ময়নামতি বৌদ্ধবিহারের ধ্বংসাবশেষ আজও বাঙালির অতীত গৌরবের চিহ্নকে বহন করে চলেছে

1
694

বাংলা একসময় শিক্ষা-দীক্ষায় যে জগৎজোড়া নাম কামিয়েছিলো, তার প্রমান বাংলায় একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষাকেন্দ্র এবং জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার ধ্বংসাবশেষ দেয়। অবিভক্ত বাংলায় ধর্মান্ধ মুসলমানদের আক্রমণে বাঙালির ধর্ম, মঠ-মন্দির শুধুমাত্র ধ্বংস হয়নি, সেইসঙ্গে ধ্বংস হয়েছিল তার হাজার বছরের গবেষণালব্ধ শিক্ষা ও সংস্কৃতি।

বাঙালির সংস্কৃতি, শিক্ষা চর্চার ক্ষেত্রে সব থেকে বড়ো আঘাত হেনেছিলেন ধর্মান্ধ বখতিয়ার খিলজি। সেই বখতিয়ার খিলজির আক্রমণে ধ্বংস হয়েছিল একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়, সংস্কৃত জ্ঞান চর্চার কেন্দ্র। সেরকম একটি বিশ্ববিদ্যালয় ছিল ময়নামতি বিশ্ববিদ্যালয় বা বৌদ্ধ বিহার। এটি বর্তমানে বাংলাদেশে শালবন বৌদ্ধবিহার নামে পরিচিত। বাংলাদেশের কুমিল্লায় অবস্থিত ছিল এই ময়নামতি বৌদ্ধ বিহার। ময়নামতি নদীর তীরে ছিল এই বিশ্ববিদ্যালয়। দেব বংশের চতুর্থ রাজা শ্রী ভবদেব এটির নির্মাণ করেন।  খ্রিস্টীয় সপ্তম শতকের শেষে এটির নির্মাণ শুরু হয় এবং অষ্টম শতকের শুরুতে এর নির্মাণ কাজ শেষ হয়। বৌদ্ধদের দ্বারা পরিচালিত হলেও এতে হিন্দু ধর্মীয় শাস্ত্র ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের শিক্ষা দেওয়া হতো। এটি অষ্টম শতাব্দী থেকে বারোশো শতাব্দীর শেষ পর্যন্ত টিকে ছিল। বারোশো শতাব্দীর শেষ দিকে এটি ধ্বংস করা হয়। ঐতিহাসিকরা অনুমান করেন যে বখতিয়ার খিলজি এটি ধ্বংস করেন। সেইসঙ্গে বৌদ্ধ বিহারের মধ্যে থাকা একাধিক বৌদ্ধ মন্দির এবং হিন্দু মন্দির ধ্বংস করে মুসলমান সেনাবাহিনি। কেমন ছিল এই বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চা? খনন কার্যের ফলে অনেকগুলি ঘরের ধ্বংসাবশেষ পাওয়া গিয়েছে। প্রতিটি ঘর ছিল চওড়া ইটের দেওয়াল দিয়ে ঘেরা এবং ঘরের সামনে বারান্দা রয়েছে। প্রতিটি ঘরে কুলুঙ্গি ছিল, যেখানে প্রদীপ এবং দেব-দেবীর মূর্তি রাখা হতো।  এটি বৌদ্ধদের দ্বারা পরিচালিত হলেও হিন্দু ধর্ম শাস্ত্র এবং বেদের চর্চা হতো। তার প্রমান পাওয়া যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঝখানে একটি বিশাল মন্দিরের ধ্বংসাবশেষের আবিষ্কার। এর থেকে সহজেই অনুমান করা যায় বৌদ্ধদের সঙ্গে সঙ্গে হিন্দু শিক্ষার্থীরাও এখানে পড়াশুনো করতে আসতেন এবং তাদের ধর্মাচরণের জন্যই এই মন্দিরের নির্মাণ করা হয়েছিল। সেইসঙ্গে বর্তমানের আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মতোই হলঘর(কমিউনিটি হল), আলাদা প্রার্থনা কক্ষ, বাগান, খাওয়ার ঘর, গ্রন্থাগার ছিল। সেইসঙ্গে একাধিক হিন্দু মন্দির ও বৌদ্ধ মন্দিরও ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যেই।

এই বিশ্ববিদ্যালয় খ্রিস্টীয় অষ্টম শতক থেকে বারোশো শতক পর্যন্ত এটি জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার উজ্জ্বল কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল। প্রায় ৪০০ বছর পরে ধর্মান্ধ মুসলমানদের  নজর পড়ে এর ওপর। বখতিয়ার খিলজি বাংলার একের পর এক জ্ঞান চর্চার কেন্দ্রগুলিকে ধ্বংস করেন। বাদ যায়নি ময়নামতি বৌদ্ধ বিহার বা বিশ্ববিদ্যালয়। বখতিয়ার খিলজি যেভাবে নালন্দা ধ্বংস করেছিলেন, ঠিক সেভাবেই এটি ধ্বংস করেন। তার সেনাদের আক্রমণে পুরো বিশ্ববিদ্যালয়, তার মধ্যে থাকা একাধিক হিন্দু ও বৌদ্ধ মন্দির ধ্বংস করা হয়। পরে খননে একাধিক টেরাকোটা মূর্তি, পোড়ামাটির মূর্তি, ব্রোঞ্জের মূর্তি পাওয়া যায়। এইসব মূর্তি প্রমান দেয় কি পরিমান ধ্বংসলীলা চালানো হয়েছিল এখানে। হয়তো বা মরুভূমিতে ঘুরে বেড়ানো, লুঠপাঠ চালানো বর্বরদের সহ্য হয়নি সভ্য হিন্দুদের সংস্কৃতি চর্চা। কুঁড়ে ঘরে থাকা বর্বর আরবীদের সহ্য হয়নি কাফেরদের বড়ো ইটের তৈরী বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকা। কয়েকশো বছর বসুধৈব কুটুম্বকম শ্লোক মুখস্থ করা হিন্দুরা ভাবতেই পারেনি যে এইভাবে কোনো মানুষ ধ্বংসলীলা, হত্যালীলা চালাতে পারে।  যে ময়নামতি নদীর তীরের আকাশ-বাতাস একসময় বৌদ্ধ শিক্ষার্থীদের প্রার্থনায় মুখরিত হট, যার আকাশ-বাতাস বেদের শ্লোকপাঠের শব্দে মুখরিত হতো, তা আজ এক নিস্তব্ধ মৃত্যুপুরী। তা আজ বর্বর ধ্বংসলীলার সাক্ষ্য বহন করছে। সেইসঙ্গে বহন করছে বাঙালির অতীত গৌরবের চিহ্ন। 

We are not big media organisation. Your support is what keeps us moving. Don't hesitate to contribute because, work, for society needs society's support. Jai Hind.

1 COMMENT

Comments are closed.