কিবুৎজ- সমাজ ও রাষ্ট্রগঠনের শতবর্ষের একটি শিক্ষা

0
259

জয় রাজ

(প্রথম পর্ব )

শুরুর দিনগুলি

২০০০বছর ধরে মাতৃভুমি থেকে ক্রমাগত বিতাড়িত  ইহুদী জাতি পৃথিবীর নানাদেশে শরনার্থী হয়। সুসভ্য ইহুদীরা তাদের কঠোর শ্রম ও মেধার সমন্বয়ে প্রতিটি দেশে সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে। সমাজের কৃতি ব্যবসায়ী,প্রযুক্তিবিদ,বিজ্ঞানী,দার্শনিক,চিকিৎসক,শিল্পী হিসাবে  আশ্রয়দাতা রাষ্ট্রকে দিয়েছে নিরলস সেবা। কিন্তু বিনিময়ে একমাত্র ভারত ছাড়া প্রতিটি দেশ ভয়াবহ গনহত্যা ও নিপীড়ন চালিয়েছে ইহুদীদের উপর। শতাব্দীর পর শতাব্দী বিদেশ বিভুঁয়ে অত্যাচারিত হয়ে উনবিংশ শতকের শেষ থেকে তৎকালীন উসমানিয়া সাম্রাজ্যের প্রান্তভুমিতে  ছিন্নমূল  ইহুদীরা ফিরে আসতে থাকে।এরই নাম হয় আলিয়া ! প্রথম যারা ইস্রায়েলে ফিরে আসে তাদের মুসলিম সমাজের মাঝে বহু অসুবিধা ভোগ করতে হয়। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই ১৯০৯ সালে যারা দ্বিতীয় আলেয়া করে তারা নতুন ধরনের বসতি গড়ে তোলার পরিকল্পনা করে।শুধু মাতৃভুমিতে নতুন করে বসত করাই নয় সম্পুর্ণ নতুন এক সমাজ গঠন। তৎকালীন ইস্রায়েলকে বলা হত মৃতদেশ। শত শত বছরের মুসলিম শাসনে এইদেশ তখন শূন্য উষর এক ভুমি। এই ভুমিকে ফুল্লকুসুমিত করার ব্রত নিয়েই আসে ইহুদীরা। কৃষি ছাড়া তৎকালীন সময়ে আর কোন জীবিকার সম্ভবনা ছিলনা। তারা যে যৌথ কৃষিখামার গড়ে তোলে তার নাম দেয় কিবুৎজ অর্থাৎ ….সমাহার। প্রথম খামার গড়ে ওঠে দেগানিয়া,মাত্র ১২জন প্রাথমিক সদস্য নিয়ে। অবশ্যই একদশকের মধ্যেই শত শত প্রাথমিক সদস্য নিয়ে বড় বড় কিবুৎজ গড়ে উঠতে থাকে। ইস্রায়েলে মুলত তিন ধরনের জমি ছিল……জলাভুমি,মরু,পাথুরে জমি। কোনটাই চাষযোগ্য ছিলনা। জায়োনিস্ট কংগ্রেসের গৃহীত প্রস্তাব অনুযায়ী সারা বিশ্বের ইহুদীদের দানে গড়ে ওঠে জুয়িস ন্যাশনাল ফান্ড। এরই অর্থে জমি কিনে কৃষি খামার গড়ে ওঠে। মুসলমানদের তখন আদৌ ধারনা ছিলনা এই বন্ধ্যা জমি কিনে ইহুদীদের কি লাভ হবে! মুসলমানদের কাছে যা ছিল নিছক জমি  ইহুদীদের কাছে ছিল হারিয়ে যাওয়া মাতৃভুমি। সেই সেচহীন জমিতে কিবুৎজের সদস্যরা সেচব্যবস্থা গড়ে তোলে। জলাভুমির জল নিষ্কাশন করে চাষ যোগ্য জমি ও বসতি তৈরী হয়। কৃষিবিজ্ঞান ও ট্র্যাকটরের প্রয়োগ হয়। যে ইহুদীরা এসেছিল তারা ছিল শহুরে ব্যবসায়ী ও নানা পেশাজীবি। কেউ কৃষক ছিলনা ক্ষেতে কাজ করার অভিজ্ঞতাও ছিলনা। ইউরোপের শহরের জীবনযাত্রা ছেড়ে মরুময় দেশের অহল্যাভুমিতে তীব্ররোদে দিনের পর দিন পরিশ্রম অনেককেই অসুস্থ করে তুলত। তেমনি ছিল ম্যালেরিয়া,টাইফাস,কলেরার মত প্রাণঘাতী রোগের আক্রমন। জলের তীব্র সংকট,রুক্ষ ভূমি,মরুময় আবহাওয়া,কৃষিতে অনজ্ঞভিতা,পরিশ্রম,রোগের আক্রমন সবের মাঝে একটিই সংকল্প কিবুৎজ সদস্যদের উদ্বুদ্ধ করে যে যেভাবেই হোক তাদের মাতৃভুমিতে বাস করতেই হবে!

নতুন সমাজ গঠন 

কিবুৎজ কেবলমাত্র কৃষিখামার গড়ে তোলার আন্দোলন নয়। নতুন সমাজ নতুন মানুষ গড়ার সংগ্রাম। নতুন সমাজে সবাই সমান। সকলের সাথে মিলিত এক যৌথজীবন। এই কারনে প্রত্যেকের বেতন সমান নির্দিষ্ট হয়। কাজের ছোটবড় বিভেদ ঘোচাতে সবকাজেই পর্য্যায়ক্রমে সকলের অংশগ্রহন নির্দিষ্ট হয়। ফলে আজ যে হিসাবরক্ষক কাল পরশু সে চাষের ক্ষেত পোলট্রি ডেয়ারী বা রান্নাঘরে কাজ করবে। ব্যক্তিগত সম্পত্তি বলতে প্রায় কিছুই রইলনা। যৌথ লনড্রী, যৌথ আহারঘর তৈরী হল। একপর্য্যায়ে চায়ের কেটলীর মত সামান্যতম ব্যক্তিগত সম্পদ নিষিদ্ধ।কারন ওইটুকুর কারনেও দম্পতিরা নিজেদের নিয়ে বেশী সময় ব্যয় করবে। তার বদলে তারা সকলের সাথে সময় কাটাক। খাবার ঘরেও স্বামী-স্ত্রী একসাথে বসা চলতনা। খাবার ঘরেও আলাদা চেয়ারের বদলে বেঞ্চের  ব্যবস্থা যাতে সর্বদা যৌথ জীবনের কথা স্মরন থাকে। কিবুৎজ পরিচালনা হত গনতান্ত্রিক পন্থায় ভোটের মাধ্যমে। এভাবে রাষ্ট্রহীন একজাতির রাষ্ট্র পরিচালনার শিক্ষা শুরু হয়। কিবুৎজে সববড় ভুমিকা বদল হয় নারীর।নারী তার পুরুষসঙ্গীকে চিরাচরিত বাআল বা আমার প্রভুর বদলে ইশি বা আমার পুরুষ বলে সম্বোধন করতে শুরু করে। নারীর ওপর পুরুষের প্রভুত্ব শেষ করতে বিবাহ ছাড়াই নারীপুরুষের একত্রবাস স্বীকৃত হয়। সব থেকে বড় পরিবর্তন হয় চিরাচরিত কর্মক্ষেত্রে।চাষের ক্ষেত,পোলট্রি,ডেয়ারী,উদ্যানপালন,মাছচাষ,যন্ত্রসারাই,হিসাব সংরক্ষন,সংস্থা পরিচালনা- সবরকম শ্রমস্বাধ্য বা বৌদ্ধিক কাজে নারীর সমান সমান যোগদান বাধ্যতামুলক হয়। এইজন্য আরেকটি বিরাট পরিবর্তন আনতে হয়েছিল। নারীকে শিশুপালন থেকে মুক্তি। কিবুৎজে শিশুরা চলে এল বয়স ভিত্তিক শিশু আবাসে। মা বাবা দিনে তিনবার দেখা করে যেত। শিশুপরিচর্যা ও শিক্ষার সবদায়িত্ব নার্স ও শিক্ষিকাদের। ছেলে মেয়ে সকলের সারাদিন একসাথে খাওয়া দাওয়া লেখাপড়া খেলাধুলা হুটোপাটি। কেউ একমুঠো লজেন্স পেলে সকলের সাথে ভাগ করে খাওয়া।আবার তার মাঝেই ঝগড়াঝাঁটি। এভাবে হামাগুড়ি বয়স থেকে একদিন সবল সমর্থ যুবক যুবতী হয়ে ওঠা। এই যৌথজীবনের ফলে  ভাবি রাষ্ট্রের নাগরিকরা নিজেদের মধ্যে রক্তের সম্পর্কের মতই দৃঢ় বন্ধন অনুভব করে।নতুন সমাজের ভিত্তি হল এই ভালবাসা!

খামাররক্ষা থেকে দেশরক্ষা

ইহুদীদের প্রথম থেকেই মুসলমানদের প্রতি ব্যবহার ছিল বন্ধুত্বপূর্ণ। গৃহনির্মান,সেচ ও চাষের ক্ষেতে মুসলমানদের প্রাথমিকভাবে কাজ দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু মুসলমানরা কোনভাবেই সহযোগীতা করতে রাজী নয়। প্রথমে কিবুৎজ বসতিগুলোতে মুসলমানরা প্রধানত নারী অপহরনের জন্য হানা দিত। কিন্তু যখন বিপুল পরিমান ফসল উঠতে থাকে তখন ফসললুঠ লক্ষ্য হয়ে ওঠে। ইহুদীরা বাধা দিলে ফসলের ক্ষেত জ্বালিয়ে দেওয়া,সেচ ব্যবস্থা ধ্বংস,বাসস্থান নিশ্চিহ্ন  করা শুরু হয়। শান্তিপ্রিয় ইহুদীদের কোন সামরিক ঐতিহ্য নেই। যুগে যুগে তারা কেবল অত্যাচারিত হয়ে একদেশ থেকে অন্যদেশে আশ্রয় খুঁজেছে। কিন্তু এবার ইহুদীরা পণ করল…না আর দেশত্যাগ নয়….আমাদের গৃহ,ক্ষেতের ফসল,নারীর সন্মান রক্ষার জন্য লড়তে হবে….শেষ রক্তবিন্দু পর্যন্ত লড়াই হবে….প্রতিরোধ হবে। রাইফেল কেনা হল। ড্রিল ও সামরিক কৌশল শিখতে লাগল প্রতিটি নারীপুরুষ। ওয়াচটাওয়ার করে কিবুৎজ পাহারা শুরু হলো- দিবারাত্রি। এভাবেই জন্ম নিল প্রতিরক্ষা বাহিনী বার গোইরা থেকে হাগানাহ্। বিশ ও ত্রিশের দশকে মুসলমানদের হিংস্র আক্রমনে ক্রমাগত রক্তস্নাত হল হিব্রূজাতি। হিব্রূদের একেবারে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার অভিযানকে প্রতিহত করতে লাগল আরো শক্তিশালী হাগানাহ্। এরপর এসে গেল ইস্রায়েলী রাষ্ট্রগঠনে আরবরাষ্ট্রগুলির যৌথআক্রমনের মুহুর্ত।দেগানিয়ার কিবুৎজিম সদস্যরা রুখে দিল সিরিয় ট্যাঙ্কবাহিনীকে। সারা দেশে কিবুৎজিমের সদস্যরা বুকের রক্ত ঢেলে সদ্যপ্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রকে রক্ষা করল। হাগানাহ হয়ে উঠল  ইস্রায়েল ডিফেন্স ফোর্স বা আইডিএফের ভিত্তিভূমি। শুধু প্রতিরক্ষা বাহিনী নয়, অস্ত্র তৈরীতেও প্রথম কিবুৎজ। প্রথম শুরু হয় গ্রেনেড তৈরী। ধীরে ধীরে জটিল ও ব্যাপক সামরিক সম্ভারের উৎপাদনে বিনিয়োগ করতে থাকে কিবুৎজগুলি। বর্তমানে ইস্রায়েলের সামরিক শিল্পের একটা বড় অংশ জুড়ে আছে কিবুৎজ। যুদ্ধের পর যুদ্ধে বিজয়ী বিশ্বত্রাস প্রতিরক্ষা বাহিনী, বিরাট গনফৌজ বিশ্বসেরা সামরিক শিল্প সবকিছুই শুরু হয়েছে  ছোট্ট কিবুৎজ রক্ষায় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ একদল নারীপুরুষের থেকে! (ক্রমশ )

We are not big media organisation. Your support is what keeps us moving. Don't hesitate to contribute because, work, for society needs society's support. Jai Hind.