৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ এবং গণহত্যা

0
33

১৬ ডিসেম্বর পালিত হয় বিজয় দিবস হিসেবে। ভারতীয় সেনার পাকিস্থান বাহিনীর উপর সম্পূর্ণ বিজয়প্রাপ্তি। জেনারেল শ্যাম মানেকশ, ল্যাফটেনান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা, মেজর জেনারেল জেকব,  লছমন সিং লাহেল, দলবীর সিং দের নাম উচ্চারনের মধ্য দিয়ে আমরা একটা আলাদা আত্মপ্রসাদ লাভ করি। এরাই ছিলেন পাকিস্থানকে ভারতের কব্জির জোর দেখাবার নায়ক। কিন্তু তার আগে দীর্ঘ কয়েকমাস পূর্ব পাকিস্থানের রাস্তায় ছিলো মৃতদেহের স্তুপ। আকাশে মহানন্দে চক্বর দিতো শকুনের পাল। চারিদিকে শুধু তাদের খাবার‌‌। সব বয়সি মেয়েরা প্রতিদিন গনধর্ষিতা হতো। তাদের তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিলো মিলিটারি ব্যারাক নামক নরককে হার মানানো কয়েদখানায়। কখন দিন, কখন রাত্রি সেই বোধ তাদের লুপ্ত হয়ে গিয়েছিলো।       

 সূত্রপাত ১৯৭০ সালের পাকিস্থানের সাধারন নির্বাচনের ফল থেকে। আগা মহম্মদ ইয়াহিয়া খানের নেতৃত্বাধীন মিলিটারি শাসনের অধীনে থাকা পাকিস্থানের প্রথম সাধারন নির্বাচন। মুজিবর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামি লীগ নির্বাচনে জয়লাভ করলো। ক্ষমতা হস্তান্তরে অনিচ্ছুক ইয়াহিয়া খান কথার মাধ্যমে কালহরন করতে লাগলো আর ভিতরে ভিতরে প্রস্তুতি নিচ্ছিলো মুজিবুরের একচেটিয়া আসন পাওয়া সম্পূর্ণ বাঙ্গালী অধ্যুষিত পূর্ব পাকিস্থানে মিলিটারি অপারেশানের। আমেরিকায় গিয়ে সে রাষ্ট্রপতি  রিচার্ড নিক্সন এবং তার জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জারের সম্মতি আদায় করতে সক্ষম হলো ।এই বিষয়ে তারা তাকে সহযোগিতার আশ্বাস দিলো। পাকিস্থান এয়ারলাইন্সের বিমানগুলি ঢাকায় পশ্চিম পাকিস্থানের সেনা নামাতে শুরু করলো।পাকিস্থান সেনাবাহিনী ছিলো পাঞ্জাব এবং পশ্চিম পাকিস্থানের অন্য  প্রদেশগুলির মানুষদের নিয়ে গঠিত।  দানবপ্র  কৃতির “বেলুচিস্থানের কসাই” ল্যাফটেনান্ট জেনারেল টিক্কা খানকে অপারেশান সার্চলাইট এর দায়িত্ব দিয়ে ঢাকায় পাঠানো হলো। ১৯৭১ এর ২৫ শে মার্চ থেকে পূর্ব পাকিস্থানে শুরু হলো আমেরিকা থেকে আসা M-8 ট্যাঙ্কের গোলাবর্ষন। আমেরিকা থেকে পাওয়া ফাইটার প্লেনগুলির নিজের দেশের মানুষের উপর বোমাবর্ষন । রাস্তায় কেবল মিলিটারি গাড়ীর শব্দ। মানবতার মৃত্যুধ্বনির শেষ ঘন্টা বাজলো। পূর্ব পাকিস্থান পশ্চিম পাকিস্থানের সামরিক বাহিনীর হাতে নরকের অন্ধকারে নিমজ্জিত হলো।

পাকিস্থানি মিলিটারির বুটের নীচে যখন পূর্ব পাকিস্থানের মানুষের জীবনের অধিকার নিষ্পেষিত হচ্ছিলো, মিলিটারি ব্যারাকে আটক সব বয়সের মেয়েরা যখন প্রতিনিয়ত নিজের মৃত্যুকে কামনা করছিলো, আমেরিকান প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন তখন ইয়াহিয়া খানের প্রতি পূর্ণ সমর্থন বজায় রেখেছিলেন।তখন ঢাকায় আমেরিকান কাউন্সেল জেনারেল ছিলেন আর্চার ব্লাড। তিনি এবং তার সহকর্মীরা ধ্বংসের বীভৎসতায় হতবুদ্ধি হয়ে গিয়েছিলেন।মানুষ এত ক্রূর, নির্মম পিশাচ হতে পারে সেটা তাদের বুদ্ধির অগম্য ছিলো।       

  নিজেদের পৈশাচিকতা যেন পৃথিবী জানতে না পারে , সেজন্যে পাকিস্থান মিলিটারি টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা নষ্ট করে দিয়েছিলো। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের, সংবাদজগতের মানুষদের একজায়গায় সীমাবদ্ধ রেখে, কড়া নজরদারির মাধ্যমে বাইরে সংবাদপ্রেরনের সব রাস্তা বন্ধ করে দিয়েছিলো। ঢাকার মার্কিন কনসুলেটে একটা গোপন wireless set ছিলো যেটার মাধ্যমে আর্চার ব্লাড আমেরিকার রাষ্ট্রপ্রধানের কাছে ধ্বংসের ভয়াবহতা জানিয়ে এটা বন্ধের জন্য আমেরিকার  হস্তক্ষেপের জন্য অনুরোধ জানান। কিন্তু মার্কিন সদরদপ্তর তার কথাকে অগ্ৰাহ্য করে এবং তাকে ঐ বিষয়ে রিপোর্ট পাঠাতে নিষেধ করে। ব্লাড তার দেশের এই অনীহাকে deafening silence বলে অভিহিত করে নিজের career এর ঝুকি নিয়েও পরপর ‘কেবল’ বার্তা পাঠান।তিনি স্পষ্ট উল্লেখ করেছিলেন যে পূর্ব পাকিস্থানে গনহত্যা (genocide) চলছে‌ এবং ক্ষতিগ্ৰস্তদের বেশীরভাগ হিন্দু। এখানে একটা অদ্ভূত প্রশ্ন আসে। পূর্ব পাকিস্থানে মুসলমানের সংখ্যা তখন হিন্দুর চেয়ে অনেকটাই বেশী। পুরো ভূখন্ডে আওয়ামি লীগ নির্বাচনে পরিষ্কার সুইপ করেছিলো। সেই ফলকে কার্যকরী না করার জন্যে মিলিটারি অপারেশান। পশ্চিম পাকিস্থানের কাছে বাঙ্গালী মাত্রেই শত্রু হওয়া উচিত।এত কিছুর পর নিহত , ধর্ষিতা এবং অত্যাচারিত ক্ষেত্রে হিন্দু অনেক বেশী টার্গেট হলো কেন? তাহলে কি ওরা নির্বিচারে হত্যা করে নি? হিন্দুদের ক্ষেত্রে বিজাতীয় আক্রোশটা অনেক বেশী ছিলো? এই হিন্দুরা দেশভাগের সময় চরম অত্যাচারিত হয়েছিলো। এখন আবার তাদের সামনে সেই নরক। যারা দেশ ভাগ করেছিলো তারা বহাল তবিয়তে ক্ষমতা ভোগ করলো, আর এই মানুষগুলিকে , এই বাঙ্গালী হিন্দুদের জীবনের বিনিময়ে,বাড়ীর মেয়েদের চরম লাঞ্ছনার বিনিময়ে তার মাশুল গুনতে হয়েছিলো।ব্লাডের পাঠানো বার্তাগুলিকে হোয়াইট হাউসের সিক্রেট টেপ থেকে বের করে প্রকাশ্যে আনলেন প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটির রাজনীতি এবং আন্তর্জাতিক বিষয়ের অধ্যাপক গ্যারী জে ব্যাস। তার লেখা বই ”Blood Telegram,  Nixon and Kissinger, a forgotten genocide”  এ তিনি ঐ কেবল বার্তাগুলি বিশ্লেষন করে দেখিয়েছেন, কিভাবে নিক্সনরা ইয়াহিয়া খানকে সমর্থন করে বসনিয়ার চেয়েও কয়েকগুন বেশী গনহত্যার রাস্তা করে দিয়াছিলেন‌। তার বই সারা বিশ্বে আলোড়ন ফেললো। বিভিন্ন দেশের প্রথম সারির সংবাদপত্রগুলি এই বইকে অসাধারন বলে অভিহিত করলো। ব্লাডের পাঠানো message গুলিকে কেবল ইচ্ছাকৃতভাবে উপেক্ষাই নয়, বিপরীতে ইয়াহিয়া খানকে পূর্ণ সামরিক এবং মানসিক সমর্থন দিয়ে নিক্সন তাকে বার্তা দিয়েছিলেন,  ”I understand the anguish you must have faced…..   ”. এ বিষয়ে  আমেরিকার উদাসিনতাকে তীব্র সমালোচনা করে Newyork Times এ Dexter Filkins লিখেছেন, ”Our government has failed to denounce atrocities”। কিন্তু শতাব্দির অন্যতম ভয়াবহ ‘genocide’ কে অগ্ৰাহ্য করে ইয়াহিয়া খানের প্রতি নিক্সনের এই অন্ধ সমর্থনের পিছনে মূল কারন কি ছিলো? (৩)পূর্ব পাকিস্থান যখন তার বুকের উপর মধ্যযুগীয় বর্বরতাকে হার মানানো অত্যাচার প্রত্যক্ষ করছিলো , তখন আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি কি ছিলো? তখন bipolar world. এক মেরুতে আমেরিকা, আরেক মেরুতে রাশিয়া। ১৯৪৫ সালে আমেরিকা পরমানু শক্তিধর রাষ্ট্রে পরিনত হয়। ৬ আর ৯ আগস্ট হিরোশিমা এবং নাগাসাকিতে the little boy এবং the fat man নামক দুটি পরমানু বোমা ফেলে তার ধ্বংসক্ষমতাও পরীক্ষা করে নেওয়া হলো। তখন আমেরিকার সব সিনেমাহলে সিনেমা শুরুর আগে পর্দায় লেখা উঠতো, পরমানু বোমা একমাত্র আমাদের আছে। একান্ত গোপনীয় এবং সুরক্ষিতভাবে। আমেরিকার জানাই ছিলো না তাদের কাছ থেকে ঐ ফর্মূলা ইতিমধ্যে রাশিয়ায় পাচার হয়ে গিয়েছে।  ১৯৪৯ সালে রাশিয়ার তৈরী পরমানু বোমা ছিলো চুরিবিদ্যার ফসল। নাগাসাকিতে ফেলা পরমানু বোমার হুবহু নকল। দুই মহাশক্তিধর রাষ্ট্র কখনো মুখোমুখি লড়ে নি। কিন্তু বিভিন্ন দেশের রনাঙ্গনে দুজন দুই পক্ষকে সাহায্য দিয়েছে। উভয়ের মধ্যে ঠান্ডা লড়াই প্রতিনিয়ত চলতো- ‘Cold War”. ভিয়েতনামে সেটা প্রকট হয়ে দেখা গিয়েছিলো। ভিয়েতনামের ক্ষতে প্রলেপ দিতে আমেরিকা চাইছিলো রাশিয়াকে সমস্যায় ফেলতে। তখন রাশিয়ার সঙ্গে চীনের সম্পর্ক তিক্ত ছিলো। আমেরিকার সঙ্গেও খুব একটা মধুর ছিলো না। নিক্সন কিসিঞ্জাররা চাইছিলো রাশিয়ার বিরুদ্ধে চীনকে ব্যবহার করতে । চীনের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক নতুন করে স্থাপন করতে তারা পাকিস্থানকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছিলো। এই কারনেই তারা ইয়াহিয়া খানকে অন্ধের মতো শুধু সমর্থনই করেনি, তাকে নতুন করে সমরাস্ত্র এবং অর্থ দিয়ে বলীয়ান করলো। একবার নিক্সন ইসলামাবাদকে রুট হিসেবে ব্যবহার করে চীন ঘুরেও গেলেন।       

  প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটির রাজনীতির অধ্যাপক গ্যারি ব্যাস এবং ১৯৭১ এর ঢাকার মার্কিন কনসাল জেনারেল ব্লাডের মতে এটা নিক্সনদের মানবতার প্রতি চরম অন্যায়ই শুধু ছিলো না, যে যুক্তি দেখিয়ে তারা এই ‘worst genocide’ কে প্রত্যক্ষ সমর্থন দিয়েছিলেন সে যুক্তিটাও ঠুনকো ছিলো। চীনের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরীর অনেক রাস্তা ছিলো। লক্ষ লক্ষ নিরীহ মানুষের লাশের উপর দিয়ে সেটা করার কোন প্রয়োজন ছিলো না। তাছাড়া ভারতকে নিক্সনরা ভাবতো সোভিয়েতপন্থী-‘Pro Soviet’।  যেহেতু পাকিস্থান ভারতের শত্রূ , তাই পাকিস্থান তাদের বিশেষ স্নেহধন্য ছিলো। কিন্তু ব্যাসের মতে ঐ যুক্তিও ছিলো নিতান্ত অসার।       

তখন ভারতবর্ষ কি অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলো? টিক্কা খানের বাহিনী যখন পূর্ব পাকিস্থানে নরকের পরিস্থিতি তৈরী করেছিলো, তখন ভারত এক অদ্ভূত পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলো।        প্রথম থেকেই ভারত সমরাস্ত্র নির্মানে খুব একটা জোর দেয়নি। চীন ভারত যুদ্ধের সময় সেটা প্রকটভাবে অনুভূত হলো। শান্তির জন্য নোবেল প্রাইজের জন্য যাতে নেহরুর  নাম মনোনীত হয় সেজন্যে প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রকে সম্পূর্ণ অগ্ৰাহ্য করা হয়েছিলো। পূর্ব পাকিস্থানে পশ্চিম পাকিস্থানের বাহিনী তান্ডব চালিয়ে , ট্যাঙ্ক এবং মেশিনগানের মুখে প্রায় ৩০ লক্ষ মানুষকে খুন করেছিলো। ৪৪০০০০ মহিলা ধর্ষিতা হয়েছিলো। দলে দলে মানুষ ভারতে পালিয়ে আসতে শুরু করলো। ভারতে একটা অভাবনীয় পরিস্থিতি তৈরী হলো। পূর্ব এবং উত্তর পূর্ব ভারতে অসম্ভব জনসংখ্যার চাপ পড়লো। একটা উদাহরন দিলে পরিষ্কার হবে। ত্রিপুরার জনসংখ্যা ছিলো ১৫ লাখ। সেখানে হঠাৎ করে ৮ লাখ মানুষ বেড়ে গেলো। ভারতের সামরিক বাহিনীর তখন জানা নেই যে পাকিস্থানের সামরিক শক্তি কতটা। ভারতের সামরিক শক্তিও তখন চীনের তুলনায় অনেক অনেক পিছিয়ে। চীন তখন কি ভূমিকা নেবে সেটাও স্পষ্ট নয়। আমেরিকা পুরোপুরি পাকিস্থানের পক্ষে। প্রথম থেকেই ভারতীয় নীতিনির্ধারক বিষয়গুলিতে বামপন্থীদের প্রাধান্য ছিলো। নেহরুর সময় তো ছিলই। এমনকি ইন্দিরা গান্ধীর সময়েও পি এন হাসক‍রের মতো ব্যক্তিরা ছিলো।  সোভিয়েতপন্থী হিসেবে ভারত পরিচিত ছিলো। এমনকি নিক্সন ইন্দিরা গান্ধীর সম্বন্ধে the old bitch কথাটা ব্যবহার করতেন।         

 পূর্ব পাকিস্থান থেকে বন্যার মতো মানুষের স্রোত ভারতে আছড়ে পড়লো। তাদের মধ্যে ৮০ শতাংশই ছিলো হিন্দু। এখানে একটা স্বাভাবিক প্রশ্ন ওঠে‌। পূর্ববঙ্গে , দেশভাগের সময়, মুসলমান ছিলো ৫৪ শতাংশ, হিন্দু ৪৫ শতা‌ংশ। দেশ ভাগের পর বহু বাঙ্গালী হিন্দু ভারতে কোনমতে প্রানসম্বল করে পালিয়ে এসেছিলেন। মুসলমানদের জন্মহার হিন্দুদের তুলনায় অনেক বেশী। সব মিলিয়ে ১৯৭১ এ মুসলমানের সংখ্যা সেখানে হিন্দুদের চেয়ে অনেক বেশী ছিলো। মিলিটারি আগ্ৰাসন যদি কোন বাছবিচার না করে হতো, তাহলে তুলনামূলকভাবে বেশী সংখ্যক বাঙ্গালী মুসলমান অত্যাচারিত হবার কথা। কিন্তু বেশী সংখ্যক হিন্দু অত্যাচারিত, নিহত, ধর্ষিতা হলো কেন? তার মানে ঐ বর্বর সেনাবাহিনী ওদের কাছে যারা কাফের , সেই হিন্দুদের প্রধান টার্গেট করেছিলো। মনে করুন কোথাও যদি ১০০ জন বাঙ্গালী থাকে, ৫০ হিন্দু ৫০ মুসলমান, এবং যদি পাকিস্থান মিলিটারির কাছে ৭০ টা গুলি থাকে তবে মৃতদের মধ্যে ৫০ হিন্দু আর ২০ মুসলমান হবে। ভারতে আসা মানুষদের পরিচয় সংক্রান্ত তথ্য সরকারকে গোপন রাখতে হচ্ছিলো কারন ৮০ শতাংশ অত্যাচারিতই হিন্দু, এটা প্রকাশিত হলে ভারতে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দেবে‌। এটা ভারত সরকার পরিষ্কার বুঝতে পারছিলো যে পাকিস্থান ভারতে আশ্রয় নেওয়া ঐ মানুষগুলির  ফেরত যাবার রাস্তা বন্ধ করে দিয়েছে। ঐ মানুষগুলির নিরাপদ প্রত্যাবর্তনের জন্য যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে উঠছিলো। কিন্তু জেনারেল শ্যাম মানেকশ জানিয়েছিলেন ঐ মুহুর্তে যুদ্ধের জন্য সেনাবাহিনী প্রস্তুত নয়। প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে জোর না দেবার মাশুল। শুরু হলো মুক্তিফৌজকে গোপনে সাহায্য করার প্রক্রিয়া। প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী আশ্রয় শিবিরগুলি ঘুরে দেখে অত্যাচারের মাত্রায় চমকে উঠেছিলেন। তিনি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ঝটিকা সফর করলেন। বিভিন্ন দেশকে প্রকৃত পরিস্থিতি বুঝিয়ে তাদের সমর্থন বহুলাংশে আদায় করলেন।   

    ঐ সময় দুটি ভালো দিক ভারতের মাটিতে প্রত্যক্ষ হয়েছিলো। ইন্দিরা গান্ধীর দৃঢ়তা এবং কূটনৈতিক পারদর্শিতা। এদিকে আমেরিকার বৈরী মনোভাব, অপরদিকে  শত্রূরাষ্ট্র চীনের উপস্থিতি, এর মধ্যে তিনি ঠান্ডা মাথায় দৃঢ় সিদ্ধান্ত নিচ্ছিলেন। অনেকের মতে আরো আগে মিলিটারি অপারেশান হলে বহু প্রান রক্ষা পেতো, বহু মেয়ে গনধর্ষিতা হতো না‌। আবার অনেকের মতে আরো আগে মিলিটারি অপারেশানের মতো অবস্থা ভারতের ছিলো না।    

   সেই সময় বিরোধী নেতা ,ভারতীয় জনসঙ্ঘের নেতা , অটলবিহারী বাজপেয়ী প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে গিয়ে বলে এসেছিলেন, এই পরিস্থিতির পূর্ণ সমাধান না হওয়া পর্যন্ত আমরা সরকারের কোন সমালোচনা করবো না। সেনাবাহিনীকে এবং গোটা বিশ্বকে আমরা message দিতে চাই যে বিপদের সময় আমরা এক হয়ে লড়তে জানি।    

  পূর্ব পাকিস্থানের পরিস্থিতি ভারতকে সেনা অভিযানের দিকে ঠেলে দিলো। ১৯৭১ এর মার্চ থেকে শুরু হওয়া পূর্ব পাকিস্থানের মর্মন্তুদ ইতিহাস সমাপ্ত হলো ডিসেম্বরে। অফিসিয়ালি ভারত পাকিস্থান যুদ্ধ শুরু হলো ৩ ডিসেম্বর ৫০ টা পাকিস্থানি যুদ্ধবিমানের ভারতের ১১ টি air station এ আক্রমনের মধ্য দিয়ে। ৪ ডিসেম্বর থেকে ভারতের আর্মি , নেভি , এয়ারফোর্স তীব্র প্রত্যাঘাত শুরু করলো। মাত্র ১২ দিনে পাকিস্থান বাহিনীর কোমর ভেঙ্গে দিলো ভারতীয় সেনা।পৃথিবীর ইতিহাসে সংক্ষিপ্ততম যুদ্ধগুলির অন্যতম। ইস্টার্ণ কম্যান্ডের ভারতীয় সেনাপ্রধান লেফটেনান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা(এবং তার সঙ্গে উপস্থিত ভাইস এডমিরাল কৃষ্ণান ,এয়ার মার্শাল ধাওয়ান)  এর কাছে পাকিস্থানের ইস্টার্ণ ফ্রন্টের সেনাপ্রধান নিয়াজি আত্মসমর্পনের চুক্তিতে সই করলো। ৯৩ হাজার পাকিস্থানি সেনা যুদ্ধবন্দী। পাকিস্থানি সেনাকে বাধ্য করা হলো ভারতীয় সেনাকে প্রকাশ্যে guard of honour দিতে‌। যে দক্ষতা এবং দ্রুততার জন্য দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মান বাহিনী গোটা বিশ্বের সমীহ আদায় করেছিলো, ভারতীয় সেনা সেই বিদ্যুৎগতির পারদর্শিতা দেখিয়েছিলো। লন্ডনের সানডে টাইমস লিখেছিলো, ”It took only 12 days for the Indian Army to smash its way to Dacca, an achievement reminiscent of the German blitzkrieg across France in 1940”.  আমাদের গর্বের ভারতীয় সশস্ত্রবাহিনীর পরাক্রমের সামনে পাকিস্থান বাহিনী বাঘ থেকে বিড়াল হয়ে গিয়েছিলো।     

  গোটা পশ্চিম বিশ্ব  ভারতের পক্ষে দাড়ায় নি। ফ্রান্সের সংস্কৃতিমন্ত্রী এ বিষয়ে লেখার পর এবং নিউইয়র্কের ম্যাডিসন স্কোয়ারে রবিশঙ্করদের এ বিষয়ে অনুষ্ঠানের পর বিশ্ব কিছুটা  পাকিস্থানি বর্বরতার বিষয়ে প্রতিক্রিয়া দিয়েছিলো। তাও সামান্য। ভারতের পক্ষে মূল সহায়ক হিসেবে দাড়িয়েছিলো ইন্দো- সোভিয়েত সামরিক চুক্তি। আমেরিকা চীনকে অনুরোধ করেছিলো ভারতের বিরুদ্ধে উত্তর সীমান্তে মিলিটারি অপারেশান চালাতে। অন্ততপক্ষে ভীতিপ্রদর্শনের জন্য হলেও যেন কিছু মিলিটারি ট্রাক চলাচল করে এবং কিছু যুদ্ধবিমান আকাশে চক্কর দেয়। কিন্তু রাশিয়ান ফৌজ সরাসরি ভারতের হয়ে যুদ্ধে নামতে পারে এই ভয়ে চীন নিজেকে ঐ যুদ্ধে জড়ায়নি। সোভিয়েত গোয়েন্দা সংস্থা K G B র কাছে খবর ছিলো যে ব্রিটিশ নেভেল ফোর্সও পাকিস্থানকে সাহায্য করতে এগোচ্ছে। নিক্সন এবং কিসিঞ্জারের নির্দেশে আমেরিকার সপ্তম নৌবহর থেকে U S S Enterprise বঙ্গোপসাগরের দিকে যাত্রা শুরু করলো। ভারতের সাহায্যে (রাশিয়া কখনো চাইতো না যে দক্ষিন এশিয়ায় আমেরিকার একচেটিয়া প্রভুত্ব হোক) রাশিয়ান নৌবহরের কিছু যুদ্ধজাহাজ বঙ্গোপসাগরের খাড়িতে পথ আটকে দাড়িয়ে পড়েছিলো। এমনকি রাশিয়ার পরমানুবাহী  সাবমেরিন ১৩ ডিসেম্বর এডমিরাল Vladimir Kruglyakov এর নেতৃত্বে Vladivostok থেকে যাত্রা শুরু করলো। পাকিস্থানকে স্বস্তি দেবার শেষ চেষ্টা হিসেবে আমেরিকা রাষ্ট্রসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব আনলো। কিন্তু ভারতের জয় সম্বন্ধে নিশ্চিত রাশিয়া ভেটো প্রয়োগ করে সেটা কার্যকর করতে দেয় নি। ভারতীয় সামরিক বাহিনী পাকিস্থানকে দু টুকরো করে দিলো। পূবের আকাশে সূর্য উঠেছে আলোকে আলোকময়  সঙ্গীতের মধ্য দিয়ে স্বাধীন রাষ্ট্র বাংলাদেশ জন্ম নিলো।    

    দুঃখ একটাই। সব ঐতিহাসিকদের মতেই পাকিস্থানি সেনা এবং রাজাকারদের হাতে বাঙ্গালী মুসলমানের চেয়ে বাঙ্গালী হিন্দুরা অনেক অনেক বেশী নির্যাতিত হয়েছিলো । ভারতীয় সেনা ( যার প্রায় পুরোটাই ছিলো হিন্দু ) বাংলাদেশ তৈরী করলো নিজেদের রক্তের বিনিময়ে। অথচ, সেই বাংলাদেশে হিন্দুরা প্রতিনিয়ত হত্যা, লুন্ঠন, অপহরন, ধর্ষনের শিকার। এটা কি মুসলমানদের মজ্জাগত হিন্দুবিরোধীতার কারনে?

We are not big media organisation. Your support is what keeps us moving. Don't hesitate to contribute because, work, for society needs society's support. Jai Hind.

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here