নোয়াখালী গণহত্যা- (৬)

0
175
নোয়াখালী পরিদর্শনে গান্ধীজি

শ্রী চপলাকান্ত ভট্টাচার্য

সরকারী সাফাইঃ

বেসরকারী মহল হইতে এই সকল বিবৃতি যখন প্রকাশিত হইতেছিল তখন সরকারী কর্তৃপক্ষ বসিয়া থাকেন নাই, তাহারাও স্বীয় অভিপ্রায়ানুযায়ী বিবৃতিসমূহ প্রকাশ করিতেছিলেন। বে-সরকারী বিবৃতিসমূহ যেমন ঘটনার স্বরূপ ও উহার পরিণামের কথা জনসমাজে প্রকাশ করিতেছিল, সরকারী বিবৃতিসমূহও তেমনি ঘটনার গুরুত্ব এবং গভর্ণমেণ্টের ও তাহাদের কর্মচারীদের দায়িত্ব লঘু করিতে চাহিতেছিল। বে-সরকারী বিবৃতিসমূহ কিছু কিছু উল্লেখ করিয়াছি। যে সকল বিবরণ হইতে সরকারী মনোভাব বুঝিতে পারা যায় তাহার কয়েকটি উল্লেখ করিতেছি :-
(১) গভর্ণর ও মিঃ সুরাবর্দী কর্তৃক একত্রে বিমান হইতে উপদ্রুত অঞ্চল পরিদর্শন সম্বন্ধে বাঙলা গভর্ণমেন্টের সরকারী বিবৃতি (২০/১০/৪৬)
(২) “ষ্টেটসম্যান” পত্রিকার রিপোর্টারের নিকট চট্টগ্রাম হইতে প্রদত্ত মিঃ সুরাবর্দীর ও পুলিশের ইন্সপেক্টর জেনারেল মিঃ টেলরের বিবৃতি (২০/১০/৪৬)
(৩) এই পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা সম্বন্ধে মিঃ সুরাবদীর নিজস্ব বিবৃতি (২১/১০/৪৬)
(৪) পার্লামেন্টে বাঙলা গভর্ণরের রিপোর্টের আলোচনা (২২/১০/৪৬)
(৫) নোয়খালির সদ্যনিযুক্ত ম্যাজিষ্ট্রেট মিঃ ম্যাকিনার্ণির ডায়েরী (“ষ্টেটসম্যান” ২৩/১০/৪৬) ও তাহার বিবৃতি (“ষ্টেটসম্যান” ২৭/১০/৪৬)
(৬) মিঃ সুরাবর্দীর তৃতীয় বিবৃতি ( ২৫/১০/৪৬)
(৭) সাংবাদিক বৈঠকে জেনারেল বুসারের বিবৃতি ( ২৭/১০/৪৬ )
(৮) বড়লাট লর্ড ওয়াভেলের বিমানভ্রমণের বিবরণ (৩/১১/৪৬ )
[“ষ্টেটম্যান” ব্যতিরিক্ত অন্যান্য তারিখগুলি “হিন্দুস্থান ষ্ট্যাণ্ডার্ড” পত্রিকার কলিকাতা সংস্করণ]
এই সকল বিবৃতি লক্ষ্য করিলেই বুঝা যায় মোটের উপর ঘটনার গুরুত্ব লঘু করাই ইহাদের উদ্দেশ্য। এগুলির মধ্যে কিছু কিছু স্বীকৃতি যে নাই, তাহা নহে। কিন্তু মূল অভিপ্রায়টা অন্যরূপ। ২০শে অক্টোবর তারিখে প্রকাশিত বিবৃতিতেই বাঙলা গভর্ণমেন্ট জানাইয়াছেন যে “নোয়াখালির অবস্থা আয়ত্তে আসিয়াছে বলিয়া বোধ হয়।”

মিঃ সুরাবর্দীর প্রথম বিবৃতিতে তিনি বলিয়াছেন যে নোয়াখালি-ত্রিপুরায় যাহা ঘটিতেছে তাহা গুণ্ডামি ও উচ্ছৃঙ্খলতা ব্যতীত আর কিছুই নহে এবং মুসলীম লীগ ইহার মধ্যে নাই। ইন্সপেক্টর জেনারেলের বিবৃতিতেও উপদ্রবের ব্যাপকতা বা ভয়াবহতার পরিচয় পাই না। কিন্তু উহাতে একটি উল্লেখ যোগ্য স্বীকৃতি আছে –
“The hooligans were armed with guns and various types of other weapons and they were still defiant and not afraid to face the police and the military!”
অর্থাৎ “উপদ্রবকারিগণ আগ্নেয়াস্ত্র এবং অন্যান্য নানাবিধ অস্ত্রে সজ্জিত ছিল। তাহারা তখনও বেপরোয়া ; এমন কি পুলিশ ও মিলিটারীর সম্মুখীন হইতেও তাহারা ভীত হয় নাই।”

গভর্ণর বারোজ সাহেব বিলাতে কি রিপোর্ট পাঠাইয়াছিলেন তাহা জানা যায় নাই। কেবল পার্লামেন্টের আলোচনার বিবরণেই কিছু প্রকাশিত হইয়াছিল। ইহাতে গভর্ণর জানাইয়াছেন নোয়াখালিতে যাহা ঘটিয়াছে তাহা কোন ব্যাপক আক্রমণ নহে, মাত্র একদল গুণ্ডার কাৰ্য্য ; মৃতের সংখ্যা শতের কোঠায় খুব নীচের দিকে থাকিবে, তবে সম্পত্তিনাশ অনেক হইয়াছে বলিয়া মনে হয়। ইহা ছাড়া অন্য কোন অপরাধের উল্লেখ গভর্ণরের রিপোর্টে নাই।

“স্টেটসম্যান” পত্রিকায় মিঃ ম্যাকিনার্ণির যে ডায়েরী প্রকাশিত হইয়াছে তার উদ্দেশ্য বিচিত্র। মিঃ ম্যাকিনার্নি কাৰ্যভার লন ১৬ই অক্টোবর তারিখে। কিন্তু ২৩শে অক্টোবর প্রকাশিত ডায়েরীতে তিনি প্রতিপাদন করিতে চাহিয়াছেন যে কয়েক দিনের মধ্যেই তিনি সমগ্র অঞ্চলময় ঘুরিয়া বেড়াইয়াছেন এবং দেখিয়াছেন যে গোলযোগ থামিয়া গিয়াছে। ইহার পর প্রকাশিত তাহার বিবৃতির বিশেষত্ব এই যে উহাতে তিনি স্ত্রীলোকদের উপর কোনরূপ অত্যাচারের কথা একেবারে অস্বীকার করিয়াছেন। মিঃ সুরাবর্দীর তৃতীয় বিবৃতিতে তিনি বলিয়াছেন যে, ১৭ই অক্টোবরের পর নোয়াখালিতে আর কোন ঘটনা ঘটে নাই, অবস্থা নিশ্চিতরূপে আয়ত্তে আসিয়া গিয়াছে ; কেবল সংবাদপত্রসমূহ উহা লইয়া বাড়াবাড়ি করিতেছে বলিয়াই লোকে ভয়ত্ৰস্ত হইয়া ৰাড়ী ছাড়িয়া পালাইতেছে। লর্ড ওয়াভেলের বিমান-ভ্রমণের পর যে বিবরণ প্রকাশিত হয় তাহাতে বলা হইয়াছিল যে, রন্ধনশালার ধূম ব্যতীত বড়লাট আর কিছুই দেখিতে পান নাই। ইহা বিচিত্রও নহে। যখন ঘটনা সদ্য সদ্য সংঘটিত হইতেছে তখনও গভর্ণর ও মিঃ সুরাবদী বিমান হইতে কিছু দেখিতে পান নাই। লর্ড ওয়াভেল গভর্ণরকে সঙ্গে লইয়াই গিয়াছিলেন এবং তৎকালে গৃহদাহের বহ্নিশিখা নিভিয়া গিয়াছে।

সাংবাদিক বৈঠকে জেনারেল বুসারের বিবৃতি সম্বন্ধে “পুনর্বসতি ও জেনারেল বুসার” শীর্ষক পরবর্তী এক অধ্যায়ে সবিশেষ আলোচনা করিয়াছি। এখানে তদতিরিক্ত কয়েকটি কথা বলিব। প্রথমবার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করিয়া ফিরিবার পর সরকারী মহলের সহিত আমার প্রথম আলাপ জেনারেল বুসারের সাংবাদিক বৈঠকে। আলাপ করিয়া বুঝিলাম অবস্থার গুরুত্ব লঘু করিবার যে মনোভাব সরকারী কর্মচারীদিগকে পাইয়া বসিয়াছিল সেই মনোভাবের দ্বারাই তিনি চালিত হইয়াছেন। উপদ্রব দমনের জন্য মিলিটারীর সাহায্যের প্রয়োজনীয়তা বুঝিয়া কুমিল্লা হইতে দিল্লীতে টেলিফোন করিয়া শরৎচন্দ্র সর্দার বল্লভভাইকে জানাইয়াছিলেন। সম্ভবতঃ তাহারই ফলে জেনারেল বুসার প্রেরিত হন। কিন্তু তাহার উপর ন্যস্ত দায়িত্ব তিনি পালন করেন নাই। জেনারেল বুসারের নিকট হইতে বিশেষভাবে এইটুকু জানা যায় যে সেনাবাহিনী উপদ্রুত অঞ্চলে প্রবেশের চেষ্টা করিলে উপদ্ৰবকারীরা বাধা, দিতেছে এবং রীতিমত সংঘর্ষ সৃষ্টি করিতেছে। কিন্তু ইহা সত্ত্বেও স্থানীয় শাসনকাৰ্য্য মিলিটারীর হাতে লইবার প্রয়োজন আছে বলিয়া তিনি মনে করেন না। ইতিপূর্বে প্রকাশ পাইয়াছিল যে, প্রাক্তন সৈন্যগণ কর্তৃক আক্রমণ পরিচালিত হইয়াছিল। জেনারেল বুসারের সহিত প্রশ্নোত্তর-প্রসঙ্গে প্রকাশ পায় যে, সৈন্যদলে কাজ করিতেছে এমন ব্যক্তিরাও আক্রমণে যোগ দিয়াছিল। চিঠিপত্র পরীক্ষা হইতে ইহা ধরা পড়ে।

ইউনাইটেড প্রেসের মারফৎ প্রচারিত এবং ২৯শে অক্টোবর “হিন্দুস্থান ষ্ট্যাণ্ডার্ড” পত্রিকায় প্রকাশিত যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলের বিবৃতির একটু বিশেষত্ব আছে। তিনি তখন কেন্দ্রীয় গবর্ণমেন্টের শাসনপরিষদে মুসলীম লীগ মনোনীত সদস্য এবং লীগের পক্ষ হইয়াই তিনি উপদ্ৰবের স্থল পরিদর্শন করিয়া ফিরিয়াছেন। ১৯শে অক্টোবর বঙ্গীয় মুসলীম লীগের ওয়ার্কিং কমিটী উপদ্রবস্থল পরিদর্শনের জন্য প্রতিনিধিপ্রেরণের সিদ্ধান্ত করেন, ২২শে অক্টোবর শ্রীযোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল ও অন্যান্য কয়েকজন লীগপ্রধান কলিকাতা হইতে বিমানযোগে যাত্রা করেন, ২৩শে অক্টোবর তাহারা ফিরিয়া আসেন, ২৪শে অক্টোবর রিপোর্ট দেন এবং ২৫শে অক্টোবর তাহা প্রকাশিত হয়। সদ্য পরিদর্শনলব্ধ অভিজ্ঞতার পর শ্রীযুক্ত মণ্ডল কলিকাতায় ফিরিয়াই ‘এসোসিয়েটেড, প্রেসের’ প্রতিনিধির নিকট বলেন–“দুর্বৃত্তেরা যাহাকে পাইয়াছে তাহারই ধৰ্মনাশ করিয়াছে। একটী স্ত্রীলোকের সহিত আমার দেখা হইয়াছিল। সে বলিল—দুর্বৃত্তেরা আমার স্বামীকে হত্যা করিয়া কন্যাকে হরণ করিয়াছে।” কিন্তু মণ্ডল মহাশয়ের এই অভিজ্ঞতা সত্বেও পরিদর্শকগণের পক্ষ হইতে লীগ সেক্রেটারী মহাশয় যে রিপোর্ট দিলেন এবং লীগ ওয়ার্কিং কমিটীর অনুমোদনে যাহা প্রকাশিত হইল তাহাতে তাহারা বলিলেন—“প্রত্যক্ষ প্রমাণ দিতে পারে এমন একটী লোকও আমরা পাই নাই,” পুনরায় বলিলেন—“তপশীলী হিন্দুসমাজের এক ব্যক্তিও নিহত বা ক্ষতিগ্রস্ত হয় নাই”। নারীহরণের দোষ ক্ষালনের জন্য বলিলেন-“এইরূপ অপহৃতা হিন্দুনারীর পরিবর্তে হিন্দুদিগকে মুসলমান নারী দেওয়া হইয়াছিল।” এই রিপোর্টে এবং বঙ্গীয় মুসলীম লীগের এতৎসংক্রান্ত প্রস্তাবে ঘটনার গুরুত্ব এবং মুসলমান সমাজ ও মুসলীম লীগের দায়িত্ব লঘু করিবার চেষ্টার বিষয় ইতিপূর্বে আচাৰ্য কৃপালনীর বিবৃতিসমূহের আলোচনাপ্রসঙ্গে উল্লেখ করিয়াছি।

বঙ্গীয় মুসলীম লীগের এই রিপোর্ট প্রকাশের পরেও শ্রীযুক্ত মণ্ডল ২৯শে অক্টোবর তারিখে ‘ইউনাইটেড প্রেসের’ মারফতে প্রচারিত তাহার বিবৃতিতে বলিয়াছেনঃ – “Any man irrespective of caste and creed will be shocked at the untold misery and sufferings of the victims of the riots at Noakhali and Chandpur. Any language is inadequate to condemn the ruthless barbarism of the hooligans at Noakhali and Chandpur.” অর্থাৎ, “জাতিধর্মনির্বিশেষে যে কোন লোক নোয়াখালি ও চাঁদপুরের উপদ্রব পীড়িত জনগণের অবর্ণনীয় দুঃখ দুর্দশা দেখিয়া মর্মাহত হইবে। নোয়াখালি ও চাঁদপুরে উপদ্ৰবকারিগণের নির্মম বর্বরতা বর্ণনা করিঝর ভাষা নাই।” [মণ্ডল মহাশয়ের এই মন্তব্য উদ্ধৃত করিয়া শ্ৰীযুক্ত ক্ষিতীশচন্দ্র নিয়োগী “Statesman” পত্রিকার সম্পাদকের নিকট যে পত্র লেখেন তাহা এই প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য। ৬ই নভেম্বর ইহা প্রকাশিত হয়ঃ-

“Sir, you lately published presumably from an official source an account of the Viceroy’s air tour of Noakhali and Tippera Districts in East Bengal. Referring to an incident where “wisps of smoke ascended, seemingly from charred debris of huts” the account stated that “closer investigation identified domestic cooking”. Then came the sentence: “Wrecked sights were rare and needed careful piloting to seek and find.”

I do not suppose any one would maintain that arson was continued on Saturday last in the affected area. The reference to deceptive wisps of smoke in this context therefore seemed an unworthy attempt at humouring in a situation where nothing but sympathy was called for.

I fervently hope that the Viceroy’s brief aerial flight over some of the affected spots will not be utilised for the purpose of minimising the gravity of the situation or supporting the inaccurate statements of Sir Frederick Burrows which were read out in Parliament a few days ago. Were such an attempt made even now it would only exasperate the affected community and might increase the difficulty in the way of restoring peace in the country.

I should like to quote the following from a press interview reported to have been granted by Mr. J. N. Mandal, Law Member of the present Government of India, who visited the affected areas in the company of some of his Muslim League colleagues: “Any man irrespective of caste or creed will be shocked at the untold misery and sufferings of the victims of the riots at Noakhali and Chandpur. Any language is inadequate to condemn the ruthless barbarism of the hooligans of Noakhali and Chandpur.”

Mr. Mandal, I understand, has just arrived at Delhi to join his office. Will the Viceroy get a detailed account from him of what he actually saw? After all Mr. Mandal cannot be accused of bias in favour of Hindus.

(New Delhi, Nov. 3, K. C. Neogy; M. L. A.(Central)]

তিনি তখন দ্বিতীয়বার উপদ্রবস্থল পরিদর্শনে যাইবার উদ্যোগ করিতেছেন। আশ্চৰ্য্য এই, ইহার পর এই ব্যক্তিই প্রকাশ্যে মুসলীম লীগের প্রচারকার্যে যোগ দেন এবং লীগ নেতৃবৃন্দের উক্তির প্রতিধ্বনি করিয়া বলেন যে, তপশীলী হিন্দু সমাজের উপর কোনই অত্যাচার হয় নাই। বলা বাহুল্য হিন্দুসমাজের মধ্যে ভেদ ঘটাইবার জন্যই বিশেষ করিয়া এই প্রকাণ্ড মিথ্যা কথাটা প্রচার করা হইতেছিল। কুমিল্লা হইতে বঙ্গীয় ব্যবস্থা-পরিষদে নির্বাচিত তপশীলী সদস্য শ্ৰীযোগেন্দ্রচন্দ্র দাস ১৪ই নভেম্বর তারিখে এক বিবৃতি দিয়া মণ্ডল মহাশয়ের এই উদ্দেশ্যপূর্ণ প্রচারকার্যের প্রতিবাদ করেন। চাঁদপুর হইতে এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, “উপদ্ৰবকারিগণের ধ্বংসকার্যে স্থানীয় তপশীল সমাজের দুর্দশা লঘু করিবার জন্য মণ্ডল মহাশয় যে চেষ্টা করিতেছেন তাহা নিতান্তই সত্যের বিরোধী। আমি এই ধ্বংস কার্য্যের প্রত্যক্ষদর্শী। চাঁদপুর মহকুমার হাইমচর অঞ্চলে কুড়ি হাজারের অধিক তপশীল সমাজের জনসাধারণের বাস। ইহা অগ্নিকাণ্ডে একেবারেই বিধ্বস্ত হইয়াছে ; গৃহসমূহ লুণ্ঠিত হইয়াছে, নারীর মর্যাদা নষ্ট করা হইয়াছে, কতগুলি বালিকার সন্ধান পাওয়া যাইতেছে না, বহুসংখ্যক নারীধর্ষণেরও সংবাদ পাওয়া গিয়াছে, কতগুলি লোক দুর্বৃত্তগণ কর্তৃক নিহত হইয়াছে, তপশীল সমাজভুক্ত প্রায় পনের হাজার স্ত্রীপুরুষ নিরাশ্রয় হইয়া ঘুরিয়া বেড়াইতেছে।”

মালব্যজীর মহাপ্রয়াণঃ

নোয়াখালি-ত্রিপুরার উপদ্রব এবং তৎসম্বন্ধে এই সকল প্রচারকার্য্য যখন চলিতেছিল সেই সময়ে ইহাদের অন্তরালে ভারতবর্ষের ইতিহাসের আর এক মর্মান্তিক ঘটনা ঘটিতেছিল। তাহা হইল পণ্ডিত মদনমোহন মালব্যজীর মৃত্যু। মালব্যজী এই সময় বয়সে ও রাগে জীর্ণ। নোয়াখালি-ত্রিপুরার অত্যাচার-কাহিনী তাহার নিকট পৌঁছিবামাত্র এই বর্ষীয়ান দেশসেবকের চক্ষু হইতে যে অশ্রুধারা প্রবাহিত হইতে আরম্ভ করে, শেষ পর্যন্ত তাহা ক্ষান্ত হয় নাই। এই ঘটনাকে লক্ষ্য করিয়া হিন্দুসমাজের ভবিষ্যৎ চিন্তায় তাঁহার জীবনের সায়াহ্নকাল যন্ত্রণাময় হইয়া উঠিয়াছিল। হিন্দুসমাজকে আপনার সম্বন্ধে সচেতন ও আত্মরক্ষার প্রবৃত্তিতে উদ্বুদ্ধ হইবার জন্য আহ্বান করিয়া ১লা নভেম্বর মালব্যজী এক আবেদন প্রচার করেন [৯ই নভেম্বর, ১৯৪৬ তারিখের “হিন্দুস্থান ষ্ট্যাণ্ডডি” পত্রিকায় প্রকাশিত।] ইহাই দেশের প্রতি ও জাতির প্রতি তাহার দীর্ঘ জীবনের উপলব্ধির শেষ নিবেদন ও শেষ বাণী। নোয়াখালি-ত্রিপুরার ঘটনার সংবাদে মালব্যজীর শরীর ও মন যে ভাবে ভাঙ্গিয়া পড়ে, তাহা তিনি আর সামলাইয়া উঠিতে পারেন নাই। সুগভীর বেদনায় ধীরে ধীরে স্তিমিত হইতে হইতে ১৩ই নভেম্বর তাঁহার জীবন-প্রদীপ নির্বাপিত হয়। ইউরোপের ইতিহাসে বলে, “Austerlitz Killed Pitt” অষ্টার্লিজের যুদ্ধে নেপোলিয়নের নিকট পরাজয়ের আঘাতেই বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী পিটের প্রাণবিয়োগ ঘটে। ভারতবর্ষের ইতিহাসেও তেমনি লিখিত হইবে, “Noakhali Killed Malaviya” নোয়াখালিতে হিন্দুসমাজের উপর অত্যাচার-কাহিনীর অসহ বেদনাই মালব্যজীর জীবনান্তের কারণ হইয়াছিল। নোয়াখালি-ত্রিপুরার ধ্বংস-কাহিনী বর্ণনা করিতে হইলে তাহার পটভূমিকায় মালব্যজীর মহাপ্রয়াণের দৃশ্য অপরিহার্যভাবেই জাগিয়া উঠিবে।

গান্ধীজীর আশ্বাসঃ

চতুর্দিকব্যাপী নিরাশার এই নিবিড় অন্ধকারের মধ্যে আলোক বিকিরণ করিতেছিলেন একমাত্র গান্ধীজী। গভীর বেদনা আপনার বুকে চাপিয়া উদাত্তকণ্ঠে বারবার সমাজকে আহ্বান করিয়া তিনি বলিতেছিলেন, “ভয়ের নিকট আত্মসমর্পণ করিওনা, ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে বিশ্বাস হারাইও না।”

নোয়াখালি-ত্রিপুরার ঘটনা প্রকাশ হইবার প্রথম দিন হইতেই তাহার আশ্বাসবাণীতে, প্রার্থনান্তিক ভাষণে ও “হরিজন পত্রিকার” মন্তব্যে নানাভাবে তিনি উৎপীড়িত জনসমাজকে ইহাই শুনাইয়াছিলেন। ১৫ই অক্টোবর দিল্লীতে তাহার প্রার্থনান্তিক ভাষণে সর্বপ্রথম ইহার উল্লেখ দেখিতে পাই। ১৭ই অক্টোবরের প্রার্থনাসভায় তিনি বলেন হত্যার সংবাদ অপেক্ষাও স্ত্রীলোকদিগকে বলপূর্বক ধর্মান্তরিত করিবার ও অপহরণ করিয়া লইয়া যাইবার সংবাদে তিনি অধিকতর ব্যথিত হইয়াছেন; কেহ কেশাগ্র স্পর্শ করিবার পূর্বে কি করিয়া মৃত্যুবরণ করিতে হয় তাহা নারীগণকে শিক্ষা করিতে হইবে। ১৮ই অক্টোবরের ভাষণে গান্ধীজী নারীদিগকে উপদেশদান প্রসঙ্গে বলেন, সম্মাননাশের পূৰ্বে তাহারা যেন বিষগ্রহণ করেন। ১৯শে অক্টোবরের ভাষণে পুনরায় ইহা উল্লিখিত হইয়াছে। মৃত্যু বরণ করিয়া কি প্রকারে মৰ্যাদা রক্ষা করিতে হয়, তাহাই গান্ধীজী বিশেষভাবে বলিয়াছেন। ২১শে অক্টোবর “এ্যাসোসিয়েটেড প্রেস অব আমেরিকার” প্রতিনিধি তাঁহার সহিত সাক্ষাৎ করিলে গান্ধীজী সুগভীর মর্মবেদনা প্রকাশ করিয়া বলেন, পূর্ববঙ্গের উপদ্রব দমন করা বাঙলার মুসলীম লীগ মন্ত্রিমণ্ডলের উচিত ছিল, তাহারা ইচ্ছা করিলে তাহা পারিতেন বলিয়াই তাহার বিশ্বাস। ২৪শে অক্টোবর তারিখের ভাষণে নোয়াখালি-ত্রিপুরার অত্যাচারের প্রতিবাদে দিল্লীর স্থানীয় জনসাধারণের বিক্ষোভ প্রদর্শনের উত্তরে গান্ধীজী বলেন, বাঙলার ঘটনায় বিচলিত হয় নাই এমন লোক থাকিতে পারে না। ভারত গভর্ণমেন্টের (তৎকালে কংগ্রেস ও লীগ কর্তৃক পরিচালিত) প্রত্যেক সদস্য ইহাতে বিচলিত হইয়াছেন। এই দিন মহাত্মাজীর মন এত বিচলিত হইয়াছিল যে আনুষ্ঠানিক প্রার্থনা পরিত্যক্ত হয়। তিনি নারীদিগকে ভয়হীন হইতে উপদেশ দেন এবং সম্মানহানির পূর্বে মৃত্যু বরণ করিতে বলেন; কারণ, দলবদ্ধ আক্রমণের বিরুদ্ধে সশস্ত্র আত্মরক্ষার চেষ্টাও নিরর্থক। ২৭শে অক্টোবরের প্রার্থনাসভায় গান্ধীজী জানান, তিনি পরদিন দিল্লী হইতে বাঙলায় রওনা হইবেন। নারী-নির্যাতনের যে সকল সংবাদ আসিয়াছে তাহাতে তিনি মর্মাহত হইয়াছেন, নারীদের অশ্রু মুছাইতে এবং তাহাদের মনে বল সঞ্চার করিতেই তিনি যাইতেছেন। ২৯শে অক্টোবর মহাত্মাজী কলিকাতায় আসিয়া পৌঁছান এবং সেই তারিখেই বৈকালে প্রার্থনাসভায় বলেন তিনি কলিকাতায় থাকিবার জন্য আসেন নাই, তিনি সদ্য সদ্যই নোয়াখালিতে রওনা হইবেন, সেইখানেই তাহার স্থান; পরে ভগবান তাহাকে যেভাবে চালিত করেন তিনি সেইভাবেই চলিবেন। ৩০শে তারিখের প্রার্থনাসভায় গান্ধীজী ঐক্যের জন্য আবেদন করেন এবং বলেন যে, ১লা নভেম্বর তারিখে তিনি নোয়াখালি রওনা হইবেন।

কিন্তু দ্রুত নোয়াখালি গিয়া পৌঁছাইবার এই আকুল আগ্রহ সত্ত্বেও দ্রুত যাত্রা করা মহাত্মাজীর পক্ষে সম্ভব হইল না। বাঙলা গভর্ণমেন্টের তৎকালীন পরিচালকগণ কখনও আলোচনার অজুহাতে, কখনও উদ্যোগ-আয়োজনের অজুহাতে, কখনও আসন্ন বক্‌রিদের (বকরি ইদের) অজুহাতে অনুরোধ করিয়া গান্ধীজীর যাত্রার দিন পিছাইয়া দিতে লাগিলেন। ইতিমধ্যে নোয়াখালি-ত্রিপুরার ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় বিহারে অগ্নিকাণ্ড সুরু হইয়া গিয়াছে। গান্ধীজী নোয়াখালি না গিয়া যাহাতে বিহারে যান তজ্জন্যও সুকৌশলে চেষ্টা আরম্ভ হইয়া গেল। অবস্থা এমন দাঁড়াইয়াছিল যে, একসময় মনে হইয়াছিল গান্ধীজী হয়তো নোয়াখালি যাত্রা স্থগিত রাখিয়া বিহারেই যাইবেন। পূৰ্বেই বলিয়াছি বিহারের অবস্থা দ্রুত আয়ত্তে আসিয়াছিল। সাম্প্রদায়িক অগ্ন্যুৎপাত যেমন অপ্রত্যাশিতভাবে অকস্মাৎ আরম্ভ হইয়াছিল তেমনি দ্রুত উহা শান্ত হইয়া গেল। একদিকে, উপদ্রব দ্রুত শান্ত না হইলে গান্ধীজীর প্রয়োপবেশনে মৃত্যুবরণের সঙ্কল্প এবং অন্যদিকে ভারত গবর্ণমেন্টের প্রবল ও ব্যাপক প্রতিকারব্যবস্থা—এই উভয়ের চাপে বিহারের উপদ্ৰবকারীরা শান্ত ও নিরস্ত হইয়াছিল। কিন্তু তৎসত্বেও গান্ধীজীকে বিহারে পাঠাইবার চেষ্টা হইতে বাঙলার লীগনায়কেরা নিরস্ত হইলেন না। শুধু টালবাহানা করিয়া এই ভাবে গান্ধীজীর যাত্রা বিলম্বিত করার একটা মাত্র অর্থই লোকে বুঝিয়াছিল—উপদ্রুত অঞ্চলে গান্ধীজীর পদার্পণের পূর্বেই বর্বরতার সাক্ষ্যপ্রমাণসমূহ যথাসম্ভব অপসারিত করা। ইহার প্রয়োজন হইয়াছিল আরও একটা বিশেষ কারণে—এতদিন উপদ্রুত এ অঞ্চলের অভ্যন্তরভাগ বাহিরের লোকের পক্ষে একপ্রকার অবরুদ্ধই ছিল। গান্ধীজীর যাত্রার সঙ্গে সঙ্গে সে অবরোধ ভাঙ্গিয়া যাইবে এবং বাহিরের সহস্র দৃষ্টি যুগপৎ উপদ্রুত অঞ্চলের উপরে গিয়া পড়িবে। যাহাই হউক, সকল প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করিয়া শেষ পর্যন্ত গান্ধীজীর যাত্রা সম্ভব হইল। গান্ধীজী বিহারে না গিয়া নোয়াখালিতে যাওয়া সম্বন্ধে দৃঢ় হইয়া রহিলেন এবং ৬ই ডিসেম্বর প্রাতে স্পেশাল ট্রেণযোগে সোদপুর হইতে নোয়াখালি রওনা হইয়া গেলেন। মন্ত্রী মিঃ সামসুদ্দীন, প্রধান মন্ত্রীর পার্লামেন্টারী সেক্রেটারী মিঃ নসরুল্লা এবং মিঃ আবদুর রসীদ এই তিন জনও মহাত্মাজীর সঙ্গে রহিলেন। রাত্রি সাড়ে আটটায় চাঁদপুরে পৌঁছিয়া মহাত্মাজী তথায় রাত্রি কাটাইলেন এবং তৎপরদিন প্রাতে স্পেশাল ট্রেণ যোগে রওনা হইয়া দ্বিপ্রহরে চৌমুহনীতে পৌঁছিলেন।

৮ই ডিসেম্বর অপরাহে চৌমুহনীর এক সভায় মহাত্মাজী হিন্দু-মুসলমান সকলের নিকট ঐক্য ও সম্প্রীতির আবেদন জানান।
৯ই ডিসেম্বর তারিখে রামগঞ্জ থানার অন্তর্গত গোপের বাগ, দত্ত পাড়া, ও অপর একটি গ্রামে ধ্বংস ও হত্যার চিহু পরিদর্শন করেন।
১০ই ডিসেম্বর তারিখে চৌমুহনী হইতে দত্তপাড়ায় শিবির স্থানান্তরিত করেন, এবং পর পর কয়দিন নয়াখালা, সোনাচাকা, খিলপাড়া, গোয়াতলী, নন্দীগ্রাম প্রভৃতি স্থানগুলি পরিদর্শন করেন। তখন হত্যাকাণ্ডের পর একমাস হইয়া গিয়াছে কিন্তু তখনও উপদ্রুত স্থানে নিহতদের দগ্ধাবশেষ ও অস্থিপঞ্জর পড়িয়া আছে।
১৩ই ডিসেম্বর মহাত্মাজী তাহার শিবির উঠাইয়া দিলেন, সহকর্মীদের প্রত্যেককে এক এক এক গ্রামে গিয়া বসিতে বলিলেন এবং ১৪ই ডিসেম্বর নিজে কাজীরখিল গ্রামে তাহার নিজস্ব দপ্তর স্থানান্তরিত করিলেন। এইখানে থাকিয়া মহাত্মাজী নন্দনপুর, করপাড়া, দশঘরিয়া ও মধুপুর গ্রাম পরিদর্শন করেন।
২০শে ডিসেম্বর তিনি সকলকে কাজীরখিলে রাখিয়া মাত্র দুইজন সঙ্গীসহ শ্রীরামপুর গ্রামে চলিয়া আসিলেন। এই শ্রীরামপুর গ্রাম হইতেই মহাত্মাজীর পদব্রজে উপদ্রুত অঞ্চলে পরিক্রমা আরম্ভ হয়।

মহাত্মাজীর শ্রীরামপুরে অবস্থিতির সময়েই শরৎচন্দ্রের সহিত পুনরায় উপদ্রুত অঞ্চল পরিদর্শনে উপস্থিত হই। সে কথায় প্রবৃত্ত হইবার পূর্বে বাঙলায় ও বিহারে সাম্প্রদায়িক উপদ্রব দমনের ব্যাপারে ভারত গবর্ণমেন্টের শাসননীতির পার্থক্য—প্রথম ক্ষেত্রে নিতান্ত নিস্ক্রিয়তা এবং দ্বিতীয় ক্ষেত্রে বিশেষ সক্রিয়তা—এবং তজ্জনিত ক্ষোভের কথা একটু বলিয়া লইব। (ক্রমশঃ)

We are not big media organisation. Your support is what keeps us moving. Don't hesitate to contribute because, work, for society needs society's support. Jai Hind.