নোয়াখালী গণহত্যা- (৪)

0
17

শ্রী চপলাকান্ত ভট্টাচার্য

দ্বিতীয় অধ্যায়ঃ

সর্বগ্রাসী অভিযানঃ [আচাৰ্য কৃপালনী ও শরৎচন্দ্রের সহিত পরিদর্শনান্তে ফিরিবার পর প্রেস এ্যাডভাইসরী কমিটির পক্ষীয় বিবৃতি। ২৪/১০/৪৬ তারিখে কলিকাতায় প্রকাশিত।]

দমদম বিমানঘাটীতে অনেক প্রতিবন্ধকতার পর আমাদের বিমানখানি অবশেষে সত্যই আকাশে উঠিল ; উঠিল বটে, কিন্তু আমরা যাহা চাহিয়াছিলাম তাহা হইল না ; বিমান ফেণীর দিকে না গিয়া কুমিল্লার দিকে চলিল। আমরা জানিতাম গবর্ণর (প্রধানমন্ত্রী মিঃ সুরাবর্দীসহ) ফেণীতে যাইতেছেন, আমাদের উদ্দেশ্য ছিল তথায় গিয়া তাহাদের সহিত মিলিত হওয়া। কিন্তু বিমানঘাটীর কর্তৃপক্ষ বলিলেন গবর্ণর ফেণী যান নাই, গিয়াছেন কুমিল্লায়; কারণ ফেণীর বিমানঘাটী বহুদিন অব্যবহৃত ও বেমেরামত থাকায় বিমান-অবতরণের পক্ষে অনুপযুক্ত হইয়া আছে। ইহার পর কুমিল্লা পৌঁছিয়া যখন শুনিলাম গবর্ণর কুমিল্লায় আসেন নাই ফেণীতেই গিয়াছেন এবং তথাকার কাজ সারিয়া ইতিমধ্যে চট্টগ্রাম রওনা হইয়া গিয়াছেন তখন আমাদের মনের অবস্থা কি হইল সহজেই অনুমেয়। কুমিল্লা ঘাটী হইতেই সরাসরি চট্টগ্রাম চলিয়া যাইবার জন্য প্রথম ঝোঁকে সকলেরই ইচ্ছা হইল। কিন্তু পরে তাহা স্থগিত করিয়া চট্টগ্রামে টেলিফোনযোগে আলাপ করা হইল, স্থির হইল পরদিন প্রাতে তথায় পৌঁছিয়া গবর্ণরের সহিত সাক্ষাৎ করা হইবে; সে রাত্রি আমরা কুমিল্লাতেই কাটাইলাম।

“What man has made of man” :

ঘটনাস্থলে উপস্থিত হইয়া সরকারী ও বেসরকারী পক্ষ একযোগে অবস্থা পরিদর্শন ও পর্যালোচনা করিবেন বলিয়া আমাদের যে কল্পনা ছিল তাহা এইভাবে ব্যর্থ হইল। কিন্তু তাহা ব্যর্থ হইলেও কুমিল্লায় যাইবার পথে, কুমিল্লা শহরে এবং পুনরায় চট্টগ্রাম হইতে প্রত্যাবর্তনের পথে নোয়াখলির ধ্বংসকাণ্ডের আমরা যথেষ্ট পরিচয় পাইয়াছিলাম। আমাদের বিমানখানি যথাসম্ভব নীচু দিয়াই উড়িয়া যাইতেছিল এবং ধ্বংসকাণ্ডের দৃশ্যসমূহ পুনঃপুনঃ আমাদের দৃষ্টির সম্মুখে অভিব্যক্ত হইতে লাগিল। তখন বর্ষা সদ্যঃ শেষ হইয়াছে। নবজাত শষ্পশস্যে পল্লীপ্রান্তর শ্যামশ্রী-মণ্ডিত। সেই কোমল শ্যামলার আবেষ্টনীর মধ্যে গ্রামে গ্রামে গৃহদাহ এবং তদুপরি উত্থিত ধূমকুণ্ডলী চক্ষুর পক্ষে নিদারুণ পীড়াজনক হইয়া দাঁড়ায়। এই দৃশ্যাবলীর উপর দিয়া যাইতে যাইতে ইংরাজ কবি ওয়ার্ডওয়ার্থের সুপ্রসিদ্ধ কবিতার ছত্রটি কেবলি মনে আসিতে লাগিল —

“What man has made of man”
“মানুষ মানুষের কী শত্রুতাই না করিয়াছে”।

বিমানে যাইতে যাইতে একস্থলে দেখিলাম উপদ্রুত জনতা এক জ্বলন্ত গ্রাম ছাড়িয়া ছুটিয়া যাইতেছে। দৃশ্যটি এমন মর্মস্পর্শী যে আমাদের ইচ্ছা হইয়াছিল সেখানেই বিমান নামাইয়া অসহায় নরনারীকে যথাসাধ্য সাহায্য করা। কিন্তু তাহা সম্ভব হয় নাই। অনেক গ্রাম দেখিলাম দগ্ধ হয় নাই বটে কিন্তু সেগুলিতে জীবনের কোন চিহ্ন মাত্র নাই, দেখিলাম জনতা জলস্রোতের ধারে এবং নৌকায় পার হইবার স্থানে আসিয়া ভীড় করিতেছে। একজায়গায় আমরা প্রত্যক্ষই দেখিলাম একদল লোকে মিলিয়া একটি সাঁকো ধ্বংস করিতেছে। বুঝিলাম ধ্বংসকাণ্ড তখনও চলিতেছে।

আকাশ হইতে যাহা দেখিতে পাই নাই কুমিল্লায় আসিয়া পলায়িত নরনারীকে দেখিয়া তাহা বুঝিতে পারিলাম। কুমিল্লা সহরে তখন দলে দলে আশ্রয়প্রার্থী অবিরাম-গতিতে আসিয়া পৌঁছিয়াছে। আমরা যখন উপস্থিত হইলাম তখনও তাহারা আসিতেছে। তাহাদের দৃষ্টি লক্য্তহীন, মুখমণ্ডল বিশুষ্ক ও বিবর্ণ এবং কণ্ঠস্বর প্রায় অবরুদ্ধ; দেখিয়াই বুঝিতে পারিলাম কী ভয়াবহ দুর্গতির মধ্য হইতে ইহারা বাহির হইয়া আসিয়াছে ; চতুর্দিকে অকস্মাৎ এক সৰ্বব্যাপী বিভীষিকার রাজত্বের প্রাদুর্ভাব ; আক্রমণোদ্যত সেনাদলের অভিযান যে সকল ত্রাসের কারণ ঘটায় এখানকার অবস্থা তাহা অপেক্ষাও আতঙ্কজনক; কারণ সৈন্যদলের অভিযান সাধারণতঃ দলবদ্ধ নারীহরণ, দলবদ্ধ ধর্মান্তর বা ব্যাপক দেবায়তন ধ্বংস ঘটায় না। এই অগণিত উপদ্রুত নরনারী যাহারা আজ আশ্রয়প্রার্থী হইয়া আসিয়াছে তাহাদের মধ্যে অনেকেই অবস্থাপন্ন গৃহস্থ ছিল, এক রাত্রের মধ্যে অবস্থা-বিপর্যয়ে ইহারা কপর্দকহীন ভিক্ষুকে পরিণত হইয়াছে। ইহাদের ভবিষ্যৎ কি হইবে তাহা সমাজের পক্ষে এক দারুণ উদ্বেগজনক সমস্যা ; রাষ্ট্রের পক্ষেও এই সমস্যায় উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু বাঙলায় বর্তমানে যে রাষ্ট্রশাসন চলিতেছে তাহা জনগণের দুঃখদুর্দশায় চিন্তিত নহে। এই শাসনের যাহারা কর্ণধার তাহারা নোয়াখালি-ত্রিপুরার উপদ্রবঘটিত অবস্থার গুরুত্ব লঘু করিবার জন্যই প্রাণপণ চেষ্টা করিয়াছেন।

উপদ্রব নহে অভিযানঃ

এই সকল ঘটনাকে মাত্র ‘উচ্ছৃঙ্খলতা’ বা ‘সাম্প্রদায়িক উপদ্রব’ আখ্যা দিলে উহাদের পরিচয় বিকৃত করা হইবে। উহা স্থানীয় সংখ্যালঘু সমাজের বিরুদ্ধে সর্বগ্রাসী সংগ্রাম। বাঙলার বর্তমান মন্ত্রিসভা যে রাজনৈতিক দলের দখলে তাহারই [মুসলীম লীগ] নামে এবং সরকারীমহলের গোপন যোগাযোগে এই সংগ্রাম পরিচালিত হইয়াছে। সরকারীমহল গোপনে গোপনে ইহাকে সমর্থন করিয়াছেন অথবা প্রতিকারে উদাসীন থাকিয়া প্রশ্রয় দিয়াছেন। উপদ্রুত অঞ্চলে সংখ্যালঘু সমাজের পক্ষে তিনটি পথ খোলা রহিয়াছে—হয় ধৰ্ম্মান্তর গ্রহণ করিতে হইবে, নয় মৃত্যুবরণ করিতে হইবে অথবা সম্ভব হইলে পলায়ন করিয়া অন্যত্র আশ্রয়ের সন্ধান করিতে হইবে। ১০ই অক্টোবর আক্রমণের প্রারম্ভ হইতে আজ পর্যন্ত উপদ্রুত অঞ্চল বাহিরের লোকের পক্ষে অনধিগম্য হইয়া রহিয়াছে—উদ্ধার করিবার অথবা স্থানে গিয়া দুর্গতিলাঘবের—কোন সুযোগই কাহাকেও দেওয়া হইতেছে না। সংখ্যালঘু সমাজের সামাজিক জীবন একেবারে উৎসন্ন—তাহারা সম্পূর্ণ ধ্বংসের সম্মুখীন।

গভর্ণমেন্টের চূড়ান্ত ব্যর্থতা প্রতিপাদিত হইয়াছে এবং স্থানীয় শাসনব্যবস্থা সম্পূর্ণরূপে ভাঙ্গিয়া পড়িয়াছে। তাহা না হইলে বৰ্বর উপদ্রবকারীদলকে এতদিনে বুঝাইয়া দেওয়া উচিত ছিল যে গবর্ণমেন্টের অস্তিত্ব এখনও আছে। গবর্ণমেন্টের ও তাহাদের কর্মচারিগণের যদি কর্তব্যপালনে কিছুমাত্র আন্তরিক আগ্রহ থাকিত তাহা হইলে ইহাই তাহাদের পক্ষে সর্বপ্রধান করণীয় ছিল। ১০ই অক্টোবর নোয়াখালির পূর্বতন ম্যাজিষ্ট্রেট শ্ৰী এন, জি, রায়কে সিউড়ীতে বদলী করা হয় এবং নূতন জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট মিঃ ম্যাকিনার্নি কার্যভার না লওয়া পর্যন্ত জেলার ভার অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট মিঃ জামানের হাতে থাকে। ১০ই হইতে ১৪ই অক্টোবর পর্যন্ত এই অবস্থা চলে এবং জেলা ম্যাজিষ্ট্রেটের পদ শূন্য থাকে [পরে জানা যায় ১৬ই অক্টোবর পর্যন্ত এই অবস্থা ছিল। ১৬ই অক্টোবর নূতন ম্যাজিষ্ট্রেট বিমানযোগে গিয়া কাৰ্যভার গ্রহণ করেন।]। বিশেষ লক্ষ্য করিবার বিষয় এই যে, এই কয়দিনের মধ্যেই সংখ্যালঘু সমাজের উপর পূৰ্ব্বসংকল্পিত ও পূর্বপরিকল্পিত আক্রমণ অকস্মাৎ আরম্ভ হইয়া উগ্রতম আকার ধারণ করে। এই কয়দিন, জেলার শান্তি ও শৃঙ্খলা রক্ষার সম্পূর্ণ ভার অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট মিঃ জামান এবং পুলিশ সুপারিন্টেন্ডেট মিঃ আবদুল্লার উপর ন্যস্ত ছিল।

আক্রমণ-প্রণালী ও উপদ্রুত অঞ্চলঃ

এই আক্রমণে গুণ্ডা-প্রকৃতির লোকের যোগ দেওয়ার কথাটা অত্যন্ত বাড়াবাড়ি করিয়া প্রচারিত হইয়াছে। গুণ্ডা-প্রকৃতির লোক ইহার মধ্যে যে ছিল তাহা নিঃসন্দেহ। কিন্তু যে বিপুল ধ্বংসকাৰ্য্য সাধিত হইয়াছে তাহা মাত্ৰ গুণ্ডাদের দ্বারা সম্ভব হয় নাই। গুণ্ডারাই অগ্রগামী হইয়া কাজ করিয়াছে বটে কিন্তু যে সকল স্থান আক্রমণের জন্য নির্দিষ্ট হইয়াছিল সেই সকল স্থানে তাহাদের সম্প্রদায়ভুক্ত অধিবাসীরাও তাহাদের সহিত যোগ দিয়াছে। ইহাদের কর্মপ্রণালী পৰ্যালোচনা করিলে স্পষ্টই বোঝা যায় আক্রমণ সঙ্গবদ্ধভাবেই ঘটিয়াছিল এবং কোনো কেন্দ্রীয় নির্দেশের দ্বারা পরিচালিত হইয়াছিল। আক্রমণের প্রণালী সম্বন্ধে যে সকল বিবরণ পাওয়া গিয়াছে তাহাতে জানা যায় সার্ট ও হাফপ্যান্ট পরিহিত দলবদ্ধ যুবকগণ স্থলপথে অগ্রসর হইয়াছে। একহাতে বলয় ইহাদের বিশেষ চিহ্ন। ইহাদের সঙ্গে সঙ্গে জলপথে অগ্রসর হইয়াছে বড় এবং ছোট নৌকা। এগুলিতে খাদ্যবস্তু এবং আক্রমণের জন্য প্রয়োজনীয় অন্যান্য দ্রব্যাদি বাহিত হইয়াছে। নির্দিষ্টস্থানসমূহে স্থলপথগামী দল থামিয়াছে এবং নৌকায় বাহিত লোকজন ও দ্রব্যসম্ভারের সাহায্য লইয়া তাহাদের কাৰ্য্য সমাধা করিয়াছে। এক এক দলের মধ্যে আবার কার্য্যের বিভাগ আছে, কাহারও গৃহদাহ, কাহারও নারীহরণ, কাহারও লুণ্ঠন ও কাহারও হত্যা। দলের প্রত্যেক অংশ হুইসিলের সঙ্কেত-ধ্বনি অনুসারে কাৰ্য্য আরম্ভ ও সমাধা করিয়াছে। কাৰ্যশেষের পর মৃতদেহগুলি নৌকায় করিয়া সরাইয়া লওয়া হইয়াছে। ইহাদের আক্রমণের প্রধান লক্ষ্য ছিল হিন্দু সমাজের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিগণ। গৃহদাহ-কাৰ্য্য সহজে সমাধা করিবার জন্য তাহারা প্রভূত পরিমাণে পেট্রোল ব্যবহার করিয়াছে এবং ষ্টীরাপ পাম্পের দ্বারা উহা ছিটাইয়া দিয়াছে। এই বিষয়টাই বড় আশ্চর্য ঠেকিয়াছে—ইহারা এত পেট্রোল কোথা হইতে পাইল?

পূৰ্ব্ব হইতে পশ্চিমে ধরিয়া নোয়াখালি জেলার প্রায় অর্ধাংশ উপদ্রুত। পূৰ্বে ফেণী হইতে চৌমূহানি হইয়া যে রাজপথ পশ্চিমে লক্ষ্মীপুরের দিকে গিয়াছে সেই পথের উত্তরে এই উপদ্রুত অঞ্চল অবস্থিত। থানা ধরিয়া হিসাব করিলে ফেণী, ছাগলনাইয়া, সেনবাগ, বেগমগঞ্জ, লক্ষ্মীপুর, রায়পুর এবং রামগঞ্জ থানা উপদ্রুত অঞ্চল বলা যাইতে পারে, পরশুরাম থানার অবস্থা খুব নিশ্চিত নহে। এই সকল স্থানের সন্নিহিত ত্রিপুরার কয়েকটি থানাতেও উপদ্রব ছড়াইয়া পড়িয়াছে । ফরিদগঞ্জ, হাজিগঞ্জ, লাক্সাম এবং চৌদ্দগ্রাম থানা বর্তমানে উপদ্রুত এবং লাক্সাম ও কুমিল্লার মধ্যবর্তী কোন স্থান পর্যন্ত আপাততঃ ইহা প্রসারিত। দ্রুতভাবে এবং দৃঢ়ভাবে যদি অবিলম্বে ইহাকে প্রতিহত করা না হয় তাহা হইলে নোয়াখালির ন্যায় ত্রিপুরা জেলায়ও উপদ্ৰবকারীদের তাণ্ডব নৃত্য আরম্ভ হইয়া যাইবে। কিন্তু ইহাদিগকে প্রতিহত করার জন্য গভর্ণমেন্টের কোন উদ্যোগ বা অভিপ্রায়ের চিহ্নমাত্র এখনও দেখা যাইতেছে না। পক্ষান্তরে জানা যাইতেছে যে লুণ্ঠন, গৃহদাহ প্রভৃতি অপরাধে হাতে হাতে যাহারা ধরা পড়িতেছে তাহাদিগকেও নামমাত্র জামীন লইয়া ছাড়িয়া দেওয়া হইতেছে।

উদ্ধার ও সাহায্যের সমস্যাঃ

আমাদের সম্মুখে বর্তমানে যে সমস্যা সৰ্ব্বপ্রধান তাহা হইল অবরুদ্ধ ব্যক্তিগণের উদ্ধার সাধন। উপদ্রুত অঞ্চল যাহাতে বাহিরের লোকের পক্ষে সহজগম্য হয় তাহার ব্যবস্থা করিতে হইবে। মিলিটারীর সহায়তা ছাড়া ইহা সম্ভব নহে, সুতরাং উপদ্ৰবকারী জনতার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা অবলম্বনের স্বাধীন ক্ষমতা মিলিটারীকে দিতে হইবে। অবরুদ্ধ ব্যক্তিগণকে যদি অবিলম্বে উদ্ধার করা না হয় তাহা হইলে, তাহাদের আর কোন দুর্গতি না হইলেও, তাহারা খাদ্যাভাবেই মারা যাইবে। আর একটি প্রধান সমস্যা উদ্বাস্তু নরনারীকে আহার জোগানোর সমস্যা। একমাত্র ত্রিপুরা জেলার বিভিন্ন কেন্দ্রে যে সকল আশ্রয়প্রার্থী সমবেত হইয়াছে তাহাদের সংখ্যাই চল্লিশ হাজারের কম হইবে না। ইহাদিগের খাদ্য সরবরাহের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা করা নিতান্ত প্রয়োজন—সরকারীভাবেই হউক আর বেসরকারীভাবেই হউক। পুনর্বসতির ব্যবস্থার কথা উঠাইবার সময় এখনও হয় নাই। এই উৎসন্ন জন-সমাজকে পুনরায় তাহাদের পূর্বস্থানে প্রতিষ্ঠিত করা কখনও সম্ভব হইবে কিনা এবং সম্ভব হইলে কি প্রণালীতে তাহা করিতে হইবে তাহা গভীরভাবে এবং সতর্কভাবে চিন্তা করিয়া স্থির করিতে হইবে।

রাত্রিতে ঘুম আসিল না। সমগ্র বিনিদ্র রজনী ধরিয়া এই সকল চিন্তাই আমার মনকে অত্যন্ত পীড়িত ও ভারাক্রান্ত করিয়া রাখিল। রবিবার প্রত্যুষে আমরা বিমানে কুমিল্লা ত্যাগ করি এবং দেড় ঘণ্টার মধ্যেই চট্টগ্রামে উপস্থিত হই।

সুরাবর্দীর রোষ ও শ্লেষঃ

চট্টগ্রামে উপস্থিত হইয়া আচাৰ্য কৃপালনী ও শরৎচন্দ্র গবর্ণরের সহিত আলোচনায় নিযুক্ত হন। সেই অবসরে সংবাদপত্রের প্রতিনিধিগণ মিঃ সুরাবর্দীর সহিত কিছু আলাপ করিয়া লন। মিঃ সুরাবর্দী তখন ক্রোধে অগ্নিশর্মা। সমস্ত সংবাদপত্র মিলিয়া, এমন কি ষ্টেটসম্যান পর্যন্তও, নোয়াখালির হতাহতের সংখ্যা অতিরিক্ত মাত্রায় বাড়াইয়া বলিয়াছে— ইহাই তাহার অভিযোগ। জেলার সরকারী কর্মচারীদিগের নিকট হইতে তিনি যে সংখ্যা গ্রহণ করিয়াছেন তাহা একশতের উর্দ্ধে যাইবে না। তাহাকে স্মরণ করাইয়া দিলাম যে এই সকল কর্মচারীই স্বীয় দুষ্কৃতি ও কর্তব্যে অবহেলার দ্বারা ধ্বংসকাণ্ডের জন্য প্রত্যক্ষভাবে দায়ী, সুতরাং তাহাদের হিসাব কখনই গ্রহণযোগ্য হইতে পারে না। পক্ষান্তরে সংবাদপত্রের বিবরণ ভুক্তভোগীদের নিকট হইতে সংগৃহীত হওয়ায় তাহাই নির্ভরযোগ্য। মিঃ সুরাবর্দী ইহাতে কিছুমাত্র সন্তুষ্ট হইলেন না। তিনি নাকি আসিবার পথে কয়েকখানি ভগ্ন গৃহ ব্যতীত উপদ্রবের আর কোন চিহ্ন দেখিতে পান নাই। ইহা তাহার বিশেষ সৌভাগ্য বলিতে হইবে। কিন্তু ইহা হইতেই আমরা তৎক্ষণাৎ বুঝিতে পারিলাম গবর্নর কি অভিজ্ঞতা সংগ্রহ করিয়াছেন।

কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর (ফিরিবার সময় আমরা তাহাকে আমাদের বিমানেই আনিয়াছিলাম) এই আত্মপ্রসাদ সত্ত্বেও চট্টগ্রাম হইতে ফিরিবার পথে নোয়াখালি সহর অতিক্রম করিবার কিছুক্ষণ পর হইতেই উভয় পার্শ্বে ধূম ও অগ্নি দৃষ্টিগোচর হইতে লাগিল; গ্রামের পর গ্রাম বিধ্বস্ত, অধিবাসীদের কি হইয়াছে ভগবানই জানেন; কতগুলি গ্রাম পুড়িয়া অঙ্গারে পরিণত হইয়াছে, কতকগুলির উপর দিয়া আম্রকুঞ্জ ভেদ করিয়া কুণ্ডলায়িত ধূমরাশি উপরে উঠিতেছে, কতকগুলি সদ্য সদ্য পুড়িতেছে এবং লেলিহান অগ্নিশিখা আকাশে উঠিতেছে। এই দৃশ্যের প্রতি প্রধানমন্ত্রী মহাশয়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হইলে তিনি শ্লেষ করিয়া উত্তর দিলেন—অকারণ আতঙ্কগ্রস্ত অধিবাসীরা পলায়ন করিয়াই এই অবস্থা ডাকিয়া আনিয়াছে ; সত্য সত্যই এই সকল হতভাগ্য গ্রামবাসীকে পলায়নের সুযোগ দেওয়া হইয়াছে অথবা তাহাদের গৃহদাহের বহ্নিতেই তাহাদের মৃতদেহ আহুতি দেওয়া হইয়াছে তাহা চিন্তার বিষয়। কিন্তু যদি আমরা মিঃ সুরাবর্দীর অনুমানই সঠিক বলিয়া ধরিয়া লই তাহা হইলেও বর্তমান বাঙলা গভর্ণমেন্টকে একটি প্রশ্নের জবাব দিতে হইবে। তাহারা কি এমন কোন অলিখিত আইন জারী করিয়াছেন যে, কোন গ্রামের একশ্রেণীর অধিবাসীরা যদি বাড়ী খালি রাখিয়া যায় তাহা হইলে তাহাদের অপর সম্প্রদায়ভুক্ত প্রতিবেশিগণ তাহাতে আগুন লাগাইয়া দিবার অধিকারী হইবে? স্মরণ রাখিতে হইবে যে-পথের দুই পার্শ্বে সামান্য অংশই আমাদের দৃষ্টিগোচর হইয়াছিল। ইহার বাহিরে কি ঘটিয়াছে তাহা এখনও প্রকাশিত হইতে বাকী।

রাজার শাসন!

এইরূপ মধ্যযুগীয় বর্বরতার পরিচয় যে কখনও প্রতাক্ষ করিতে হইবে। তাহা স্বপ্নেও কল্পনা করি নাই; গভীর বেদনার বিষয় যে ইহা দেখিতে হইল এবং গভীরতর দুঃখের কথা এই যে এইরূপ ঘটনা ঘটিতে পারিয়াছে। গভর্ণর ইংরাজ, চীফ সেক্রেটারী ইংরাজ, বিভাগীয় কমিশনার ইংরাজ এবং পুলিশের ইনস্পেক্টর জেনারেল ইংরাজ—ইহাদের অধীনেই নোয়াখালিতে এই ধ্বংসকাংশু ঘটিল ; ইহারাই আবার জগতের সমক্ষে গর্ব করিয়া থাকেন যে ইহারা ভারতবর্ষে “রাজার শাসন” চালাইতেছেন!

(ক্রমশঃ)

We are not big media organisation. Your support is what keeps us moving. Don't hesitate to contribute because, work, for society needs society's support. Jai Hind.

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here