রাজেশ-তাপসের বাংলা ভাষা এবং ওদের ভাষা

0
252

অমিত মালী

বাংলা ভাষা অনেক পথ পেরিয়ে এসেছে।অনেক রূপ পরিবর্তন পেরিয়ে আজ একটু মার্জিত রূপ পেয়েছে এই ভাষা। আজও এই ভাষার মধ্যে অনেক আরবি,উর্দু শব্দ রয়ে গিয়েছে-যা এই বাংলায় মুসলিম শাসন যে একসময় ছিল তার চিহ্নস্বরূপ। আজ ভাষা বাঙালির পরিচয় হয়ে উঠেছে। বাঙালি এই ভাষায় কালজয়ী সাহিত্য রচনা করেছে, এই ভাষায় কালজয়ী গান রচনা করেছে এই বাংলার মাটিতে বসেই। কিন্তু এত কিছুর পরেও বাঙালি আজ যেন বাংলা ভাষার পরিচয় হারাতে বসেছে। কারণ কি? এর কারণ হলো পশ্চিমবঙ্গ এবং ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে থাকা বাঙালির মুখের ভাষাকে পরিবর্তন করে দেবার চেষ্টা চলছে সুপরিকল্পিতভাবে। সেই পরিকল্পনার অনেকগুলি দিক রয়েছে, যেমন ভাষার মধ্যে বিভিন্ন বিজাতীয় শব্দ ঢুকিয়ে দেওয়া, যা গত 200 বছরেও বাংলা ভাষার মধ্যে ছিল না। এছাড়াও পরিকল্পনা করে ভাষার জন্মগত পরিচয় এবং গর্ব ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে পশ্চিমবঙ্গের বাঙালির কাছ থেকে। বিশ্বে প্রচার চলছে যে বাংলা ভাষা বাঙালির নয়, বাংলাদেশের।আর সেই পরিচয় বিশ্বের মানুষের কাছে তুলে ধরা হচ্ছে জোর গলায়। এর ফলে পশ্চিমবঙ্গে এবং ভারতে থাকা যেসব মানুষ পরিশীলিত এবং রুচিমার্জিত বাংলাভাষায় কথা বলেন, তারা বাংলা ভাষার নিজস্ব পরিচয় হারাতে বসেছেন। সে পরিচয় ফিরিয়ে আনা, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে বাংলা ভাষার গর্ব, অনুপ্রেরণা রেখে যাওয়া বর্তমান প্রজন্মের দায়িত্ব।সেই দায়িত্ব আমাদের নিতে হবে।

বাংলা ভাষার সৃষ্টি দেবভাষা সংস্কৃত থেকেই। তাই বাংলাভাষার একশটি শব্দের মধ্যে আজও প্রায় ৪৫টি শব্দ সংস্কৃত। এভাবেই চলছিল। ভাষার পরিচিতি, রক্ষা নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের হিন্দুদের কোনোদিন মাথাব্যথা ছিল না। বাঙালি যে ভাষায় রোজ কথা বলে, যে ভাষায় বই পড়ে, যে ভাষায় কবিতা লেখে, যে ভাষায় গান গায়, সে ভাষার রক্ষায় কোন ভূমিকা নিলো না। আর এর ফল হলো মারাত্বক। নতুন সৃষ্টি হওয়া বাংলাদেশ বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা ঘোষণা করল এবং ভাষার পরিচিতি দাবি করলো এবং বিশ্বের স্বীকৃতি পেলো। তারা এ ধারণাও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দিলো যে বাংলা ভাষায় যে বা যারা কথা বলে, তারাই বাঙালি।কিন্তু  বাংলাদেশ যে ভাষাকে বাংলা ভাষা বলে দাবি করে, সে ভাষা কিন্তু কোনোভাবেই বাংলা ভাষা নয়। বাংলাদেশ যে ভাষাকে বাংলা ভাষা বলে দাবি করে, তা হলো বাংলা, আরবি ও উর্দু মিশ্রিত এক জগাখিচুড়ি বাংলা ভাষা। যে ভাষার সৃষ্টি হয়েছে মাদ্রাসার ভিতর থেকে, যে ভাষার সৃষ্টি আলেম-উলেমার মুখ থেকে; যে ভাষার কোন অস্তিত্ব পাওয়া যায় না বাঙালির গর্ব বঙ্কিম চন্দ্র চট্টোপাধ্যায় কিংবা শরৎ চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়-এর সাহিত্যে; যে ভাষায় পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি কথা বলে না। কিন্তু সময় পাল্টেছে, কিন্তু বাঙালি হিন্দু তার মনের-প্রানের ভাষা বাংলা নিয়ে একটুও চিন্তিত নয়। আর এর ফলেই বাঙালির ভাষা কেড়ে নেবার এক সুগভীর চক্রান্ত শুরু হয়েছে। এই চক্রান্তের একটি দিক হলো উর্দু ভাষাকে সরকারি ভাষার স্বীকৃতি দেওয়া এবং যে এলাকায় ১০% মুসলিম জনসংখ্যা রয়েছে, সেই সব এলাকার স্কুলে উর্দু ভাষার শিক্ষক নিয়োগ করার সিদ্ধান্ত। ফলে এ থেকে সিদ্ধান্তে আসতে হবে বাঙালি হিন্দুদের যে, বাংলা ভাষা শুধুমাত্র বাঙালি হিন্দুর, বাঙালি মুসলমানের নয়। কারণ পশ্চিমবঙ্গে বসবাস করা মুসলমানের ঝোঁক সেই আরবি,উর্দুতে।তাদের মুখের ভাষাও সেই আরবি এবং উর্দু মিশ্রিত। বাঙালি হিন্দু বলে, ‘আমি স্নান সেরে মুরগির মাংস দিয়ে ভাত খেলাম’। কিন্তু বাঙালি মুসলমান বলে, ‘আমি গোসল করে মুরগির গোস্ত দিয়ে ভাত খেলাম’।এখানেই পার্থক্য পরিষ্কার। আপনি কাকা বলবেন, কিন্তু মুসলমান বলবে চাচা; আপনি পিসি বলবেন, মুসলমান বলবে ফুফু; আপনি বাবা বলবেন, কিন্তু মুসলমান বলবে আব্বা। এইরকম অজস্র অশুদ্ধ শব্দ এই পশ্চিমবঙ্গের মুসলমানদের মুখে শুনতে পাবেন, যেমন-ফুফা, চাচী, আম্মা, খালা আম্মা, দুলাভাই ইত্যাদি।  

বাঙালির বাংলা ভাষাকে ছিনিয়ে নেওয়ার আর একটি বড় চক্রান্ত করা হচ্ছে স্কুল সিলেবাসের পরিবর্তন করার মাধ্যমে। পশ্চিমবঙ্গে বাংলা মাধ্যম স্কুলগুলোতে যেসব পাঠ্যপুস্তক ছাত্র-ছাত্রীদের পড়ানো হচ্ছে, সে সমস্ত বইয়ের ভাষায় প্রচুর আরবি, উর্দু শব্দ ঢোকানো হয়েছে।এমনকি তৃতীয় শ্রেণী, দ্বিতীয় শ্রেণীর পাঠ্যপুস্তকে পরিবার পরিচয়ে দুজন ছাত্রকে তুলে আনা হয়েছে-হিন্দু ছাত্র বলছে যে তার পরিবারে বাবা, মা, কাকা, কাকিমা, ঠাকুরদা এবং ঠাকুরমা রয়েছে। কিন্তু মুসলিম ছাত্রটি বলছে যে তার পরিবারে আব্বা, আম্মা, চাচা, চাচি, নানা ,নানী রয়েছে। অর্থাৎ দুজন ছাত্র দুরকম ভাষা বলবে। তাহলে এই শিক্ষা যদি চলতে থাকে, তাহলে হিন্দু ছাত্র একরকম ভাষা বলবে, যা বিশুদ্ধ বাংলা ভাষা  আর মুসলিম ছাত্র আর একরকম বাংলা ভাষায় কথা বলবে যা আরবি,উর্দু মিশ্রিত। তাহলে বাংলা ভাষার অধিকার কার কাছে থাকবে? বাংলা ভাষার পরিচয় দাবি করে জোর গলায় আওয়াজ তোলা উচিত কার? সেই দায়িত্ব আজ বাঙালি হিন্দু যুব সমাজকে নিতে হবে। সেই সঙ্গে আজ পশ্চিমবঙ্গের স্কুলগুলোতে বাংলা ভাষার শিক্ষকের পদ ফাঁকা থাকলেও নিয়োগ করা হচ্ছে না, উল্টে উর্দু ভাষার শিক্ষক নিয়োগ করা হচ্ছে। শিশু শ্রেণী থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত স্কুল সিলেবাসে বাংলা ভাষায় কালজয়ী, অমর সাহিত্যিক বঙ্কিমচন্দ্র এবং শরৎ চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের লেখা সাহিত্য বাদ দিয়ে দেওয়া হয়েছে। তার জায়গায় বেগম রোকেয়া, আল মাহমুদ, বন্দে আলী মিয়াঁ-এর মত বাংলাদেশি মুসলমান লেখকের লেখা পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। কারণ কি? কারণ এটা আমাদের অজানা নয় যে বাংলা ভাষার গর্ব, পরিচয় তৈরিতে বাঙালি হিন্দুর ভূমিকা অনস্বীকার্য। তাই সেই পরিচয়, গর্ব ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে অনেক আগেই। আর এখন বাঙালি হিন্দুর মুখের ভাষা কেড়ে নেবার চক্রান্ত চলছে।সেই চক্রান্তের অঙ্গ হলো বাংলা ভাষায় আরবি, উর্দু ভাষায় অনুপ্রবেশ ঘটানো।সেই চক্রান্তের অঙ্গ হলো দাড়িভিট স্কুলে জোর করে আরবি শিক্ষককে নিযুক্তি দেওয়া। ছাত্র-ছাত্রীরা বাধা দেওয়াতে লাঠি চার্জ করা, গুলি চালানো থেকে দুইজন ছাত্রকে হত্যা করা কোনকিছুই বাদ যায়নি। সেই চক্রান্তের শিকার হয়ে রাজেশ-তাপসকে প্রাণ দিতে হয়েছে। তাদের সেই প্রাণ বলিদান ছিল বাংলা ভাষা রক্ষার জন্যে, বাঙালির মনের ভাষা বাঁচানোর জন্য। তাদের এই বলিদান আমরা ব্যর্থ হতে দিতে পারিনা।

কিন্তু এত কিছুর পরেও বাঙালি তাদের সেই বলিদানকে মনে রাখেনি।কারণ বাঙালি বড়ই আত্মবিস্মৃত জাতি। তাই একবার নিজের ভিটে-মাটি হারানোর পরেও সম্প্রীতির গান গাইছে। এই পরিস্থিতিতে জোর প্রচার চলছে যে এই বাংলা এবং ওপার বাংলা অর্থাৎ বাংলাদেশের সবাই বাঙালি। দাবি উঠেছে ঐক্যবদ্ধ করার। কিছু বিকিয়ে যাওয়া বুদ্ধিজীবী এর সপক্ষে প্রচারও চালাচ্ছেন। গড়ে উঠেছে ‘বাংলা পক্ষ’ নামে একটি সংগঠন। ভুল বুঝে কিছু শিক্ষিত যুবক বাংলা-বাঙালির নাম করে বিভেদ সৃষ্টি করছে। নির্বিচারে অপমান করছে বাংলায় বসবাসকারী অন্যান্য ভাষা-ভাষী মানুষদের। ফলে বাঙালি যে ভাষা কাউকে গ্রহণ করার জন্য কোনোদিন জোর করেনি, সেটাই করা হচ্ছে- যা বাঙালির সংস্কৃতি নয়। এতে বাঙালির অপমান। এসব দেখে এটা বুঝতে অসুবিধা হয় না যে ভাষার হুজুগ তুললেও  এদের আসল লক্ষ্য কিন্তু অন্যকিছু। এদেরকে সমর্থন করে চলেছেন কিছু তথাকথিত বুদ্ধিজীবী।  এই বুদ্ধিজীবীরা ২১শে ফেব্রূয়ারি  ভাষা দিবস পালনের উৎসাহ দিচ্ছে-যে তারিখে উর্দু ভাষা চাপিয়ে দেবার প্রতিবাদে বাংলাদেশে কয়েকজন ছাত্র প্রাণ দিয়েছিল। কিন্তু আজ বাংলাদেশের ভাষা আর বাংলা ভাষা নেই, তা আরবি, উর্দু মিশ্রিত এক দূষিত ভাষা।   তাই সেই ভাষা দিবস পালন বাঙালির কাছে অর্থহীন।তাই বাংলা শিক্ষকের দাবিতে, জোর করে উর্দু চাপিয়ে দেবার প্রতিবাদে প্রাণ বলিদান দেওয়া রাজেশ-তাপসের মৃত্যুদিন ২০শে সেপ্টেম্বর হয়ে উঠুক বাঙালি হিন্দুর ভাষা দিবস। যে দিবস উদযাপনের মধ্যে দিয়ে বাঙালি হিন্দুর ভবিষ্যৎ প্রজন্ম মুখের ভাষা, প্রানের ভাষা বাংলা ভাষাকে রক্ষায় প্রেরণা পাবে। বাঙালি হিন্দুর মনন থেকে, প্রাণ থেকে আওয়াজ উঠুক- বাংলা ভাষা রক্ষায় শহীদ রাজেশ-তাপস অমর রহে।

We are not big media organisation. Your support is what keeps us moving. Don't hesitate to contribute because, work, for society needs society's support. Jai Hind.