথে একজন প্রকৃত মানুষ এক বাঙালি মুসলমান সোনা মিঁয়ার আলাপ হয়। সোনা মিঁয়া নকুলেশ্বরকে পরামর্শ দিল, যেতে যদি হয় তাহলে রাস্তায় যেন তারা অতি অবশ্যই মুসলমান পরিচয় দেয়। কবি দলের মহিলা সদস্যদের সে বোরখা জোগার করে দিল আর পুরুষদের এনে দিল লুঙ্গি আর টুপি। বরিশাল অভিমুখে নৌকা চলছে মাঝি-মাল্লাসহ সকলেরই সাবেকি মুসলমান পোশাক।  নৌকার মধ্যে কারো কোন সাড়া শব্দ নেই প্রত্যেকেই আশঙ্কায় প্রহর গুনছে ! নৌকায় ছিলেন নকুলেশ্বর স্বয়ং, ঢুলি হরিচরণ, হারমোনিয়াম বাদক অশ্বিনী শীল তিনজন মাঝি, নকুলেশ্বর এর বাড়ির পাশের এক হাওলাদার ও মহিলা সদস্যরা। ন জন মানুষ প্রাণ হাতে করে এগিয়ে চলেছে মেঘনা বেয়ে বরিশালের পথে। নৌকা থেকে ‘বীনাপানি কবি পার্টি’ সাইনবোর্ড সরিয়ে ‘সার্কেল অফিসার’ সাইনবোর্ড লাগানো হয়েছে। ৭৫% পথ, বিনা বিপদে কেটে গেল। নৌকা মেঘনা নদীতে ফরিদপুর বরিশালের বর্ডারে, বেলা সকাল দশটা। পাঠক এখানে একটা জিনিস জেনে রাখা ভালো, নকুলেশ্বর কুমিল্লা ছাড়ার আগে নিরাপত্তা তাড়নায় নিজের সাথে একটি বন্দুক জোগাড় করে নিয়েছিল। হঠাৎ দেখা গেল পনের-বিশটা ছিপ নৌকো নকুলেশ্বরের নৌকাটাকে ঘিরে ফেলেছে। এক একটা নৌকায় ২০-২৫ জন করে মানুষ, হাতে রামদা,সড়কি, বল্লম। তারা হাঁক পারতে লাগলো : ‘ বাদাম নামা, নৌকা থামা।’ নকুলেশ্বরের মাঝিরাও জবাব দিল : নৌকা থামাবো কেন ? দেখছিস না সার্কেল অফিসারের নৌকা ? বরিশাল কোর্টে যেতে হবে সময় নেই ! হামলাকারীর দল বলে উঠলো: কিরকম সার্কেল অফিসার আমরাও একটু দেখব ! এইবার নকুলেশ্বর ভাবল এই মুসলিম দাঙ্গাকারীরা সত্যি সত্যি নৌকায় উঠে পরে তাহলে বাঁচা মুশকিল। অতএব এখনই প্রতিরোধ করতে হবে ! নকুলেশ্বর তৎক্ষণাৎ বন্দুকে গুলি ভরে দু-তিনটে শুন্যে ফায়ার করল।  সঙ্গে সঙ্গে হামলাকারীর দল ভয়ে চম্পট দিল ! যাক এযাত্রা বাঁচা গেল ! নকুলেশ্বর এর নৌকা ঝালকাঠি গ্রামে পৌঁছানোর জন্য খালে প্রবেশ করল।  খালে প্রবেশ করে নকুলেশ্বর যে দৃশ্য দেখল তা সে জীবনেও কখনো কল্পনা করেনি ! খালের দু’পাশের ঝোপেঝাড়ে জঙ্গলে শুধু নারী-পুরুষের রক্তাক্ত লাশ আর লাশ, পাড়ের গ্রামগুলো সব জ্বলে পুড়ে ভষ্মিভূত | এ যেন এক মূর্তিমান মৃতের নগরী।  এমনভাবে গ্রামগুলোতে আগুন দেওয়া হয়েছে যে নারকেল গাছের মাথা পর্যন্ত জ্বলে গেছে। নকুলেশ্বরের চোখে জল এলো, এ কি দেখলেন তিনি ! তার নিজের বাড়ির কি অবস্থা ? সকলে জীবিত আছে তো ? বাড়িটুকু আছে ? কালজিরা নদীতে পড়ে বাড়ির দিকে যতই এগোচ্ছেন নকুলেশ্বর, আশপাশের দৃশ্য দেখে হাত পা অবশ হয়ে যাচ্ছে নকুলেশ্বরের। বাড়ির কাছে এসে উনি মাঝিদের নৌকা নদীর ঘাট থেকে স্বল্প দূরে রাখতে বললেন। পাড়ে দাঁড়িয়ে মুসলমান মাতব্বররা বলল: সরকার মশার ভয় নেই আপনার বাড়ি আপনার ভক্তরা কিছুই করেনি ! এখানে রায়ট হয়েছে, কিন্তু কাটাকাটি হয়নি ! বাস্তবে নকুলেশ্বর তার বাড়ি গিয়ে দেখলেন বাড়ীর চাল বেড়া ছাড়া সবই লুঠ করা হয়েছে, এমনকি বাড়ির ঝাঁটা পর্যন্ত।  বাড়ির লোকজন পালিয়ে জঙ্গলে বা প্রতিবেশীর বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে। নকুলেশ্বরের ফেরত আসার খবরে সকলের দৌড়ে ছুটে এলো, এবং কান্নার রোল পড়ে গেল।  গ্রামের মুসলমান মাতব্বররা অবশ্য দু-একদিন অল্পস্বল্প লুটের মাল ফেরত দিয়ে গিয়েছিল। নকুলেশ্বর ততদিনে বুঝে ফেলেছে এই বিশ্বাসঘাতকদের চরিত্র। সে ঠিক করল কলকাতা পাড়ি দেবে। কলকাতার স্টিমার, রেল অত্যাচারিত, ভীত মানুষে কানায় কানায় পূর্ণ ! ইসলামী রাষ্ট্রে জিম্মি থাকার অবস্থা নকুলেশ্বর সেদিন হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছিল। সাত পুরুষের সোনার ভিটে ছেড়ে কবিয়াল নকুলেশ্বর অনিশ্চিতের অন্ধকারে পা বাড়ালো !

© hinduvoice.in

We are not big media organisation. Your support is what keeps us moving. Don't hesitate to contribute because, work, for society needs society's support. Jai Hind.