মুসলমানের ভারত বিজয়- (১)

0
78

মুসলমানের ভারত-বিজয় সম্ভবতঃ ইতিহাসের সর্বাপেক্ষা রক্তাক্ত কাহিনী, যে কোনো জাতির পক্ষে এক নৈরাশ্যজনক অধ্যায়। এ থেকে সুস্পষ্ট শিক্ষা পাওয়া যায় যে মানবসভ্যতা এমনই এক নিরাপত্তাহীন বস্তু যার সূক্ষ জটিল বিন্যাস ও স্বাধীনতা , সংস্কৃতি ও শান্তি যে কোনও সময় বর্বর আক্রমণের দ্বারা তছনছ হয়ে যায়। হিন্দুরা তাদের অন্তর্দ্বন্দ্ব, বিভেদ এবং নিজেদের মধ্যে পারস্পরিক যুদ্ধের দ্বারা নিজেদের শক্তিক্ষয় করে চলে। তারা জীবনবিমুখ বৌদ্ধ এবং জৈন ধর্মমতকে গ্রহণ করে নিজেদের বেঁচে থাকার কঠোর সংগ্রামের জীবনযাত্রাকে দুর্বল করে ফেলে। হিন্দুরা তাদের সীমান্ত রক্ষা, তাদের রাজধানী, ধনসম্পদ, তাদের স্বাধীনতা রাখা করতে নিজেদের শক্তি সংহত করতে ব্যর্থ হয়। ফলে শক, হুন, আফগান এবং তুর্কিরা ভারত-সীমান্তে বারে বারে হানা দিতে থাকে এবং তারা সুযোগের অপেক্ষা করতে থাকে- কবে এ জাতির দুর্বলতা তাদের পথ দেখিয়ে দেশের মধ্যে ঢুকতে দেবে। চার শত বছর (৬০০-১০০০ খ্রিস্টাব্দ) ধরে ভারত দখলের জন্য তাদের আমন্ত্রণ জানিয়ে এসেছে, অবশেষে তা-ই হলো।   মুসলমানদের প্রথম ক্ষণস্থায়ী আক্রমণ শুরু হয় পশ্চিম পাঞ্জাবের মূলতানে (৬৬৪ খ্রিস্টাব্দে)। পরবর্তী তিন শতাব্দী ধরে হানাদারেরা তাদের সুযোগ-সুবিধা মতো আক্রমণ চালিয়েই যেতে থাকে। এর পরিণতি হল মুসলমানেরা সিন্ধু উপত্যকায় নিজেদের প্রতিষ্ঠা কায়েম করতে লাগল। তাদের সমধর্মী আরবেরা ঐ সময়ে (৭৩২ খ্রিস্টাব্দে) ইউরোপে প্রভুত্ব বিস্তার করতে পশ্চিম দিকে তুর এলাকায় যুদ্ধ শুরু করে। তবে প্রকৃতপক্ষে মুসলিমদের ভারত বিজয় সম্পন্ন করতে খ্রিস্টের জন্মের পরে এক হাজার বছর অপেক্ষা করতে হয়।  

৯৯৭ খ্রিস্টাব্দে এক তুর্কি সর্দার মামুদ( বা মহম্মদ) পূর্ব আফগানিস্তানের এক ছোট্ট রাজ্য গজনীর সুলতান হন। মামুদ জানতেন যে তার রাজ্য খুবই ছোট এবং দরিদ্র। কিন্তু নিকটেই রয়েছে এক সুপ্রাচীন দেশ ধনসম্পত্তিতে পূর্ণ ভারত।  পরবর্তী সিদ্ধান্ত তো অতি সুস্পষ্ট। হিন্দু পৌত্তলিকতাকে ধ্বংস করার পবিত্র ধর্মীয় কর্তব্যপালনের নাম করে মামুদ ভারতের সীমান্তে সেনাবাহিনী নিয়ে আছড়ে পড়লেন। তার সঙ্গে ধর্মীয় উন্মাদনায় উত্তেজিত সেনাবাহিনীর চোখে তখন ভারতের বিপুল সম্পদ লুন্ঠনের স্বপ্ন। ভীমনগরে অপ্রস্তুত হিন্দুদের উপর অতর্কিতে ঝাঁপিয়ে পড়লেন মামুদ। হিন্দুরা হলো কচুকাটা, শহরগুলি হলো লুন্ঠিত, মন্দিরগুলি ভেঙে মাটিতে মিশিয়ে দেওয়া হলো। শত শতাব্দীর সঞ্চিত বিপুল ধনরাশি কেড়ে নিয়ে স্বদেশে পাড়ি দিলেন মামুদ। গজনীতে ফিরে দেশ-বিদেশের রাজদূতদের সামনে তুলে ধরলেন লুন্ঠিত অগাধ রত্ন সম্ভার -‘ মণি, চুনী, পান্নার দ্যুতি ঠিকরে পড়ছে যেন মদের মধ্যে বরফের টুকরো, হীরের আকার যেন এক একটি ডালিমের মতো।’ এরপর প্রতি শীতেই মামুদ ঝাঁপিয়ে পড়তেন ভারতের উপর – লুন্ঠিত সোনা-দানায় সিন্দুক ভরে ওঠে। নিজের সেনাবাহিনীর সর্বশ্রেণীর জন্য অবাধে হত্যা ও লুন্ঠনের অধিকার দেওয়া হয়। প্রতি বসন্তে ফিরে যান নিজের রাজধানীতে, গত বারের চেয়ে আরও বেশি ধনী হয়ে ওঠেন। মথুরায়( যমুনার তীরে) মামুদ মন্দির থেকে সোনার মূর্তি, যার অঙ্গে বহুমূল্য প্রস্তরাদি খচিত, সেটির সাথে মন্দিরের সঞ্চিত ধনভাণ্ডার খালি করে সংগ্রহ করলেন অপরিমিত সোনা, রুপা, মনি -মানিক্য ইত্যাদি। মামুদ এখানকার মন্দিরের গঠনশৈলীর প্রশংসা করে উল্লেখ করেন যে অনুরূপ একটি মন্দির তৈরী করতে হলে দশ কোটি ‘দিনার’ লাগবে এবং সময় লাগে দু’শো বছর। এর পরে তিনি হুকুম দিলেন ‘ন্যাপথা’ দিয়ে পুরো মন্দির ভিজিয়ে আগুন দিয়ে একেবারে ছাই করে  দিতে।   

ছয় বছর পর মামুদ ভারতের আর একটি ঐশ্বর্যশালী মন্দির-নগরী সোমনাথ ধ্বংস করেন। এখানকার সমস্ত লোক- পঞ্চাশ হাজার জনকে হত্যা করেন এবং সমস্ত ধনসম্পদ গজনীতে নিয়ে যান। অবশেষে ইতিহাস যতদূরে রয়েছে, তাতে জানা যায় মামুদই ইতিহাসে সরপেক্ষ ধনী। কখনও কখনও মামুদ নগরীগুলি ধ্বংস করে সেখানকার অধিবাসীদের হত্যা না করে নিজের দেশে নিয়ে গিয়ে তাদের বিক্রয় করে দিতেন। আবার এই সকল বন্দিদের সংখ্যা কয়েক বছরে এতো বৃদ্ধি পেলো যে কোনও ক্রেতা পাওয়া যেত না যে মাত্র কয়েক শিলিং ব্যয় করে একজন দাস কিনবে। প্রতিটি অভিযানের পূর্বে মামুদ হাঁটু গেড়ে প্রার্থনা করতেন, আল্লাহ যেন তার বাহুতে আশীর্বাদ বর্ষণ করেন। শতাব্দীর এক-তৃতীয়াংশ সময় তিনি রাজত্ব করেছিলেন। মুসলিম ঐতিহাসিকদের মতে, তখনকার সময়ে মামুদ মহত্তম সম্রাট এবং যে কোনও কালের জন্য তিনি সকলের চেয়ে দোর্দণ্ডপ্রতাপ শাসক। (ক্রমশঃ)    

বিশ্ববিখ্যাত ঐতিহাসিক উইল ডুরান্ট-এর লেখা বই ‘দি স্টোরি অফ সিভিলাইজেশন’ থেকে 

We are not big media organisation. Your support is what keeps us moving. Don't hesitate to contribute because, work, for society needs society's support. Jai Hind.

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here