পূর্বপুরুষের স্মৃতির খোঁজে নোয়াখালীতে

0
287

মিঠুন চৌধুরী

ছোটবেলায় মায়ের মুখে শুনতাম দেশের বাড়ির কথা। মা বলতেন বাংলাদেশের নোয়াখালীতে আমাদের বাড়ি ছিল। মা সময় পেলেই দেশের বাড়ির কথা শোনাতেন। সেইসব অতীতের কথা শোনার আগ্রহ দুই ভাই ও দিদির মধ্যে আমারই ছিল বেশি। তখন ছোট ছিলাম, শুধু শুনে যেতাম আর মনে মনে ফেলে আসা বাড়ি-ঘরের কল্পনা করতাম। মায়ের মুখে শুনেছিলাম ১৯৪৬ সালে উন্মত্ত মুসলমানেরা বাড়ি-ঘর জ্বালিয়ে দিয়েছিলো। রাতের অন্ধকারে সবকিছু ছেড়ে চলে আসতে হয়েছিল। সারা রাত ধরে হেঁটে  পালিয়ে কোনোরকমে প্রাণে বেঁচে গিয়েছিলেন। তারপর কেটে গিয়েছে অনেক বছর। চাকরি পেলাম। দীর্ঘ চাকরি জীবন কাটিয়ে এখন আমি অবসর নিয়েছি। হঠাৎ করেই একদিন মায়ের কথা মনে গেলো। মনে পড়ে গেল ছোটবেলায় মায়ের মুখে শোনা সেই সব কথা। সেই সঙ্গে তীব্র ইচ্ছা জাগলো মায়ের বলা সেই গ্রাম, বাড়ি-ঘর, পুকুর একবার দেখে আসতে। সেটা ছিল ২০১৮ সালের শেষের দিকে। 

বাংলাদেশে যাওয়ার কথা আমার এক বন্ধু দুলালকে বললাম। সেও আমার সঙ্গে যেতে রাজি বাংলাদেশ। আসলে দুলালও ছিল উদ্বাস্তু পরিবারের সন্তান। দেশভাগের সময় ওদের পরিবারও আমাদের মতো বাড়ি-ঘর ছেড়ে ঢাকা থেকে চলে এসেছিল। আমাদের দুজনেরই পাসপোর্ট ছিল না। তাই দুজনেই পাসপোর্ট বানাতে দিলাম। তারপর ভিসা করিয়ে বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম দুই বন্ধু- পূর্বপুরুষের ভিটে দেখতে। এই বছরে -জানুয়ারি, ২০১৯ তে। 

প্রথমে আমরা ঢাকা পৌছালাম। সেখান থেকে গাড়ি, স্টিমার পাল্টে পৌছালাম নোয়াখালী শহরে। মায়ের মুখে শুনেছিলাম আমাদের গ্রামের নাম ছিল নোয়াখালা। গ্রামের মধ্যে একটি মাত্র চৌধুরী পরিবার ছিল। মা-কে জিজ্ঞেস করেছিলাম যে আমি যদি কোনোদিন বাংলাদেশে যাই, তাহলে আমাদের বাড়ি চিনবো কি করে? তখন মা বলেছিলো যে নোয়াখালা গ্রামে একটা বড়ো দীঘি আছে; ঐরকম বড়ো দীঘি আশেপাশের গ্রামেও নেই। ওর পূর্বপাশে আমাদের বাড়ি ছিল। নোয়াখালী শহরে পৌঁছে একটা অটো ভাড়া করে পৌঁছে গেলাম নোয়াখালা গ্রামে। গ্রামটা খুব ছোট। একজন মুসলমান লোককে ডেকে জিজ্ঞেস করলাম যে এই গ্রামে সব চেয়ে বড় দীঘি কোথায়। খোঁজ পেয়ে গেলাম দীঘি দেখতে। দেখলাম দীঘি মায়ের কথা অনুযায়ী ততটা বড়ো নয়। কারণ এই এত বছরে দীঘির অনেকটাই বুজিয়ে ফেলা হয়েছে।  তারপর রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে আমাদের পূর্বপুরুষের ফেলে আসা বাড়ি খুঁজতে বের হলাম। বেশ কয়েকজনকে জিজ্ঞেস করলাম যে গ্রামে চৌধুরীদের বাড়ি কোনটা। কেউই বলতে পারলো না। শেষে একজন বয়স্ক মুসলমান ব্যক্তিকে পেলাম। তাকে জিজ্ঞেস করতে তিনি বললেন যে এই গ্রামে আগে চৌধুরীরা থাকতো। কিন্তু এখন থাকে না। আমি জানতে চাইলাম যে চৌধুরীরা কোথায় গেলো? উত্তরে ও বললো যে, সেই যে অনেক আগে ঝামেলা, কাটা-কাটি হয়েছিল, তখন তাঁরা বাড়ি-ঘর ছেড়ে চলে গিয়েছে। আবার জিজ্ঞেস করলাম, কোথায় গিয়েছে আপনি বলতে পারবেন?  তিনি উত্তরে জানালেন যে তিনি জানেন না। তারপর তিনি আর কথা বাড়াতে চাইলেন না । বলে দিলেন চৌধুরীদের বাড়িটা কোন দিকে, তারপর চলে গেলেন। বুঝলাম তিনি আর কথা বলতে চাইছেন না কিংবা হিন্দু হত্যার কথা তিনি বলতে চাইছেন না। খুঁজে খুঁজে গেলাম চৌধুরী বাড়ি দেখতে। কিছুটা দূরে দেখলাম। সেই জমি এখন দখল হয়েছে। এক মুসলমান পরিবার সেখানে বসবাস করছে এখন। দূর থেকে দেখে চলে এলাম। সেই জমি দেখে অনুভব করলাম তখন কি ঝড় বয়ে গিয়েছিলো আমাদের পরিবারের ওপর দিয়ে। রাতারাতি সাজানো বাড়ি-ঘর, স্বচ্ছল জীবন থেকে নিঃস্ব হয়ে গিয়েছিলো। রাতারাতি উদ্বাস্তু হয়ে কলোনিতে আশ্রয় নিতে হয়েছিল। সেইসব কষ্টের দিনের কথা এখন আর নতুন প্রজন্ম অনুভব করতে পারবে না। তাদের এতো টানও থাকবে না। তবু পূর্বপুরুষের ফেলে আসা ভিটে-মাটির টানে গিয়েছিলাম। সেই অভিজ্ঞতাই ভাগ করে নিলাম আপনাদের সাথে। 

We are not big media organisation. Your support is what keeps us moving. Don't hesitate to contribute because, work, for society needs society's support. Jai Hind.