বখতিয়ার খিলজি নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯ কোটি বই পুড়িয়েছিলেন

11
599

এ কথা সকলেই একবাক্যে স্বীকার করেন যে মুসলিম আক্রমণে ভারতের হাজার বছরের অর্জিত জ্ঞান,বিজ্ঞান, চিকিৎসাবিদ্যা সব ধ্বংস হয়েছিল। মুসলিম আক্রমণকারীরা শুধু লুঠপাট চালিয়ে ক্ষান্ত থাকেনি, ভারতবর্ষের সনাতন ধর্মের ওপরও আঘাত হেনেছিল। সেইরকম একটি ছিল নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়। এই বিশ্ববিদ্যালয় ছিল ভারতের জ্ঞান-বিজ্ঞান ও ধর্ম চর্চার সবচেয়ে বড়ো কেন্দ্র। তক্ষশীলা(বর্তমান আফগানিস্তান)  বিশ্ববিদ্যালয়ের পরে এটি ছিল অখণ্ড ভারতের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিশ্ববিদ্যালয়। এই বিশ্ববিদ্যালয় বর্তমানে বিহারে অবস্থিত, যা তৎকালীন মগধ সাম্রাজ্যের অন্তর্গত ছিল। ঐতিহাসিকদের পাওয়া তথ্য অনুযায়ী এই বিশ্ববিদ্যালয় ১৪ হেক্টর এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে ছিল। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে তিব্বত, চীন, গ্রিস, পারস্য, জাপান, কোরিয়া এবং ইন্দোনেশিয়া থেকে ছাত্র-ছাত্রীরা জ্ঞানলাভ করতে আসতো। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন গুপ্ত বংশীয় সম্রাট শক্রাদিত্য। পরবর্তীকালে ভারতে বৌদ্ধধর্মের প্রভাব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ে বৌদ্ধ মতের প্রভাব বৃদ্ধি পায়। ফলে পরবর্তীকালে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে বৌদ্ধ মতের জ্ঞান চর্চা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। কিন্তু সেই সঙ্গে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে বৈদিক শাস্ত্র, সাংখ্য, সংস্কৃত গ্রামার, গণিত, চিকিৎসাশাস্ত্র, নীতিশাস্ত্র, দর্শন, যুক্তিশাস্ত্র, তর্কশাস্ত্র ইত্যাদি গুরুত্বসহকারে পড়ানো হতো। এটি ছিল আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়। বর্বর মুসলিম আক্রমণকারী বখতিয়ার খিলজি ধ্বংস করার পূর্বে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় ১০,০০০ ছাত্র পড়াশুনো করতো এবং শিক্ষক-অধ্যাপক মিলিয়ে ২,০০০ জন ছিলেন। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে আটটি আলাদা বিল্ডিং , ১০টি মন্দির, অনেকগুলি ধ্যানের ঘর, শ্রেণী কক্ষ, উদ্যান ও বাগান। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে একাধিক গ্রন্থাগার ছিল, যার মধ্যে হাতে লেখা পুঁথি থাকতো। অনেক বিদেশী ছাত্ররা দীর্ঘদিন বিশ্ববিদ্যালয়ে থেকে পুঁথি হাতে লিখে নিয়ে ফিরে যেতেন নিজের দেশে।  চীনা পর্যটক হিউয়েন সাং এই বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেছিলেন, দীর্ঘদিন এখানে জ্ঞানচর্চা করেছিলেন। তাঁর লেখা বই থেকে অনেক বিষয় জানা যায়। তিনি লিখেছেন সেসময় নালন্দার অধ্যক্ষ ছিলেন শীলভদ্র, যিনি বাঙালি ছিলেন। 

কিন্তু ১১৯৩ খ্রিস্টাব্দে বখতিয়ার খিলজি নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়কে ধ্বংস করেন। তিনি নালন্দায় ধ্বংসলীলা চালান। নালন্দা ধ্বংসের ইতিহাস জানা যায় ঐতিহাসিক মিনহাজ-ই-সিরাজ-এর লেখা বই তাবাকাত-ই-নাসিরী বইতে। মিনহাজ-ই-সিরাজ নালন্দা ধ্বংসের কয়েক দশক পরে নালন্দায় এসেছিলেন। স্থানীয়দের কাছে এবং যারা বখতিয়ারের আক্রমণের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছিলেন, তাদের কাছে বিস্তারিত শুনে তিনি নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় ধ্বংসের ইতিহাস লিখে গিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, বখতিয়ার তার বাহিনী নিয়ে নিয়ে আক্রমণ করেন। প্রথমে পাশে থাকা একটি দুর্গ দখল করেন এবং দুর্গে থাকা অনেক ধন সম্পত্তি হস্তগত করেন। নালন্দার ভিতরে থাকা বেশিরভাগ মানুষ ছিল ব্রাম্ভন, তাদের মাথা কামানো ছিল। বখতিয়ার সকলকে হত্যার নির্দেশ দেন। মুসলমান সেনাবাহিনী নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিতরে তান্ডব চালাতে থাকে। নির্বিচারে ছাত্র-অধ্যাপকদের গলা কেটে হত্যা করা হতে থাকে। ভিতরে থাকা হিন্দু মন্দির ও বৌদ্ধ মন্দিরগুলিকে ভেঙে ফেলে মুসলমান সেনারা। তারপর তাঁর নজর পড়ে নালন্দার ভিতরে থাকা লাইব্রেরির ওপর। জানা যায়, নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ে মোট তিনটি লাইব্রেরি ছিল এবং মোট ৯ কোটি পুঁথি ছিল। বখতিয়ার খিলজি নির্দেশ দেন লাইব্রেরিতে আগুন লাগানোর। হাজার বছরের গবেষণালব্ধ জ্ঞান জ্বলে-পুড়ে ধ্বংস হতে থাকে। এছাড়াও, কিছু পুঁথি যেগুলো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল এবং আগুনের হাত থেকে বেঁচে গিয়েছিলো, সেইসব পুঁথিকে মুসলমান সেনাদের রান্নার জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হয়। অনেক বৌদ্ধ সন্ন্যাসী, ব্রাম্ভন যারা পালিয়ে বাঁচার চেষ্টা করেছিলেন, তাদেরকে হত্যা করা হয়। তারপরেও কিছু দর্শন, শাস্ত্র বেঁচে গিয়েছিলো কারণ দেশ-বিদেশের বহু ছাত্র নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আসতেন। অনেক ছাত্র বিশ্ববদিয়ালয়ের পুঁথি নকল করে নিজের সঙ্গে নিয়ে যেতেন। তাছাড়া অনেক পন্ডিত কিছু পুঁথি নিয়ে নেপালে পালিয়ে আশ্রয় গ্রহণ করেন। ফলে বহু পুঁথি বেঁচে যায়। মিনহাজ আরও লিখেছেন, বখতিয়ার অনেক বৌদ্ধ সন্ন্যাসী এবং ব্রাম্ভনকে  ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত করার নির্দেশ দেন। কিন্তু  তারা অস্বীকার করায় তাদের জীবন্ত পুড়িয়ে হত্যা করা হয়। নালন্দার লাইব্রেরিতে লাগানো আগুন কয়েক মাস ধরে জ্বলেছিল এবং কালো ধোঁয়া দূর থেকে দেখা যেত। 

নালন্দার ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কার ও ইতিহাস জানার জন্যে দুবার খনন করা হয়। বর্তমানে এটি একটি UNESCO হেরিটেজ স্থল হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছে। তবে আমাদের ভারতবাসীর লজ্জা এই যে, যে বখতিয়ার খিলজি নালন্দা ধ্বংস করেছিলেন, তাঁর নাম আজও সযত্নে বাঁচিয়ে রেখেছি আমরা। আজও কেউ যদি অতীত গৌরবময় ইতিহাসের খোঁজে নালন্দা দেখতে যেতে চায়, তাকে নামতে হবে বখতিয়ারপুর জংশনে। স্বাভাবিকভাবেই আমাদের কারওর মনে অসন্তোষ আসে না , কেন ধ্বংসকারীর নাম আমরা সযত্নে রেখেছি আমরা ? কারণ আমাদের  মনে এক বিকৃত মানসিকতার প্রবেশ ঘটেছে। সেই মানসিকতাকে সযত্নে কয়েকশো বছর ধরে লালন-পালন করে চলেছি আমরা। সেই বিকৃত মানসিকতার জন্য অনেক কিছুই হারিয়েছি আমরা। যতদিন ওই বিকৃত মানসিকতাকে আমরা বহন করে চলবো, ততদিন আমরা হারাতেই থাকবো। 

We are not big media organisation. Your support is what keeps us moving. Don't hesitate to contribute because, work, for society needs society's support. Jai Hind.

11 COMMENTS

  1. One reference is not enough to believe all these pro ga panda. Even proper investigation needs to evaluate the truth. Anti muslim writing indeed.

  2. নালান্দা শুধুমাত্র বক্তীয়ারের আক্রমনে শেষ হয়নি । আরো অনেক তৎকালীন আভ্যন্তরীণ কারন ছিল। একথাও অস্বীকার করার নয় যে এই সব বিপুল রাজ পৃষ্ঠপোষকতায় চলা এসব বৌদ্ধ বিহারের মধ্যে যা চলত সেটা বুদ্ধের শুরু র আদর্শের থেকে বহুদূরে। দূর্নীতি ও ভিখ্যুসঙঘের মানের অধঃপতন প্রকট হয়ে উঠেছিল।

  3. বকতিয়ার খলজি ছিলেন একজন সাধারণ সৈনিক, ধর্মীয় মূল্যবোধ তাঁর ছিল না. তার কর্মকাণ্ডে ইসলামকে বিচার করা যাবে না. এখনো এদেশ মুসলমানরাই শাসন করেন যদিও তাঁদের ধর্মীয় লেবাসটুকুও নেই.

Comments are closed.